
গাঁয়ে মায়ে সমান (ধারাবাহিক উপন্যাস)
সুদীপ ঘোষাল
দ্বিতীয় পর্ব
মানুষ বিনা কারণে মন্দ পথে যায় না। তার অনেক কারণ থাকে।
বিপিন রায়, বামুন পাড়ার ছেলে কিন্তু সে কোনো জাতিভেদ প্রথা মানত না। সে পৈতে নিয়েছে বৈশাখ মাসে। উপনয়নের পর উপবীত ধারণ করতে হয়। এই উপবীতের চলতি নাম পৈতে। পৈতে কথাটি সমাজে বহুপ্রচলিত।
বাহুতে গুরুদেব বেঁধে দিয়েছেন রক্ষা কবচ। রাজুদের বংশের গুরুদেব বলেছেন, সমস্ত বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করবে এই কবচ আর পৈতে। সব কাজে সফল হবে নিশ্চিতভাবে আর সারাজীবন রক্ষাকবচ আগলে রাখবে ঘর, সংসার, প্রাণ। ব্রাহ্মণদের সাধারণ গ্রামের মানুষ বামুন বলেন। তাদের পাড়ার নাম হল, বামুনপাড়া।
বিপিন গরীব বামুনের ছেলে। দুবিঘে জমি, দুটো গরু আর গোটা দশেক ছাগল তাদের সম্পত্তি। রাজুর পৈতেটা একটু দেরি করেই হয়েছে। তার ফলে গুরুদেবের আদেশ অনুযায়ী প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছে তার ফর্দমত। তার ফলে খরচ অনেকটা বেড়ে গেছে।
যখন তার বয়স উনিশ ছিল তখন এই গুরুদেব তাদের বাড়ি যাওয়া আসা করত। কারণ তার বাবা মারা গেছেন অনেক আগেই। আর মা অই গুরুদেবের কথামত সংসার চালান। পুজো, উপবাসে মেতে থাকেন, আর গুরুদেবের ফলাহার খিদে পেটে তাকিয়ে দেখেন। থালাভরা ফল আর বিভিন্ন রকম মিষ্টান্ন পেটপুরে খান গুরুমশাই।
বিপিন ভাবে, সারাদিন উপবাসে থাকেন আমার মা। কারণ বিধবাদের একাদশীর দিনে উপবাসে থাকতে হয়। তাদের রঙিন শাড়ি পরতে নেই। কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে মানুষের মন এইসব গুরুর মিথ্যা কথার কারণে। বিদ্যাসাগর মশাই না থাকলে এই অভিশাপ কত গভীরে প্রবেশ করত, তা বলার অপেক্ষা থাকে না। মা গুরুদেবের খাওয়ার শেষে তার উচ্ছিষ্ট পরিষ্কার করে পুণ্য সঞ্চয় করেন।
গুরুদেব মাঝে মাঝে রাতে বিপিনদের বাড়িতে থাকেন। বিপিন বোঝে সবকিছু কিন্তু চুপ করে থাকে। গুরুদেব মাকে বলেন, আমার কথামত চললে তোমাদের ভালো হবে। এই ভাল হওয়ার লোভে রাজুর মা গুরুদেবের সব কথা মুখ বুজে মেনে নেন। রাজুর মায়ের মিথ্যে রক্ষাকবচ হল গুরুদেবের মিথ্যা প্রবচন। এক অদৃশ্য দেওয়া নেওয়ার খেলা তিনি খেলেন নিষ্ঠুর হৃদয়ে।
বিপিন সকালবেলা মাঠে যায়। সে বামুন হলেও লাঙল ধ’রে চাষ করে। ছোট থেকেই করে আসছে। বেশ গাঁট্টাগোঁট্টা চেহারা তার। সকলে বেশ সমীহ করে চলে তাকে। পড়াশুনা বেশিদূর গড়ায়নি। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে সংসারের দায়িত্ব তার উপরেই ন্যস্ত।
সে সকালে গরু ছাগল নিয়ে মাঠে যায়। হাতে পাঁচন গলায় গামছা। লুঙ্গি পরে আলের উপর বসে থাকে। গরু ছাগল পালিয়ে গেলে ডেকে নিয়ে আসে ঘাসের বনে। পরের ফসল খেলে লোকে ছাড়বে না। এ নিয়ে অনেকবার ঝগড়া হয়েছে বিপিনের সঙ্গে জমির মালিকদের। একদিন রমেন মোড়ল লাঠি নিয়ে এসে বলল, তোর ছাগলে আমার জমির ফসল খেয়েছে। খবরদার বলছি আমি কিন্তু ছাড়ব না। এই লাঠি মেরে মাথা ফাটিয়ে দোব। বিপিন বলল, বেশ কাকা আর হবে না এই ভুল। আমি নজর রাখব। সঙ্গে সঙ্গে মোড়ল নরম সুরে বলল, তোমরা হলে গিয়ে বামুনের ছেলে। বলতে খারাপ লাগে। বুঝলে তোমার বাবাকে আমি দাদা বলে ডাকতাম।
বিপিন বলল, মায়ের কাছে শুনেছি সব। তবে আপনার ফসলের ক্ষতি হলে তো রাগ হবেই। আমি এবার ভাল করে লক্ষ রাখব। মোড়ল বললেন, বেশ বাবা বেশ। বেঁচে থাক।
বিপিন ভাবে ফসলের মাঠে গরু, ছাগল চড়ানো খুব কঠিন। কখন যে কার মাঠে নেমে যায় বোঝা মুশকিল। সে ভাবল, কাল থেকে অই পাকা রাস্তার ধার ঘেঁষে বারেন্দা গ্রামের কাছাকাছি জঙ্গলে যাবে গরু চড়াতে। ওখানে ফসলের জমি নাই। নিশ্চিন্তে বসতে পারবে। মাকে বলে জলখাবার সঙ্গে নিয়ে যাবে।
পরের দিন বিপিনের মা সকাল থেকে আলুভেজে দিল আখের গুড় দিল আর এক জামবাটি ভরতি করে মুড়ি দিল। সে গামছায় বেঁধে গরু, ছাগলের দড়ি খুলে পাঁচন হাতে চলে গেল জঙ্গলে। সেখানে গিয়ে দেখল ঘাস আছে পাতা আছে। আর ভিড় কম। পাশে ক্যানেলের পরিষ্কার জল। সেখানে মাছ ধরছে হাজরাদের একটা মেয়ে। বিপিন ভাবল, কি সুন্দর দেখতে মেয়েটা। উবু হয়ে মাছ ধরছে। মেয়েটা তাকে দেখতে পায় নি।
একটু পরে বিপিন ডাকল, ও মেয়ে, তোর নাম শ্যামলী নয়?
শ্যামলী বলল, হুঁ। তুমি বিপিন।
– তুই রোজ এখানে আসিস মাছ ধরতে?
– হুঁ
– আমাকে চিনিস?
– হুঁ
– আয় এখানে আয়। দুজনে মুড়ি খাই। তোর মাছ নেব না। আয়।
শ্যামলী হাত, পা ভাল করে ধুয়ে চলে এল তার কাছে।
বিপিন গামছায় মুড়ি ঢেলে দিল। দুজনে গল্প করতে করতে খেল। তারপর দুপুর হলে দুজনে চলে এল নিজের বাড়ি।
বিপিন গোয়ালে গরু বেঁধে, হাত পা ধুয়ে স্নান সেরে নিল। তারপর দরজার কাছে এসে দেখল দরজা বন্ধ।
দরজায় একটা ফুটো আছে। বিপিন ফুটোতে চোখ লাগিয়ে দেখল, গুরুদেব মাকে তার নধর দেহ দিয়ে ঢেকে ফেলেছে। মা কলাগাছের মত পড়ে আছেন নীচে, বল্কলহীন, পাতাছেঁড়া অবস্থায়। এখন গুরুর চেহারা দেখে বিপিনের অসুরের মূর্তির কথা মনে পড়ছে।
মাকে দেখা যাচ্ছে না। তাহলে কি মাকে বশ করেছে কবচ পরিয়ে? আমাকেও দিয়েছে কবচ। তার রাগ হল। কিন্তু কোন আওয়াজ না করে চলে গেল গোয়ালে।
প্রায় কুড়ি মিনিট পরে তার মা তাকে দেখতে গোয়ালে এল।
মা বলল, আমি তোকে না দেখে একটু শুয়েছিলাম। আজকে তোর দেরি হল কেন? সে বলল, মা আমার খিদে পেয়েছে। খেতে দাও। আমি এখানে বসে খাব।
তারপর বর্ষা এল। নদী, পুকুর, খাল, বিল সব কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেল। শুধু পূর্ণ হল না বিপিনের মন। গুরুদেবের প্রতি ঘৃণায় তার মন ভরে গেল। কিন্তু এখনও সেই ঘটনা ঘটে চলেছে। সে জানে, মানুষের জীবনে কিছু ঘটনা মনের কোণে থেকে যায়। তার প্রতিকার হয় না কোনোদিন।
বিপিন এবার চাষ করেছিল সময়ে। কিন্তু বন্যায় ধানের চারা ডুবে থাকল দশদিন। সব পচে গেল। পচে গেল সমস্ত কৃষকের আশা আকাঙ্ক্ষা সবকিছু। আর কদিন পরেই শরৎকালের দুর্গাপুজো। সবাই নতুন জামা, কাপড় কিনবে। কিন্তু এই বাউড়ি আর হাড়ি পাড়ার লোকগুলো খালি গায়ে গামছা কাঁধে ঘুরবে।
এখন বিপিন শ্যামলীকে অনেক কথা বলে। সে বলে, তোকে একটা শাড়ি দোব ভেবেছিলাম, কিন্তু কি করে দোব?
শ্যামলি বলে, দিতে হবে না গো। তুমি শুধু এমনি করে আমাকে জড়িয়ে থেকো।
বিপিন আর শ্যামলী দুজনে দুজনকে ভালবাসে। তারা বিয়ে করবে। কিন্তু বামুনের সঙ্গে হাজরা বা হাড়ি জাতের বিয়ে সমাজের সেনাপতিরা মেনে নেবে না।
ওরা ঠিক করল, পালিয়ে গিয়ে ওরা বিয়ে করবে পরে। ততদিনে সে ভাবে, একটু গুছিয়ে নেব নিজেকে। টাকা, পয়সা জমিয়ে রাখব। তারপর বিয়ে, সংসার।
প্রায় দুবছর পরে বিপিন আর শ্যামলী ঠিক করল দুদিন পরে তারা শিবলুন স্টেশনে ট্রেন ধরবে। তারপর বহরমপুরে চলে যাবে। ওখানে নিশ্চয় কাজ পেয়ে যাবে। তা না হলে কুলিগিরি করবে। ওদের ঠিক চলে যাবে।
বিপিন আজ বাড়ি গিয়ে গুরুদেব আর মাকে দেখতে পেল। গুরুদেবের দয়ায় মায়ের খাওয়া-পরার অভাব নেই। গুরুর মেয়ের বয়সী মা। গুরুদেব এই মেয়ের বয়সী অসহায় বিধবার সঙ্গে যে খারাপ দৃষ্টি দিতে পারে, এই ধারণা গ্রামের সরল মানুষের ছিল না। আর তার দেখা সেদিনের ঘটনা একমাত্র শ্যামলী বিশ্বাস করে। আর কাকে বলবে সে। এই ঘটনার সঙ্গে যে মা জড়িত। মা যদি লজ্জায় গলায় দড়ি দিয়ে বসে তাহলে সে তো মাতৃহারা হবে। তাই নিজের পায়ে কোপ সে মারতে চায় না। নিজের মত করে পরবর্তী জীবন সে আনন্দে কাটাতে চায়।
হঠাৎ একদিন গুরুদেব বিপিনকে কাছে বসালেন। বললেন, তুই নিজেকে খুব চালাক মনে করিস নয়?
মা বললেন, কেন কি করেছে রাজু?
গুরুদেব বললেন, তোমার ছেলে হাড়িদের মেয়ের সঙ্গে ঘোরে। মাখামাখি করে। ওদের পাড়ার অনেকে দেখেছে। আমাকে বলেছে।
বিপিন বলল, হ্যাঁ, আমি ওকে বিয়ে করতে চাই।
গুরুদেব বললেন, আমি হতে দেব না। তুই বামুনদের ছেলে। সমাজ মানবি তো হতভাগা।
বিপিন বলল, আপনার মুখোশপরা সমাজ আমি মানি না। আমি জাতপাত মানি না। এই বিয়ে হবেই। কোনো শক্তি এই বিয়ে আটকাতে পারবে না। প্রয়োজনে প্রাণ দিয়ে দেব।
মা চিৎকার করে বললেন, কাকে কি বলছিস তুই? এই বিয়ে হলে আমার মরা মুখ দেখবি। আমি গলায় দড়ি দেব।
গুরুদেব বললেন, ছি ছি। মায়ের কথা চিন্তা না করে তুই দেহের কথা চিন্তা করছিস। ছি ছি।
বিপিন মাকে বলল, মা হয়ে তুমি ছেলেকে সাজা দেবে?
বিপিন ছুটতে ছুটতে নতুন পুকুরের পাড়ে গেল।
মা, ছেলেকে ডাকছেন, ফিরে আয়। ফিরে আয়।
বিপিন দূর থেকে দেখল শ্যামলী ছুটতে ছুটতে শিবলুন স্টেশনে যাচ্ছে। এখন তাকে কোনো বাধা আটকাতে পারবে না।
আজ তাদের পালিয়ে বিয়ে করার দিন। বিপিন অবাক চোখে দেখে, শ্যামলী খোলামাঠে হৃদয় মেলে আনন্দে মেঘ হয়ে ভাসছে।
বিপিন ভাবল, এই আনন্দ ম্লান হয়ে যেতে পারে না। সেও হাওয়ায় উড়তে চায়।
কিন্তু বিপিন যেন অসহায়। সে ভেবে পাচ্ছে না কী করবে? একদিকে শ্যামলী তার প্রাণের বাঁশি আর আরেকদিকে মা, রাজুর শ্রেষ্ঠ দেবী।
গুরুদেবের সমস্ত মিথ্যাকথা তার মনে পড়ছে। কবচ পরলে নিশ্চিতভাবে সকল কাজে সফল হওয়া যায়। পৈতে থাকলে সিদ্ধিলাভ হয়। কই রাজুর জীবন তাহলে ব্যর্থতায় ভরা কেন? সে ভাবে, এইসব কিছু গুরুদেবের বানানো কথা। শাস্ত্র কখনও জাতিগত ভেদাভেদ করেনি। পৃথিবীর কোনো ধর্ম কোনো মানুষকে ছোট করনি।শুধুমাত্র গুরুদেবের মত স্বার্থপর লোকেরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এইসব নিয়ম চালু রাখেন সমাজে।
সে এই মুখোশ একা খুলতে পারবে না। তবু নিজের জীবনে তো নিজের ইচ্ছেমত থাকতে পারবে। সে মাকে বুঝিয়ে বলবে। মা নিশ্চয়ই বুঝবে।
অনেক আশা নিয়ে পৈতে খুলে ফেলল সে। কবচ খুলে ফেলল। দুটো বিষফলের মত, কুসংস্কারের বোঝা ছুঁড়ে ফেলে দিল পুকুরের জলে। আর কখনও বিষফল দুটো তার ভাবনার বাধা হতে পারবে না। তার মনটা হাল্কা হল।
তারপর সে দৃপ্ত পদক্ষেপে হাঁটা শুরু করল মানুষের মনের কুসংস্কার মুছে ফেলার সংকল্প নিয়ে।
বিপিন দৌড়তে শুরু করল। তারপর সে উড়তে শুরু করল। সমস্ত বাধাকে জয় করতে পারলে বোধহয় এইরকমই অনুভূতি হয়, সে ভাবল, আকাশে ওড়া শ্যামলীকে এবার ও নিজেও উড়তে উড়তে ধরবে। শ্যামলীকে ভালোবেসে আকাশে ওড়াটা সে ভালভাবেই রপ্ত করেছে…।
তারপর তিন বছর পরে, গুরুর নিষ্ঠুর চক্রান্তে গ্রামের লোক শ্যামলীকে ডাইনি অপবাদে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারল। প্রচুর লোক, বিপিন কার সাথে লড়বে। সে অসহায়ের মত কাঁদতে শুরু করল।
তারপর বাউড়িবউ বিপিনকে দেখাশোনা করতে শুরু করল। বিপিন এখন কোনো লোককে বিশ্বাস করে না। প্রেম, ভালোবাসা তার মন দখল করতে পারে না। সে এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে সমাজের নিয়ম ভাঙার জন্য।
সে বলে, আর ভালোবাসা নয়। শুধু স্বার্থেপর হয়ে বেঁচে থাকব আর মুখোশপরা মানুষের মুখোশ খুলব।
তারপর অনেক বছর কেটে গেছে। শ্যামলীকে আর কারও মনে নেই। গুরুদেবের মুখমণ্ডলে ক্যান্সার হয়েছিল। বীভৎস যন্ত্রণা পেয়ে সে মরে গেছে। বিপিনের মা গতবছর গত হয়েছেন।
এখন বিপিন বাড়ি, জমির মালিক। তার আগুপিছু কেউ নেই। মদ খায়, লাম্পট্য করে। কাউকে ভয় করে না। বাউড়িবউ তাকে রেঁধে খাওয়ায়, বদলে মাস গেলে দু হাজার টাকা পায়। (ক্রমশ)
(বাকি অংশ পরবর্তী সেপ্টেম্বর-অক্টোবর, ২০২৬ সংখ্যায়)
[পরবর্তী পর্ব: তৃতীয় পর্ব। আগের পর্ব: প্রথম পর্ব]