
জগাই মাধাই (অনুগল্প)
সদানন্দ সিংহ
জগাই-মাধাই সাব্রুমে এক আত্মীয়ের বিয়েতে এসে খুব মুশকিলে পড়ে গেল। আমিও এসেছি এই বিয়ে উপলক্ষ্যে। তবে এখানে এসে মনে হল আমার, না এলেই বরং ভালো হত। কারণ এই জগাই-মাধাই। বারবার আমাকে বিরক্ত করছে এই জগাই-মাধাই। এই জগাই-মাধাই দুজনের মধ্যেও নাকি ভাই-ভাই সম্পর্ক। তবে খুব দূর সম্পর্কের, যার তলটা ওরা নিজেরাও ঠিক খুঁজে পায়নি।
প্রথমে ওরা এসে আমাকে বলেছিল, দাদা আপনাকে আমরা সঠিকভাবেই খুঁজে বের করেছি।
আমি একটু অবাক, আমাকে খুঁজে বের করার কী আছে !
জগাই-মাধাইকে অনেকেই চেনেন। আমিও চিনি। গাঁজাখোর হিসেবে। গাঁজা খেয়ে ওরা ব্যোম হয়ে বসে থাকে অথবা কেবল হাসে। আমি তাই সরে পড়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু এরা দুজন আমার পায়ে পড়ে গেল। দুজনের মধ্যে মাধাই সবসময় যেন ব্যোম হয়ে থাকে, আজকেই তাই। জগাই বলল, দাদা আপনি আমাদের বাঁচান।
চমকে গিয়ে বললাম, এ্যাই এসব কী হচ্ছে ? পা ছেড়ে দাও, বলো কী দরকার ?
ওরা আমার পা ছেড়ে দিল। জগাই আবার বলল, আপনি আমাদের রক্ষা করেন।
— কি আশ্চর্য! আমি কীভাবে রক্ষা করব ?
— আপনি এ শহরে ভালো পদে দশ-পনের বছর আগে চাকরি করে গেছেন। আপনিই আমাদের রক্ষা করতে পারেন।
— আশ্চর্যের ব্যাপার। একসময় চাকরি করেছি বলে আমি তোমাদের কীভাবে রক্ষা করতে পারব ?
— এখানে গাঁজা কোথায় পাওয়া যায় যদি একটু বলেন।
এবার একটু রেগেই বললাম, আমি কি গাঁজা খাই নাকি ? কোথায় পাওয়া যায় কী করে বলব ?
জগাই আবার বলল, না মানে, কোনোখানে অনেকদিন থাকলে কোথায় কী হয়, কী পাওয়া যায় তা তো সবাই জেনে যায়।
— না ভাই, আমি এসব খোঁজ রাখি না। ভুল লোকের কাছে এসেছ। বলেই আমি তাড়াতাড়ি বিয়েবাড়ির অন্যদিকে চলে গেলাম।
তারপরও ওরা আমার পিছু ছাড়েনি। একে তো বিয়েবাড়ি, বিশাল জায়গা তো নয়, তাই ঘুরেফিরে আমার সাথে ওদের দেখা হয়ে গেল কয়েকবার। দেখা হলেই জগাই বারবার বলছিল, দাদা আপনি আমাদের জানাচ্ছেন না। আমি বারবার তাদেরকে বলেছি, আমি সত্যিই জানি না।
একসময় জগাই আমাকে বলল, ঠিক আছে দাদা, আমরা নিজেরাই খুঁজে বের করছি। একটু কায়দা করতে হবে, জানেন তো গাঁজাখোরদের ব্রেনটা খুব শার্প।
তারপর আমি দেখলাম জগাই-মাধাই বিয়েবাড়ি ছেড়ে একটু দূরে রাস্তায় চলে গেল। আমার বেশ কৌতূহল হল। আমিও ওদের কাছাকাছি রাস্তার পাশে এসে দাঁড়ালাম। দেখলাম রাস্তার একদিকে জগাই চলে গেল, রাস্তার অন্যদিকে মাধাই চলে গেল। দুজনেই আসন গেড়ে বসল। তারপর খালি হাতে এক অভিনয় যেন শুরু হল। নিঃশব্দে মাধাই যেন দুহাতে দড়ি ছাড়ছিল এবং জগাই রাস্তার অন্যপ্রান্তে বসে দড়িটা যেন লাটাই দিয়ে গোটাচ্ছিল।
রাস্তায় চলাফেরা করা লোকজন জগাই-মাধাইকে দেখে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। সবাই বুঝে গেছে এসব নেশাখোরদের কাণ্ডকারখানা। কেউ কেউ রাস্তায় যেতে যেতে জিজ্ঞেস করছিল, কী দাদা্রা, দড়ি গোটাচ্ছেন না সুতো গোটাচ্ছেন ?
জগাই-মাধাই কোনো উত্তর দিচ্ছিল না, নীরবে কাজ করে যাচ্ছিল।
বেশ কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে একজন লোক এল। এসেই লোকটা জগাই-মাধাইকে বলে উঠল, দাঁড়ান দাঁড়ান মশাইরা, একটু আস্তে করেন। আমি একটু পার হয়ে নিই। বলেই লোকটি এক পা তুলে যেন দড়িটা পার করল, তারপর অন্য পাটাও আস্তে আস্তে তুলে যেন দড়ির ওপর দিয়ে পার হয়ে গেল।
সঙ্গে সঙ্গেই জগাই-মাধাই লাফিয়ে উঠে লোকটার পায়ে পড়ে বলে উঠল, গুরুদেব, তুমি আমাদের মহাপ্রভু। আমাদের একটু প্রসাদ দিয়ে যাও।