মণিপুরি নৃত্য প্রসারে রবীন্দ্রনাথ এবং ত্রিপুরার অবদান – সদানন্দ সিংহ

মণিপুরি নৃত্য প্রসারে রবীন্দ্রনাথ এবং ত্রিপুরার অবদান – সদানন্দ সিংহ

মণিপুরি নৃত্য প্রসারে রবীন্দ্রনাথ এবং ত্রিপুরার অবদান

সদানন্দ সিংহ

আমরা জানি, শিল্পকলা মূলত মানুষের সৃজনশীল ক্ষমতার বহিপ্রকাশ, যা প্রধানত সাত রকম ধারায় প্রকাশিত হয় — চিত্রকলা বা পেইন্টিং, ভাস্কর্য, স্থাপত্য, সঙ্গীত, সাহিত্য, নৃত্য এবং সিনেমা বা চলচ্চিত্র-র মাধ্যমে। তবে বিনোদনের উদ্দেশ্যে যে সিনেমা হয় তা মোটেই শিল্পকলা নয়, আর ঋত্ত্বিক ঘটকের সিনেমা বা সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালির মতো সিনেমার মধ্যে যে শিল্পকলা দেখতে পাই, তা এখন আর দেখি না। এছাড়াও এখন আরো কিছু কিছু কাজের অপূর্ব সৃষ্টিকে শিল্প বলে ধরা হচ্ছে, যেমনঃ ফটোগ্রাফি, সিরামিক, অঙ্কন, গ্রাফিক ডিজাইন, ফ্যাশন ডিজাইন, ইন্টেরিয়র ডিজাইন ইত্যাদি। এই শিল্পকলাগুলোর মধ্যে নৃত্যকে মানব সভ্যতার প্রাচীনতম শিল্পকলা হিসেবে গণ্য করা হয়। এর ঐতিহাসিক প্রমাণও আছে। ভারতে প্রায় ৯,০০০ বছর আগের পুরনো গুহাচিত্রে নৃত্যের যেসব দৃশ্য খোদিত পাওয়া গেছে, তা নৃত্যের প্রাচীনত্বের প্রমাণ।
লিখিত ভাষা তৈরি হওয়ার আগে, মানুষ তার শরীরের ভঙ্গি বা নাচের মাধ্যমেই তার অনুভূতি ও গল্প একে অপরের কাছে প্রকাশ করে সমাজে পৌঁছে দিত। তাই নৃত্য ছিল একটা যোগাযোগের মাধ্যমও বটে। তাছাড়া আদিম মানুষ শিকার, ঋতু পরিবর্তন, আনন্দ বা শোক প্রকাশ এবং দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য আগুনের চারপাশে নেচে গাইত। এসব ছিল ধর্মীয় বা সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের এক অঙ্গ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিংশ শতাব্দীতে বাংলা সাহিত্যে ও সংস্কৃতিতে নৃত্যনাট্যের এক নতুন ধারার সূচনা করেন, যা “রবীন্দ্রনৃত্য” নামে পরিচিত। রবীন্দ্রনৃত্য মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান, কবিতা বা নাটকের ভাবকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি বিশেষ নৃত্যধারা। এটি কোনো প্রথাগত একক ধারার নাচ নয়, বরং মণিপুরি এবং কথাকলি ধ্রুপদী নৃত্য ও লোকনৃত্যের এক সংমিশ্রণ।

নৃত্য প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন—‘আমাদের দেহ বহন করে অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ভার, আর তাকে চালনা করে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গতিবেগ৷ এই দুই বিপরীত পদার্থ যখন পরস্পরের মিলনে লীলায়িত হয় তখন জাগে নাচ৷ দেহের ভাবটাকে দেহের গতি নানা ভঙ্গিতে বিচিত্র করে, জীবিকার প্রয়োজনে নয়, সৃষ্টির অভিপ্রায়ে দেহটাকে দেয় চলমান শিল্পরূপ৷ তাকেই বলি নৃত্য৷।
রবীন্দ্রনাথ নাচকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে গ্রহণ করেই শিক্ষার অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে যুক্ত করেছিলেন এবং তিনি শান্তিনিকেতনে ভারতীয় নৃত্যের শিক্ষাদান চালু করেছিলেন।

রবীন্দ্রনৃত্যকে আমরা যদি অনুধাবন করি তাহলে আমরা গীতিনাট্য এবং নৃত্যনাট্য এই দু জায়গায় এই নৃত্যকে দেখি । রবীন্দ্রগীতির সাথে নৃত্য রচনা করা হয়েছিল প্রথমে। তবে গীতিনাট্য থেকে নৃত্যনাট্যে উত্তরণের সময়টা বেশ দীর্ঘ। গীতিনাট্য শরু হয়েছিল ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ দিয়ে ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দে এক বিদ্বজন সমাগমের বার্ষিক অনুষ্ঠানে। তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর। পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনে মঞ্চস্থ হয়েছিল ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্য ১৯৩৬ সালে, ‘চণ্ডালিকা’ নৃত্যনাট্য ১৯৩৮ সালে এবং ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্য ১৯৩৯ সালে।
তবে ইদানীং রবীন্দ্রনৃত্যের যে পরিবেশিত ধারা দেখা যাচ্ছে সেখানে মণিপুরি ও কথাকলির সঙ্গে মিশ্রিত হচ্ছে কত্থক, পাশ্চাত্য এবং আঞ্চলিক নাচ। জানি না, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবিত থাকলে এটা তিনি অনুমোদন করতেন কিনা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে রবীন্দ্রনৃত্যের সূচনা করেছিলেন তা কিন্তু তৈরি হয়েছিল মূলত মণিপুরি ও কথাকলি নৃত্যশৈলী এবং তার বিভিন্ন মুদ্রার সংমিশ্রণে। কথা প্রসঙ্গে বলি যে নাচ নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন তাঁরা বলেছেন যে মনিপুরি নৃত্যের মধ্যে যে ‘মাইবি জাগোই’ বলে যে নৃত্য আছে তার বিভিন্ন মুদ্রাগুলো খ্রীষ্টপূর্ব আমলের এবং সেটা প্রচলিত ছিল পনেরশ শতাব্দীর বহু পূর্বেই। পনেরশ শতাব্দীতে মণিপুরে বৈষ্ণব ধর্মের প্রসারলাভ হয়। তবে আঠারোশ শতাব্দীতে মণিপুরে মহারাজা ভাগ্যচন্দ্রের আমলেই রাধা-কৃষ্ণের প্রেম কাহিনির উপর ভিত্তি করে প্রবর্তন করা হয় ‘মহারাস’, ‘বসন্ত রাস’ ও ‘কুঞ্জ রাস’ ইত্যাদি মণিপুরি নৃত্য।

প্রশ্ন জাগতে পারে, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মণিপুরি নৃত্যের সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল কীভাবে ?
আসলে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মণিপুরি নৃত্যের সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল ত্রিপুরার রাজাদের মাধ্যমেই। সুদূর মণিপুর থেকে মণিপুরিরা ত্রিপুরায় এসেছিল দু ভাবে। প্রথমতঃ ত্রিপুরার রাজাদের সঙ্গে মণিপুরের রাজাদের একটা বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল। ফলে বৈবাহিক সূত্রে যখন মণিপুরের রাজকুমারী ত্রিপুরায় চলে আসত তখন সেই রাজকুমারীর সঙ্গে অনেক মণিপুরি সাঙ্গোপাঙ্গকেও চলে আসতে হতো। তবে সেইসব মণিপুরিদের বসতিস্থাপন হয়েছিল রাজপ্রাসাদের কাছাকাছি আগরতলায় কিছু জায়গায়। দ্বিতীয়তঃ ‘চহী তরেৎ খুন্তারাকপা’ অর্থাৎ ‘সাত বছর বহির্গমন’ – সাত বছরের এই সময় ১৮১৯ থেকে ১৮২৬ সাল পর্যন্ত, প্রায় সাতবছর বর্মীবাহিনী মণিপুর শাসন করেছিল, তখন বর্মীবাহিনির অত্যাচারে প্রচুর মণিপুরি মনিপুর ত্যাগ করে আসাম, ত্রিপুরা এবং অধুনা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।

রবীন্দ্রনাথ সর্বপ্রথম মণিপুরি নৃত্য দেখেছিলেন ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় ১৮৯৯ সালে।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজাদের সঙ্গে একটা সুসম্পর্ক ছিল। তাই রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৯ সাল থেকে ১৯২৬ সালের মধ্যে সাতবার (১৮৯৯, ১৯০০, ১৯০৫, ১৯১৯, ১৯২২, ১৯২৫ এবং ১৯২৬) ত্রিপুরায় এসেছিলেন। প্রথমবার তিনি এসেছিলেন ১৮৯৯ সালে মহারাজা রাধাকিশোর মাণিক্যের শাসনকালে। তিনি তখন রাজ-অতিথি হয়ে কর্ণেল ঠাকুরের জন্য নির্মিত গৃহে অবস্থান করেছিলেন। উজ্জয়ন্ত রাজপ্রাসাদের নির্মাণ কার্য তখনো শেষ হয়নি। এইসময় আগরতলার কুঞ্জবনস্থিত শৈলশিরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথমবারের মতো মণিপুরি বসন্তরাস নৃত্য প্রত্যক্ষ করেন। মণিপুরি নাচ দেখে তিনি বেশ প্রভাবিত হয়েছিলেন। এর প্রায় দুবছর পরই তিনি শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয়ের সূচনা করেছিলেন।

তিনবার ত্রিপুরা ভ্রমণের পর রবীন্দ্রনাথ মণিপুরি নৃত্য দেখে ভীষণভাবে প্রভাবিত হয়ে ঠিক করেছিলেন মণিপরি নৃত্যের উৎসভূমি মণিপুরে ভ্রমণ করবেন। তাই তিনি ১৯১৯ সালের শেষের দিকে অক্টোবর মাসে গুয়াহাটি পৌঁছে মণিপুর যাবার অনুমতিপত্রের অপেক্ষা করেছিলেন। তখন যদিও মণিপুর ছিল দেশীয় রাজার শাসনে, কিন্তু ব্রিটিশ পলিটিকেল এজেন্ট মণিপুরের সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করত। আর ওই বছরেই পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশের দেওয়া ‘স্যার’ উপাধি তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে ব্রিটিশ পলিটিকেল এজেন্টের পরামর্শে মণিপুরের রাজা চূড়াচান্দ রবীন্দ্রনাথকে মণিপুরে প্রবেশের অনুমতি দেননি।
১৯১৯ সালের ১১ই অক্টোবর থেকেই রবীন্দ্রনাথ শিলং-এ অবস্থান করেছিলেন। তখনই সিলেট ভ্রমণের আমন্ত্রণ তাঁর কাছে আসতে থাকে। সেইসময় শিলং থেকে সিলেট যাওয়ার রাস্তা ছিল না, শুধু চেরাপুঞ্জি হয়ে তারপর খাসিয়া কিংবা গারোদের কাঁধে চেপে সিলেটে যাওয়া যেত। মানুষের কাঁধে চেপে যেতে হবে বলে তিনি সিলেট যেতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু সিলেটের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন জনের টেলিগ্রাম পেয়ে তিনি মত পরিবর্তন করেন এবং দীর্ঘ পথ ঘুরে — গুয়াহাটি থেকে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের লামডিং-বদরপুর সেকশন হয়ে করিমগঞ্জ-কুলাউড়া হয়ে তিনি সিলেট পৌঁছে যান ৫ই নভেম্বর ১৯১৯ সালে। সঙ্গে ছিলেন পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী। কবিকে টাউন হল প্রাঙ্গণে শ্রীহট্টবাসী জনসাধারণের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা জানানো হয়। সেখানে প্রায় পাঁচ হাজার লোক রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য শুনতে এসেছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে কবি দেড় ঘণ্টাব্যাপী বক্তব্য রাখেন। বিকেলে তিনি মণিপুরি ‘রাখাল নৃত্য’ দেখেন এবং আগের মতোই প্রভাবিত হন।
সিলেট থেকে তিনি ত্রিপুরার মহারাজা বীরেন্দ্র কিশোর মাণিক্যের আমন্ত্রণে আগরতলায় আসেন ৯ই নভেম্বর। এবং আগরতলার কুঞ্জবনস্থিত ‘মালঞ্চনিবাস’-এ অবস্থান করেন। মহারাজা বীরেন্দ্র মাণিক্যের পুত্র রাজকুমার ব্রজেন্দ্রকিশোরের সাথে রবীন্দ্রনাথের সখ্যতা আগেই গড়ে উঠেছিল, পবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ইটালি সফরের সময় ব্রজেন্দ্রকিশোরকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময় ব্রজেন্দ্রকিশোর আগরতলায় অনুপস্থিত ছিলেন। ১০ই নভেম্বর ১৯১৯ তারিখ তিনি আগরতলার উমাকান্ত একাডেমী স্কুলে ছাত্র-শিক্ষকদের সাথে মিলিত হন। এইসময়ের আশেপাশেই মহারাজা বীরেন্দ্র কিশোর মাণিক্য শান্তিনিকেতনে হাসপাতাল নির্মাণের জন্যে পাঁচ হাজার টাকা দান করেন এবং আরও পাঁচ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এখানে অবস্থানের বর্ণনায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “পৃথিবীতে প্রকৃতির লীলাক্ষেত্র অনেক দেখিয়াছি কিন্তু ঐ ত্রিপুরার কুঞ্জবনের শৈলশ্বেতভবন আমার স্নৃতি হইতে মলিন হইতে পারিতেছে না”।

এর কিছুদিন পর রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে একজন মণিপুরি নৃত্যের প্রশিক্ষক পাঠাবার জন্যে ব্রজেন্দ্রকিশোরের মাধ্যমে ত্রিপুরার মহারাজাকে অনুরোধ করেন। ব্রজেন্দ্রকিশোর তাঁর পিতা মহারাজা বীরেন্দ্র কিশোর মাণিক্যের পরামর্শ অনুযায়ী নৃত্য ও কারুশিল্পী রাজকুমার বুদ্ধিমন্ত সিংহকে শান্তিনিকেতনে পাঠান। ১৯২০ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে বুদ্ধিমন্ত সিংহ শিক্ষক হিসেবে শান্তিনিকেতনে যোগ দেন। এ বিষয়ে শান্তিদেব ঘোষ লিখেছেন, ‘মহারাজাকে অনুরোধ করেছিলেন শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয়ের ছাত্রদের শিক্ষার জন্য একজন মণিপুরি নর্তককে দেয়ার জন্য। মহারাজা প্রস্তাবে উৎসাহিত হয়ে তাঁর দরবার থেকে নর্তক বুদ্ধিমন্ত সিংহকে পাঠালেন, মাঘ মাসের প্রথম দিকে।’

পরবর্তীকালে বুদ্ধিমন্ত সিংহ ত্রিপুরায় ফিরে আসেন। বুদ্ধিমন্ত ফিরে আসার পর ব্রজেন্দ্রকিশোরের কাছে ব্যক্ত করেছিলেন যে শান্তিনিকেতনে প্রথম দিকে মেয়েরা তাঁর নির্দেশ মতো নাচের পদক্ষেপ ও অঙ্গ সঞ্চালন করতে স্বীকৃত ছিল না। তখন বুদ্ধিমন্তের নির্দেশানুযায়ী বয়োবৃদ্ধ অবস্থায় রবীন্দ্রনাথ নাচের পদক্ষেপ ও অঙ্গ সঞ্চালন করতে শুরু করলে মেয়েদের লজ্জা ভেঙেছিল।

১৩৩২ বঙ্গাব্দে (১৯২৫ সালে) রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গ ভ্রমণে বের হয়ে ঢাকা থেকে কুমিল্লা আসেন। তখন তিনি ব্রজেন্দ্রকিশোরকে বারবার কুমিল্লায় তাঁর সাথে দেখা করার জন্য আহ্বান জানান। উত্তরে ব্রজেন্দ্রকিশোর রবীন্দ্রনাথকে আগরতলায় পদধুলি দেওয়ার জন্য ব্যাকুলতা দেখান। ত্রিপুরার মহারাজা ছিলেন তখন তরুণ বীর বিক্রম এবং তাঁর সাথে রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ পরিচয় ছিল না বলে তিনি সংকোচ করছিলেন। আবশেষে তিনি আগরতলায় পদার্পণ করেন ১০ই ফাল্গুন রাত্রিবেলায়। থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল কুঞ্জবন প্রাসাদে। ১২ই ফাল্গুন সন্ধ্যায় ব্রজেন্দ্রকিশোরের বাড়িতে তিনি মণিপুরি রাসনৃত্য উপভোগ করেন। কবিকে রাসনৃত্য দেখাবার জন্য ব্রজেন্দ্রকিশোরের বাড়িতে মেয়েরা দু’দিন ধরে তালিম নিচ্ছিল এবং এই নৃত্যশিক্ষা দিচ্ছিলেন আগরতলা নিবাসী ঠাকুর নবকুমার সিংহ। এই সান্ধ্য অনুষ্ঠানটি রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘকাল ভোলেননি, পরবর্তীকালে বারবার উল্লেখ করেছেন। এই রাসনৃত্যের আসরেই তরুণ মহারাজা বীর বিক্রমের সাথে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় হয়। এই রাসনৃত্য দেখে অবিভূত হয়ে রবীন্দ্রনাথ পুনরায় শান্তিনিকেতনে মণিপুরি নৃত্য চালু করার জন্য উৎসুক হয়ে উঠেন, কারণ বুদ্ধিমন্তের প্রত্যাগমনের ফলে শান্তিনিকেতনে মণিপুরিব নৃত্যশিক্ষায় কিছুকালের জন্য একটা গ্যাপ তৈরি হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ব্রজেন্দ্রকিশোরকে বলে যান আবার একজন নৃত্যশিক্ষক শান্তিনিকেতনে পাঠাবার জন্য। তাতে ব্রজেন্দ্রকিশোর নবকুমার সিংহকে শান্তিনিকেতনে পাঠিয়েছিলেন। আর তাতেই মণিপুরি নৃত্যের স্বর্ণযুগ শুরু হয়েছিল বলা যায়। শান্তিনিকেতনে একে একে মঞ্চস্থ হতে থাকে ‘শাপমোচন’, ‘ঋতুরঙ্গ’, ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘চণ্ডালিকা’, ‘মায়ার খেলা’। নবকুমার সিংহ নিজে অভিনয় করেন ‘শাচমোচন’ নৃত্যনাট্যে। ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্যে সম্পূর্ণভাবে মণিপুরি সুর ও তাল গ্রহণ করে মঞ্চস্থ হয়। ‘নটীর পূজা’-য় মণিপুরি মুদ্রার প্রবর্তন করা হয়। ‘চিত্রাঙ্গদা’-য় অভিনয় করানোর জন্য আসাম থেকে নিয়ে আসা হয় নৃত্যশিল্পী চন্দ্রজিৎ সিংহকে। তারপর সাহায্যকারী হিসেবে একে একে শান্তিনিকেতনে আসতে থাকেন নরোত্তম সিংহ, মণিপুর থেকে সূর্যবর সানা, গোপাল সানা। রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে, নবকুমার সিংহের তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে মণিপুরি নৃত্যের খ্যাতি সারা ভারতব্যাপী ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। একসময় মণিপুরি নৃত্যের শিক্ষাদানের জন্যে নবকুমার সিংহকে আহমেদাবাদ এবং মুম্বাইতেও যেতে হয়। মুম্বাইতে নবকুমার সিংহ একসময় একটা নৃত্যশিক্ষার বিদ্যালয়ও খুলেছিলেন। মুম্বাইয়ের হিন্দি চলচ্চিত্র ‘বসন্ত সেনা’-তে তিনি মণিপুরি নৃত্য পরিচালনা করেন এবং তাঁর পুত্র এই সিনেমায় মণিপুরি নৃত্য পরিবেশন করেন, মৃদঙ্গ বাজিয়েছিলেন ত্রিপুরার মৃদঙ্গ শিক্ষক সুরেন্দ্রজিৎ সিংহ।

নবকুমার সিংহের কৃতিত্বের কথা লিখতে গিয়ে শান্তিদেব ঘোষ লিখেছিলেন, “শান্তিনিকেতনে আসার আগে তিনি ছিলেন প্রকৃত নর্ত্তক। যা শিখেছিলেন তারই পুনরাবৃত্তি করতেন তিনি। নতুনভাবে নাচ শেখার কথ তিনি পূর্ব্বে কখনো ভাবেন নি। এখানে এসে প্রথম সেই পথে তাঁকে হাত দিতে হয় এবং সকলের পরামর্শক্রমে নতুন সম্ভবনার পথ তিনি দেখাতে সক্ষম হন। শ্রীযুক্ত নবকুমার সিংহ এদিক থেকে এযুগের মণিপুরী নৃত্য আন্দোলনের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এঁরই জিন্য শিক্ষিত দেশবাসী মণিপুরী নাচের মাধুর্য্য উপলব্ধি করল নটীর পূজার সময়ে।”

পরিশেষে বলা যায়, মণিপুরি নৃত্যের প্রসারে রবীন্দ্রনাথের অবদান যেভাবে ইতিহাস হয়ে থাকবে সেভাবে ইতিহাস হয়ে থাকবে ত্রিপুরার রাজ-পরিবারে মণিপুরি নৃত্য-প্রীতি, রবীন্দ্রনাথের সাথে ত্রিপুরার রাজ-পরিবারের সুসম্পর্ক এবং নবকুমার সিংহের নাম। তাঁদের মিলিত প্রচেষ্টার কারণেই মণিপুরি নৃত্যের প্রসার সম্ভব হয়েছিল।