বিচ্ছিন্ন বারীন – সদানন্দ সিংহ

বিচ্ছিন্ন বারীন – সদানন্দ সিংহ

বিচ্ছিন্ন বারীন          (ছোটোগল্প)

সদানন্দ সিংহ

বি টেক পাস করার সঙ্গে সঙ্গেই প্রশান্ত ছেলেটা নতুন চাকরি পেয়ে এখানে জয়েন করেছে ট্রেনি হিসেবে। মাইনেপত্র অবশ্য বেশি পায় না, ট্রেনি বলে। কেটেকুটে মাসে পঁচিশ হাজারেরও কম পায়। কিন্তু চলনে তার ঠাটবাট সাংঘাতিক। সবসময় সে ব্র্যান্ডেড কোম্পানির দামি পোশাকআশাক, দামি জুতো, হাতে আইফোন নিয়ে চলাফেরা করে। এসব দেখে একটু অবাক হয় বারীন।
বারীন এ অফিসের বস নয়, তবে সিনিয়র আর্কিটেক। আর প্রশান্তের পোস্টিং হয়েছে তারই আন্ডারে। প্রশান্ত বারীনকে স্যার বলে সম্বোধন করে। অফিসের অন্যেরা অবশ্য তাকে বারীনদা বলেই ডাকে।
বারীন প্রশান্তকে যতই দেখে ততই অবাক হয়। কারণ প্রশান্ত সবার কাছেই গর্ব করে বলে বেড়ায়, তার জামার দাম কতো, প্যান্টের দাম কতো, জুতোর দাম কতো। বারীন মনে মনে ভাবে, আরে ব্যাটা — কী আছে তোমার ওই পাঁচহাজারী দামের জুতোর মধ্যে ! আমার এই জুতোটা দেখ, তোমার থেকে কম কিছু নয়।
এটা সত্যিই, বারীনের জুতোর দাম সাধারণত চারশ থেকে পাঁচশ’র মধ্যেই থাকে। খুব বেশি হলে আটশ। তাই বলে সে হিসেবী নয়, কৃপণও নয়। বরং সে ভাবে, আলতো-ফালতু খরচ না করে গরিব-দুঃখী কাউকে সাহায্য করা যেতে পারে এবং সে এটা করেও। এটা সে তার একার জন্যেই ভাবে না, সে তার স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েদেরও তার মতো রাখার চেষ্টা করে চলেছে। সে জানে না অবশ্য, ভবিষ্যতে সে এভাবে রাখতে পারবে কিনা। কারণ তার কলেজে পড়া ছেলেটার নাক দিনে দিনে উঁচু হয়ে যাচ্ছে। মেয়েকে নিয়ে চিন্তা নেই। তবে তার বউয়ের ঝোঁক অবশ্য অন্যদিকে — দামি দামি শাড়ির দিকে। স্ত্রীর এই ব্যাপারটা বারীনও মেনে নিয়েছে, মানে তাকে মানতে হয়েছে। শান্তি বজায় রাখার জন্য অনেককে অনেক কিছুই মেনে নিতে হয়। বারীনও তাই করেছে।

দুপুরবেলা। ইদানীং চারিদিকে ঝাঁ ঝাঁ করে রোদের তেজ বেড়েই যাচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ কোথা থেকে যেন আজ এক পশলা বৃষ্টি এসেও হারিয়ে গেছে। অফিসের ভেতর এসব কিছু টের পাওয়া যায় না। সেখানে বেশির ভাগ কামরায় বাতানুকূল ব্যবস্থা, আলো জ্বলে দিনেও। বারীনও ব্যস্ত একটা প্রোজেক্টের কাজ নিয়ে। এইসময় প্রশান্ত কাছে এসে বলে, স্যার, আমার দুয়েক দিন ছুটির দরকার হতে পারে।
চোখ না তুলেই বারীন বলে, কবে ?
— তারিখ এখনও ঠিক হয়নি।
— মানে ?
প্রশান্ত একটু হাসে, জবাব দেয়, মানে স্যার – তারিখ এখনও ঠিক হয়নি কিনা কবে আইফোন ১৮ লঞ্চ হবে। যেদিন লঞ্চ হবে, ঠিক তার আগের দিন থেকে দুদিন ছুটি নেব।
এবার বারীন চোখ তুলে প্রশান্তকে দেখতে থাকে, পাগল নাকি ছেলেটা ? এই তো বছর খানেক আগে লাখ টাকার ওপর খরচ করে আইফোন ১৭ কিনেছিল, এখনো ওটা নতুনের মতোই দেখায়। এখন আরেকটা আইফোনের লেটেস্ট মডেল নিচ্ছে ? লেটেস্ট লেটেস্ট করে কিছু লোক পাগল হয়ে যাচ্ছে। আশ্চর্য, এই পাগলামি দিনে দিনে বেড়েই যাচ্ছে !
প্রশান্তই ব্যাপারটা খোলসা করে বলে, স্যার – ব্যাপার হচ্ছে, এই নতুন মডেলের দাম নাকি দু লাখ টাকার কাছাকাছি হতে পারে। তাই এবার একটু লোন নিতে হবে, সেজন্যেই লঞ্চের একদিন আগে ব্যাঙ্কে গিয়ে লোন-এর ব্যবস্থা করব।
— তোমার এই বর্তমান ফোনটা তো ভালোই রয়েছে, নতুনের মতোই। কেন আবার আরেকটা শুধুশুধি কিনতে যাচ্ছ ? ওটার কী হবে ?
— স্যার, লেটেস্ট মডেলের ব্যাপারটাই আলাদা। পুরোনোটা দেখি নতুন নেওয়ার এক্সচেঞ্জ করা যায় কিনা। আপনিও স্যার, এবার একটা আইফোন কিনে ফেলুন না।
— ধূস। আমার আইফোনের দরকারই নেই। বলেই বারীন আবার মনে মনে বলে, তোমার লাখ লাখ টাকার আইফোনে যা আছে, আমার দশ হাজার টাকার অ্যান্ড্রয়েড ফোনেও তাই আছে বাছাধন। তুমি ব্যাটা নিজে টুপি পরে নিয়েছো, আবার অন্যকেও পরাতে চাইছো ? একদিন তুমি দেখবে বাছা, যুগের হাওয়ায় তাল মেলাতে মেলাতে ঋণের সাগরে সাঁতার কাটছো।

তারপর দুপুর গড়িয়ে যায়। এর মধ্যেই টিফিন খাওয়া হয়ে গেছে। বারীন তার প্রজেক্টের কাজ কিছুতেই গুছিয়ে আনতে পারছে না। এদিকে আবার দুদিনের মধ্যেই তাকে রিপোর্টটা জমা দিতে হবে। আর এই সময়েই কিনা টেবিলের ওপর রাখা তার মোবাইল ফোনে রিং হতে থাকে। সে দেখে, বাড়ি থেকে ফোন করেছে রিমি। তারই কন্যাশ্রী, আগামী বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। সে ফোনটাকে তুলে বলে, বলো, শুনতে পাচ্ছি।
ওপার থেকে রিমি বলে, বাবা, আমাদের ওয়াই-ফাই কাজ করছে না, নেটের লাইনটা মনে হয় খারাপ হয়ে গেছে।
— ওয়াই-ফাইয়ের সবুজ লাইট কি জ্বলছে ?
— না। তবে লাল লাইট দপ্ দপ্ করে জ্বলছে-নিভছে।
বারীন এবার বুঝতে পারে, নেটের ফাইবার লাইন বা ওয়াই-ফাই — যেকোনো একটার মধ্যে সমস্যা হচ্ছে। সে বলে, ঠিক আছে, আমি কমপ্লেন লজ করে দিচ্ছি।

বিকেল গড়িয়ে যাবার আগেই বাড়ি থেকে স্ত্রী এবং ছেলেমেয়ের ফোন বারবার পেতে থাকে বারীন। তাদের সবার বক্তব্য — ফাইবার নেট কাজ করছে না, এদিকে তাদের মোবাইলের এক জিবি ডাটাও শেষ হয়ে গেছে, তারা নাকি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তারা জানতে চাইছে, কখন ঠিক করার লোক আসবে ? বারীন বারবার একই উত্তর দিয়েছে, কমপ্লেন হয়েছে, শিগগির যাবে।
বাড়ি থেকে আবার ফোন আসে, এখনো কেউ আসেনি। বারীন ফাইবার নেট প্রোভাইডারকে আবার ফোন করে, কখন যাচ্ছে ঠিক করতে ? ওরা জবাব দেয়, শিগগির। এইসব করতে করতে বারীনের প্রোজেক্টের কাজের আজ বারোটা বেজে যায়।
অফিস ছুটির পর বাড়িতে ঢুকতেই বারীন দেখে, ছেলেমেয়ে-বউ সবাই কেমন গোমড়া মুখে বসে মোবাইলে গেম খেলছে। নেট নেই বলে টিভিতেও নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম ইত্যাদি সবও চলছে না। তাকে দেখতেই তার স্ত্রী তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রশ্নবান চালাতে থাকে, কেন কেউ এখনো আসেনি ? তুমি নিশ্চয় কড়া করে কথা বলোনি, তাই ওরা লাই পেয়ে যাচ্ছে। ফাইবার কোম্পানি পালটিয়ে নিচ্ছ না কেন ? ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কথা। বারীন চুপ করে শোনে, উত্তর দেয় না।

সময় গড়ায়। ঘড়ির কাঁটা রাত ন’টা পেরিয়ে যাচ্ছে। জনপ্রিয় কিছু টিভি সিরিয়াল দেখা হয়নি বলে আক্ষেপ করে বারীনের অর্ধাঙ্গিনী কীসব বকবক করতে করতে রান্নাবান্নায় নেমে পড়েছে। ফাইবার নেট ঠিক করার লোক আর আসেনি, আগামীকাল দশটার মধ্যে ঠিক করে দেবে বলে ওরা ফোনে জানিয়ে দিয়েছে।
ছেলেমেয়েরা তাদের বন্ধু-বান্ধবীদের দ্বারা কিছু ডাটার প্যাক রিচার্জ করিয়ে নিয়েছে, ফলে তারা আর কোনো শব্দ করছে না। বারীন ঠায় বসে আছে। সে না পারছে ইউটিউব দেখতে, না পারছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপে গিয়ে কিছু করতে। ফলে আস্তে আস্তে তারও মনে হতে থাকে, সে যেন সমগ্র পৃথিবী থেকে একটু বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পৃথিবীর কোথায় কীসব ঘটে চলেছে তার অজান্তেই, আর সে এসব কিছুরই খবর পাচ্ছে না। যদিও বিভিন্ন প্রোজেক্টের কাজ করতে হয় বলে অনেক কিছুর ডাটা তার জানা আছে। যেমন, বর্তমান হিসেবানুযায়ী ভারতের ১৪৮ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে উচ্চবিত্তের সংখ্যা প্রায় ১০ কোটি, মধ্যবিত্তের সংখ্যা প্রায় ৩০ থেকে ৪০ কোটি। বাকিরা সব নিম্নবিত্ত। মধ্যবিত্তের এক বিরাট অংশ এবং নিম্নবিত্তের বেশির ভাগ অংশ নানা ঋণে জর্জরিত। আবার নিম্নবিত্ত অংশের কোটি কোটি লোক ঠিকভাবে দুবেলা খেতে পায় না। তবুও ভারতবর্ষের ৯০ কোটি লোক নাকি স্মার্টফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেটের সুবিধা উপভোগ করে। এই ৯০ কোটির আর্ধেক লোকই নিম্নবিত্ত লোক যাদের অনেকেরই ঠিকভাবে খাওয়াপরার সাধ্য নেই, কিন্তু ইন্টারনেটে মত্ত। তাহলে ভারতবর্ষের বাকি ৫৮ কোটি লোকের সাথে ইন্টারনেটের যোগাযোগ নেই। তারা সব তাহলে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন ? বারীন এই মুহূর্তে নিজেকে এই ৫৮ কোটি লোকদেরই একজন ভেবে পরিতৃপ্তি পায়। অথচ আশ্চর্য, এই ৫৮ কোটি লোকদের প্রকৃত সমস্যা কী, তাদের অভাব-অভিযোগগুলো কী কী — এসব নিয়ে সে একদম চিন্তা করে না।