
গাঁয়ে মায়ে সমান (ধারাবাহিক উপন্যাস)
সুদীপ ঘোষাল
প্রথম পর্ব
বাবুরাম সর্দার এর বিয়ের আসরে একটা ঝামেলা হয়েছিল।
বামুনের কয়েকজন নিমন্ত্রিত ছিল বিয়েতে। তাদের মধ্যে দু একজন ছোটো জাতির সঙ্গে একসঙ্গে বসে খেতে চাইছিল না। বিপিনও নিমন্ত্রিত ছিল। বিপিন রেগে গিয়ে বলে উঠল, ছোটো জাত বলছো শালা, রাতে তো ছোটো জাতির মেয়ের পা ধোয়া জল খাও, তখন মনে থাকে না।
একজন বলল, মুখ সামলে কথা বল বিপিন। তোর মত নয় সবাই।
– আরে আমি তো বলে কয়ে প্রেম করি, লুকিয়ে নয় রে।
বাবুরামের বন্ধু শিবে বলে, আরে এটা অনুষ্ঠান বাড়ি। গাজনতলা নয়। খাবে খাও, তা না হলে পথ দেখ বাপু।
নিমন্ত্রিতরা আর টুঁ শব্দ করেনি।
আসলে সকলেই জানে, জাতিভেদ মানুষের বানানো মিথ্যা এক প্রথা। মানুষের একটাই জাতি, তা হল মানবজাতি। তবু কুসংস্কার কেমন অন্ধকার মনে বাস করে এই আধুনিক যুগে।
প্রায় প্রতি গ্রামেরই এক প্রান্তে অপরিচ্ছন্ন, অবহেলায়, ভাঙাচোরা ঘর, স্থূপীকৃত ভাঙা হাঁড়ি কুড়ি ও শূকরের আনাগোনা, হাঁস, মুরগির ডাক—এসবে অনুমান করা হত এটা বাউড়িপাড়া। এদের পেশা সাধারণ ভাগচাষী, লোকের বাড়িতে মাহিন্দার, মুনিষ রূপে কাজ করে। ক্ষেত্রসমীক্ষা থেকে দেখা গেছে বাঁকুড়ার জেলার অধিকাংশ গ্রামের বাউড়িরা ছ’মাস ‘পুব’ করতে চলে যায় অর্থাৎ বাঁকুড়া ছেড়ে চাষাবাদে লাগে। যেমন, বর্ধমান, হুগলি প্রভৃতি জেলায় চাষের কাজ অর্থাৎ ধান লাগানো, ধানঝাড়া প্রভৃতি কর্ম করতে চলে যায়। এটি তাদের ভাষায় ‘পুব যাওয়া’ বলে। এরা পরিশ্রমী, নিত্যনৈমিত্তিক অভাবের জ্বালায় তারা অনেক ধরনের কাজ করে থাকে।
বাউড়িরা নিম্নলিখিত উপবর্ণগুলিতে বিভক্ত: মল্লভূমিয়া, শিখরিয়া বা গোবারিয়া, পঞ্চকোটী, মোলা বা মুলো, ঢালিয়া বা ঢুলো, মালুয়া, ঝাটিয়া বা ঝেটিয়া ও পাথুরিয়া। বাউড়িদের কয়েকটি উপবর্ণ নির্দিষ্ট অঞ্চলের সীমার মধ্যে বসবাস করতেন। মল্লভূমিয়া, মালুয়া ও সম্ভবত মোলারা প্রাচীন মধ্য ও দক্ষিণ বাঁকুড়ার বাসিন্দা ছিলেন। শিখরিয়ারা সম্ভবত বাস করতেন শিখরভূমের মধ্যবর্তী অঞ্চলে। ঢুলিয়ারা বাস করতেন ঢলভূম অর্থাৎ বর্তমান অঞ্চলে। পঞ্চকোটীরা ছিলেন পঞ্চকোট এস্টেটের বাসিন্দা।
লাল-পৃষ্ঠ বিশিষ্ট সারস ও কুকুর আজও বাউড়িদের টোটেম। সারস এই জাতির প্রতীক রূপে ব্যবহৃত। বাউড়িরা কুকুরকে পবিত্র মনে করে এবং কোনো অবস্থাতেই কুকুর হত্যা করে না।
বাউড়ি জাতি বাংলার একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী, যারা পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় অঞ্চলের বাঁকুড়া, বীরভূম, পুরুলিয়া এবং অন্যান্য জেলায় প্রধানত বাস করে।
এরা তফসিলি জাতি ও উপজাতি তালিকাভুক্ত এবং এই জাতির মধ্যে কাশ্যপ, পলাশগাছ, বক, শালগাছ, বাঘ, ঈগল, বানমাছ ও সাপ—এ ধরনের টোটেম বা গোত্র রয়েছে।
এই জাতির ইতিহাসে দেখা যায়, ব্রিটিশ শাসনের সময় এরা একাধিকবার অধিকার আদায়ের দাবিতে আন্দোলনে যুক্ত হন, কিন্তু তাদের আন্দোলনগুলো প্রায়শই আড়ালে থেকে গেছে।
সমাজজীবনের ক্ষেত্রে এদের মধ্যে যুক্ত পারিবারিক নীতি প্রচলিত। পরিবারের সব সদস্য এক ছাদের নীচে বাস করে। কম বয়সে বিবাহ, ঘটকের উপস্থিতিতে পাত্রপাত্রী নির্বাচন, এবং পণপ্রথা এখনো প্রচলিত রয়েছে। রক্তের সম্পর্কের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ এবং বিবাহের ক্ষেত্রে জাত ও গোত্র অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে।
বাউড়ি সমাজে প্রেম বিবাহ, আসুরিক বিবাহ এবং বউ বদলের মতো বৈশিষ্ট্যও দেখা যায়, তবে এসব সমাজের বৈশিষ্ট্য হিসাবে প্রচলিত। এছাড়া, সমাজে পণপ্রথা অনুযায়ী কনেপক্ষকে বরপক্ষ এক টাকা দিয়ে কনে কিনে নেওয়ার প্রথা আছে, যা আজও টিকে আছে।
মৃত্যুর পর শ্মশানের সমস্ত ভারী কাজ ওদের দ্বারাই নিষ্পন্ন হয়। এদের সামাজিক ও আর্থিক কোনো উন্নতি নেই। রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের সাহায্য যদিও প্রভূত পরিমাণ নয়, তবুও এদের সমাজের মানুষেরা গতানুগতিকভাবে জীবনযাপন করে আসছে। মেয়েদের একটিই পরিচিতি কোনো ধনী লোকের বাড়িতে কামিন অর্থাৎ মাজা, ঘষা, ঘরদোর পরিষ্কার করার কাজেই নিযুক্ত। মাসে সামান্য কিছু পয়সা পায়, বড়জোর একবেলা আহার মনিবের ঘর থেকে জোটে। এদের প্রায় সব শিশুরাই স্কুলে যায় না। মায়ের পিছনে পিছনে এসে সেও একদিন কাজের মেয়েতে পরিণত হয়ে যায়।
বাউড়িবউ পূর্ব বর্ধমান জেলার কেতুগ্রাম অঞ্চলের গ্রামে বাস করে। বাউড়ি পাড়ার কালোদা বিপিনের প্রিয় বন্ধু। বয়সে বড় হলেও কালোদা বিপিনের সিনিয়র বন্ধু। তারা একসঙ্গে বসে বাংলা মাল খায়।
কালোদার স্ত্রী মারা গেছেন বহুদিন আগে। বিপত্নীক কালোদা যুবক বয়সে মানুষের উপকার করতেন।
বিপিন বলে, আজ বড়দা, কাকাবাবু, বাবা, মা নেই বলতে বুক ফেটে যাচ্ছে। মা ও বড়দার কাছে শোনা একটি মজার সত্যি ঘটনা সকলকে জানাতে ইচ্ছে হলো।
গ্রামের বাড়িতে বিপিনের মাটির দোতলা বাড়ি ছিল। তখন তার বাবা, কাকা, মা, কাকিমা থাকতেন পুরুলে গ্রামের বাড়িতে। বিপিন বলে, আমার কাকাবাবু হেমন্তবাবু ছিলেন আমাদের ফ্রেন্ড, ফিলোজফার আ্যান্ড গাইড। সন্ধ্যাবেলা হলেই হ্যারিকেন নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে যেতাম দোতলার ঘরে। আমরা ভাই বোন একসাথে পড়ছি, এমন সময়ে কালোদার গলা শুনতে পেলাম। পড়ার থেকে গল্প হত আমাদের বেশি। বড়দা সবাইকে চুপ করতে বলল, কিসের চিৎকার হচ্ছে। শুনলাম নিচে হৈ হট্টগোলে সবাই ছোটাছুটি করছে। কালোদা আমাদের বাড়ির লোকাল গার্জেন। তিনি নীচে থেকে বলছেন, ওপরে যারা আছো, কেউ নিচে নামবে না। বড়দা জিজ্ঞাসা করল, কেন কালোদা? কালোদা জোরে চেঁচিয়ে বললেন, গোলার তলায় গুলবাঘ ঢুকেছে। সাবধান। ওরা মানুষের রক্ত খায়। বড়দা বললো, গুলবাঘ আবার কি? কালোদা বলল, বাঘের মত দেখতে। কিন্তু বাঘ নয়। সাইজে একটু ছোটো। ঠিক হায়েনার মত। ওরা খুব হিংস্র।
বাড়িতে সবাই আতঙ্কিত। সকলে ঘরে ঢুকে খিল দিয়ে বসে আছে। উঠোন একদম ফাঁকা। আমার বড়দার ভালো নাম দিলীপ। কিন্তু বড় শ্রদ্ধায় ডাকনাম আমরা দিয়েছি, বাহাদুর। বাহাদুর দিলীপদা পরোপকারী, বুদ্ধিমান, দরদী এবং সাহসী যুবক। দিলীপদার কাহিনি আমার স্মৃতিকথা, সাদা পাতায় জীবনরেখা গল্পে বিস্তারিত বর্ণনায় পাবেন। যাইহোক দিলীপদা বললেন, আর পারা যাচ্ছে না। গুলবাঘ গোলার তলায় ঢুকে আছে। বের হচ্ছে না। দেখি খুঁচিয়ে বের করি। এই বলে একটা গিঁট তোলা লাঠি নিয়ে নিচে নেমে এলেন। একহাতে তিন ব্যাটারির টর্চ আর এক হাতে লাঠি। মা, বাবা, কাকা সকলে চিৎকার করে উঠল, যাস না হতভাগা। কিন্তু বড়দা মনস্থির করে ফেলেছেন। তার বুদ্ধিতে সে বুঝতে পারছে এটা ভয়ংকর কিছু নয়। কিন্তু লাঠি দিয়ে খোঁচা মারার সঙ্গে সঙ্গে গুলবাঘ দাদার কাছে চলে এল। সে দেখল, একটা ভোঁতা মাথা। টর্চ রেখে দাদা মারল চার লাঠি। কিন্তু একটাও গুলবাঘের শরীরে পড়ল না। জন্তুটা লাফিয়ে উঠছে তিন ফুট। তারপর মাথা ঠান্ডা করে অপেক্ষা করল কিছুক্ষণ। সে দেখল, জন্তুটা বসে আছে আর মাথাটা নাড়াচ্ছে। তিন ব্যাটরীর টর্চের আলোয় দেখলেন, ওটা মাথা নয়। একটা ঘটি। জল রাখবার ঘটি। অই ঘটিতে চারটে ট্যাংরা মাছ দাদা ছিপে ধরে রেখে ভুলে গেছে বাড়িতে বলতে। দাদা ঘটিটা হাত দিয়ে ধরে টান মারতেই খুলে গেল। একটা বিড়াল মাছ খেতে গিয়ে ঘটিতে মাথা আটকে যাওয়ায় এই বিপত্তি। বড়দা লাঠি রেখে বিড়ালটাকে ধরে আদর করলেন। সবাই বেরিয়ে এল ঘর থেকে। কালোদা বলল, শালা বিড়ালের লোভ আর যাবে না। মারো শালাকে। কালোদা একটা লাঠি হাতে এগিয়ে আসেন পালোয়ানের মত।
ভিতর থেকে বিপিনের মা বলেন, কুকুর, বিড়াল কোনোদিন মেরো না, ওতে পাপ হয়। পৃথিবীটা ওদেরও।
কালোদা গিন্নিমাকে বলেন, আজ্ঞে, ঠিক বলেছেন।
বিড়ালটা আদরে আব্দারে ধন্যবাদ জানাল। সে সজোরে ডেকে উঠলো, ম্যাঁও…। (ক্রমশ)
(বাকি অংশ পরবর্তী জুলাই-আগস্ট, ২০২৬ সংখ্যায়)
[পরবর্তী পর্ব: দ্বিতীয় পর্ব]