
জাহাজবাড়ির রহস্য (ছোটোগল্প)
সদানন্দ সিংহ
প্রতীকের প্রবল ইচ্ছে ছিল, একদিন সে একজন দেশের বড়ো নামকরা সাংবাদিক হয়ে উঠবে। সে কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে গোলাগুলির মাঝে সংবাদ পরিবেশন করবে। পৃথিবীর এপার থেকে ওপার চষে বেড়াবে। সে আশা নিয়েই সে জার্নালিজমে এক ডিগ্রি করে ফেলেছিল। কিন্তু সময়টা তার সত্যিই খারাপ। অনেক যোগাযোগ করেও সে কোনো নামি সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেনি এখনও। ফলে হতাশা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। আটাশ বসন্তের পর থেকে তার স্বপ্নগুলি চুরমার হতে শুরু করেছিল।
এসবের মাঝেও কিন্তু তার অপূর্ণ ইচ্ছেটা অদম্য হয়ে ওঠেছিল। তাই প্রতীক শুরু করে সাংবাদিকতার এক সোলো পরিভ্রমণ। মোবাইলের সাহায্যে বিভিন্ন লোকের এক ভিডিও সাক্ষাৎকার নিয়ে সোশিয়্যাল মিডিয়ায় পোস্টিং। সে দেখে, তার ভিডিও সাক্ষাৎকারগুলি নেটপাড়ার লোকজনেরা বেশ খাচ্ছে। ভালো-খারাপ কমেন্টে ভরে যাচ্ছে। তারপর থেকেই তার প্রধান কাজ হয়ে উঠল, বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বিভিন্ন লোকের খোঁজ করা এবং তারপর বিচিত্র সব সাক্ষাৎকার গ্রহন করে বিভিন্ন সোসিয়্যাল মিডিয়ায় পোস্টিং।
আর প্রতীকের এসব কাজে আপ্রাণ সহযোগিতা করে সুরভি তার চমক লাগানো ভিডিও এডিটিং এর মাধ্যমে। ভিডিও এডিটিং সুরভির প্রধান শখ। প্রতীকের বোন যূথীর বান্ধবী সুরভি। সুরভি প্রতীককে প্রতীকদা বলেই ডাকে। না, তাদের মধ্যে কোনো রিলেশনশিপ এখনও গড়ে ওঠেনি। তবে প্রতীক টের পায়, তার প্রতি সুরভির মনোভাব খুব সফট।
তখন বিকেলবেলা। শরতের ঝিরিঝিরি হাওয়া। এই হাওয়া সমস্ত মানুষের মনে এক আনন্দ ছুঁয়ে যায়। এই সময়েই শহরতলির অনেক জায়গাতে এখনও বেশ কাশফুল ফোটে। প্রতীক বাস থেকে নেমে পীচের রাস্তা ছেড়ে ইটের সোয়েলিং রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছিল। তখনই ফোন বেজে ওঠে। সুরভির ফোন।
প্রতীক বলে, হ্যালো।
ওপার থেকে সুরভির গলার আওয়াজ ভেসে আসে, প্রতীকদা তুমি কোথায় ? আমি সেই কখন থেকে ট্রাই করে যাচ্ছি। লাইন কিছুতেই ঢুকছিল না।
প্রতীক জবাব দিল, আমি এক জাহাজবাড়ির উদ্দেশ্যে যাচ্ছি।
— জাহাজবাড়ি ? বাঃ। নামটা শুনেই আমারও যাবার খুব ইচ্ছে করছে কিন্তু। সেটা কোথায় ? কী আছে ওখানে ?
— সেটা আমাদের আশেপাশেই। সেখানে এক রহস্য আছে। সেই রহস্যের খুঁজেই যাচ্ছি।
— রহস্য ? বেশ তো। রহস্যের প্রতি তো চিরকাল সবার আকর্ষণ। যদি কোনোদিন দরকার হয়, আমাকে বলো, আমিও যাবো। আর হ্যাঁ, তোমার আগের দেওয়া ভিডিও-র এডিটিং-টা শেষ।
— অনেক অনেক ধন্যবাদ। এবারের সাক্ষাৎকারটা হয়ে গেলেই জানাব।
— ঠিক আছে। রাখছি তাহলে।
— আচ্ছা।
প্রতীক ফোনটা নামিয়ে প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে দেয়।
এবার দূর থেকে দেখা যাচ্ছে জাহাজবাড়িটাকে। প্রতীক যত সামনের দিকে এগোচ্ছে তত জাহাজবাড়িটা বড়ো হয়ে ফুটে উঠছে। একসময় সে যখন বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল তখন সে দেখে বাড়িটা একটা দোতলা বাড়ি এবং ওটা অবিকল জাহাজের মতো করে বানানো হয়েছে।
প্রতীক বাড়ির মালিককে বাহবা না দিয়ে পারল না। এতো নিখুঁতভাবে জাহাজের মতো করে বানানো, সত্যিই দেখার মতো। বাড়ির সীমানার চারিদিকে প্রচুর পাতাবাহারের গাছ। কয়েকটা বড়ো আম-কাঁঠাল গাছও আছে। সীমানা জুড়ে কাঁটাতারের বেড়া। সীমানার ভেতরে প্রবেশ করার জন্য একটা বড়ো লোহার গ্রিলের বন্ধ গেইট। এই গেইট খুললে একটা ট্রাকগাড়িও ভেতরে যেতে পারবে।
প্রতীক গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে ওপরের দিকে তাকিয়ে জাহাজবাড়ির খুঁটিনাটি লক্ষ করছিল। এমন সময় পুরুষকণ্ঠে কে যেন বলে উঠল, কী দেখছেন অত খুঁটিয়ে ?
প্রতীক চমকে উঠে দেখে, গেইটের ভেতরে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা একজন কাঁচাপাকা চুলের লোক তাকে প্রশ্নটা করেছেন। দেখে মনে হয় লোকটার বয়স ষাট বা তার ওপর হবে। প্রতীক উত্তর দেয়, না মানে, বেশ সুন্দর একটা জাহাজবাড়ি তো, এইরকম বাড়ি আমি আগে কোথাও দেখিনি।
— ও আচ্ছা।
জবাব দিয়েই লোকটা ভেতরের দিকে চলে যাচ্ছিল। প্রতীক তাড়াতাড়ি ডাকে, স্যার একটু দাঁড়াবেন ? আপনাকে আমার কিছু প্রশ্ন করার ছিল।
লোকটা পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে বলে, আমার কাছে প্রশ্ন ! আশ্চর্য তো। বলুন কী বলবেন।
প্রতীক জিজ্ঞেস করে, এই বাড়িটা কি আপনার ?
— হ্যাঁ। কেন বলুন তো ?
প্রতীক কোনো ভণিতা না করে সোজাসুজি বলে, আপনার একটা সাক্ষাৎকার নিতে চাই। এই বাড়ির সব ইতিহাস জানতে চাই, এই বাড়ির কল্পনা কী করে মাথায় এল, এত ডিজাইন থাকতে জাহাজের ডিজাইন কেন — এইসব ব্যাপার নিয়ে। অবশ্য আপনি যদি অনুমতি দেন।
লোকটা সরাসরি নাকচ করে দিলেন, আমি কাউকে সাক্ষাৎকার-টাক্ষাৎকার দিই না।
লোকটা আবার ফিরে চলে যাচ্ছিলেন। পরিকল্পনা মাটি হয়ে যাচ্ছে দেখে প্রতীক তাড়াতাড়ি বলে উঠল, স্যার স্যার, আমি আপনার পনের মিনিট মাত্র সময় নষ্ট করব। প্লিজ প্লিজ। বাড়িটা আমার খুব ভালো লেগেছে তাই।
লোকটা আবার ফিরে দাঁড়ায়। তারপর প্রতীকের দিকে এগিয়ে এসে চোখ গোল করে বললেন, সত্যিই বাড়িটা নিয়ে সাক্ষাৎকার চান ?
— হ্যাঁ।
— তাহলে সাহস থাকলে আগামীকাল রাত বারোটায় আসুন।
— রাত বারোটায় সাক্ষাৎকার ? আশ্চর্য তো। রাতেই কেন ?
— আগামীকাল অমাবস্যা। অমাবস্যার রাতে কেউ এ বাড়িতে আসতে চায় না। আপনি চাইলে আসতে পারেন। এলে অনেক রহস্য জানতে পারবেন। গেইটের দরজা খোলা থাকবে, ভেতরে এসে কলিং বেল বাজাবেন। আমি আপনাকে জাহাজবাড়ির ছাদে নিয়ে যাব। সাক্ষাৎকার চলবে।
লোকটা ভেতরের দিকে চলে গেলেন। প্রতীকের মনে হল, এই সাক্ষাৎকারের ভেতর হয়তো কিছু রহস্য আছে, আর নেটপাড়ার লোকজনেরা এই রহস্যের ব্যাপারগুলি বেশ গিলবে। ফলে তার ভিউ বাড়বে, লাইক বাড়বে, কমেন্ট বাড়বে। তাই সে স্থির করল, এই সাক্ষাৎকারটা তাকে নিতেই হবে।
পরদিন প্রতীক রাত বারোটার দিকে জাহাজবাড়ির সামনে এসে দেখে গেইট বন্ধ। গেইটের সামনে কোনো আলো নেই। ভেতরে বাড়ির সামনে একটা বাল্ব জ্বলছে। প্রতীক মোবাইলের আলোয় গেইটটা দেখতেই বুঝতে পারে গেইটের আগলটা বাইরে থেকেই খোলা বা বন্ধ করা যায়। প্রতীক গেইট খুলে ভেতরে ঢুকে আবার বন্ধ করে দেয়। তারপর বাড়ির সামনে্র দরজায় এসে কলিং বেল বাজায়। সঙ্গে সঙ্গেই দরজা খুলে যায়। ক্ষীণ আলোর মাঝে ভেতর থেকে আওয়াজ আসে, আসুন।
প্রতীক ঘরের ভেতরে ঢোকে। ক্ষীণ আলোর মাঝে লোকটাকে চিনতে অসুবিধে হয় না প্রতীকের। লোকটা দরজা বন্ধ করে বলেন, চলুন একদম ছাদে।
জাহাজবাড়িটার ছাদে তিনটে প্লাস্টিকের চেয়ার ছিল। দুটো চেয়ারে দুজন বসে পড়ল। এত বড়ো ছাদটার মাঝে শুধুমাত্র একটা দু-তিন ওয়াটের একটা বাল্ব টিমটিম করে জ্বলছে।
প্রতীক বলল, আমি কিন্তু ভিডিও সাক্ষাৎকার নেব। আপনার আপত্তি নেই তো ?
লোকটি যেন আবছা আলোয় রহস্যজনক হাসি হাসলেন, কিন্তু ভিডিও উঠবে তো? এই আবছা আলোয়–।
— মনে হয় উঠবে, তবে চেহেরা হয়তো স্পষ্ট হবে না। কথাবার্তাগুলি কিন্তু বোঝা যাবে। বলেই প্রতীক মোবাইলে ভিডিও রেকর্ডিং চালু করে দেয়।
লোকটি বললেন, জানেন তো আমরা কোথায় বসেছি ?
প্রতীক বাড়িটার দুদিক দেখে বলল, জাহাজবাড়ির অগ্রভাগে।
প্রতীক আবছা আলোয় দেখল, লোকটি যেন আবার হাসলেন। তারপর বললেন, এই জাহাজটা দুদিক থেকেই আপনি চালাতে পারবেন, অগ্র-পশ্চাৎ বলে কিছুই নেই। দুদিকটাই অগ্র, আবার দুদিকটাই পশ্চাৎ। আপনার মনোভাবের ওপরই নির্ভর করবে, কোন্দিকটা অগ্র এবং কোন্দিকটা পশ্চাৎ। তার মানে, আপনার মনেই আছে আসল রহস্য। হা- হা- হা- হা।
নির্জন-নিস্তব্ধ আবছা আলোয় লোকটার অট্টহাসিতে এবার প্রতীক একটু যেন চমকে উঠল। এমন সময় ঘরের ভেতর থেকে পুরনো এক ওয়াল ঘড়ির ঢং ঢং ঢং করে রাত বারোটার আওয়াজ ভেসে এল।
লোকটি বললেন, অমাবস্যার দিন, রাত বারোটা বাজলেই দেখবেন খালি চেয়ারটা একটু নড়ে উঠবে। মনে হবে কেউ যেন চেয়ারে এসে বসেছেন।
প্রতীকের মনে হল খালি চেয়ারটা যেন একটু নড়ে উঠল। এটা কি মনের ভুল ? সে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না।
সব ব্যাপারগুলি প্রতীক ভিডিও করে চলছে। প্রতীক বলল, রাত বারোটার ব্যাপারটা একটু খুলে বলবেন ?
— বলব, সময় হলেই বলব।
প্রতীক এবার বলল, আচ্ছা এবার বলুন তো, এই জাহাজবাড়ি বানাবার পরিকল্পনা কী করে আপনার মাথায় এল ?
— আমি বানাইনি তো।
— তাহলে কে বানালো ?
— বলেন্দ্রবাবু।
— তিনি এখন কোথায় ? এখন বাড়িটার মালিক কে ?
— বাড়িটার মালিক এখন আমি। বলেন্দ্রবাবুর ছেলে বিদেশে থাকেন, তার কাছ থেকেই আমি কিনেছি। আর বলেন্দ্রবাবুর কথা কী বলব, একা থাকতেন। একদিন…। কথা বলতে বলতে লোকটি থেমে গেলেন।
প্রতীকের তর সইছিল না, তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করল, কী হল একদিন ?
লোকটির গলাটা যেন হঠাৎ একটু ফ্যাসফ্যাসে হয়ে গেল। ফ্যাসফ্যাসে গলায় তিনি ধীরে ধীরে বললেন, ওই যে বাগানের মাঝখানে অন্ধকারের মধ্যে আমগাছটা দেখছেন ? এক অমাবস্যার রাতে ঠিক রাত বারোটার সময় তিনি আমগাছটা থেকে গলায় দড়ি লাগিয়ে ঝুলে পড়লেন। আত্মহত্যা করলেন।
এবার প্রতীকের বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। শরীরের লোমকূপগুলিও যেন একটু খাড়া হয়ে উঠল। ভিডিও করা কিন্তু থামাল না।
এবার ফ্যাসফ্যাসে গলায় লোকটি বললেন, জানেন, আসলে মানুষের মনটাই সব, মনেই আসল রহস্য লুকিয়ে থাকে। মন চাইলেই মানুষ নিজের প্রাণকেও বধ করে ফেলে, মন চাইলেই আবার মানুষ বিন্দুতে সিন্ধু দেখেন। যদি আপনি এখানে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে দু হাত প্রসারিত করে গভীরভাবে টাইটানিক জাহাজের কথা একমনে চিন্তা করেন, দেখবেন আপনি সমুদ্রে ভেসে চলেছেন। পরিবেশও আবার সব কিছু পালটে দেয়। আজকের এই পরিবেশেও আপনি দেখবেন, আমি হয়তো এখন আপনার সামনে বসে আছি, পরমুহূর্তেই হয়তো আপনি আমাকে আর খুঁজে পাবেন না।
প্রতীক এবার শিউরে উঠল। দেখল সামনে লোকটিকে আর দেখা যাচ্ছে না, যেন শূন্যে মিলিয়ে গেছে, চেয়ারটা এখন খালি।
প্রতীক চেয়ার ছেড়ে একটা লাফ দেয়। তাতে চেয়ারটা ওলটে পড়ে গেল। প্রতীকের মনে হল, একটা লম্বা হাত কোত্থেকে বেরিয়ে এসে চেয়ারটাকে আবার দাঁড় করিয়ে দিল।
প্রতীক এবার বেশ ভয় পেয়ে গেল। দৌড়ে সে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল। তারপর দরজা খুলে জাহাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। কিন্তু গেইটের দিকে দৌড়ে যাবার সময় সে একটা স্পষ্ট নির্দেশ শুনতে পেল, দাঁড়ান। দৌড়ে যাবেন না।
প্রতীক কাউকেই দেখতে পাচ্ছিল না, কিন্তু নির্দেশটাকে অমান্যও করতে পারল না, দাঁড়িয়ে গেল।
অন্ধকারের ভেতর থেকে কে যেন ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলে উঠল, মনে রাখবেন, যা দেখলেন যা শুনলেন — সব একটা ইল্যুশন মাত্র। বাড়ি যান এখন।
আবার প্রতীক দৌড়োতে লাগল। প্রাণপণে।
পরদিন সে ভিডিওগুলি এডিটিং করার জন্য সুরভির কাছে ইমেইল করল। বিকেলে সুরভি খবর দিল, ভিডিওগুলিতে কিচ্ছু নেই — না ছবি, না শব্দ।
প্রতীক আশ্চর্য হয়ে গেল, সবগুলিই তবে কি ইল্যুশন ? পৃথিবীর সবাই কি তাহলে এক ইল্যুশনের জগৎ নিয়ে বেঁচে থাকে ? কী হবে এর উত্তর ? না ? কিংবা হ্যাঁ ? প্রতীক জানে না।