
চক্রব্যূহ (ছোটোগল্প)
ডঃ নিতাই ভট্টাচার্য্য
— স্টপ বাদল, স্টপ। এনাফ। ডোন্ট মেক মোর স্টোরি।
— অতনুদা, প্লীজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড। এটা গল্প নয়। আমার মা ফোন করে কান্নাকাটি করছে। বাবা ভীষণ ভায়োলেন্ট হয়ে উঠেছে। বাড়িতে মা একা। মাকে মারধর করছে বাবা। এই অবস্থায়…।
— বাদল, কয়দিন আগেও একই কথা শুনিয়েছিলে তুমি। যাইহোক, আমার মনে হয় তোমার এখন বাড়িতেই থাকা উচিত। সব কিছু সামলে নিয়েই না হয় মার্কেটে নামবে। ততদিন অন্য কাউকে দেখছি। লাইন কেটে দেয় অতনু। স্ক্রীনের দিকে চেয়ে থাকে বাদল। অতনুর কথায় একটা স্পষ্ট বার্তা আছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না বাদলের। কী করবে বাদল! ইচ্ছে করে তো আর বাড়ি ফিরে যাচ্ছে না। প্রয়োজন। ভীষণ প্রয়োজন। পরে নিশ্চয় কাজ করে পুষিয়ে দেবে কাজের ঘাটতি। আজ অতনুদার কথা গায়ে বিঁধিয়ে মার্কেটে পড়ে থাকলে চলবে না।
কাউন্টার থেকে বেরিয়ে বাসস্ট্যান্ডের দিকে হাঁটা দেয় বাদল। ফোন করে সবিতাকে। টানা রিং হয়ে কেটে যায়। আবারও ফোন করে মায়ের ফোনে। এবারও হতাশ হয়। ফোন ধরে না সবিতা। একটা দুরন্ত রাগ মাথার মধ্যে ছুটোছুটি করে। বাদলকে এই সময় ফোন না করলেও পারতো সবিতা। পাশের বাড়ির রমলা কাকিমাকে ডেকে চেষ্টা করতে পারতো একবার বাবাকে শান্ত করবার। আগেও তো এ কাজ করেছে সবিতা। তাহলে আজ…।
আবার বাড়িতে ফোন করে বাদল। সাড়া শব্দ নেই সবিতার। কে জানে কী ঘটে গেছে। অতুল হয়তো হাতের কাছে পেয়ে গলা চেপে মেরেই ফেলেছে সবিতাকে। অবিশ্বাস্য নয় মোটেই। বাবার এমন চেহারা নিজে চোখে দেখেছে বাদল। হঠাৎ করেই বাদলের হাতের ফোন বেজে ওঠে। মা ফোন করেছে। ফোন ধরে বাদল। হ্যালো, মা। মা। হ্যালো। বাদলের কথা গুলোই শুনতে পায় বাদল। কেটে যায় লাইন। ঘুরিয়ে ফোন করে বাদল। নট রিচেবেল। ওহ্। পরিস্থিতি যেন অসহনীয় হয়ে উঠছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে।
আজ মাস পাঁচেক বিছানায় পড়ে রয়েছে অতুল। নিউরো প্রবলেম। ওঠা হাঁটা সম্পূর্ণ বন্ধ। যেকোনো কাজেই সবিতা নয়তো বাদলের সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে। ইদানীং আবার নতুন সমস্যা উঁকি দিয়েছে। মেজাজ মুহুর্মুহু মাথায় চড়ে। সঙ্গে অসংলগ্ন কথা। বহু পুরনো দিনের বন্ধুর প্রসঙ্গ টেনে নিয়ে আসে। বলে আজই দেখা হলো। খানিক আগেই। সবিতা বলে নাও, বোঝ। কোন জন্মে মরে ভুত হয়ে গেছে। তিনি নাকি এসে দেখা করেছে। কিছু বলে না বাদল। শোনে। কষ্ট পায়।
বাদলকে দেখলেই হলো। অতুলের অভিযোগ। বাদল, তোর মা আমাকে মারধর করে। জোর হাত করে বলছি আমাকে মেরে ফেল। বিষ দে। আমি…। সবিতা বলে তোর বাবা কেমন মানুষ দেখছিস বাদল। বলে কিনা আমি গায়ে হাত তুলি। সারাদিন ওর পেচ্ছাব পায়খানা ঘেঁটে দিন কাটে আর বলে আমি মারি! ভগবান আমার মরণ হলে বাঁচি। প্রথম প্রথম সবিতাকে শান্ত করবার চেষ্টা করত বাদল। এখন মায়ের মুখে এইসব কথা শুনে চুপই থাকে। অতুলের অসুস্থতার কথা সামনে এনে সবিতাকে শুষ্ক প্রবোধ বাক্য শোনানো অর্থহীন। বোঝে বাদল। সারাদিন অতুলকে সামলে সবিতাও খিটখিটে হয়ে উঠেছে দিনে দিনে। কথায় কথায় রেগে যায়। এই সব অস্বাভাবিক নয় মোটেই।
আজ সাতগেছিয়া মার্কেটে কাজ করছিল বাদল। বেশ কয়েক সপ্তাহ এদিকে আসা হয়ে ওঠেনি। গতকাল রাতে ফোন করেছিল অতনু। বাদল, সাতগেছিয়া, মেমারি আর শক্তিগড়ের মার্কেট দেখার সময় হবে তোমার। ওদিকের সেল বেশ ডাউন। আসলে তুমি…। বাকি কথাটা না বললেও বুঝে নিয়েছে বাদল। বর্ধমানের আশেপাশের মার্কেটে সেইভাবে কাজ করে উঠতে পারেনি। সেই কথা মনে করিয়ে দিতেই অতনুদা ফোন করেছিল। আজ বেলা দশটার মধ্যেই কাজ শুরু করেছিল বাদল। পর পর গোটা দশেক কাউন্টার ভিজিট করে ভেবেছিল বর্ধমান রওনা দেবে। ফেরবার পথে রসূলপুরের মার্কেটে কাজ করবে। সে ভাবনা ভাবনাই রয়ে গেলো। সবিতা ফোন করে। তুই বাড়ি আয়। এইভবে আগে কোনদিন কান্নাকাটি করেনি সবিতা। বিষয়টা গুরুতর নিশ্চয়। বাড়ি না ফিরে উপায় নেই। বাড়ির পরিস্থিতি অতনুকে বলে বাদল। ফোঁস করে ওঠে অতনু। হাজার কথা শুনিয়ে দেয় বাদলকে।
একটা দশ বাজে। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে বাদল। মেমারি ফিরবে। দুটো পঁচিশের বর্ধমান লোকালটা পেলে সুবিধা হয়। ঘন্টা দেড়েকের মধ্যে বাড়ি পৌঁছে যাবে। না জানি কী কাণ্ড ঘটে গেছে। আজ কার মুখ দেখে উঠেছিল বাদল কে জানে! সত্যি এক একটা দিন আসে বটে।
সপ্তাহ দুয়েক আগেও এমনই সমস্যায় পড়েছিল বাদল। অশোকনগর মার্কেটে কাউন্টার ভিজিট করছিল। সবিতা ফোন করে। বলে, বাদল তোর বাবা মনে হয় পাগল হয়ে গেছে জানিস। হাতের কাছে যা আছে ছুঁড়ে মারছে আমার দিকে। মায়ের কথা শুনে আঁতকে ওঠে বাদল। কাজ ফেলে বাড়ি ফেরে। মায়ের কথা সত্যি। অতুল উন্মাদের মত আচরণ করছে। বালিশ তোষক ছিঁড়ে কুটোকুটি করেছে। দূরে বসে কান্নাকাটি করছে সবিতা। পাশের বাড়ির রমলা কাকিমা ব্যস্ত সবিতাকে সামলাতে। অতুলকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় বাদল। সাইকোসিস হয়েছে অতুলের। দীর্ঘদিন একই পরিবেশে বন্দি থেকে…।
পাঁচ মাস চার দেওয়ালের অন্ধ কূপে আটকা পড়েছে অতুলের জীবন। পরিচিত পরিজনদের উপস্থিতি ম্লান হয়ে এসেছে মনে। রোগ, যন্ত্রণা, ওষুধ আর ডাক্তার। এই শব্দ ঘুরে ফিরে আসে অতুলের কানে।
আসলে একই পরিবেশে দীর্ঘদিন থাকলে রোগী এমন আচরণ করে। ভায়োলেন্ট হয়ে ওঠে ভীষণ। এমনকি আত্মহত্যাও করে ফেলে।
বাকরুদ্ধ বাদল। দুশ্চিন্তার ছায়া দুই চোখে। চেয়েছিল ডাক্তারবাবুর দিকে। ভয় পাবার কিছু নেই। ওষুধ দিচ্ছি কমে যাবে। হুইল চেয়ারে বসিয়ে আপনার বাবাকে বাইরের পরিবেশে নিয়ে আসুন। পরিচিত মানুষজনের সঙ্গে কথা বললে খুব দ্রুত রিকভারি হবে। ডাক্তারবাবুর পরামর্শ। পাড়ার মানুষজনদের বাড়িতে ডেকে এনেছে সবিতা। অনেকের মাঝে অতুলকে রেখে চেষ্টা করেছে স্বামীর মানসিক স্থিতি স্বাভাবিক খাতে ফিরিয়ে নিয়ে আসবার। সময় মূল্যবান বড়। রোজ রোজ এসে অতুলের প্রলাপ শোনার গরজ কারই বা আছে! কাজ না থাকাটাও কাজ। তাই সবিতার সেই চেষ্টা কাজে আসেনি খুব একটা। তবুও চেষ্টার ত্রুটি নেই সবিতার। রমলা কাকিমা বলছিল সেইদিন, বাদল তোর মাকে দেখে ভীষণ খারাপ লাগে রে। তোর বাবার কাছে বসে দুটো কথা বলবে বলে কী আকুতিই না জানায় পাড়ার লোকের কাছে।
রোজ রাতে মার্কেট থেকে ফিরে বাবার সামনে দাঁড়ায় বাদল। এক সুতীব্র মনোবেদনা বেজে ওঠে অন্তরে। অতুলের অবস্থার উন্নতি নেই বিশেষ। ক্ষয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে। অসংলগ্ন কথা বেড়েই চলেছে। হুইল চেয়ারের প্রয়োজন। বিছানার থেকে নামাতেই হবে বাবাকে। ভীষণ তাগিদ অনুভব করে বাদল। হাজার সাত আট টাকার কমে হুইল চেয়ার হয় না। খোঁজ নিয়েছে। মার্চের স্যালারি পেয়ে ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবে বলে ভেবেছে। ওই পর্যন্তই। সংসার, অতুলের চিকিৎসা খরচ সামলে সাশ্রয় কোথায়!
সবিতা জানে নিম্ন মধ্যবিত্তের সংসারে টানা পোড়েনের খট খট শব্দ। একটা টাকা বাড়তি খরচ করবার আগে ভাবতে হয় দশবার। বাদলের অবস্থা অনুমান করতে কষ্ট হয়নি সবিতার। ছেলের সাধ অন্তহীন। সীমিত সাধ্য। তাড়াহুড়ো করিস নে বাদল। রয়ে সয়ে কিনে আনবি হুইল চেয়ার। অত কীসের তাড়া! চোখের কোল চিক চিক করে উঠেছে বাদলের। সংসারে মায়েরা বড় অদ্ভুত। জোড়াতালি দিয়ে সব কূল বজায় রাখার প্রচেষ্টায় সবিতাদের জুড়ি নেই। স্বয়ং ঈশ্বরও বুঝি অবাক হয়ে ভাবেন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার এমন নিখুঁত কৌশল সবিতারা আয়ত্ত করলো কীভাবে!
ছেলের মাথায় হাত রেখেছে সবিতা। কষ্ট পাস নে বাদল। আমি তো রয়েছি। আমি রোজই দু-একজনকে ডেকে নিয়ে আসি। তোর বাবা কথা বলে তাদের সঙ্গে। তবে কি জানিস, রোগ যে হারে বাড়ে সেভাবে কি কমে। সময় লাগবে। সব ঠিক হবে দেখিস। তোর বাবা সুস্থ হবে ঠিকই। তুই চিন্তা করিসনে। মায়ের কথা শুনে নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি বাদল। সবিতার কাঁধে মাথা রেখে কেঁদেছিল হাউ হাউ করে। ছেলেদের পাশে দাঁড়িয়ে দুর্বল মনে সাহস দেবার ব্যপারে জগৎ জননীও বুঝি কয়েক কদম পিছিয়ে থাকে সবিতাদের থেকে। ভেঙে পড়িস নে বাদল। ভগবান আছেন। নিজের বুকে পাথর চাপিয়ে বাদলের মনে সাহস জুগিয়ে ছিল সবিতা। মায়ের কথা শুনে বাদলের দুই চোখের ধারা স্রোতস্বিনী হয়ে উঠেছিল।
সে রাতে ফোন করেছিল অতনুও। বাদল সবার জীবনে এমন দিন আসে। কাঁধটা যেন ঝুঁকে না যায়। চড়াই উতরাই ভেঙে এগিয়ে চলাই জীবন। কাজও করতে হয়। আমাদের সবার একটা টার্গেট আছে। চিন্তা না করে কাজে মন দাও। সামনে সুদিন নিশ্চয় আছে। সেদিন অতনুদার গলায় ছিল সমবেদনার সুর। পাশে থাকার আশ্বাস। এই দুই সপ্তাহে বদলে গেছে অতনুর সুর।
দেড়টা বাজে। এখনো বাসের দেখা নেই। ঠিক কী করা উচিত বুঝে পায় না বাদল। বিভ্রান্ত। অতনুর কথাগুলো নড়িয়ে দিয়েছে আজ। কানে বেজে ওঠে ‘ডোন্ট মেক স্টোরি’, মানে বাদল মিথ্যা বলছে! মানে বিশ্বাস নেই বাদলের উপর! আত্মসম্মানে আঘাত লাগে ভীষণ। হয়তো কাজ হারাবে না ঠিকই। তবুও বাদলের নিষ্ঠার প্রতি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল অতনু। আজ কতদিন অসুস্থ হয়ে পড়ে রয়েছে অতুল। কথায় কথায় বাবাকে নিয়ে ছুটেছে ডাক্তারের কাছে। তারপরেও যতটা সম্ভব নিজেকে নিংড়ে দিয়েছে। সে কথা অজানা নয় অতনুর। তবুও…।
চৈত্রের বেলা। বাসে লোকজন কম। জানালার বাইরে চেয়ে থাকে বাদল। কখনো অতুল কখনো সবিতা কখনো বা অতনুর কথা ছুঁয়ে যায় বাদলকে। মার্কেট, সেল, টার্গেট মাঝে মধ্যে আড়ি পাতে ভাবনায়। শহর ছেড়ে এগিয়ে চলেছে বাস। পাতলা হচ্ছে লোকবসতি। দুই পাশে ধান জমি। বহুদূরে দিগন্ত রেখায় গা এলিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে গ্রামগুলি। বৈশাখী খরতা গলা টিপে ধরেছে প্রকৃতির। এক অসহনীয় রুক্ষতা গ্রাস করে বাদলকেও।
দাদা ভাড়াটা করে নেবেন। ভাড়া চাইছে কন্ডাক্টর। ফোনটা বেজে ওঠে আবার। চমকে ওঠে বাদল। ভেবেছিল সবিতার ফোন হয়তো। না। অতনু ফোন করেছে। আবার কী বলবে কে জানে। ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে ফোনটা ধরে বাদল। তোমাকে টেক্সট করেছি দেখ। বর্ধমানের কাউন্টারের নামগুলি পাঠিয়ে দাও। সার্থক আজ বর্ধমানে কাজ করছে। ওকে বলেছি। আজই ভিজিট করে নেবে। বলে অতনু। গালে থাপ্পড় খেলো বাদল। ইচ্ছে যায় কয়েকটা কথা শুনিয়ে দিতে। দাঁতে দাঁত চেপে সংযত রাখে নিজেকে।
অতনুকে কাউন্টারের ডিটেইলস পাঠিয়ে দেয় বাদল। চোখ বন্ধ করে। রগের শিরাগুলো একযোগে দপ দপ করছে। মনের তীব্র রাগ সংক্রমিত হৃদয়ে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত রক্ত ছুটছে শরীরের উপরের দিকে। মাথার তালু ফুঁড়ে বাইরে আসবে রক্তের ফিনকি। কপালের ডান দিকটায় যন্ত্রণা শুরু হয়েছে ভীষণ। মাইগ্রেন। আজ সারাদিন ভোগাবে। বাস থেকে নেমে একটা ওষুধ খেতেই হবে। নয়তো ভীষণ বাড়াবাড়ি হবে।
জানালার বাইরের দিকে তাকায় বাদল। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই মেমারি পৌঁছে যাবে। মাথার যন্ত্রণা অসহ্য হয়ে ওঠে। ডান দিকের রগের উপর চাপ দেয় জোরে। আরাম লাগে বেশ। আরো জোরে চাপ দেয়। বুড়ো আঙুলের চাপ রগের উপর ধরে রাখে বেশ কিছুক্ষণ। নিজেকে পাগল বলে মনে হয় বাদলের। সহ্যেরও তো সীমা আছে। টানা কয়েক মাস ধরে চলছে বাবাকে নিয়ে। অতুলের একটা ভালোমন্দ কিছু হয়ে গেলেই ভালো হয় বোধ হয়। মনে হয় বাদলের। মায়ের মুখটা মনে পড়ে। বড় মায়াময় সবিতার মুখ। সারাদিন অতুলকে সামলায় সবিতা। সংসারের অন্তহীন ব্যস্ততার মাঝেও ঠিক সময়ে স্বামীর মুখে জল ওষুধ দেয় সবিতা। কর্তব্যের খামতি নেই কোনো। নেই কোনো অভিযোগ। আজ হয়তো ভীষণ কষ্ট পেয়েছে অতুলের ব্যবহারে। বাঁধ ভেঙেছে সহ্যের। তাই ফোনে…।
স্টেশন পৌঁছে গেছে বাদল। প্লাটফর্মে এসে বসে। বাসস্ট্যান্ড থেকে স্টেশন বেশ অনেকটা পথ। হেঁটেই এসেছে বাদল। ঘামে ভেজা জামা লেপ্টে গেছে শরীরে, পাখার হওয়ায় যেনো আগুনে হল্কা। আকাশের দিকে চেয়ে দেখে। সাদা চকচকে আকাশ। মেঘের লেশ মাত্র নেই। চৈত্র শেষে দিকে। আগুন ঝরছে আকাশ থেকে। দুচোখ পুড়ে যাবার উপক্রম। চোখ বন্ধ রাখে বাদল।
স্টেশন মাইকে ঘোষণা হচ্ছে। শক্তিগড়ে মালগাড়ি খারাপ হয়েছে। ট্রেন চলাচল কখন চালু হবে বলা যাচ্ছে না। ওহ। এই এক যন্ত্রণা। সময়ও যেন সময় বোঝে। কখন কোন ঘটনা ঘটালে চরম বিপদের কবলে পড়বে বাদল এই চক্রান্ত যেন সময়েরই সাজানো। আজ বলে নয়। রোজ রোজ। মাসের পর মাস এমনিই চলছে। মুক্তি নেই বাদলের। সময়ের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে ছটপট করে বাদল।
বাস ধরে ব্যান্ডেল চলে যাবার কথা ভাবে। মাথার যন্ত্রণায় ইচ্ছে যায় না রোদে পা ফেলতে। ব্যাগ থেকে একটা এনালজেসিক বের করে। ওষুধ খায়। কিছু সময় পড় মাথা যন্ত্রণা কমে আসবে।
সাড়ে তিনটে বাজে। ট্রেনের খবর নেই কোনো। প্লাটফর্মে বেশ কিছু মানুষের ভিড়। এতো লোকের মধ্যে থেকেও নিজেকে একলা মনে হয় বাদলের। সামনে তাকায় বাদল। রেল লাইনের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে চলে বাদলের চিন্তাসিক্ত দৃষ্টি। দূরে বহু দূরে প্লাটফর্মের ভিড় পিছনে ফেলে একলা ছুটে চলে বাদলের মন।
মাটির থেকে কেঁপে কেঁপে উঠে আসে গরম ভাপ। নির্মম দাবদাহের কাছে প্রকৃতির অসহায় আত্মসমর্পন। তারই দীর্ঘশ্বাস বুঝি। বাদলের বুকের মধ্যে জমে থাকা বাতাস স্বতস্ফূর্তভাবেই বাইরে আসে। দীর্ঘ হয়ে। অতনুদার কথাগুলো মনে পড়ে আবার। ইচ্ছে যায় ফোন করে অতনুদাকে। থাক। আবারও কড়া কথা শোনাবে অতিনুদা। আসলে কোম্পানির বেঁধে দেওয়া মাইলস্টোন ছুঁতে অতনুকেও ছুটতে হয়। ছুট ছুট আর ছুট। প্রত্যেক শ্বাস মনে করিয়ে দিয়ে যায় মার্কেট সেল আর টার্গেটের কথা। বাদল অতনুদের জীবনের শ্বাসবায়ু। তন্দ্রাচ্ছন্নতায় মুদে আসে বাদলের দুই চোখ। ওষুধের ঘোর। স্টেশনের মাইক বেজে ওঠে। ট্রেন আসবে কিছুক্ষণ পর।
একরাশ দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে বাড়ি ফেরে বাদল। বিছানায় শুয়ে অতুল। নির্বিকার। পাশের ঘরে রয়েছে সবিতা। চোখমুখ থমথমে। চেহারা অবিন্যস্ত। দেখলেই মনে হয় ঝড়ঝাপটা সামলে বাঁচিয়ে রেখেছে নিজেকে। মাকে দেখে ভীষণ কষ্ট হয় বাদলের। অতুলের কাছে আসে আবার। ভীষণ ধমক দেয় অতুলকে। পাগলামির সীমা আছে। তোমার বোঝা উচিত তোমাকে নিয়ে মা আমি কত দুশ্চিন্তায় আছি। আমরা এত করছি আর তুমি পাগলামো করে চলেছ। এখন চুপ করে আছো। আমি না থাকলেই শুরু হয়…।
অতুল চেয়ে থাকে বাদলের দিকে। চাউনিতে অসহায়তা ফুটে ওঠে। আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল বাদল। সবিতা আসে। বলে, আর বলিসনে বাদল। ছেড়ে দে। অসুস্থ তো। অবাক হয়ে মাকে দেখে বাদল। অথচ…।
কয়দিন পরেই মিটিং ডাকবে অতনুদা। মাস শেষে সবাইকে কাজের হিসাব দিতে হয়। নিজের কাজ গুছিয়ে নিচ্ছে বাদল। কাল সকালবেলায় আবার সাতগেছিয়া থেকে কাজ শুরু করবে। টার্গেটের থেকে পিছিয়ে আসে বাদল। পরপর কয়দিন সময় দেবে বর্ধমানের দিকে। টার্গেটের যতটা কাছে পৌঁছানো যায়।
ঘড়ির দিকে তাকায় বাদল। রাত হয়েছে। বারোটা দশ বাজে। আলো অফ করে শুয়ে পড়বে। হঠাৎ সবিতার গলা শুনতে পায়। নিচু স্বরে ডাকছে বাদলকে। দৌড়ে পাশের ঘরে যায় বাদল। বিছানায় বসে সবিতা। অঘোরে ঘুমাচ্ছে অতুল। বাদলকে দেখে চমকে ওঠে সবিতা। বলে বাদল আর পারছি না। তোর বাবা আমাকে মারলো দেখ। কখন? জিজ্ঞাসা করে বাদল। এইমাত্র বলে সবিতা। ঘরের আলো জ্বালিয়ে দেয় বাদল। বলে দেখো বাবা ঘুমাচ্ছে। অবাক হয়ে অতুলকে দেখে সবিতা। তারপর চেয়ে থাকে বাদলের দিকে। কি যেনো ভাবতে থাকে সবিতা। মায়ের চোখের এমন চাউনি অচেনা বাদলের। মুখের অভিব্যক্তি অন্য কিছুর আভাস দেয়। দুশ্চিন্তা ছেয়ে আসে বাদলের মনে। ঘুমের ওষুধ দেয় সবিতাকে। মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। ঘরের আলো অফ করে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় বাদল। একটা ভাবনা এসে ঝাঁকিয়ে দিয়ে যায়। এতদিন অতুলকে নিয়ে লড়াই করেছে বাদল। পাশে থেকেছে সবিতা। এইবার? অমীমাংসিত প্রশ্ন মুচকি হাসে বাদলের দিকে চেয়ে। অতুলের মুখটা ফুটে ওঠে আঁধারে। অনুশোচনা হয় বাদলের। ভীষণ অনুশোচনা। সবিতার কথা শুনে বাবাকে ওইভাবে…। কি করে জানবে বাদল সবিতার মনের ভিতরেও কবে…।
দুশ্চিন্তার খরপ্রবাহ বাদলের মনে। ভাবনা থমকে দাঁড়ায়। হঠাৎ করেই শোনে, ‘বাদল’। সবিতা এসেছে বারান্দায়। বলে, বাদল তোর বাবা যখন তখন আমাকে মারতে পারে। আমি তোর ঘরে শোবো। অন্ধকারে সবিতাকে জড়িয়ে ধরে বাদল। মাথা রাখে মায়ের কাঁধে। হাজার ঝড়ঝাপটায় মাকে জড়িয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাদল। আজ বড্ড অসহায় মনে হয় নিজেকে। সবিতা বলে, বাদল তোর ঘরে চল। বাদলের হাত ধরে টানতে থাকে সবিতা। আজ থেকে ছেলের পাশেই শোবে। নয়তো মারবে অতুল! সবিতাকে দেখে কেঁপে ওঠে বাদলের বুক। পায়ের নিচের মাটি টলোমলো। একরাশ বিপন্নতা আঁকড়ে ধরে বাদলকে। রাতের নির্জন আকাশে চেয়ে থাকে বাদল। কে যেন তারায় তারায় অদৃশ্য রেখা টেনে ফুটিয়ে তোলে এক চক্রব্যূহ। অনতিক্রম্য গণ্ডি। অতুল, সবিতা, অতনু, মার্কেট, সেল, টার্গেট আর সময় এই সপ্তরথী ঘিরে ধরেছে অভিমন্যু- বাদলকে। রথী মহারথীদের তীক্ষ্ণ তিরের নিদারুণ আঘাতে জর্জরিত বাদল। নিয়তির নির্মমতায় পর্যুদস্ত ভীষণ। নক্ষত্র খচিত গম্ভীর আকাশে চক্রব্যূহর মধ্যে বাদলের অসহায় আত্মসমর্পণ প্রত্যক্ষ করতে থাকে বাদল, একা।