উৎসর্গ – সুদীপ ঘোষাল

উৎসর্গ – সুদীপ ঘোষাল

উৎসর্গ    (অনুগল্প)

সুদীপ ঘোষাল

​ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। রাত তখন বারোটা। টেবিল ল্যাম্পের মৃদু আলোয় সুগতর খসখস কলম চলার শব্দটাই শুধু ঘরে বেঁচে আছে। তার নতুন উপন্যাসের শেষ অধ্যায় চলছে। সাহিত্যিক হিসেবে সুগত আজ সুপ্রতিষ্ঠিত, কিন্তু এই সাফল্যের পেছনের গল্পটা একটু অন্যরকম।

​পাঁচ বছর আগে, সুগত যখন চাকরিটা হারিয়েছিল, তখন তাদের সংসারটা অকূলে ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সুগত চেয়েছিল লেখালেখি ছেড়ে দিয়ে যাহোক একটা ছোটখাটো কাজে ঢুকে পড়তে। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল অনন্যা, তার স্ত্রী।
অনন্যা সুগতর হাত দুটো ধরে বলেছিল, “তোমার ভেতরের লেখকটাকে এভাবে মরে যেতে দিতে পারি না। তুমি শুধু লিখে যাও, বাকিটা আমি দেখে নেব।”
অনন্যা নিজের মাস্টার্স ডিগ্রির সার্টিফিকেটটা আলমারি থেকে বের করেছিল। যে মেয়েটি কোনোদিন ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে একা কোথাও যায়নি, সে একটা বেসরকারি স্কুলে দ্বিগুণ পরিশ্রমে পড়ানো শুরু করল। বিকেলে করাতো টিউশনি। বাড়ি ফিরে ক্লান্ত শরীরেও সুগতর চায়ের কাপটি এগিয়ে দিতে ভুলত না। নিজের শখ, আহ্লাদ, নতুন শাড়ি কেনার ইচ্ছে — সবকিছুকে এক নিমেষে বিসর্জন দিয়েছিল সে। সুগত যখনই অপরাধবোধে ভুগত, অনন্যা হাসিমুখে বলত, “এটা ত্যাগ নয় সুগত, এটা আমার বিনিয়োগ। তোমার লেখার ওপর আমার বিশ্বাস।”

​আজ সুগতর সেই উপন্যাস প্রকাশের আলো দেখছে, চারদিকে ধন্য ধন্য পড়ে গেছে।
​কলমটা থামিয়ে সুগত ড্রয়িংরুমের দিকে তাকাল। অনন্যা সোফাটায় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। তার হাতের আঙুলগুলোয় চক খড়ির হালকা দাগ, চোখের নিচে কালির ছায়া — যা তার গত কয়েক বছরের নিরলস আত্মত্যাগের নীরব সাক্ষী।
সুগত আলতো পায়ে অনন্যার কাছে গেল। পরম মমতায় তার গায়ে একটা চাদর ঢাকা দিয়ে দিল। তারপর উপন্যাসের প্রথম পাতায় গিয়ে ‘উৎসর্গ’ অংশে লিখল—
“আমার সেই আলোর উৎসের নামে, যে নিজে অন্ধকারে থেকে আমার কলমকে দীপ্তিময় করে তুলেছে।”

অনন্যার ঠোঁটের কোণে তখন ঘুমের ঘোরেও এক চিলতে তৃপ্তির হাসি।