নিবন্ধ

ঈশানকোণ একটি সাহিত্যের ওয়েবজিন এপ্রিল-মে-জুন ২০১৮ ইং

[ঈশানকোণ নতুন সংখ্যা দেখার জন্যে এখানে ক্লিক করুন]

মৃত্যুঞ্জয়ী রবীন্দ্রনাথ
বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী

জন্ম যেমন আশ্চর্য সুন্দর, স্বাভাবিক, মৃত্যুও তেমনি। অপরপক্ষে জন্ম যেমন আনন্দদায়ক, মৃত্যুও তেমনি বেদনাদায়ক। রবীন্দ্রনাথের জীবনচর্চা জন্মমৃত্যুর হাসিকান্নার কোলাহল দ্বারা আন্দোলিত।
সন্নিকট মানুষের ঘন ঘন মৃত্যু দ্বারা আন্দোলিত রবীন্দ্র জীবনের স্থায়ী রস বোধ-করি শান্ত বিস্বাদের। রবীন্দ্রজীবনের কৈশোরেই ঘটে মাতৃবিয়োগ – বয়স তাঁর চৌদ্দ, খৃ ১৮৭৫, সে সময়ে অনুভূতি খুব তীব্র নয় – ঘুমেই ছিলেন – ভোরবেলা জেগে দেখেন বারান্দায় তাঁর সুসজ্জিত দেহ খাটের ওপরে শয়ান – তবে মৃত্যু যে ভয়ংকর সে দেহে তার কোন প্রমাণ, সে পরিস্থিতে ছিল না। জীবনস্মৃতিতে সেই দৃশ্যকে লেখক বলেছেন, “তাহা সুখসুপ্তির মতোই প্রশান্ত ও মনোহর।” মায়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সংসর্গ খুব নিবিড় ছিল না – না হলে চৌদ্দ বৎসরের বালকের কাছে মায়ের মৃত্যু কীভাবে মনোহর হয় তা বোঝা ও বোঝানো দুই কঠিন। এর পরের মৃত্যুদৃশ্যে (খৃ ১৮৮৪) গভীরতর বেদনা সৃষ্টি করেছে কবিমনে কারণ এই মহীয়সী কাদম্বরী – কবির ভ্রাতৃজায়া যিনি মায়ের অভাব যেমন দূর করেছেন সেবায় ও যত্নে তেমনি বন্ধুর সংসর্গ দিয়ে কবির সৃষ্টির জগৎকেও পরিপূর্ণ করেছিলেন – এই মৃত্যুর সময় রবীন্দ্রনাথের বয়স কিন্তু ২৪। এর স্থায়ী প্রভাব সারা জীবনে রয়েছে। সমসাময়িক পাঁচটি গ্রন্থ তাঁকেই উপহৃত। এটাই অভিজ্ঞতার শেষ পরিণতি নয়। এর কিছুকালের মধ্যেই মৃত্যু ঘটে আনা তড়খড়ের (খৃ ১৮৯১) যার কথা পরিণত বয়সেও বিবিধ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ভুলতে পারেননি। এরপরে ভ্রাতুষ্পুত্র বলেন্দ্রনাথ (১৮৯৯), সহধর্মিণী মৃণালিনী দেবী (১৯০২), তার বছর ঘুরবার আগেই গেলেন ক্ষয়রোগে কিশোরী সদ্য বিবাহিতা কন্যা রাণী (১৯০৩), এর দু বছর পর পরিণত বয়সে মহর্ষির শেষ শয্যা (১৯০৫)। কবির শান্ত কণ্ঠের স্তোত্রপাঠ, আবার আঘাত দুবছর বাদেই কনিষ্ঠ পুত্র শমীর মৃত্যু (১৯০৭), মাত্র এগার বছর, মুঙ্গেরে সহপাঠি বন্ধুর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে কলেরায় আক্রান্ত হন। খবর পেয়ে রবীন্দ্রনাথ সেখানে গেলেন। কিন্তু ছেলেকে নিয়ে ফিরতে পারলেন না। এরপর মেজভ্রাতা সত্যেন্দ্রনাথ (১৯০৮), ক্ষয়রোগে জ্যোষ্ঠা কন্যা মাধুরীলতা (১৯১৮), জ্যোতিদাদা (১৯২৫), বড়দাদা (১৯২৬) এবং দৌহিত্রের কনিষ্ঠা কন্যা মীরার পুত্র সতীন্দ্রনাথ (১৯৩২) উচ্চ বিদ্যালাভের জন্য জার্মানীতে গিয়ে অসুস্থ ও মৃত্যুবরণ। তার কিছুদিন পরে তার সকল গানের ভাণ্ডারী ভ্রাতুষ্পুত্র দ্বিজেন্দ্রনাথের পুত্র দৌহিত্র দীনেন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন ত্যাগের কিছুদিনের মধ্যেই মারা যান। রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ জীবনের কালসীমায় এই তো গেল মৃত্যুর ভাসানযাত্রা।

এবার রবীন্দ্রনাথ জীবনের বিভিন্ন সময়ে মৃত্যুকে কীভাবে কী বিভিন্ন রূপে দেখেছেন এবং সামগ্রিকভাবেই তাঁর কাছে মৃত্যুর সম্যক সাধারণ চেহেরা কী ছিল তা জানার চেষ্টা করা যেতে পারে। প্রত্যেক মানুষই মৃত্যুকে অবশ্যম্ভাবী জানে – এটা ঠিক, তা জেনেও তাকে সে ভুলে থাকতে চায় – রবীন্দ্রনাথও চাইতেন, সাধারণভাবে দেখতে গেলে তিনিও একজন নির্ভেজাল মানুষ।

রবীন্দ্রনাথ এও জানতেন জাগতিক নিয়মে প্রাপ্তির সঙ্গে সাধারণ বিস্মরণও স্বাভাবিক। তাই পৃথিবী কবিতায় দেখি তিনি মাটির ফোঁটা একটি তিলক নিয়ে জীবপালিনীকে প্রণতি জানাচ্ছেন নিজেকে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হওয়ার আগেই।

ব্যক্তিগতভাবে দেখলে মৃত্যুকে তাঁর উৎকট সত্য হিসাবেই মেনে নিতে হল। কিন্তু আরেকটা দিক থেকে মৃত্যু তাঁকে বিচলিত করে। যখন দেখেন তাঁর দেশের তাঁর সমকালীন পৃথিবীর মানুষ সমাজভেদের শিকার হয়ে মারা পড়ছে – তাই হিজলীর ছেলে রাজবন্দি খুন হলে, জালিয়ানওয়ালাবাগে অত্যাচারীর নৃশংস বিধানে রাশি রাশি মানুষের জীবনহানি ঘটলে, দেশে অশিক্ষায় অনাহারে অপুষ্টিতে, রোগে মারিতে মড়কে, বৃথা মৃত্যুর বিভীষিকা তাকে কোনো কবিত্ব দ্বারা মধুর করে দেখার চেষ্টাও তিনি করেননি। অপরদিকে বৃহত্তর জীবনদৃষ্টিতে দেখলে মৃত্যুর অবশ্যম্ভাবী ভিন্নরূপ তাঁর চোখে ভাসে। এ মৃত্যু শুধু স্বাভাবিক নয়, সামাজিক প্রয়োজনেও। মৃত্যু আছে বলেই সেখানে জীবন আছে। শুধু তাই নয়, মৃত্যু আছে বলেই জীবনে নতুনের আবির্ভাবের সম্ভাবনাও জেগে থাকে।

মহর্ষির চেতনাজাত বিশ্বসন্দর্শনের বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে কবির মনে এক অদ্ভুত বৈরাগ্য বা নিরাসক্তি জেগে থাকে তখন মৃত্যুকে আর ভীতিজনক মনে হয় না। তাই তাঁর একান্ত আপনজনেরও মৃত্যুশোক উত্তরণে কবি শোকে অবিভূত হন কিন্তু পরাভূত হন না। দৈনন্দিন সৃষ্টিমূলক ও সামাজিক কর্মে তার একচুলও বিচ্যূতি ঘটেনা। তাই একান্ত করে পাওয়া এবং একান্ত করে ছেড়ে যাওয়া দুইই তাঁর কাছে সমান সত্য বলেই প্রতিভাত হয়।

আরেকটা কারণ, মৃত্যু জীবনকে উজ্জ্বলতর করে প্রকাশ করে। কোনো সত্যলাভের জন্য কোনো মহৎ আবির্ভাবের জন্য কোনো মানবাদর্শ রক্ষার জন্য মৃত্যুবরণকে কবি সানন্দে বরণ করতে প্রস্তুত কারণ গুরুগোবিন্দের জন্যে তিনি কখনো কখনো মানেন –
হায়, সে কি সুখ, ...
অত্যাচারের বক্ষে পড়িয়া
হানিতে তীক্ষ্ণ ছুরি।

উদয়ের পথে তাই মাভৈঃ সংগীত শোনান, বোদ্ধা মানুষকে আশ্বাসও দেন –
প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।
(প্রবন্ধসংগ্রহ, বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী)
                                                                                                                                     HOME

এই লেখাটা শেয়ার করুন