
গাঁয়ে মায়ে সমান (ধারাবাহিক উপন্যাস)
সুদীপ ঘোষাল
তৃতীয় পর্ব
(আগেকার পর্ব- পর্ব-১, পর্ব-২,)
বিপিন বাউড়িবউকে রান্নাঘরে বলল, বুঝলে দশ বছর আগে, ঈশানী নদীর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে সবকিছু। জমির ধান, চালাঘর, জালা ও মাটির কলস, ছাগল, গরু, ভেড়া, হাঁস আর একটা কিশোরী।
গণেশদার কাঁধে একটা কালো ছাগল, হাতটা ফাঁকা। এক গলা জলে দাঁড়িয়ে স্রোতের দিকে। সে এগিয়ে এসে কিশোরীর চুল ধরে আটকালো কোনোরকমে। টানতে টানতে নিয়ে এল গ্রামে। তারপর নতুন পুকুরের উঁচু পাড়ে তেঁতুলগাছে বাঁধলো বাঁশ। বাঁশ আর ত্রিপল সহযোগে তৈরি করল গাছের উপর ঘর। গণেশ হাজরা একা মানুষ। অকৃতদার, পরোপকারী মানুষ।
কিশোরীকে জিজ্ঞাসা করেছিল, কি রে তোর নাম কি? কোথায় তোর বাড়ি।
– আমার বাড়ি কোপা।
– তোর মা বাবা কোথায়?
– মা, বাবা রান্নাঘরের চালায় বসে ছিল। তারপর জল বাড়লে ভাসতে ভাসতে চলে গেল নদের গর্ভে।
– বলিস কি। আহা রে। বেশ, আমি আছি তোর বাপের মতন। ভয় করিস না। আমি তোকে দেখব।
– কিশোরীর সাহস বাড়ল। কান্না থামিয়ে বলল, আমার খিদে পেয়েছে।
বাউড়িবউ বলে, আমরা জানি গণেশদা পরোপকারী লোক।
গণেশদা মুড়ি আর গুড় দিল। কিশোরী খেয়ে শান্ত হয়ে বসল। আবার তার চোখে জল। তার মনে পড়ে বাড়ির কথা। মা, বাবার কথা।
বাউড়িবউ রান্না হলে বিপিনকে বলে চলে যায় নিজের বাড়িতে।
তারপর গণেশ আসে বিপিনের কাছে। বিপিন বলে, কিশোরী কেমন আছে?
– ভালো আছে।
– সবকিছু মায়ের ইচ্ছা গো।
বাউড়িবউ বলেছিল, তোমার কাজে যদি মানুষের ক্ষতি হয়, সমাজের ক্ষতি হয় সেটাই পাপ কাজ।
বিপিন বলে, ঠিক বলেছিস বাউড়িবউ। সেইজন্য তোকে আমার এত ভাল লাগে।
বাউড়িবউ, গ্রামের নকুল বাউলের কাছে শুনেছে, সত্য যুগে দক্ষযজ্ঞে সতী শিবের নিন্দা সহ্য করতে না পেরে আত্মাহুতি দেন। এর পর মহাদেব কালভৈরবকে পাঠান দক্ষকে বধ করতে। সতীর দেহ নিয়ে তিনি শুরু করেন তাণ্ডবনৃত্য। ফলে বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ বিভিন্ন ভাগে খণ্ডিত করেন। এই অংশগুলো যেখানে পড়েছে সেখানে মন্দির তৈরি হয়েছে। এগুলোকে সতীপীঠ বা শক্তিপীঠ বলে। এগুলি তীর্থে পরিণত হয়েছে। পীঠনির্ণয়তন্ত্র মতে দেবীর বাম বাহু পড়েছিল বহুলায়। পরে রাজা চন্দ্রকেতুর নামানুসারে এই গ্রামের নাম হয় কেতুগ্রাম।
বিপিন বলে, তোকে নকুল বাউল যা বলেছে সব সত্যকথা।
তারপর নকুল বাউল এল। সে একটা গান শোনাল, এই দেহের ঘরে, তির মেরে, কামের বিনাশ কর।
বাউড়িবউ বলে, একটু বোসো বাউল।
নকুল নলে, তুমি আমার রাই গো। তুমি বললে, না বসে পারি।
তারপর সে বাতাসা আর জল খায়।
বাউড়িবউ বলে, সতীপীঠের গল্প বলো সাধুবাবা।
সাধু বলে, জেনে রাখ, পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে মাতা সতী নিজের বাপের বাড়িতে বাবার কাছে স্বামীর অপমান সহ্য করতে না পেরে সেখানেই দেহত্যাগ করেছিলেন। মাতা সতীর দেহত্যাগের খবর মহাদেবের কাছে পৌছতেই মহাদেব সেখানে উপস্থিত হন। সতীর মৃতদেহ দেখে ক্রোধে উন্মত্ত মহাদেব এই দেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য চালু করেন। মহাদেবের তাণ্ডব নৃত্যে পৃথিবী ধ্বংসের আশঙ্কায় শ্রীবিষ্ণু তার সুদর্শন চক্র দ্বারা মাতা সতীর দেহ একান্নটি খণ্ডে খণ্ডিত করেন। সেই দেহ খণ্ড গুলোই যে যে স্থানে পড়েছিল সেখানে একটি করে সতীপীঠ প্রতিষ্ঠা হয়। সেই রকমই একটি সতীপীঠ হলো “বেহুলা” বা “বহুলা” সতীপীঠ। অন্নদামঙ্গল গ্রন্থে এটিকে আবার “বাহুলা” পীঠ বলে উল্লেখ করা আছে এবং এখানের অধিষ্ঠিত দেবীকে “বাহুলা চণ্ডিকা” বলা হয়েছে। আবার “শিবচরিত গ্রন্থ” অনুযায়ী কেতুগ্রামেরই ‘রণখন্ড’ নামে একটি জায়গায় সতীর ‘ডান কনুই’ পড়েছে। এখানে অধিষ্ঠিত দেবীর নাম বহুলাক্ষী ও ভৈরব মহাকাল।
বিপিন বলে, পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া থেকে কুড়ি কিলোমিটারের মধ্যে দুটো সতীপীঠ, বহুলা সতীপীঠ ও অট্টহাস সতীপীঠ অবস্থিত। দুটি সতীপীঠই কেতুগ্রাম থানায় অবস্থিত।
নকুল বাউল বলেন, হ্যাঁ ঠিক বলেছো বাবু, কেতুগ্রামে তিলি বংশজাত ভূপাল নামক এক রাজা বাস করতেন। সেই রাজার একটি ছেলে ছিল, তার নাম চন্দ্রকেতু। মনে করা হয় চন্দ্রকেতুর নামেই এই গ্রামের নাম হয়েছে কেতুগ্রাম। প্রাচীনত্বের বিচারে এই কেতুগ্রামের বয়স অনেক। অনেকের মতে এই কেতুগ্রামেই জন্মেছিলেন নানুরের বিশালাক্ষী-বাশুলি দেবীর উপাসক চণ্ডীদাস। এই গ্রামে ছিল তার আদি বাসস্থান। এই কেতুগ্রামের উত্তরদিকের একটি জায়গাকে স্থানীয় মানুষজন চণ্ডীভিটা বলে সম্বোধন করে থাকে। গ্রামেই অবস্থান বহুলা মায়ের মন্দিরের। রাও পদবিধারী জমিদারেরা বহুলা দেবীর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে মনে করা হয়। বর্তমানে মন্দিরের যে সেবাইতরা রয়েছেন তারা এই রাও জমিদারদের বংশধর। এই কেতুগ্রামে “মরাঘাট মহাতীর্থ” বলে একটি জায়গা রয়েছে। অনেক ঐতিহাসিকদের মতে শিবচরিত গ্রন্থে রণখণ্ড বলে যে জায়গার উল্লেখ করা আছে সেটি আসলে কেতুগ্রামের মরাঘাট মহাতীর্থ নামক জায়গাটি। এখানেই দেবীর দেহখণ্ড পড়েছিল। এই মরাঘাটের পাশ দিয়ে ছোট নদী বয়ে গেছে। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে মরাঘাট মহাতীর্থ অনেক বছর আগে শশ্মান ছিল। শশ্মানের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর তীরে মৃত শিশুদের দেহ পোঁতা হতো। এখানে অনেক সাধক সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছেন। এখানেই রয়েছে দেবীর ভৈরব ভীরুক। তবে এটা নিয়ে মতান্তর আছে। অনেকের মতে কেতুগ্রামে বহুলা দেবীর সাথেই ভৈরব ভীরুকের অবস্থান। আবার অনেকের মতে কেতুগ্রাম থেকে একটু দূর “শ্রীখণ্ডে” আছে মায়ের আসল ভৈরব ভীরুকের লিঙ্গ ও মন্দির।
বিপিন বলে, গ্রামে মায়ের যে মন্দির আছে, সেটিকে নতুন ভাবে সংস্কার করা হয়েছে। মন্দিরে দেবীর মূর্তিটিকে একটি কালো পাথরের উপর স্থাপন করা হয়েছে। দেবীর মুখ বাদে সারা শরীর সুন্দর বস্ত্র দ্বারা আবরণ করা থাকে। মায়ের মূর্তির চারটি হাত। মায়ের পাশেই রয়েছে অষ্টভুজ গণেশের মূর্তি। গণেশের এই মূর্তিটি অনেক পুরানো। মা এখানে স্বামী পুত্র নিয়ে একসাথে বাস করেন। এখানে দেবীর নিত্য পুজো করা হয়। মাকে রোজ অন্নভোগ দেওয়া হয়। মন্দিরের পাশে একটি পুকুর আছে, অনেকের বিশ্বাস এই পুকুরে অবগাহন করলে রোগ ভালো হয়ে যায়।
নকুল বাউল বিপিনের তৈরি বাঁশের মাচায় বসে একতারা বাজাচ্ছিল। হাওয়ায় তার চুল উড়ছে, গলায় খালি একটা কাপড়।
নকুল বাউল গান করছে, কামের ঘরে কাদা ছুঁড়ে, কামের বিনাশ কর।
বিপিন গান শুনে বলে, ও নকুলদা, কি সুন্দর সুরে গাইছো গো? মনটা কেমন শান্ত হয়ে গেল।
নকুল হেসে বলে, এই সুরে আছে ভিতরের ডাক রে বিপিন, জগৎ যত দেখি তত বুঝি—সবই মায়া।
বিপিন বসে পড়ে পাশে, পায়ের ধুলো ঝেড়ে বলে, মায়া হোক আর সত্যি হোক, পেটের দায়টাও তো মিথ্যে না, নকুলদা।
নকুল একতারা ছুঁয়ে মৃদু স্বরে বলে, ঠিকই বলেছিস। কিন্তু এই খাওয়ার মধ্যেই খুঁজে নিতে হয় সেই সত্যি। ভিতরের ভাবটার বিশ্রাম যদি হয়, তবেই গান জমে।
বিপিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,তবু মাঝে মাঝে মনে হয়, এই গানই তো আমাদের প্রাণ, বেঁচে থাকার রসদ।
নকুল চোখ মেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, ঠিক তাই বিপিন, বাউলের গান মানে তো খোঁজ। নিজেকে, মানুষকে, আর সেই অদেখা প্রেমকে।
বিকেলের রোদে তাদের হাসির সঙ্গে মিশে যায় একতারার মৃদু সুর। গভীর অথচ অচেনা এক শান্তি ছড়িয়ে দেয় গ্রামজুড়ে। তারপর নকুল বাউল বলে, আসছি গো, আবার একদিন এসে খাওয়া দাওয়া করব। ভালো থেকো গো, সুখে থেকো।
নকুল বাউল গান ধরে আবার, “স্বার্থ ছাড়া বন্ধু বান্ধব কাছেও আসে না,… বিনা স্বার্থে ভালোবাসে শুধু আমার মা”।
এই নকুল বাউলের জীবনের একটা বিরাট কাহিনি আছে। (ক্রমশ)
(বাকি অংশ পরবর্তী নভেম্বর-ডিসেম্বর, ২০২৬ সংখ্যায়)
[পরবর্তী পর্ব: চতুর্থ পর্ব। আগের পর্ব: প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব]