মিথ্যে রোগী – চেখভ

মিথ্যে রোগী – চেখভ

মিথ্যে রোগী

চেখভ

(রাশিয়ান গল্প, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: বিজয়া দেব)

মারফা পেত্রনোভা পেটসনকিন, জেনারেলের বিধবা স্ত্রী, যে গত দশ বছর ধরে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক হিসেবে প্রাক্টিস করছে, সে মে মাসের মঙ্গলবারে তার চেম্বারে বসে রোগী দেখছিল। টেবিলের ওপর ওষুধ রাখার বাক্সে হোমিওপ্যাথি ওষুধ, একটি হোমিওপ্যাথি বই, হোমিওপ্যাথি কেমিস্টের দেওয়া ওষুধের বিল রাখা। দেয়ালে ঝোলানো রয়েছে পিটার্সবার্গের কিছু হোমিওপ্যাথের চিঠি, মারফা পেত্রনোভার মতানুসারে এঁরা অত্যন্ত স্বনামধন্য ও উন্নতমানের চিকিৎসক, চিঠিগুলো সোনালি ফ্রেমে বাঁধিয়ে দেয়ালে ঝোলানো রয়েছে এছাড়াও ফাদার আরিস্টার্কের একটি পোর্ট্রেট টাঙানো, যাঁর কাছে মারফা নিয়মিত শ্রদ্ধাভক্তি নিবেদন করে থাকে, অর্থাৎ, সে বিশ্বাস করে ক্ষতিকারক আলোপ্যাথি থেকে নিজেকে রক্ষা করার কথা তিনি বলেছেন এবং সত্যি জানার জ্ঞান একমাত্র তাঁর কাছ থেকেই পাওয়া সম্ভব। পাশের ঘরে রোগীরা অপেক্ষা করছে, বেশিরভাগ রোগীরা কৃষক। এদের মধ্যে দুই-তিনজন খালি পায়ে আছে, কারণ মহিলাটি তাদের দুর্গন্ধ নোংরা জুতো বাইরে উঠোনে রেখে আসতে বলেছেন।

মারফা পেত্রনোভা ইতিমধ্যে দশটি রোগী দেখেছেন, এখন এগারো নম্বরের জন্যে হাঁক দিলেন, “গাভরিলা গ্রুজ”!

দরজা খুলে গেল এবং গাভরিলা গ্রুজের পরিবর্তে জামুহ্রিসেন, দারিদ্র‍্যে ডুবে যাওয়া এক প্রতিবেশি জমিদার, দেখতে ছোটখাটো এক বুড়ো মানুষ যার দুটো ঘোলাটে চোখ, মাথায় ভদ্রোচিত টুপি লাগানো, ঘরে এসে প্রবেশ করল। সে তার হাতের ছড়ি ঘরের এককোণে রেখে, মহিলাটির কাছে এসে একটি শব্দও খরচ না করে হাঁটু মুড়ে আত্মনিবেদনের ভঙ্গিতে মারফার সামনে বসে পড়ল।
“এসব কি হচ্ছে কাঝমা কুঝমিচ? – ভয়ার্ত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো মহিলাটি। উত্তেজনায় সে লাল হয়ে বলল – “ঈশ্বরের দোহাই!”
“আমি বেঁচে আছি, আর যদি বেঁচে থাকি, আমি কখনওই উঠে দাঁড়াবো না।” –
জামুহ্রিসেন মারফার হাতের কাছে নতজানু হয়ে বলল, “আমাদের অভিভাবক আপনি, ঈশ্বরের দূত, মানবজাতির সাহায্যকারী আপনি! আপনি একটি সুন্দরী পরি, যে আমাকে নতুন জীবন দিয়েছে, সত্যের পথকে চিনিয়েছে, এবং সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্নতা থেকে জাগ্রত করেছে, আমি তাঁর কাছে শুধু হাঁটু মুড়ে বসে কৃতজ্ঞতাই শুধু স্বীকার করবো না, আমি তাঁর জন্যে আগুনের ভেতর দিয়ে ছুটে যেতে পারবো। হে অবিশ্বাস্য শুশ্রূষাকারিণী! অনাথ ও বিধবাদের মাতা! আমি নিজেকে ফিরে পেয়েছি, আমি এখন এক নতুন মানুষ, আপনার জাদুকরী গুণে আমি মন্ত্রমুগ্ধ।”
“আমি.. আমি খুব খুশি… আনন্দে উদ্বেল হয়ে মহিলাটি উচ্চারণ করলো, “তোমার কথাগুলো আমাকে আনন্দ দিয়েছে… প্লিজ বসো। সেই মঙ্গলবারে তুমি এতো গুরুতর অসুস্থ হয়েছিলে কেন?”
“সত্যিই, আমি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম,ভাবতেই দারুণ অস্বস্তি হচ্ছে।” সামনের চেয়ারে বসতে বসতে জামুহ্রিসেন বলল। “আমার সারা দেহ, দেহের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বাতব্যাধিতে আক্রান্ত। গত আটবছর থেকে আমি চরম দুঃখযন্ত্রণার মধ্য দিয়ে চলেছি, এর থেকে অব্যাহতি মিলছে না…সারা দিন সারা রাত, হে আমার শুশ্রূষাদাত্রী! আমি অনেক ডাক্তারের কাছে গেছি, কাজানের অধ্যাপকদের কাছেও দেখা করেছি; কাদা জলে স্নান করেছি, প্রচুর জলপান করেছি, ঈশ্বর সাক্ষী, নিজেকে সুস্থ করে তুলতে কোন্ চেষ্টা আমি করিনি! হে সৌন্দর্যের দেবী! আমি আমার যা কিছু আছে, সব কিছুই নষ্ট করেছি ঐ ডাক্তার আর সুচিকিৎসার জন্যে, ডাক্তাররা আমার শুধু ক্ষতিই করেছে। তাঁরা এই রোগকে আমার ভেতর পর্যন্ত নিয়ে গেছে। রোগকে ভেতর দিকে টেনে নিতেই তাঁরা জানে, রোগকে টেনে বের করে দেওয়ার কোনও রাস্তা তাঁদের চর্চিত বিজ্ঞানের বাইরে। তাঁদের সবাই কি নিয়ে আগ্রহী? তাঁদের ফী, এই ব্যাপারে তাঁরা ডাকাত, কিন্তু মানবজাতির সুস্থতার জন্যে তাঁদের এক চুলও কিছু যায় আসে না। হাবিজাবি কিছু ওষুধ তারা প্রেস্ক্রাইব করে দেবে, আর তোমাকে তা পান করাতে বাধ্য করবে। ‘আততায়ী’ এই একটি শব্দেই তাঁদের পরিচয় দেওয়া ভালো। যদি আপনি না থাকতেন, হে দেবদূতী! আমি এতদিনে কবরে শুয়ে থাকতাম। সেই মঙ্গলবার আমি আপনার এখান থেকে বাড়ি গেলাম, আপনার দেওয়া ছোট্ট ছোট্ট বড়িগুলো দেখে ভাবলাম এই অতি ক্ষুদ্র বড়িগুলোর মাঝে এমন কী চমৎকার আছে! এটা কি সম্ভব এই ছোট্ট শস্যদানার মতো বড়ি আমার এই সারাদেহে ছড়িয়ে পড়া দীর্ঘমেয়াদি অসুখ নিরাময় করবে? এটাই আমি ভেবেছিলাম, এ যে একেবারেই অবিশ্বাস্য! আমি মৃদু হেসেছিলাম ; কিন্তু যখন সেই ছোট্ট বড়ি নিলাম, তৎক্ষণাৎ তার একটা প্রত্যুত্তর পেলাম, এটা এমন যেন আমি অসুস্থই হইনি, যেন আমাকে তা শোয়া থেকে তুলে একেবারে ওপরে উঠিয়ে দিয়েছে। আমার স্ত্রী এমনভাবে আমার দিকে তাকিয়ে যেন তার চোখদুটো কপাল থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসবে, সে কিছুতেই বিষয়টা বিশ্বাস করতে পারছিল না।
‘এ কি তুমি? কোলিয়া?’, ‘হ্যাঁ, আমি।’’ – বলেছিলাম। আমরা হাঁটু মুড়ে বসে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছিলাম। এবং আমাদের দেবদূতের জন্যেও প্রার্থনা করছিলাম- ‘হে ঈশ্বর! তুমিই তাঁকে পাঠিয়েছ। হে ঈশ্বর আমরা সত্যিই তা-ই অনুভব করছি।’’

জামুহ্রিসেন জামার হাতা দিয়ে চোখ মুছে চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে পড়লো আবার হাঁটু মুড়ে বসে কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্যে, কিন্তু মহিলাটি এবার বাধা দিল ও তাঁকে চেয়ারে বসতে অনুরোধ করল।
‘সে আমি নই, যাঁকে তুমি ধন্যবাদ জানাতে চাইছো’- সে উত্তেজনায় উদ্বেল হয়ে বলে উঠল, উৎসাহে পূর্ণ হয়ে সে দেয়ালে ঝোলানো ফাদার আরিস্টার্কের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘’আমি কিছু নই, আমি তাঁর আজ্ঞাবহ মাত্র..এ সত্যিই মিরাকল, আট বছরের বাতব্যাধির রোগীকে একটি বড়ি একেবারে দাঁড় করিয়ে দিলো!
“ক্ষমা করবেন, আপনি সত্যিই খুব দয়ালু, আপনি আমাকে তিনটি বড়ি দিয়েছিলেন একটি আমি রাতের খাবারের পর নিয়েছি, যার প্রতিক্রিয়া একেবারে হাতে হাতে! অন্যটা সন্ধের সময়, এবং তিন নম্বরটি পরের দিন, ব্যস! তারপর থেকে আর সেই খিঁচ ধরা ব্যথা গায়েব! আপনাকে বলি, আমি ভেবেছিলাম আমি মরে যাচ্ছি, আমার ছেলেকে চিঠি লিখলাম মস্কোতে, চলে আসবার জন্যে! ঈশ্বর আপনাকে বুদ্ধি দিয়েছেন, জ্ঞান দিয়েছেন, হে শুশ্রূষার দেবী! এখন আমি হাঁটতে পারছি, আর অনুভব করছি যেন আমি স্বর্গে আছি। ঐ মঙ্গলবার আমি এসেছিলাম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, আর আজ! মনে হচ্ছে আমি ঘোড়াকে ধরার জন্যে ছুটতে পারবো…আমি আরও একশো বছর বাঁচতে পারবো, শুধু একটিই অসুবিধে আমার, আমি গরিব। আমি এখন সুস্থ, কিন্তু বাঁচতে গিয়ে যে অর্থের প্রয়োজন, তা-ই যদি না থাকে, তাহলে এই স্বাস্থ্য দিয়েই বা কী হবে! দারিদ্র্য বোঝার মতো আমার ঘাড়ে চেপে বসেছে এবং দারিদ্র্য অসুস্থতার চাইতেও বেশি ক্ষতিকর… যেমন ধরুন, এখন ওটস রোপণের সময়, কিন্তু সে কী করে কাজটা করবে, যদি তার কাছে শস্যদানাই না থাকে! আমার উচিত সেটা বাজার থেকে কিনে নেওয়া, কিন্তু টাকা… সবাই জানে আমি কতটুকু দরিদ্র…’’
“আমি তোমাকে ওটস দেবো, কুঝমা কুঝমিচ… বসো বসো। তুমি আমাকে এতো আনন্দ দিয়েছ, এতটাই স্ফূর্তি দিয়েছ যে তোমার ধন্যবাদ দেওয়ার কথা নয়, আমারই তোমাকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত।”
“আপনি আমাদের আনন্দ! আপনি ঈশ্বরের এক অনবদ্য সৃষ্টি! আনন্দে থাকুন ম্যাডাম, ভালো কাজের দিকেই আপনার দৃষ্টি থাকুক…আমাদের মতো পাপীতাপীদের তো নিজেদের নিয়ে আনন্দ করার মতো কোনও কারণ থাকে না, আমরা তুচ্ছ, দুর্বল ইচ্ছেশক্তি নিয়ে জন্মেছি, একেবারেই যাকে বলে ইউজলেস… নামেই ভদ্রলোক, কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে, আমরা দরিদ্র কৃষকদের সমপর্যায়ের, একেবারেই নীচে..আমরা পাথরের ঘরে বাস করি, কিন্তু সেটাও একটা কল্পিত বাস্তব..ছাদ ফুটো হয়ে জল পড়ছে। এটাকে যে সারাই করব তার জন্যে তো টাকার দরকার!’’
‘আমি তোমাকে কাঠ দেবো, কুঝমা কুঝমিচ!’
জামুহ্রিসেন এরপর একটি গরুর না থাকার অসুবিধের কথা বলে গরু পাবার ব্যবস্থা করল, তার মেয়েকে বোর্ডিং ইশকুলে পাঠানোর জন্যে একটি সুপারিশপত্রের ব্যবস্থা করল, মহিলার এই দানশীলতায় আপ্লুত হয়ে সে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারছিল না, চোখের জল মোছার জন্যে সে পকেটে হাত দিয়ে সে রুমাল খুঁজতে লাগল।
মারফা দেখলো তার পকেটে একটি লাল কাগজের স্লিপ উঁকি দিচ্ছে রুমালের সাথে এবং তা নিঃশব্দে মেঝেতে পড়ে গেল।
“আমি কখনওই এই সাহায্য ভুলবো না, সবই ঈশ্বরের দয়া…”সে বলতে লাগলো। “আমি আমার সন্তানদের নাতিপুতিদের আপনার এই মহৎ সাহায্যের কথা বলবো যাতে এই অপার সাহায্য তারা কখনও, মানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভুলে না যায়! বলবো – “ জেনে রাখো, কে আমাকে কবর থেকে তুলে এনেছিল কে….”

যখন রোগীটি বেরিয়ে গেল, মহিলাটি এক মিনিট দেয়ালে ঝোলানো ফাদার আরিস্টার্কের পোর্ট্রেটের দিকে তাকিয়ে রইল, দু’চোখ জলে পূর্ণ, তার ওষুধপত্র, বই, বিল, হাতল দেওয়া চেয়ার এইমাত্র যে লোকটা বসেছিল একটু আগে, এইসব খুঁটিনাটির ওপর পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো, এইবার তার চোখ পড়লো সেই লাল কাগজের টুকরোর দিকে যা সেই রোগীর পকেট থেকে পড়েছে। সে কাগজের টুকরোটি তুললো, ভাঁজ খুললো, এবং দেখতে পেলো সেই কাগজে মোড়া রয়েছে সেই তিনটি ওষুধের দানা যা সে গত মঙ্গলবার জামুহ্রিসেনকে দিয়েছিল।
সে বিভ্রান্ত হয়ে ভাবতে লাগলো, ‘এই তিনটি ওষুধই তো.. সেই কাগজটিই তো মনে হচ্ছে, সে মোড়ক থেকে খোলেনি পর্যন্ত! তাহলে সে কোন ওষুধ খেলো! আশ্চর্য!… নিশ্চয়ই সে আমাকে এভাবে ধোঁকা দিতে পারে না!

তাঁর এই দশ বছরের রোগী দেখার অভিজ্ঞতায় এই প্রথম মারফা পেত্রনোভার মনে একটা সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি হলো… সে পরবর্তী রোগীদের যখন দেখছে,এদের খুঁটিনাটি ব্যবহার লক্ষ করতে লাগলো। এমন কী ব্যাপার যে তার কান ও চোখ এখন পর্যন্ত এড়িয়ে যাচ্ছে। রোগীদের প্রত্যেককেই দেখে মনে হচ্ছে যেন সবাই একটি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে আছে, প্রথমে তাকে খোশামোদ করছে তার চিকিৎসার অভাবনীয় নিরাময় ক্ষমতার কথা বলে, আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলে যাচ্ছে তার চিকিৎসক হিসেবে সুদক্ষতার কথা এবং এলোপ্যাথ ডাক্তারদের দোষারোপ করছে, এবং যখনই সে উত্তেজনায় আনন্দে আপ্লুত হয়ে উঠেছে তারা অনর্গল বকেই যাচ্ছে আসলেই নিজের প্রয়োজনে। কেউ একটুকরো চাষের জমি চাইছে, কেউ কাঠ চাইছে, কেউ বা তার জঙ্গলে বন্দুক চালিয়ে শিকার করতে চাইছে ইত্যাদি ইত্যাদি। সে সামনের বোর্ডে ঝোলানো ফাদার এরিস্টার্কের হিতৈষী মুখাবয়বের দিকে তাকালো, ইনি তার নিকট সত্য উদঘাটন করেছিলেন, কিন্তু এখন আরেক নতুন সত্য তার ভেতরটা কুরে খাচ্ছে, এবং সেই সত্য বড্ড নিপীড়ক…মানুষের প্রতারণা!

(মূল গল্প – Anton Chekhov’s “Malingerers” থেকে অনূদিত, অনুবাদ করেছেন বিজয়া দেব)