
আড়াল (অনুগল্প)
গুলশন ঘোষ
বুদ্ধপূর্ণিমা। আগের দিন রবিবার। সেই সঙ্গে মাসের চতুর্থ শনিবার। টানা ৩দিন ব্যাঙ্ক বন্ধ। পুরি যাওয়ার প্ল্যান করে ফেললেন ঘোষালবাবু। সব্বাই ফ্যামেলি নিয়ে যাবে। জমপেশ আড্ডা হবে। কিন্তু, বেঁকে বসলেন অ্যাকাউটেন্ট সুজয়বাবু। তিনি ছুটিতে দেশের বাড়ি যাবেন বলে মনস্থির করে ফেলেছেন।
অবশেষে বোসবাবুর জোরাজুরিতে পুরোপুরি ‘না’ বলতে পারল না তিনি। তবে সে তার টিকিট রিজার্ভ করতে নিষেধ করলেন।
শুনে মিত্রদা বললেন- ‘তখন টিকিট পাওয়া যাবে না সুজয়। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে যাবে। না, কি সেবার শিলিগুড়ি যাওয়ার মতো বাথরুমে লুকিয়ে লুকিয়ে যাবে!
“আরে মিত্রদা, অত ভাবতে হবে না। তেমন হল জেনারেল টিকিট কেটে উঠে পড়বো।”-এই বলে সুজয় চৌধুরী লাঞ্চে চলে গেলেন।
হাওড়া-পুরি ধৌলী এক্সপ্রেস। ভোর পাঁচটা পঞ্চান্ন। বোসবাবু, ঘোষলাবাবু, মিত্রদা সবাই ফ্যামেলি নিয়ে D-5-এ উঠে বসেছেন। কিন্তু, চৌধুরীর দেখা নেই। সময় হয়ে এলো ট্রেন ছাড়ার। মিত্রদা স্টেশনে নেমে চায়ের স্টল খুঁজছেন। দেখলেন চৌধুরী দৌড়ে দৌড়ে আসছেন।
সিগন্যাল গ্রিন। হর্ণ বেজে উঠল। মিত্রদা খুশিতে হাত নাড়িয়ে ইশারা করে চা নিয়ে ট্রেনে উঠলেন।
ট্রেন ছেড়ে দিল। হাঁফাতে হাঁফাতে উঠে পড়লেন চৌধুরী ।
সবাই বেজায় খুশি। হাসি মশকরাতে রত। ট্রেন সাঁতরাগাছি পেরিয়ে গেল। ঘোষালদার বউ টিফিন বক্স বার করলেন। লুচি আর আলু কষা। সবাই খাচ্ছেন। কিন্তু, চৌধুরী এদিক আর ওদিক করছেন।
তার অস্থিরতা দেখে বোসবাবু বললেন, ‘কী চৌধুরীদা না খেয়ে এদিক-ওদিক করছেন কেন?”
“টিকিট কাটতে গেলাম। এত ভোরেও দেখি কাউন্টারে দীর্ঘ লাইন। টিকিট কাটা হয়নি।”
“সেকি- সেকি” বলে উঠলেন বোসবাবু, ঘোষালবাবুর স্ত্রী।
মিত্রদা বললেন, “এক কাজ করো, টি টি এলেই আগে একটা চালান করে নাও।”
“মিত্রদা চিন্তা করছেন কেন, কিছু হবে না। সব সামলে নেব। টি টি তো আগে উঠুক।”চৌধুরীর এই কথা শুনে কেউ হাসল। কেউ আবার লজ্জায় একটু ভীত হল।
ডূঁয়া। টি টি-কে D-4-এ দেখে চৌধুরী বললেন, “মিত্রদা তাড়াতাড়ি পাঁচ টাকার খুচরো দিন।”
“কেন?”-
“তাড়াতাড়ি দিন, পরে বলছি।”
পকেট হাতড়ে পাঁচটা ১টাকার কয়েন বার করে চৌধুরীর হাতে দিলেন মিত্রদা। কয়েনগুলি নিয়ে সে দ্রুত বাথরুমে চলে গেলো।
টি টি D-5-এ। খাওয়া বন্ধ রেখে বোসবাবু টিকিট ধরালেন টি টির হাতে।
“কত দূর- আর কত দূর- বল মা…”-একজন অন্ধ ভিখারি ছেঁড়া গেঞ্জি পরে গান গাইতে গাইতে এদিকে এগিয়ে আসছেন।
খুচরো কয়েক ঠোকার আওয়াজ উঠছে হাতের তালু থেকে। হাত বাড়িয়ে দিলেন মিত্রবাবুর দিকে।
তার মুখের দিকে তাকাতেই মিত্রবাবুর চোখ স্থির হয়ে গেল। বাকিদের অবস্থাও তাই।
মিত্রবাবু পকেট হাতড়ে কয়েন খুঁজতে ব্যস্ত। তাঁর বিস্মিত চোখজোড়া যেন ভিক্ষুকের হাতের কয়েনগুলির মতো চকচক করে উঠলো।