
চিংড়িমামার টুপি (ছোটোদের গল্প)
সদানন্দ সিংহ
চিংড়িমামাকে দেখলাম, কী এক দারোগা টাইপের সাদা টুপি পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ এই টুপি পরার ব্যাপারটা বুঝলাম না। সুদেব, পিন্টু, ফটকে, গদা, জগা, গোবরা — কেউই ব্যাপারটা সম্বন্ধে বলতে পারল না। সুদেব বলল, মনে হয় কোনো সিনেমা হলে ইংরেজি সিনেমা দেখে এসেছে টিকিট না কেটেই।
হতে পারে, আমরা সবাই একমত। চিংড়িমামার মতো লোক নিজের পয়সা খরচ করে সিনেমা দেখবে ভাবা যায় না, হয়তো কারুর মাথায় বাড়ি দিয়ে দেখেছে। আর এখন নায়ক সেজে হেঁটে বেড়াচ্ছে।
তবে টুপিটা বেশ সুন্দর। আমার তো ভীষণ পছন্দ হয়ে গেল। এইসময় দেখলাম চিংড়িমামা আমাদের দিকেই আসছে।
কাছে এসে চিংড়িমামা বলল, কী হে বাতাপুরার দল, একসঙ্গে দাঁড়িয়ে কীসব ফন্দিফিকির হচ্ছে ? তোদের মাথায় তো সবসময় খারাপ খারাপ চিন্তা খেলে।
আমি প্রতিবাদ করলাম, একেবারেই বাজে ধারণা। আমরা তোমাকে নিয়ে ভালো চিন্তা করছি, আর তুমি বলছ আমরা খারাপ চিন্তা করি। ছিঃ ছিঃ।
— তাই নাকি ? এ যে ভূতের মুখে রামনাম। তা আমাকে নিয়ে তদের কী ভালো চিন্তা হচ্ছে শুনি।
এবার আমরা সবাই চুপ। সত্যি বলতে কি, চিংড়িমামা আমাদের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করে, চিংড়িমামাকে নিয়ে কোনো ভালো চিন্তাই আমাদের মনে আসে না।
— বল্ বল্, আমাকে নিয়ে কী ভালো চিন্তা করছিলি ?
কেউ কিছু বলছে না দেখে আমি বলে ফেললাম, তোমার টুপিটা দারুণ। ওটা মাথায় তোমাকে একেবারে সিনেমার দেবানন্দের মতো লাগছে।
মনে হল আমার কথা শুনে চিংড়িমামা বেশ খুশিই হয়েছে।
চিংড়িমামা টুপিটাকে এক হাত দিয়ে একটু ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, ওরকম লাগবেই তো। ওটা কোত্থেকে এনেছি দেখতে হবে তো।
গদা জানতে চাইল, কোত্থেকে ?
— জানতে চাও ? শোনো বৎসগণ, ওটা আমি আমার এক বন্ধুকে দিয়ে ডিরেক্ট লন্ডন থেকে আনিয়েছি।
— লন্ডন ? আমরা সবাই অবিশ্বাসের সঙ্গে বলে উঠলাম।
একটু মুচকি হেসে চিংড়িমামা বলল, জানি, তোদের মতো বাতাপুরার দল আমার কথা শুনে বিশ্বাস করবি না। তোদের বিশ্বাস-অবিশ্বাসে কী এসে যায় ? চলি, আমার জরুরি কাজ আছে। ফালতু সময় এখানে নষ্ট করার দরকার নেই।
চিংড়িমামা গট গট করে চলে গেল।
জগা বলল, দেখেছিস, কীভাবে মিথ্যে বলে গেল, লন্ডন থেকে এনেছে !
আমি বললাম, ও রকম মিথ্যে চিংড়িমামা হামেশাই বলে থাকে। তবে টুপিটা আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। ওরকম একটা টুপি আমারও চাই। কোথায় পাব জানিস তোরা ?
কেউই বলতে পারল না, ওরকম টুপি কোথায় পাওয়া যাবে ?
পাঁচদিন পরের কথা। আমি মাকে বলছিলাম, মা আমাকে দারোগার টুপির মতো একটা সাদা টুপি কিনে দাও না গো।
মা একটু আশ্চর্য হয়ে বলল, কী যা তা বলছিস। আমি কোথ্যয় পাব দারোগার মতো টুপি ?
— বাজারে নিশ্চয় বিক্রি হয়। কিনে দাও।
— কোথায় বিক্রি হয় আমি জানি না। তোর বাবাকে বলিস।
এমন সময় দেখলাম, রাস্তায় দাঁড়িয়ে গোল্লুদাদার মা হাতের ইশারায় আমাকে ডাকছে। আমি কাছে গেলাম। গোল্লুদাদার মা ফিসফিস করে আমাকে বলল, আমি এইমাত্র শুনলাম তুমি দারোগার টুপি কিনতে চাও। আমার কাছে আছে, দশ টাকা দিয়ে বিক্রি করব।
আমি একটু আশ্চর্য হয়ে বললাম, তোমার কাছে আছে ! দারোগার টুপি ?
— হ্যাঁ ভাই, আছে। যদি কিনতে চাও দশ টাকা নিয়ে আমার বাড়িতে আসো।
— হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি এখনই কিনব। আমার সঙ্গেই দশ টাকা আছে।
আমি গোল্লদাদার মায়ের সাথে চললাম।
গোল্লুদাদার বাড়ির বারান্দায় একটা চেয়ার ছিল। গোল্লুদাদার মা বলল, তুমি এই চেয়ারটায় বসো, আমি ট্রাঙ্কের ভেতর থেকে টুপিটা বের করে আনছি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই টুপি হাতে গোল্লুদাদার মা বেরিয়ে এল। আমি টুপিটাকে দেখে অবাক হলাম, এ যে হুবহু চিংড়িমামার টুপির মতো। আমি সঙ্গে সঙ্গে দশ টাকা বের করে টুপিটা নিয়ে নিলাম। টুপিটাকে হাতে নিয়ে আমি খুব খুশি হলাম।
গোল্লুদাদার মা বলল, আমার কাছে দুটো ছিল। একটা কয়েকদিন আগে জটু কিনে নিল।
জটু মানে চিংড়িমামা। এতক্ষণে আমি চিংড়িমামার টুপি কেনার রহস্য বুঝতে পারলাম।
গোল্লুদাদার মা আবার বলল, আরেকটা টুপি যদি চাও তাহলে সেটা আমি আগামী বছর দিতে পারব।
— আগামী বছর ? কোত্থেকে আসবে।
— গোল্লু তো সরকারি ড্রাইভার। প্রতি বছর গোল্লু আফিস থেকে ড্রাইভারের পোষাক-টুপি পায়।
টুপির সমস্ত রহস্যই আমার সামনে এল। টুপিটা তাহলে দারোগার টুপি নয়, ড্রাইভারের টুপি। ভাবলাম, সে যাক গে, দেখতে তো একদম দারোগার টুপির মতোই — ড্রাইভারের টুপি বলে কেউই ধরতে পারবে না।
পরে দেখলাম, সত্যিই, আমার বন্ধুদের কেউই ধরতে পারেনি ওটা যে ড্রাইভারের টুপি। শুধু জানালাম, ছোটোমামা এনে দিয়েছেন। আনন্দে আমি এই টুপি পরে অনেকখানে ঘুরলাম।
কয়েকদিন পর এই টুপি পরে আমি যখন বাড়ি থেকে বেরুলাম তখন দেখলাম বিপরীত দিক থেকে টুপি মাথায় চিংড়িমামা আমার দিকেই আসছে। কাছে এসে চিংড়িমামা চোখ দুটো গোল করে আমার টুপির দিকে চেয়ে থাকল।
বললাম, টুপিটা আমি আমেরিকা থেকে এনেছি।
উত্তর না দিয়ে চিংড়িমামা চলে যাচ্ছিল। আমি একটু জোরে বললাম, আমাকে কেমন লাগছে এখন ? রাজেশ খান্না না অমিতাভের মতো ?
পেছন ফিরে চিংড়িমামা বলল, হারামজাদার মতো।
বললাম, তাহলে এই টুপি যারা মাথায় দেয় তারা সবাই হারামজাদা।
— ধুত্তোরি। বলে চিংড়িমামা নিজের মাথার টুপিটা খুলে রাস্তার কিনারের ড্রেইনে ছুঁড়ে ফেলে দিল। দেখলাম, ড্রেইনের ময়লা জলে টুপিটা ভেসে যাচ্ছে।