মহিলাবৃন্দ – চেখভ

মহিলাবৃন্দ – চেখভ

মহিলাবৃন্দ

চেখভ

(রাশিয়ান গল্প, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: বিজয়া দেব)

ফিওদর পেত্রোভিচ, উত্তরাংশের এক প্রদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ডিরেক্টর। সে নিজেকে এক প্রশস্ত হৃদয়ের উদার মনোভাবাপন্ন মানুষ বলেই ভাবে। এখন তাঁর অফিসঘরে সে একজন স্কুলমাস্টারের মুখোমুখি। কথা চলছে। ব্যাপারটা খানিকটা ইন্টারভিউ পর্যায়ের। স্কুলমাস্টারের নাম ভ্রিমেন্সকি।
— না না, ভ্রিমেন্সকি, তোমার অবসরে যাওয়াটা অনিবার্য। এই কণ্ঠস্বর নিয়ে ছাত্রদের পড়ানোর কাজটা আমি অসম্ভব বলে মনে করছি। তুমি কাজটা চালিয়ে যেতে পারবে না। গলা দিয়ে এখনও পর্যন্ত যতটুকু আওয়াজ বেরোচ্ছে, সেটিও হারিয়ে ফেলতে চাও?
— আমার যখন ঘাম হয় তখন ঠান্ডা বিয়ার খাই। স্কুলমাস্টার হিসহিস করল।
— ওহো কী বলবো! চৌদ্দ বছর কাজ করার পর, এই ধরনের দুর্ঘটনা, সমস্ত কেরিয়ার নষ্ট হয়ে গেল এই গলা খারাপের জন্যে, এখন কী করতে চাও তুমি?
মাস্টার চুপ।
— তোমার কি পরিবার আছে?
— হ্যাঁ স্যার। আমার স্ত্রী ও দুটো সন্তান রয়েছে। স্কুলমাস্টার আবার হিসহিসিয়ে বলে।
ঘরে আপাত নীরবতা। ডিরেক্টর উঠে ঘরের ভেতর চিন্তিত মুখে পায়চারি করতে থাকে।
— আমি জাস্ট ভাবতেই পারছি না এই মুহূর্তে আমি তোমাকে কীভাবে সাহায্য করি। শিক্ষকতা তুমি চালাতে পারবে না এবং পেনশনও তুমি পাবার মতো সময়কালীন কাজ করোনি, তোমাকে এভাবে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়াটাও খুবই মুশকিল, এটা আমার কাছে খুবই অস্বস্তিকর। তুমি আমাদের শিক্ষকদের মধ্যেই একজন, চৌদ্দ বছর চাকরি করেছ, তোমাকে আমরা নিজের মানুষ বলেই জানি, সুতরাং তোমাকে সাহায্য করাটা আমাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে, কিন্তু কীভাবে আমরা সাহায্য করতে পারি? তোমার জন্যে কী করতেই বা পারি? তুমি তোমাকে আমার জায়গায় বসিয়ে দেখো, বড্ড অসহায় লাগবে।
আবার সেই নীরবতা, ডিরেক্টর পায়চারি করতে করতে ভাবছে। এই হঠাৎ জেগে ওঠা সমস্যা নিয়ে ডিরেক্টর যে বিড়ম্বিত, তা স্পষ্ট, চেয়ারে বসছে কিন্তু তার এককোণে ভেবেই চলেছে। আচমকা তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল এবং দু আঙুলে তুড়ি মেরে বলে উঠল — ওহো, এতসময় থেকে ভেবেই চলেছি, আমার আশ্চর্য লাগছে যে, এতক্ষণ থেকে কেন আমার এই ব্যাপারটা মনেই পড়লো না, শোনো, আমি তোমাকে একটা প্রস্তাব দিচ্ছি, আগামী সপ্তাহে আমাদের হোম সেক্রেটারি অবসরে যাচ্ছে, যদি তুমি কাজটা পছন্দ করো, তাহলে তাঁর জায়গায় তুমি বসবে। এখন তোমার সিদ্ধান্ত। — ভ্রিমেন্সকি এরকম একটা প্রস্তাব আসবে কল্পনাই করতে পারেনি। সেও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
— এটা দারুণ।
— তাহলে আজই একটা আবেদনপত্র পাঠিয়ে দাও।
এই বলে ভ্রিমেন্সকিকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে ডিরেক্টর স্বস্তি ও হাল্কাবোধ করল। এই হিসহিসিয়ে কথা বলা স্কুলমাস্টারের মুখোমুখি আর তাঁকে হতে হবে না, এটা স্বীকার করতেই হবে যে, হোম সেক্রেটারির কাজটা ভ্রিমেন্সকি ভালোভাবেই করতে পারবে, লোকটা আগাগোড়া ভালো ও ভদ্র। কিন্তু এই মানসিক অবস্থান খুব বেশি টেঁকাতে পারল না ডিরেক্টর, যখন সে বাড়ি ফিরে স্ত্রীর সঙ্গে ডিনারের টেবিলে বসল, নাতাশিয়া ইভানোভনা, তাঁর স্ত্রী, হঠাৎ করেই বলে উঠল — ও হ্যাঁ, আমি তো বলতেই ভুলে গেছি যে, নিনা সেরগেইনা এসেছিল দেখা করতে গতকাল। সে বলছিল একটা চাকরির জন্যে, তো আমি তাকে হোম সেক্রেটারির শূন্য হতে যাওয়া পদটির কথা বলেছি…
— আমি ঐ পদের জন্য আরেকজনকে কথা দিয়ে ফেলেছি। আর তুমি তো আমার নিয়ম-নীতি ভালোই জানো, আমি কাউকে অনুগ্রহে চাকরি দিই না। ডিরেক্টর বিরক্তভাবে ভ্রুকুটি করল।
— আমি জানি, কিন্তু নিনার জন্যে তোমার ঐ শক্তপোক্ত নীতিনিয়ম আলগা করতে পারো, সে কিন্তু আমাদের পরিবারের খুব কাছের একজন, সে আমাদের ভালবাসে, কিন্তু আমরা তার জন্যে কখনও তেমন কিছুই করিনি। তুমি তোমার কথার চাবুক দিয়ে আমাদের দুজনকেই অপমান করছো।
— সে কি কারোর জন্যে সুপারিশ করছে?
— হ্যাঁ, পলজুহিন।
— কে পলজুহিন ? ঐ লোকটা কি যে নিউ ইয়ার্স ডে-র পার্টিতে চাতস্কি খেলছিল? সে কি একটা ভদ্রমানুষ? কোনওভাবেই নয়।
ডিরেক্টর খাওয়া ছেড়ে উঠে গেল।
— ঈশ্বরের নির্দেশ, ওকে কোনওভাবেই ঐ পদে দেওয়া সম্ভব নয়।
— কিন্তু কেন?
— মাই ডিয়ার, তুমি নিজেই ভেবে দেখো তো, যে নিজের জন্যে নিজে না এসে এক মহিলাকে দিয়ে সুপারিশ করায় সে কী ধরনের লোক হতে পারে! কেন সে নিজে আসেনি?

রাতের খাওয়ার পর ডিরেক্টর সোফায় শুয়ে নিজের পড়াশোনা এবং জমে থাকা খবরের কাগজ, দরকারি কাগজপত্র, চিঠি ইত্যাদি দেখে। এরমধ্যে একটি চিঠি পাওয়া গেল শহরের মেয়রের স্ত্রীর লেখা – “প্রিয় ফিওদর পেত্রোভিচ, একবার তুমি আমাকে বলেছিলে, আমি মানুষের হৃদয় পড়তে পারি এবং মানুষকে বুঝতে পারি, এখন একটা সুযোগ এসেছে সেই সত্যিটা প্রমাণ করার। কে, এন পলজুহিন, যাকে আমি একটি চমৎকার যুবক বলে চিনি, দু’একদিনের মধ্যে তাঁকে ডাকা হোক, হোম সেক্রেটারির পদটা ওকে দেওয়ার জন্যে। যুবকটি দারুণ ও এই কাজের জন্যে যোগ্য, যদি তুমি এব্যাপারে আগ্রহী হও, তাহলে নিশ্চয়ই সে রাজি হবে…ইত্যাদি ইত্যাদি।
— কোনও ভাবেই না, আমি মাস্টারকে কথা দিয়েছি, তার মানে ওটা ঈশ্বরের নির্দেশ, আমি তা কোনও মূল্যেই অমান্য করতে পারবো না। ডিরেক্টর ভাবল।

এরপর একদিনও পার হয়নি, পলজুহিনের জন্যে আর কোনও সুপারিশপত্র ডিরেক্টর পাওয়ার আগেই, এক চমৎকার সকালে পলজুহিন নিজেই এসে হাজির। তার সুঠাম দেহ, ঝকঝকে জকিদের মতো কামানো মুখশ্রী, কালো চকচকে স্যুট পরে এসে সে নিজেকে উপস্থাপন করল। তার অনুরোধ শোনার পর ডিরেক্টর বলল — আমি এসব ব্যাপারে প্রার্থীদের এখানে নয়, আমার অফিসে কথা বলি।
— ক্ষমা করবেন স্যার, কিন্তু আমাদের চিরপরিচিত জনেরা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন এখানে আসার জন্যে।
— হুম! – পলজুহিনের কালো চকচকে জুতোর ছুঁচোলো ডগার দিকে ডিরেক্টর ঘৃণার চোখে কটাক্ষ করে বললো — আমি যতদূর জানি, তোমার বাবার ভালোই সম্পত্তি আছে, তাহলে এই পোস্টে তুমি বহাল হতে চাইছ কেন? মাইনে তো একেবারেই তুচ্ছ।
— মাইনের জন্যে নয় স্যার, এটা একটা সরকারি চাকরি, সেজন্যে।
— হুম!..আমার যা মনে হচ্ছে তুমি এই কাজ কিছুদিন করেই অসুস্থ হয়ে পড়বে এবং কাজটা ছেড়ে দেবে, অনেক যোগ্য প্রার্থী রয়েছে, যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়, তারা এই চাকরি থেকেই নিজের কেরিয়ার তৈরি করবে, তারা তো এক্ষেত্রে বঞ্চিত হবে..
— এই চাকুরির জন্যে অসুস্থ হবো না স্যার, – পলজুহিন ডিরেক্টরের কথার মাঝখানেই বলে উঠল, আমি আমার সমস্ত দিয়ে কাজটা করে যাবো।
এটা ডিরেক্টরের জন্যে একটু বেশিই হয়ে গেল। তাচ্ছিল্যভরে একটু হেসেই বলল — তুমি নিজে থেকে এই পদের জন্যে আবেদন না করে ট্রাবল তৈরিকারী মহিলাদের দিয়ে সুপারিশ করাচ্ছ কেন?
— আমি জানতাম না স্যার, এটা আপনাকে অসন্তুষ্ট করবে। আমি সবকিছু নিয়ে এসেছি। এই বলে সে পকেট থেকে আবেদনপত্র ও আনুষঙ্গিক কাগজপত্র ডিরেক্টরের কাছে নিয়ে এল, তাঁর হাতে তুলে দিয়ে সই এর জন্যে দাঁড়িয়ে রইল। কিছু না দেখেই কিছু অবুঝ ও একগুঁয়ে মহিলার হাত থেকে শুধু রেহাই পাওয়ার জন্যে ডিরেক্টর সই করে দিল।
— এই এপ্লিকেশন তুমি আগামীকাল পাঠিয়ে দিও অফিসে, এখানে কিছুই করা যাবে না। – পলজুহিন যখন বেরিয়ে গেল, ডিরেক্টর মাথা নীচু করে চরম বিতৃষ্ণায় যেন পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পণ করল। চালাক! খুব চালাক! ডিরেক্টর কথাগুলো উচ্চারণ করল সবিশেষ বিতৃষ্ণার সঙ্গে। ঘরের এককোণ থেকে আরেক কোণ দেখতে দেখতে আপনমনে বলতে লাগল, যা চেয়েছিল তা পেয়ে গেল, একটা অপদার্থ তোষামোদে লোক, মহিলাদের পটিয়ে কাজ আদায় করে নিল, একটা মেরুদণ্ডহীন লোক, জন্তু! – কথাটা চেঁচিয়ে বলে উঠল যে দরজা দিয়ে পলজুহিন বেরিয়ে গেছে সেই দিকে তাকিয়ে এবং সঙ্গে সঙ্গেই চরম অস্বস্তির সাথে দেখল, এক মহিলা, প্রভিশনাল ট্রেজারির সুপারিন্টেন্ডেন্ট এর স্ত্রী, দোরগোড়ায়।
— আমি কয়েকটি মিনিট আপনার নষ্ট করবো, আপনি বসুন, আর মন দিয়ে আমার কথাগুলো শুনুন, আমি আপনাকে আগেই বলেছি একটি পোস্ট ভেকেন্ট রয়েছে, সেই পদের জন্যে একটি লোক আজ অথবা আগামীকাল একজন যুবক আসবে..তার নাম পলজুহিন। … মহিলাটি বলে চলেছে, ডিরেক্টর তার দিকে অনুভূতিহীন তাকিয়ে, মনে হচ্ছে এভাবেই সে যে কোনও সময় জ্ঞান হারাতে পারে, তবে সে তার ঠোঁটে ঝুলিয়ে রাখলো একচিলতে বিনম্র হাসি।

পরদিন সেই স্কুলমাস্টার ভ্রিমেন্সকি অফিসে এল, ডিরেক্টর অনেকটা সময় ধরে নিজেকে তৈরি করতে লাগল সত্যিটা বলার জন্যে, সে দ্বিধাগ্রস্ত, অসংলগ্নচিত্ত, কীভাবে কোথা থেকে শুরু করা যায়, ভেবে পাচ্ছে না, সে কি ভ্রিমেন্সকির কাছে ক্ষমা চাইবে? পুরো সত্যিটা কি বলা যায়? কিন্তু জিভটা অসার হয়ে রইল, মদ খেয়ে বিবশ মাতালদের মতো কান ঝাঁ ঝাঁ করছিল, হঠাৎ করেই অসম্ভব বিরক্তি এল তার, তাঁকে কেন নিজের অফিসে বসে এমন অদ্ভুত ভূমিকায় অভিনয় করতে হবে তারই অধস্তনের সামনে! সে হঠাৎ করেই হাতের মুঠো পাকিয়ে টেবিলে সশব্দে ঘুষি মেরে রেগে বলে উঠল — তোমার জন্যে আমার কাছে কোনও চাকরি নেই, এই ব্যাপারে এটাই আমার শেষ কথা, আমাকে শান্তিতে থাকতে দাও, আমায় দুর্ভাবনায় ফেলো না, আমায় একা ছেড়ে দাও, এটাই সবচাইতে ভালো হবে। – কথাটা বলে ডিরেক্টর অফিস থেকে বেরিয়ে গেল।

(Hundred Stories Of Anton Chekhov থেকে অনূদিত, মূল গল্প – “ Ladies” – Anton Chekhov, অনুবাদ করেছেন বিজয়া দেব)