
আরেক হর্ষবর্ধনের সুখদুঃখ (ছোটোগল্প)
সদানন্দ সিংহ
এক
আকাশে মেঘ ভেসে যাচ্ছে। দেখে বেশ আনন্দ হয় হর্ষবর্ধনের। কবিতার খাতা খুলে আঁকাবুকি কাটে। কবিতা তাকে কুরে কুরে খায় না, সে-ই কবিতাকে কুরে কুরে খাচ্ছে ইদানীং।
কারণ হর্ষবর্ধনের খুব ইচ্ছে একটা কবিতার বই বের করবে আর নিজের নামের একটা কার্ড বানাবে, যে কার্ডে লেখা থাকবে কবি হর্ষবর্ধন। কবি হওয়ার সাধ বহুদিনের তার। কবিতাটা ঠিক আসেনি এখনো, তা সে নিজেও জানে। কী লিখবে ছাতা-মাথা সে প্রায়সময়েই খুঁজে পায় না। কলম নিয়ে বসে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা, কিন্তু লেখা আর এগোয় না। এইসময়েই দুটি বিখ্যাত লাইন তার চোখের সামনে সর্বদা জ্বলজ্বল করে – “আমাদের ছোট নদী চলে বাকেঁ বাকেঁ, বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে।”
প্রায়সময়েই হর্ষবর্ধনের গিন্নি টিপ্পনি কাটে, রবীন্দ্রনাথ সেজে বসে বসে কেমন কাটিয়ে দিচ্ছ। এদিকে বাজার-টাজার সব করে আমি মরছি।
স্ত্রীর এসব কথা হর্ষবর্ধন গায়েই লাগায় না। সে জানে কবি হতে গেলে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়। তবে সে মুখে বলে, কবিরা কিন্তু বেশিদিন বাঁচে না। আমি মারা গেলে আর তোমাকে জ্বালাব না।
— বলি রবীন্দনাথ কতদিন বেঁচে ছিলেন ?
— তিনি বিশ্বকবি। তাঁর কথা আলাদা।
— তুমি তাহলে কীসের কবি ? একবার সবাইকে দেখিয়েই দাও না।
কীসের কবি – কথাগুলো শুনলে হর্ষবর্ধনের পিত্তি জ্বলে। মনটাকে শক্ত করে, হ্যাঁ একদিন দেখিয়েই দেব।
দুই
কবিতা লিখতে না পেরে হর্ষবর্ধনের মন সত্যিই খারাপ হয়। বাড়ির বাইরে গেলেও পকেটে কাগজ-কলম নিয়ে ঘোরে। তবু ফলাফল শূন্য। হতাশা বাড়ে।
একদিন হর্ষবর্ধন লক্ষ করে রাস্তায় দেয়ালে এক চিরকুট লাগানো আছে। সে কাছে গিয়ে দেখে ওখানে লেখা আছে – “ফ্রী কবিতার কোচিং, যোগাযোগ কবি গোবর্ধন (দশটি কাব্যগ্রন্থের লেখক) মোবাইল ৯৪৯৪৯৪৯৪৯৪।”।
প্রথমে সে ভাবল, এরকম একটা সুন্দর নাম্বার কি মোবাইলের হয়? তারপর কৌতূহলে সে এই নাম্বারে ফোন করতেই দেখে রিং হচ্ছে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ওপার থেকে আওয়াজ ভেসে আসে, হ্যালো, কে বলছেন?
হর্ষবর্ধন আমতা আমতা করে বলে, না মানে মানে আমি কবি হর্ষবর্ধন বলছি।
ওপার থেকে উত্তর আসে, বুঝতে পেরেছি, ফ্রী কবিতার কোচিং চাইছেন। তাই তো? ঠিক আছে আধ ঘন্টা বাদে আমার একটা শ্লথ খালি আছে। ওই সময় যদি নিতে চান তবে আপনার নাম-ঠিকানা বলুন, আমি আপনার বাড়ি গিয়ে কোচিং দেব। আর না হলে কুড়ি দিন পরের একটা শ্লথ খালি, তখন হবে। বলুন কী করবেন, তাড়াতাড়ি বলুন।
হর্ষবর্ধন তাড়াতাড়ি আধঘন্টা পরের শ্লথটা বেছে নেয় এবং কীভাবে তার ঠিকানায় আসতে হবে তাও জানিয়ে দেয়।
ঠিক আধ-ঘন্টা পরেই হর্ষবর্ধনের কলিং বেল বেজে ওঠে। হর্ষবর্ধন তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিতেই দেখে হাতে অনেকগুলি কবিতার বই নিয়ে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন তিনিই যে কবি গোবর্ধন তা চিনতে বিন্দুমাত্র অসুবিধে হয় না তার। কবি গোবর্ধনকে দেখে হর্ষবর্ধন প্রথমেই কাত হয়ে যায়। সাদা পাজামাপাঞ্জাবি পরা কাঁধে ঝোলা ব্যাগ সহ বাবরি চুলের কবিকে দেখে বিগলিত হর্ষবর্ধন বলে ওঠে, আমিই আপনাকে ফোন করেছিলাম। আসুন আসুন।
তারপর চা খেতে খেতে কবি গোবর্ধন বলতে থাকেন, কবিতা লেখার জন্যে প্রথমেই চাই অন্তরের খোলা মন। অন্তরের দৃষ্টি দিয়ে সামনে যাকে ইচ্ছে হয় দেখুন, তারপর আপনার যা মনে আসে লিখে ফেলুন। ধরুন সামনে যিনি আছেন তিনি হলেন ‘তুমি’। এবার তুমিকে নিয়ে আপনি যা মনে আসে তা লিখে ফেলুন। তবে একটু ঘুরিয়ে লিখুন। ধরুন তুমি নামক মাহিলাটির চুলে রজনীগন্ধার গন্ধ আপনি পেলেন। তাহলে সোজা ভাবে না লিখে আপনি লিখুন—
শতাব্দীর এক চারণভূমিতে
রজনীগন্ধার মেঘমল্লার
আর তোমার সেই অবিন্যস্ত কেশ
সারারাত আমি বিদিশার মুখ দেখে যাই।
তারপর ধরুন কোনদিন আপনি অবসাদগ্রস্ত, কিছুই আপনার ভাল লাগছে না, তখন আপনি লিখুন –
অবসাদগ্রস্ত পৃথিবী
চারিদিকে কেনো এতো হাহাকার
ডারউইনের হস্তে দাঁড়িয়ে আছি
উৎসবমুখর কেবল তোমার রাত।
আর হ্যাঁ, কবিতাকে আরো যদি দারুণভাবে দাঁড় করাতে চান তাহলে ঠিক জায়গামতো কিছু কিছু শব্দ ঢুকিয়ে দিন, যেমন লিঙ্গ, যোনি, স্তন, বাল এইসব। তারপর ফেসবুকে পোস্ট করে দিন। দেখবেন কিছুক্ষণের মধ্যেই লাইকের পর লাইক পড়ে যাচ্ছে।
হর্ষবর্ধন কবি গোবর্ধনের কথাগুলি বেদবাক্যের মত গিলতে থাকে। যাবার সময় কবি গোবর্ধন তাঁর প্রকাশিত দশটি বইয়ের মধ্যে কমপক্ষে পাঁচটি বই কেনার জন্যে অনুরোধ করেন পঞ্চাশ শতাংশ ছাড়ে। পঞ্চাশ শতাংশ ছাড় পেয়ে হর্ষবর্ধন ছ’টি বই কিনে নেয় হাজার টাকা দিয়ে।
তিন
এখন হর্ষবর্ধনের কলম থেকে কবিতা বেরুচ্ছে তো বেরুচ্ছেই। একেবারে যেন রেডিমেড। খাতার পর খাতা ভরে গেছে। মাঝে মাঝে জায়গামতো সে লিঙ্গ, যোনি, স্তন ইত্যাদি শব্দগুলো লাগিয়ে দেয়। এমন কি বাংলা ভাষায় যে শব্দ ব্যবহৃত হয়নি এমন কিছু শব্দও নিজে তৈরি করে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। নিয়মিত ৯৪৯৪৯৪৯৪৯৪ নাম্বারে যোগাযোগ হয়। সবচেয়ে খুশির খবর হল, কিছুদিনের মধ্যেই হর্ষবর্ধনের একটা কবিতার বই প্রকাশিত হচ্ছে। প্রকাশক আর কেউ নয়, কবি গোবর্ধন। কবিতার বই প্রকাশের জন্যে হর্ষবর্ধনের এক পয়সাও দিতে হচ্ছে না। তবে শর্ত একটাই, বইটা প্রকাশিত হলে হর্ষবর্ধনকে একশ কপি কিনতে হবে। এক কপি বইয়ের দাম রাখা হবে কমপক্ষে তিনশ টাকা। কবি যদি নিজের বই কিনেন তাহলে চল্লিশ শতাংশ ছাড় দেওয়া হবে। এতে হর্ষবর্ধন এক নিমেষেই রাজি। যাক, বইটা প্রকাশিত হলে নামের আগে কবি শব্দটা অনায়াসে লাগিয়ে নামের কার্ড বানাতে পারবে সে। আর কবিতার বইটা বেরুলেই সর্বপ্রথম তার স্ত্রীকেই দেখাবে — বুঝুক সে হর্ষবর্ধন নামের তার স্বামীটি অত ফেলনা নয়।