
চোর (অনুগল্প)
সদানন্দ সিংহ
মহানন্দ বিপত্নীক মানুষ। বয়স চল্লিশ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু পত্নী বিয়োগের পর আর বিয়ে করেননি। নিঃসন্তানও। আগে কাপড়ের ব্যবসা ছিল, সেই ব্যবসা এখন তিনি বন্ধ করে দিয়েছেন। শহরতলিতে নিজের এক তেতলা বাড়িতে থাকেন। বাড়িটা অবশ্য পিতৃদত্ত সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি। একতলা এবং দোতলার সব ঘর ভাড়া দেওয়া। এই ভাড়ার টাকায় তাঁর বেশ চলে যায়। তিনতলা কাউকে ভাড়া দেননি, একাই থাকেন। দুটো ঘর নিজে ব্যবহার করেন। বাকি তিনটে ঘর তালা দেওয়া থাকে। দু বোনের বহু বছর আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে বোনরা বা আত্মীয়স্বজন কেউ এলে বন্ধ ঘরের দরজাগুলো খোলা হয়।
গলায় ক্যান্সার ধরা পড়ার পর তাঁর পত্নী চারিদিকে তাঁদের সীমানা বরাবর বিভিন্ন ফুলের গাছ, পাতাবাহার গাছ, লাল-সাদা কাগজফুলের গাছ লাগিয়ে বলেছিল, আমি যখন থাকব না, তখন কিন্তু ফুলের গাছগুলি থাকবে, আর গাছে প্রচুর ফুল ফুটবে, দ্যাখো।
গতবছর মহানন্দ কাগজফুলের গাছের ফাঁকে ফাঁকে অনেক অপরাজিতার চারা লাগিয়েছিলেন।
আজ সেই পাতাবাহার গাছ, লাল-সাদা কাগজফুলের গাছ, করবী-কদম-চাঁপা-জুঁই ইত্যাদি গাছগুলো অনেক বড় হয়ে গেছে এবং প্রচুর ফুল ফুটতে শুরু করেছে। কাগজফুল গাছের লাল-সাদা ঝাঁকের মাঝেও অপরাজিতার অসংখ্য ফুল। দূর থেকে মহানন্দের বাড়িটাকে দেখে সবাই একপলক তাকিয়ে যায়।
ইদানীং সকালে ঘুম থেকে উঠে মহানন্দ টের পাচ্ছেন, তাঁর সীমানার অনেক ফুল প্রতিদিন চুরি হয়ে যাচ্ছে। কে বা কারা সকালে কাক-ভোরে এসে ফুলগুলি চুরি করে নিচ্ছে। মুশকিল হচ্ছে, মহানন্দের খুব ভোরে কিছুতেই ঘুম ভাঙে না। ফলে চুরি আটকাতে আর তিনি পারছেন না।
একদিন পেচ্ছাবের চাপে মহানন্দের ঘুম ভেঙে যাওয়ায় বাথরুম সেরে ঘড়িতে দেখেন, ভোর চারটা কুড়ি বেজেছে। তখনই ফুলচোরকে ধরার জন্য তাড়াতাড়ি তিনি নীচে নেমে আসেন। তিনি ভোরের আবছা আলোয় দেখেন গেইটের কাছে কাগজফুলের গাছে ফুটে থাকা অপরাজিতা ফুলগুলো একটা বাঁশের সাহায্যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কেউ পেড়ে নিচ্ছে। তিনি তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে তড়াক করে গেইটের দরজা খুলে রাস্তায় এসে দেখেন এক সুন্দরী মহিলাকে। মহিলাও মহানন্দকে হঠাৎ বেরুতে দেখে চমকে গিয়ে একটু সলজ্জিত হাসি দিয়ে বলে, পুজোর জন্যে কিছু ফুল নিচ্ছিলাম।
মহানন্দও প্রথমে একটু অবাক হয়ে গেছিলেন মহিলাকে দেখে। তারপর এইভাবে বেরিয়ে কোনো মহিলাকে বিব্রত করে ফেলেছেন ভেবে তিনিও একটু লজ্জিত হয়ে বলেন, দিন বাঁশটা। আমি পেড়ে দিচ্ছি।
গল্পটা কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি। বরং আরেক কাহিনির শুরু বলা যায়। কারণ তার পরের দিন থেকে মহানন্দ প্রতিদিন খুব ভোরে উঠে মহিলাটির জন্যে অপেক্ষায় থাকেন। মহিলাটি এলে তিনি অসংখ্য নানা জাতের ফুল নিজ হাতে পেড়ে মহিলাকে দেন।
চোর ধরতে এসে তিনি যেন নিজেই চোরের হাতে পাকড়াও হয়ে গেছেন। এমনটা যে হবে তিনি নিজেও হয়তো কল্পনা করেননি।