ছোটোগল্প

ঈশানকোণ একটি সাহিত্যের ওয়েবজিন বইমেলা সংখ্যা ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ইং 

[ঈশানকোণ নতুন সংখ্যা দেখার জন্যে এখানে ক্লিক করুন]

স্থানে অস্থানে
প্রদীপ সরকার

প্রচণ্ড ঝড় মাথায় অংশু বাস থেকে নামল। এ অঞ্চলের মানুষ এটাকে বাস না বলে কৃষ্ণ সিং-এর মুড়ির টিন বলে। যানটির হতাশার জন্য, নাকি রাক্ষসের মত যাত্রী গেলার জন্য; বিষয়টি দ্ব্যর্থক। তবে দূর সীমান্ত গ্রামের জন্য কৃষ্ণ সিং আর বনমালীর ঝরঝরে বাস দুটিই সুপার ডিলাক্স। শহরমুখো মুটে-মজুরের কাছে খুব আপন। একমাত্র ভরসাও বটে। অনেকে একটু সুব্যবস্থা পাবার জন্য মালিক কাম ড্রাইভারকে খাতির করে। সুযোগ পেলেই চা, খাস্তা বিস্কুট বা কুকিজ খাইয়ে খাতির জমায়। এও খুব কঠিন কাজ। কৃষ্ণ সিং, বনমালী সবসময় দার্শনিকের মত ভাব ধরে থাকে। ‘সেবাহি পরম ধর্ম’, একদম নির্লিপ্ত। শুধু উপাস্য বাসটির চারপাশে চোখ বুলায়। কখনও আবার যন্ত্রযানটির যখন তখন জ্বালাতনে খিটখিটে হয়ে থাকে। স্টিয়ারিং ছেড়ে লাফ দিয়ে মাটিতে নামলেই মনে হয়, এইমাত্র রগচটা গিন্নির সাথে তুমুল খটাখটি করে ঘর ছেড়েছে। অংশু কোনোদিনও তাদের মন যোগানোর চেষ্টা করে না। আজকেই বোধহয় প্রথম সিটে বসে আসতে পারল। সে আজ অসময়ে ফিরেছে।
বৃষ্টির তেজ আরও বেড়ে গেছে। চারিদিকে ঝাপসা। বাসটি অংশুদের ওঠানামার জায়গা থেকে আরও প্রায় দেড় ফার্লং আগে নামিয়ে দিয়েছে। বৃষ্টির ফোঁটায় চোখেমুখে রীতিমতো ঢিল খাওয়ার মতো ব্যথা লাগছে। বেশ কতকটা হাঁটার পর তার গ্রামের রাস্তা – ঠিক রাস্তা নয়, মোটাসোটা একটা আলপথ। সেখান থেকে আরো দুই কিলোমিটার। বৃষ্টি বর্শার মতো গায়ের চামড়ার ভেতর বিঁধে যাচ্ছে। অংশু বৃষ্টিকাতর গরুবাছুরের মতো মাথা গুঁজে দৌড়ের মতো হাঁটছে। মুষলধারে বৃষ্টির কারণে আজ ঢালাইয়ের কাজ বন্ধ, পেমেন্টও বন্ধ। বেলা থাকতেই শূন্য হাতে ফিরতে হচ্ছে। সাধারণত সঙ্গীদের সাথে শেষ বাসে বাদুরঝোলা হয়ে ফেরে সে। দিনের রুজিটাও হাতে থাকে। আজকেই বকুল বলেছিল, দোকানি সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে – গত সপ্তাহের টাকা পরিষ্কার না করলে আর এক পয়সার জিনিসও দেবেনা। ভিজতে ভিজতে ঠাণ্ডায় অংশুর শরীরে কাঁপন ধরে গেছে। কিন্তু দোকানির কথাটা মনে পড়তেই তার কানদুটো আস্বাভাবিক গরম হয়ে ওঠে। ঘরে যে আজ এক মুঠোও চাল নেই, সেটা সকালে হাঁড়িতে বকুলের হাতা নাড়ার সতর্কতাতেই আঁচ করতে পেরেছিল। বকুল এ বেলাও ঢকঢক করে জল গিলে পেট ভরাবে ? দুঃশ্চিন্তায় তার মাথা ঘুরছে।
বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে অংশুর খসখসে ধূসর পায়ের পাতাগুলো যেন ছলম ছেড়ে নতুন হয়ে উঠেছে। এত ঝকঝকে ফ্যাকাশে পা দেখে নিজেই চমকে উঠেছে। দ্বারে দ্বারে ঘুরতে ঘুরতে তার শুধু পাগুলোই নয়, গোটা শরীর, জীবন – সবটাই বিবর্ণ। পাগুলোর দিকে তাকিয়ে হাঁটতে অংশুর বেশ ভালো লাগছে। হারানো ধন ফিরে পাওয়া। চোখের ভিজে পাতায় অতীত-স্মৃতি আর স্বপ্নের ছবি ভেসে উঠছে। শৈশব থেকে চাকরির বয়স উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত অম্ল-মধুর এক পর্ব।
সোঁ-সোঁ করে টিলার লাল জল ঢালু জমির দিকে নামছে। জমা জলে জমি-রাস্তা প্রায় একাকার। বিষাদময় মগ্নতায় অংশুও ডুবে গেছে। চলার গতি অনেকটা মন্থর। মাথা গুঁজে হাঁটার ভঙ্গিতে মনে হয় একালের কোনও ব্যর্থ পর্যটক কালো কুচকুচে পিচের রাস্তায় পায়ের ছাপ এঁকে এঁকে সামনে এগোচ্ছে। অংশু হঠাৎ চমকে দুপা পিছিয়ে গেল। অন্যমনস্কতায় কিছু বুঝে উঠতে পারেনি। এ অঞ্চলে মাঝে মাঝে বিরাট আকৃতির দাঁড়াশ, ময়াল-সাপের সাক্ষাৎ মেলে। ঘোর কাটতেই দেখে প্রকাণ্ড এক শোল মাছ শরীর-লেজ বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে সরীসৃপের মতো পিচের রাস্তা পার হচ্ছে। এ এক অসম্ভব ব্যাপার। এই অস্থানে এটা এলো কী করে ? আশেপাশে মাছ বসবাস করার মতো কোন জলাই তো নেই। সকালে যাওয়ার সময়ও দেখেছে খটখটে মাঠে ছাগলেরা খুঁটে খুঁটে ঘাস খাচ্ছে। চারদিকে তো শুধু টিলার গড়ানো জল। অংশু হাতের ছেঁড়া চপ্পলগুলো ছুঁড়ে ফেলে অতি কষ্টে কসরৎ করে শোলের ঘাড় দুহাতে চেপে ধরল। পরক্ষণে তার মনে পড়ল; ব্যাটাকে বধ করে নয়, জ্যান্ত নিয়ে যেতে পারলে বকুলকে তাক লাগিয়ে দেয়া যাবে। লেজের কয়েকটা জুতসই আঘাতে অংশুর কব্জি প্রায় অবশ হয়ে যাওয়ার মতো। শক্ত বন্য লতার নাকা পরানো বিশাল শোল মাছ অংশুর হাতে ঝোলানো। অংশুর চলার গতি আবার অনেক বেড়ে গেছে। মাঝেমাঝেই জোর ঝাঁকুনি দিয়ে ল্যাজায় এমন চাত্তি মারছে; অংশু বেসামাল হয়ে যায়।
ক্রমাগত ভিজে অংশুর ঠাণ্ডায় জমাট চোয়ালে, বদ্ধ মুখের অভ্যন্তরেও একটা স্বাদু তরল রস ভরে উঠছে। আদা, পেঁয়াজ, জিরাবাটা দিয়ে তেল-কৈয়ের মতো মায়ের হাতের শোল মাছের কুটি ভাজা – আঃ অমৃত! বকুল কি সেরকম রান্না করতে পারবে ? তা পরখ করার কোনও সুযোগই তো হয় নি। বিয়ের পর থেকে শাক-লতাপাতা ছাড়া কোনোদিন রান্নার কি তেমন কোনও ভাল জোগাড়পত্র দিতে পেরেছে ?
তিনমাসের মাথায় প্রথম সন্তানটা যখন নষ্ট হয়ে গেল, অনেক ধারদেনা করে ডাক্তার দেখিয়েছিল। ডাক্তারের দেওয়া খাবার-দাবারের ফর্দ অংশুর কাছে রাজসূয় যজ্ঞের মতো।
‘যে পরিমান রক্তস্বল্পতা। মাছ-মাংস-ডিমের দিকে একটু ঝুঁকুন। নইলে সন্তান টেকানো দায় হবে’।

মাছটা মাঝে মাঝে এমন ঝাঁকুনি দিচ্ছে, মনে হচ্ছে মনে হচ্ছে অংশুর দান হাতটা কাঁধ থেকে ছিঁড়ে নিয়ে পালাবে। অংশুর মনে ডাক্তারের ফর্দপূরণের অসামর্থ্যের দুঃখ দূর করতে বকুল প্রায়শ তাচ্ছিল্যের সুরে বলত, ‘রাখ তোমার ডাক্তারের ফর্দের কথা। একজন বলবেন মাস-মাংস-ডিম-দুধের দিকে ঝুঁকুন, আরেকজন বলবে সজনে পাতার রস খান – দুধের সমান। কলমিশাক, কলার মোচা, থোর খান – ফুল আব আয়রন। আগে আমিষ-নিরামিষের বিতর্ক শেষ হোক, পরে ডাক্তারের ফর্দ নিয়ে ভাবা যাবে’।
ক্রমাগত শরীর ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে আর হাঁ করে থাকতে থাকতে মাছটি যেন নিস্তেজ হয়ে পড়ল। অংশু ভাবছে, না, ব্যাটার দম ফুরোলে চলবে না। একদম জলজ্যান্ত প্রবল পরাক্রম মাছ বকুলের হাতে তুলে দিতে হবে। লেজের চাট্টি খেয়ে বকুল কী করে সামলায়, তা দেখতে মজার ব্যাপার হবে। একটা উঁচু জায়গার সামান্য গর্তে পরিষ্কার টলটলে জল জমে আছে। এখান থেকে ছুটে পালানো সম্ভব হবে না। অংশু একটু দম নেওয়ার জন্যে মাছটিকে সেই গর্তে ছাড়ল। দীর্ঘক্ষণ হাঁ করে থাকা মুখের কপাটটি বন্ধ করতেই বেচারার মুখ থেকে কয়েকবার বুদবুদ বেরিয়ে পড়ল। তারপর একদম নিস্তেজ সটান শান্তভাবে পড়ে থাকে। অসহায় অবস্থাটা দেখে মাছটির উপর অংশুর ভীষণ মায়া পড়ে গেছে। একমনে তাকিয়ে থাকে তাই।
‘এতো জল, জলা, নদী-ছড়া থাকতে এই ডাঙার রাস্তায় অস্থানে কেন মরতে এলি ? তোদের তো আর কাজ খুঁজতে মানুষের মতো যেখানে সেখানে যেতে হয় না যে জায়গায়-অজায়গায় পড়ে মরবি? ’
মাছটি আবারও বারকয়েক চোয়াল নেড়ে মুখে বুদবুদ ছাড়ল। বৃষ্টির জোর অনেকটা কমে এসেছে। রঙিন কাঁচের মার্বেলের মতো লাল চকচকে মাছের চোখ দুটোর দিকে তাকাতেই অংশুর গা-টা ছমছম করে উঠল। আগুনের মতো লাল পাতিহীন চোখ দুটো যেন তাকে শাসাচ্ছে, ‘চাঁদু! তোমাকে একবার যদি গভীর জলে নাগাল পেতাম! অন্তত বুকের দু-তিনটি পাঁজর ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতাম।এখন আমাকে নিয়ে খেলা করছ ? ’
এমনই লাল গোল গোল দুটো আগুনে চোখ একদিন অংশুকে ভয় দেখাতে জ্বলে উঠেছিল। পাড়ার তথাকথিত যুবনেতা রক্তচক্ষু করে শাসিয়েছিল, বকুলের সঙ্গে ফের দেখতে পেলে ভুঁড়ি ফাঁসিয়ে নদীতে ফেলে দেবে। চোখ দুটো শোল মাছের মতোই এমন বিশ্রী ছিল। অংশু একটু অন্যমনস্ক। সেদিনের জেদের কথাটা সে ভাবছে। বকুল কত দুঃসাহস দেখিয়েছিল।
‘গুণ্ডাটা কী বলেছে ? আমার সাথে সম্পর্ক ছাড়তে হবে ? চল, এক্ষুণি তার বাড়ির সামনে দিয়ে শহরে যাব।’
শোল মাছটা লেজ দিয়ে জোর চাত্তি মেরেছে। গেরিলার মতো অতর্কিত হানা। জলের জোর ঝাপটায় অংশুর দুচোখ বন্ধ হয়ে গেছে। চোখ থেকে হাত সরাতেই দেখে বেচারা আবার শান্ত। মুখ দিয়ে একটু একটু করে খাবি খাচ্ছে। তবে অংশুর দিকে ভয়ঙ্করভাবে তাকিয়ে আছে। অংশু মনে মনে ভাবছে, শোল গজার জাতীয় মাছগুলো কুলীন সম্প্রদায়ভুক্ত নয় বলেই বোধহয় জান বড় শক্ত। সহজে কাবু হতে চায় না। কইমাছের জান তো আরো শক্ত। কেটে কড়াইয়ের গরম তেলে ছাড়লেও জেদে লাফাতে থাকে। হার মানতে নারাজ।
অংশু এমন হার না মানা জেদ দেখেছে বকুলের বান্ধবী তাপসীর মাসির। কিছু কাঠের যেমন উল্টো আঁশ থাকে, র‍্যাঁদায় পালিশ করা কঠিন, সেইরকম। যুবনেতা মন্ত্রী হবেন বলে রব ওঠায়, ওনাকে এখন আর কুড়িয়ে খেতে হয় না। হাতের দৈর্ঘও বেশ বেড়ে গেছে। সেই লম্বা হাতে বকুলকে ধরতে না পেরে, যখন অংশু-বকুলের প্রাণনাশের হুমকি চলছে, তখন এই মাসি রক্তচক্ষুর সামনে রুখে না দাঁড়ালে বকুলকে পাওয়া কি সম্ভব হত ?
আজকে কেন জানি অংশুর শুধু শরীরটাই নয়, বকুলের জন্য তার মনটাও ভীষণভাবে ভিজে উঠেছে। অনাহার, অর্ধাহার, অপুষ্টির কারণে প্রথম সন্তানটিকে যখন পৃথিবীর আলো দেখাতে পারল না, স্বপ্নের সব কুঁড়ি যখন ঝড়তে শুরু করেছে, তারপরেও সে মুখের হাসিটাকে কী করে বাঁচিয়ে রাখে! অংশুর উপর তার কোনও অনুযোগ নেই, অভিমান নেই। বরং উল্টো কথা বলে, ‘অংশু, তোমার জীবনে আমি যদি না আসতাম, তাহলে তো তোমার মতো মেধাবীর জীবনটা এমন ছারখার হত না!’
অবশ্য অনুযোগ করবে কেন ? বকুল তো দেখছে, অংশু কী না করছে! তার কৃতিত্বের একগাদা ছাড়পত্র নিয়ে সে কোথায় না গেছে! বকুলের প্রচেষ্টাও কি কম ? তার চেয়ে কম যোগ্যতার অনেকেরই কিছু একটা সংস্থান হয়েছে। তাদের টাকাভর্তি মুঠি আর পেছনের খুঁটি – দুটোর একটাও নেই। কত পাত্রে-অপাত্রে ঘুরেছে, কোথাও নির্দয় সম্ভাষণ, কোথাও প্রত্যাশার হাতছানি – এক একসময় মনে হয়েছে, আশার ঘন মেঘে আকাশ ভারি হয়ে উঠেছে, মাথার খুব কাছে নেমে গেছে, তাদের বিশুষ্ক জীবনে বর্ষণ হতে আর বেশি বাকি নেই।
অংশু শেষ ইন্টারভিউর জন্য যেদিন পেছনের সারিতে দাঁড়ানো, সেইদিনই বুঝতে পেরেছে প্রতারণার মেঘ উধাও। তার হাতে ময়লা ছেঁড়াফাড়া ছাড়পত্রগুলো দেখে অনুজ এক কর্মপ্রার্থী দুঃখ করে বলেছিল, ‘অংশুদা, সার্টিফিকেটগুলোর কী দশা করেছেন ? লেমিনেশান করাতে পারলেন না ?’
অংশুর মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি। খেলা শিক্ষা, সাংস্কৃতিক জগতের একগাদা ছাড়পত্র মেলে ধরে বলেছিল, ভাই, এইগুলোর আয়ু মাত্র তিনমাস। তারপর আমার ডবল ডিগ্রি হয়ে যাবে। বেকার প্লাস ওভার এজ্‌ড্‌!’
সেদিন অন্যদের সাথে অংশুও বাতাস কাঁপিয়ে হেসেছিল, তবে সেটা ছিল একধরণের কান্না।

অংশু মাছ আর চপ্পলের মধ্যে হাতটা একটু বদল করে নিল। ডানহাতের কব্জিটা বেশ ধরা ধরা ঠেকছে। মাছটা অনেকক্ষণ পর আরেকটা ঝাঁকুনি দিয়ে বুঝিয়ে দিল সে দমবার পাত্র নয়। এই নাড়ানাড়ি তার পছন্দ হচ্ছে না। অংশু এখন তার ডানহাতের কব্জির জন্য বেশিক্ষণ ভারী কিছু বইতে পারেনা। একদিন উপরে ইট ছুঁড়ে দেবার সময় মিস্ত্রির হাত থেকে ফসকে পড়ে কব্জিটা দারুণ জখম হয়েছিল। সমবেদনার পরিবর্তে ঠিকাদারের গালমন্দ শুনতে হয়েছে, ‘আগেই বলেছিলাম, এইসব অর্ধশিক্ষিত দিয়ে কোনও কাজ হবে না। না হালের না বীজের। তখন কত তোষামোদ – আমাকে একটু সুযোগ দিয়ে দেখুন, আমি সব পারি। দেখলাম তো পারার ছিরি।’
সেইদিনই অংশু প্রথম তার বিদ্যা, বুদ্ধি, মর্যাদা সব থান ইটের নিচে চাপা দিয়েছিল। বকুলের কষ্টটা তাকে বোবা করে দিয়েছে। কোনও প্রতিবাদ করেনি। তার বর্তমান বাস্তব অবস্থার সাথে দুটো জগতকে কোনোভাবেই মেলাতে পারছিল না। কলেজে অধ্যাপক পিঠ চাপড়ে বলেছেন,’অংশু, এইভাবে চালিয়ে যেতে পারলে তোমার দ্বারা অনেক কিছুই সম্ভব।’ আর ঠিকাদার ? নিষ্কর্মা অপদার্থ অংশু সত্যের কোনও সংগতি খুঁজে পায় নি।
কব্জির ব্যথাটা আড়াল করতে অংশু বকুলকে অনেক মিথ্যে কথা বলেছিল। আজকাল তাকে অনেক জায়গায় মিথ্যের আশ্রয় নিতে হয়। পরিচিত এলাকা ছেড়ে অনেক দূরে কাজ খুঁজতে যায়। বাড়ির ঠিকানা, নাম সঠিক বলে না। মজুরের কাজ খুঁজতে গেলে বলে স্কুলের গণ্ডি পেরোতে পারেনি। বকুলকে বলেছে, শহরে খাতা লেখার কাজ করে। প্রথম প্রথম বিছানায় এলানো অবসন্ন শরীরটা দেখে বকুল ভ্রূ কুঁচকে প্রশ্ন করত, ‘খাতা লেখা তো বসে বসে কাজ। তুমি এত ক্লান্ত হয়ে পড় কেন!’ এই সন্দেহকে নিয়ে বকুল বেশিদূর এগোতে সাহস পায় না। অংশু কি জানে যে বকুল শহরে টিউশানি করতে যায় না, দুটো বাসায় ঝিয়ের কাজ করে সে। অথচ অংশুকে বলেছে তার বান্ধবী দুটো টিউশান জোগাড় করে দিয়েছে। অভাব আর স্বভাবের নিকট-সম্পর্ক নিয়ে অংশুর কোন মাথাব্যথাও নেই, লজ্জাও নেই। এই মুহূর্তে সমস্ত মন জুড়ে শুধু আজকে বকুলের উচ্ছ্বাসটা দেখার অপেক্ষা।
যাই হোক, কোন বিপত্তি ছাড়াই মাছটা নিয়ে অংশু বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে গেল। ঠিক করেছে আগে থেকে বকুলকে কিছু বলবে না। হঠাৎ চমকে দেবে। ঘরে তখনো তালা। বকুলও বেরিয়ে যায়। এক তালার দুই চাবি। সাধারণত বকুলই আগে ফেরে। এইবার অংশু কিছুটা দমে গেল। বকুল ঘরে না থাকায় তার প্রথম ক্লাইমেক্সটাই নষ্ট হয়ে গেল। বৃষ্টির জন্যে বোধহয় বকুলের আসতে এত দেরী। গত বর্ষার আগে থেকেই বলে আসছিল, একটা ছাতা কিনে দেবে। হয়ে ওঠে নি। মেয়েদের ছাতা তো শুধু রোদ-বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচানো নয়, সময়-অসময়ে অনেক কিছু থেকে আড়াল করে। ঢালাইয়ের কাজটা না হওয়ায় আজকের রুজিটাও মার খেল। আবার একটা ঘাটতিতে পড়ে গেল। অনিশ্চিত কাজে প্রায়ই তাকে এমন ঘাটতিতে পড়তে হয়। তবে যাই হোক, আগামী সপ্তাহের টাকাটা পেলেই চোখমুখ বন্ধ করে বকুলকে একটা ছাতা কিনে দেবে। ছাতাটা থাকলে তো বকুল এতক্ষণে চলে আসত। এত রাত হত না। পুরুষরা তো ভিজে ভিজেও আসতে পারে। মেয়েরা ভিজলে তো আবার অনেকের চোখে বিশেষ দ্রষ্টব্য হয়ে ওঠে। বকুলের লজ্জাটাও এমনিতেই সাধারণ মেয়েদের চাইতে একটু বেশি। পালিয়ে এসে বিয়ে করার পর অংশু একদিন বলেছিল, ‘এত লাজুক মেয়ে দুঃসাহসী প্রেমিকা হয় কী করে?’
‘যে শৈশবে তোমার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল, তখন কি লজ্জা জন্মাবার বয়স হয়েছিল?’
‘যখন বয়সটা পেলে?’
‘কিছু না, পুরানো সম্পর্কের শুধু রূপান্তর ঘটল।’

মাছটাকে নিয়ে অংশু খুব মুশকিলে পড়েছে। এতবড় মাছ ঘরে জিইয়ে রাখার মতো কোন পাত্রই নেই। শেষমেশ একটা ভাঙা বড় কড়াইয়ে সামান্য জল দিয়ে মাছটাকে বৃত্তাকারে রেখে কাঠ দিয়ে ঢেকে রাখে। বেচারা শোল এখন আর নড়াচড়া করছেনা। অংশু তার নিস্তেজ অবস্থা দেখে চিন্তিত। বকুলকে বোধহয় আর জ্যান্ত দেখানো সম্ভব হবেনা। আবার ভাবে, নাকি ভড়ং ধরে বসে আছে। আর শেষ লড়াই লড়ার জন্য দম নিচ্ছে।
রাতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অংশুর দুশ্চিন্তা বাড়ছে। না, ঘরে বসে আর অপেক্ষা করা যায় না। বৃষ্টি অনেকক্ষণ থেমে গেছে। বকুল কোনোদিন এত রাত করে না। দুশ্চিন্তা অংশুর উদ্বেগকে বাড়িয়ে তুলছে। অনেক সরল অথচ নিহত বিশ্বাসের নিষ্ঠুর ঘটনা একসাথে অংশুর মাথায় ভিড় জমাচ্ছে। লেকের জলে সবিতার নিষ্প্রাণ শরীরটা আবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। অংশু অজানা আশঙ্কায় বকুলকে খুঁজতে উদ্ভ্রান্তের মতো বেরিয়ে পড়ে। কোথায় খুঁজবে? সে তো কোনও ঠিকানা জানে না। একজন মানুষকে তো আর বাড়ি বাড়ি খোঁজা যায় না। নিশ্চেষ্ট হয়ে বসেও থাকা যায় না।

অংশুর ছোট্ট উঠোনে জমাট বাঁধা অন্ধকার। বোবা নিস্তেজ রাত চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে। প্রকাণ্ড শোল মাছটির সারা শরীর বালি-কাদায় মাখামাখি। চেনা যায় না। তবু ঘাড়-লেজ বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে জলের খোঁজে বাঁচার আশায় প্রাণপণ চেষ্টা করছে। অচলপ্রায় শরীরটা টেনে টেনে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সে কি তবে জলের কোনও ঠিকানা পেয়ে গেছে? ডাঙার এ কঠিন জীবন থেকে মুক্তি পেতে তার প্রাণান্ত প্রয়াস।

শোলটা তখনো মাথা লেজ বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে অংশুর উঠোনের সীমানা অতিক্রম করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে।
                                                                                                                                     HOME

SHARE THIS PAGE!