
বুদবুদ (অনুগল্প)
গুলশন ঘোষ
টোটো থেকে নামতেই দশ টাকা দিলেন দীপেশ।
– আরো দশ দিন-।
– কেন, ভাড়া তো ১০টাকা!
– বুঝতেই পারছেন সব জিনিসের দাম রোজ রোজ কত বাড়ছে। আর আপনাদের পুরানো কী সব বকেয়া মিটিয়ে দিচ্ছে সরকার। খবরে দেখলাম তাই…..
– হ্যাঁ, ঠিকই দেখেছেন, এই নিন। অতিরিক্ত দশটাকা ধরিয়ে নামার পর আবার সে বাসে উঠল।
চরণবিলা থেকে বাসে করে দীপেশ স্কুলে যায়। কোথায় কোন দেশে যেন দুটো মিসাইল ছুঁড়েছে। জ্বালানির দাম বেড়েছে লিটারে ১টাকা। আজ তাকে ২৫ টাকার জায়গায় ৩০ টাকা বেশি ভাড়া গুণতে হল।
দিনের শেষে একই পথে বাড়ি ফেরে দীপেশ। বাড়ি ফেরার পথেই সবজির বাজার করে আনা তার পুরানো অভ্যাস। চেনামুখ। অফিস ফেরত ভিড়ের মাঝেই স্যর, মাস্টার মশাই ডাকে আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর উঠলেও, হেঁসেলের ব্যাগ ভরে না কিছুতেই। দিন দিন খরচের খাতা বেড়েই চলেছে। পৃথিবীর সব দাবির যেন ঠিকা তাকে নিয়ে বসে থাকতে হয়।
সন্ধ্যা নেমে এল শাঁখ আর প্রদীপকে সাক্ষী রেখে। সিরিয়ালের আওয়াজে বাড়ি গমগম করছে। বাড়ির দুই সন্তান ফোনে মগ্ন, মা-বাবা বসে সিরিয়াল সেবন করছে। কিছু না বলে ফ্রেশ হয়ে সোফায় বসে দীপেশ বলে, ‘পলা একটু চা নিয়ে আসো তো।’
সন্ধ্যার পুজো পাঠ করতে করতে সে বলে, ‘যাচ্ছি’। শাঁখের আওয়াজের মতোই দুবার বলে চুপ হয়ে যায় পল্লবী।
কিছুক্ষণ পরে চায়ের সঙ্গে একটা থালায় মুড়ি আর বেগুনি হাতে ঘরের ভিতর এল পলা।
সোফায় বসে সে সবে শুরু করেছে মুড়ি খেতে। পলা হাসি মুখে বসে পড়ল সোফার পাশের সিটে। আত্মবিশ্বাস মাখা দু’চোখে সে বলে ওঠে, ‘দুপুরের খবরে শুনলাম যে তোমাদের বকেয়া ডিএ সব মিটিয়ে দিচ্ছে।’
মুড়ি চিবিয়ে যাচ্ছে দীপেশ। নীরব।
হাত দুটো দীপেশের মুখের সামনে তুলে ধরে একটু নাকি সুরে বলে, ‘এই জানো, মাকে বলছিলাম আমার না এই হাতের নোয়াগুলো বড্ড সরু হয়ে গেছে, এগুলো ভেঙে এক জোড়া বাউটি করবো।’
উত্তর না পেয়ে দীপেশের হাতে আলতো একটু ধাক্কা মেরে বলে, ‘এই চুপ কেনো, শুনতে পাচ্চোনা…?’
টিভিতে বিজ্ঞাপন দেওয়ায় দীপেশের বাবা, বাংলা সন্ধ্যার ঘন্টা নিউজ চ্যানেলে ঘুরিয়ে দিলেন। ব্রেকিং নিউজ টিকারে দেখাচ্ছে, বকেয়া ডিএ এখনি নয়। আগামীকাল রাজ্যসরকার ডিএ মামলার রায় নিয়ে পুনর্বিবেচনার আর্জি জানাতে সুপ্রিম কোর্টে।
পলার মুখের দিকে একভাবে তাকিয়ে আছে দীপেশ। এইভাবেই দীপেশদের মতো স্বল্প বেতনের সরকারি কেরানির কাছে আবদার করা কত স্বপ্ন বুদবুদের মতো মিলিয়ে যায়। এমন অনেক ফর্দের গায়ে ছেঁড়া-ফাটা মশকধরা জামার ঘাম লেগে আছে — কে কার হিসাবে রাখে।