বর্ণবাদের সত্যতা, সনাতন ধর্মে বর্ণব্যবস্থার প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য – প্রোজ্জ্বল মণ্ডল

বর্ণবাদের সত্যতা, সনাতন ধর্মে বর্ণব্যবস্থার প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য – প্রোজ্জ্বল মণ্ডল

বর্ণবাদের সত্যতা, সনাতন ধর্মে বর্ণব্যবস্থার প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য

প্রোজ্জ্বল মণ্ডল

সমাজে ‘বর্ণপ্রথা’ নামে যে ধারণা প্রচলিত, তা শাস্ত্রভাষায় যথার্থ নয়; শাস্ত্রে যা আছে তা হলো ‘বর্ণাশ্রম’ বা ‘বর্ণব্যবস্থা’—বর্ণ ও আশ্রমের সমন্বিত সামাজিক-আধ্যাত্মিক রীতি। সনাতন শাস্ত্রে চতুর্বর্ণকে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র হিসেবে বর্ণিত করা হয়েছে। অনেক সময় বর্তমান সমাজে বংশগতভাবে একই বর্ণের সন্তানরা ঐ বর্ণের কাজই করে — তবে শাস্ত্রে বর্ণ কীভাবে নির্ধারিত হবে সে ব্যাপারে স্পষ্ট বিধান আছে। মহামুনি যাস্ক বলেছেন “বর্ণো বৃণোতেঃ”, অর্থাৎ বর্ণ বরণ করা হয়; ব্যক্তি নিজের গুণ ও স্বভাব অনুযায়ী যে কর্ম বেছে নেয়, তিনি সেই বর্ণ ধারণ করেন। এভাবে চার বর্ণ মানবজীবনের বিভিন্ন কার্য-আচ্ছাদন মাত্র, যেগুলি গুণ ও কর্মের মাধ্যমে গৃহীত হয়।
বেদের বিভিন্ন স্থানে বর্ণের স্বভাব ও কর্তব্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। ঋগ্বেদে বলা আছে— “নানানং বা উ নো ধিয়ো বি ব্রতানি জনানাম্। তক্ষা রিষ্ঠং রুতং ভিষগ্ব্রহ্মা সুন্বন্তমিচ্ছতীন্দ্রায়েন্দোপরি স্রব।।” (ঋগ্বেদ ৯/১১২/১) — অনুবাদ: প্রত্যেকের কর্মক্ষমতা ও আধ্যাত্মিকতা ভিন্ন; সে অনুসারে কেউ ব্রাহ্মণ, কেউ ক্ষত্রিয়, কেউ বৈশ্য ও কেউ শূদ্র। মনুস্মৃতি ও উপনিষদে প্রতিটি বর্ণের কর্ম ও আচরণ বর্ণিত; গীতায় ব্রাহ্মণের গুণগুলো বলেছে— “শমো দমস্তপঃ শৌচং ক্ষান্তিরার্জবমেব চ। জ্ঞানং বিজ্ঞানমাস্তিক্যং ব্রহ্মকর্ম স্বভাবজম্।।” (গীতা ১৮/৪২) — অর্থ: শম, দম, তপ, শুচিতা, ক্ষমা, সরলতা, ভক্তি, জ্ঞান ও বিজ্ঞানের অনুশীলন—এগুলো ব্রাহ্মণের স্বভাবজাত কর্ম। ক্ষত্রিয়দের জন্য গীতা নির্দেশ করে— “শৌর্যং তেজো ধৃতিদাক্ষ্যং যুদ্ধে চাপ্যপলায়নম্। দানমীশ্বরভাবশ্চ ক্ষাত্রং কর্ম স্বভাবজম্ ॥” (গীতা ১৮/৪৩) — সাহস, তেজ, ধৈর্য, দক্ষতা, যুদ্ধ ও প্রজাসুরক্ষা, দান—এসব ক্ষত্রিয় স্বভাব। বৈশ্যদের জন্য— “কৃষিগৌরক্ষ্যবাণিজ্যং বৈশ্যকর্ম স্বভাবজম্।” (গীতা ১৮/৪৪) এবং শূদ্রদের জন্য— “পরিচর্যাত্মকং কর্ম শূদ্রস্যাপি স্বভাবজম্ ॥” (গীতা ১৮/৪৪)। মনুস্মৃতি শূদ্রকে নির্দেশ দেয় উচ্চস্তরের ব্যক্তিদের সেবা করা ও ঈর্ষা-নিন্দা থেকে বিরত থাকার কথা: “একমেব হি শূদ্রস্য প্রভুঃ কর্ম সমাদিশাত্। এতোষামেব বর্ণানাং শুশ্রূষামনসূয়য়া।।” (মনুস্মৃতি ১/৯১)। এসব শাস্ত্রীয় বর্ণনা পরিষ্কার করে যে প্রতিটি বর্ণকে ভিন্ন দায়িত্ব প্রদান করে সমাজকে কার্যনির্ভরভাবে সমন্বিত করা হয়েছে।
শাস্ত্রে বর্ণ পরিবর্তনের সুযোগ ব্যাখ্যাও আছে, কারণ বর্ণ নির্ধারণ গুণ ও কর্মের ওপর। মনুস্মৃতি ও উপনিষদে নানা কাহিনি রয়েছে যেখানে জন্মসূত্রে নিম্নবর্গীয় ব্যক্তিরাই তপস্যা ও বিদ্যার মাধ্যমে উচ্চ বর্ণে উঠেছেন। ছান্দোগ্য উপনিষদে সত্যকাম জাবালের কাহিনি আলোচিত; তিনি পতিতার পুত্র বলে জন্মেও ঋষি গৌতমের কাছে উপনয়ন নিয়ে ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করেন। ছান্দোগ্যে পৌত্রায়নের কাহিনি, বিশ্বামিত্রের ক্ষত্রিয় থেকে ব্রাহ্মণত্বে উত্তরণ—এসবই প্রমাণ করে জন্মভিত্তিক শ্রেণিবদ্ধতা শাস্ত্রীয় শিক্ষার সারমর্ম নয়; তপস্যা, জ্ঞান ও আচরণের মাধ্যমে কেউ যে কোন উচ্চ বর্ণ অর্জন করতে পারে। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ও ঋষি মাতঙ্গের কাহিনি একই নীতি পুনরাবৃত্ত করে। এইসব আখ্যান বর্ণবিভাগকে গুণকর্মনির্ভর হিসেবে উপস্থাপন করে।
বেদের বহু মন্ত্রই চার বর্ণকে সমমনা ও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান করে। অথর্ববেদে আছে— “প্রিয়ং মা কৃণু দেবেষু প্রিয়ং রাজসু মা কৃণু। প্রিয়ং সর্বস্য পশ্যত উত শূদ্র উতার্যে।।” (অথর্ববেদ ১৯/৬২/১) — অনুবাদ: হে প্রভু! আমাকে ব্রাহ্মণদের মধ্যে প্রিয় কর, ক্ষত্রিয়দের মধ্যে প্রিয় কর, শূদ্র ও বণিক সমাজে প্রিয় কর। ঋগ্বেদেও সমচেতনা ও ঐক্যের ওপর জোর আছে— “সমিতিঃ সমানী সমানং মনঃ সহচিত্ত মেষাম্। সমানং মন্ত্রমভি মন্ত্রয়ে বঃ সমানেন বো হবিষা জুহোমি ।।” (ঋগ্বেদ ১০/১৯১/৩)। এসব মন্ত্র দেখায় শাস্ত্রের উদ্দেশ্য সমাজে সাম্যের অনুশীলন ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। মূলত বর্ণব্যবস্থার লক্ষ্য ছিল সমাজকে কাজভিত্তিকভাবে বিভক্ত করে ধারাবাহিকতা, শৃঙ্খলা ও ধর্ম-শিক্ষার রক্ষণ করা—কিন্তু ইতিহাসে এই ব্যবস্থাকে অনেক সময়ে জন্মভিত্তিক শক্তি-বিভাজনে রূপান্তর করে বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে, যা শাস্ত্রের মূল বক্তব্যের পরিপন্থী।
ইতিহাসে বর্ণবাদের অপব্যবহার ঘটেছে—শাসক বা স্বার্থান্বেষী শ্রেণি বর্ণব্যবস্থাকে ক্ষমতা ধরে রাখার উপায় হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং ধর্মীয় আড়ালে জন্মভিত্তিক বৈষম্যকে বৈধতা দিয়েছেন। ফলে সমাজে দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্য ও বঞ্চনার উপদ্রব দেখা দিয়েছে। কিন্তু শাস্ত্র সাদৃশ্য নয়; শাস্ত্রে বর্ণ নির্ধারণ গুণ ও কর্মের ওপর—যদি কোনো ব্যক্তি ব্রাহ্মণ কুলে জন্ম নিয়ে তাঁর কর্তব্য পালন না করে, বিদ্যার অন্বেষণ না করে, সভ্য আচরণ বজায় না রাখে, তিনি ব্রাহ্মণ হিসেবেই গণ্য হবেন না; বিপরীতে শূদ্রকুলের কেউ যদি তপস্যা, জ্ঞান ও কৃতিত্ব দ্বারা অনন্য হয়ে উঠে, তিনি উচ্চ বর্ণে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন। মনুস্মৃতির স্পষ্ট উক্তি— “শূদ্রো ব্রাহ্মণতামেতি ব্রাহ্মণশ্চৈতি শূদ্রতাম্। ক্ষত্রিয়াজ্জাতমেবং তু বিদ্যাদ্বৈশ্যাত্তথৈব চ ।।” (মনুস্মৃতি ১০/৬৫) — এখানে বলা হয়েছে শূদ্রকুলেই জন্মগ্রহণ করে যে কেউ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় বা বৈশ্যদের সমান গুণ অর্জন করলে তিনি সেই বর্ণে অধিষ্ঠিত হবেন; আর যদি ব্রাহ্মণকুলে জন্ম নিয়ে গুণ-স্বভাব শূদ্রদের মতো হয়, তিনি শূদ্রে পতিত হবেন। অর্থাৎ বর্ণ জন্মগত নয়, গুণ ও কর্ম-নির্ভর।
গীতার একটি কেন্দ্রীয় বক্তব্য— “ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়শং শূদ্রানাং চ পরন্তপ। কর্মাণি প্রবিভক্তানিং স্বভাপ্রভ বৈর্গুণৈঃ।।” (গীতা ১৮/৪১) এবং “চাতুর্বর্ণং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ” (গীতা ৪/১৩)—এই দুটি মন্ত্রই পরিষ্কার বলেছে যে চতুর্বর্ণ সৃষ্টি গুণ ও কর্মভিত্তিক। তাই লোকমুখে প্রচলিত ‘বর্ণপ্রথা’ শব্দটি শাস্ত্রীয় পরিভাষায় ভুল বোঝাবুঝি; সঠিক নাম ‘বর্ণাশ্রম’—একটি সামাজিক-আধ্যাত্মিক সংগঠন যা ব্যক্তি-গুণ ও কর্ম অনুযায়ী দায়িত্ব বণ্টন করে। পবিত্র বেদ, উপনিষদ ও স্মৃতি সব মিলিয়ে যে বার্তা দেয়, তা স্পষ্ট—বর্ণ হ’ল আচার-গুণ-কার্যের স্বরূপ, জন্মভিত্তিক চিহ্ন নয়।
বর্তমান সমাজে বর্ণবাদের বিষয়ে প্রচলিত ভুলধারণা ও অপব্যাখ্যা দূর করতে প্রয়োজন শাস্ত্রের ঐতেজসপূর্ণ পাঠ ও নৈতিক বোঝাপড়া। সনাতন ধর্মকে জন্মভিত্তিক বর্ণবাদের সমর্থক হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়; পবিত্র গ্রন্থগুলো স্পষ্টভাবে বলেছে বর্ণ নির্ধারিত হয় স্বভাব, গুণ ও কর্মের ওপর। ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের অভিজ্ঞতাও বলে দিয়েছে যে প্রকৃত শাস্ত্রীয় মনোভাব ছিল গুণকর্মনির্ভর ও সমাজকে কার্যনির্ভর বিভাজন করে সংহত রাখার চেষ্টা; কেবল ইতিহাসের কিছু দিকই জন্মভিত্তিক হায়ারার্কি তৈরি করে তুলেছে।
অতএব বর্ণব্যবস্থার সারসংক্ষেপ এই যে — ব্যক্তি জন্মের পরে উপযুক্ত সময়ে নিজের গুণ, জ্ঞান ও কর্মের মাধ্যমে যে অবস্থান অর্জন করে, সেই অনুযায়ী বর্ণ নির্ধারিত হয়। পবিত্র বেদে বর্ণ স্পষ্টরূপে জ্ঞান ও কর্মনির্ভর। যদি কেউ ব্রাহ্মণ কুলে জন্ম নিয়ে ব্রাহ্মণীয় গুণ-কার্যের অনুশীলন না করে, তিনি ব্রাহ্মণ হিসেবে গণ্য হবেন না; এবং শূদ্র কুলে জন্ম নিয়েও যদি কেউ গুণ, তপস্যা ও জ্ঞান অর্জন করে, তিনি উচ্চ বর্ণে অধিষ্ঠিত হতে পারেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিই শাস্ত্রে উল্লিখিত এবং আধুনিক নৈতিকতায় গ্রহণযোগ্য। ফলে আমাদের বর্তমান দায়িত্ব হলো—শাস্ত্রের মূল বার্তা মেনে নয়া যুগে গুণ ও কর্মকে মানদণ্ড করা এবং জন্মভিত্তিক বৈষম্য নির্মূল করে সনাতনের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দিককে জোরদার করা। শাস্ত্রে কোথাও এমন কোনো সমর্থন নেই যা বলে ঈশ্বর জন্মসূত্রে কাউকে চিরতরে সম্মানিত বা লাঞ্ছিত করেন; বরং প্রত্যেককে তার অর্জিত গুণ ও কাজ অনুযায়ী মূল্যায়ন করা হবে—এটাই শাস্ত্রের মূল বক্তব্য। তাই বিকৃত বর্ণভিত্তিক প্রথা ও বৈষম্যকে অগ্রাহ্য করে যার প্রতি শাস্ত্র আহ্বান করে—সাম্যের মনোভাব ও গুণকর্মনির্ভর মূল্যায়ন—তাই বর্তমান সমাজে গ্রহণযোগ্য ও নৈতিক পথ।