স্বপ্নের তেরঙ্গা – সন্দীপন তালুকদার

স্বপ্নের তেরঙ্গা – সন্দীপন তালুকদার

স্বপ্নের তেরঙ্গা    (ছোটোগল্প)

সন্দীপন তালুকদার


গত তিনদিন ধরে শ্রাবণের ধূসর আকাশটা একখানা প্রকাণ্ড ভেজা ক্যানভাসের মত হয়ে ছিল। একটানা থমথমে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি। মানিকচকের পথ-ঘাট কাদা আর জলে একাকার। শেষ বিকেলে ট্যারচা রোদ শেফালিতলার প্রাচীন শ্যাওলাধরা কোঠাবাড়িটার একতলার বারান্দায় পড়ত। গদি ছেঁড়া তোয়ালে জড়ানো ইজি চেয়ারে বসে বৃদ্ধ মানুষটি স্মৃতি রোমন্থন করতেন।
ভোরের ভিজে বাতাস সেদিন স্নিগ্ধতা ছড়াচ্ছিল। আলো ফুটতেই মেহগনি কাঠের পুরোনো আলমারিটার পাল্লা খুললেন সুধীররঞ্জন তরফদার। আশি পার করা অশক্ত শরীরে হরেক রকমের বেদনা বাসা বেঁধেছে। হাঁটু দুটো সবচেয়ে বেশি বিদ্রোহ করে, কিন্তু মনের বয়েস তাঁর বাড়েনি। খদ্দরের তেরঙা পতাকাটি বের করে সযত্নে বুকে চেপে ধরলেন তিনি। ন্যাপথলিননের গন্ধকে ম্লান করে সোনালি স্মৃতির পরশ তাঁর মস্তিষ্কের স্নায়ুকে সজীব করে তুলল। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ তিনি এই আমেজটা উপভোগ করলেন। পাশের তাক থেকে বের করলেন ধবধবে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি আর খদ্দেরের ঝোলা। প্রতি বছর এই বিশেষ সকালে তাঁর নিঃসঙ্গ, একাকিত্বে ভরা ঘরটায় যেন এক অদৃশ্য মুক্তির আলো এসে পড়ে। তাঁর বয়স্ক শিরদাঁড়াটা আপনা থেকেই সোজা হয়ে যায়। সুধীরবাবুর এই মানিকচকে নিজের রক্ত বলতে আর কেউ নেই। এই তেরঙা পতাকাই তাঁর সন্তান, তাঁর অতীত, আর আগামী প্রজন্মের হাত ধরে বেঁচে থাকার একমাত্র সেতু। ব্যাগে নিলেন ছোটদের জন্য কেনা দু-কৌটো লজেন্স আর দুটি জলের বোতল। গত দুই দশক ধরে ১৫ই আগস্টের সকালটা তাঁর এমনভাবেই শুরু হয়। বাইরে তখন মেঘ চিরে সূর্য উঁকি দিতে চাইছে, কিন্তু সুধীরবাবুর বুকের গভীরে এক নিদারুণ দ্বিধা আর সংশয় — “পারব তো এবার ?”
তাঁর এই অনিশ্চিয়তার দোলাচলের আসল কারণ কেবল নিজের বয়স নয়, বুকের ভেতর তাজা হয়ে থাকা এক নিদারুণ যন্ত্রণা। প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবসে তিনি যেতেন তাঁর প্রাণের চেয়ে প্রিয় প্রতিষ্ঠান — ‘হরিমোহিনী উচ্চ-প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এ। তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রামী ও সমাজসেবী বাবা নিজের প্রয়াত স্ত্রীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে মানিকচকের এই দুর্গম চরাঞ্চলে নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে তৈরি করেছিলেন ইস্কুলটি। অবসর নেওয়ার পরেও এই স্কুলেই সুধীরবাবু তাঁর গ্রামের কচিকাঁচাদের সঙ্গে পতাকা তুলতেন, জাতীয় সংগীত গাইতেন, লজেন্স বিলোতেন। কত প্রজন্ম পেরিয়ে গেল! কত বাচ্চা তাঁর হাত ধরে পতাকাতলে দাঁড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাইল। তারপরে বড় হয়ে কেউ ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হল; কেউ আবার বাপ-দাদার জমিতে সোনার ফসল ফলাতে রয়ে গেল। আর গঙ্গা যাদের সব কেড়ে নিল, তারা পেটের টানে পাড়ি দিল মুম্বাই, পুনে কিংবা বেঙ্গালুরু। মাস তিনেক আগে, এই বর্ষার ঠিক শুরুতেই প্রমত্তা গঙ্গার সর্বগ্রাসী রাক্ষসী ভাঙনে ভেসে গেছিল স্কুল। চোখের সামনে ইটের পর ইট যখন ধসে পড়ে তলিয়ে যাচ্ছিল তখন তিনি পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন। শুরুটা দেখেছিলেন সেই দশ বছর বয়েসে, শেষটাই বা বাকি থাকবে কেন? বৃত্তটা সম্পূর্ণ হোক। তবে এরই মধ্যে এলাকার মানুষের স্মৃতি থেকেও একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে তাঁদের দুই পুরুষের কর্মভূমি। ভাঙনের এই দেশে কোনো কিছুরই স্থায়িত্ব নেই, শোকেরও না। দুঃখটাও এখানে যেন বিলাসিতা। তাঁর পৈতৃক ভিটেবাড়িটাও চার বছর আগেই গঙ্গায় গেছিল। সেই থেকে নিজের জন্মভূমিতেই তিনি শরণার্থী! সামান্য পেনশন আর প্রভিডেন্ট ফান্ডের নামমাত্র পুঁজি সম্বল করে কলকাতা প্রবাসী এক কৃতি ছাত্রের একতলার দু’টি স্যাঁতস্যাঁতে ঘরের ভাড়াটে। কিছু স্মৃতি, কিছু বইপত্র আর একবুক স্বপ্ন নিয়ে তিনি বেঁচে আছেন -স্কুলটা সশরীরে না থাকুক, আগামী প্রজন্মের মনে যাতে বেঁচে থাকে পিতৃদেবের আদর্শ।
বাড়ির সদর দরজার সামনে থেকে টোটো চালক মাধব অধৈর্য হয়ে হর্ন দিল। সুধীরবাবু মনে মনে ভাবলেন, এই ছোকরা এমনিতে মন্দ নয়, কিন্তু আজকালকার যুবকদের মতোই বড্ড হিসেবি, বস্তুবাদী আর বড্ড চঞ্চল। সুধীরবাবু জাতীয় পতাকাটি বুকের কাছে সযত্নে চেপে ধরে, ভারী ঝোলা সামলে, টোটোয় উঠে বসে বললেন “চল রে মাধব, এ’বছর প্রগতি প্রাইমারি স্কুলটার দিকে চল। তার আগে বাবা ওই সিঁড়ির তলা থেকে শাবল আর বাঁশটা একটু তোর পক্ষীরাজে তুলে নে।”
মাধব মোবাইলে সময় দেখে বিরক্ত মুখে বলল, “দাদু, আজ ভাড়ার বাইরে এক পয়সাও বেশি পাব না। সকাল-সকাল আমায় কোথায় ঘুরিয়ে মারবা? আজকের দিনে বাজারে কত প্যাসেঞ্জার! সবাই মোড়ে মোড়ে পতাকা তুলতে যাবে। ও’বেলা আবার ক্লাবে ফাংশন।”
“পাবি রে পাবি, তোর ভাড়ার এক্সট্রা টাকা আমি দেব। চল তো আগে,” সুধীরবাবু ম্লান হাসলেন।
মাধবের চোখে-মুখে বিরক্তি স্পষ্ট। সুধীরবাবু সেটা বুঝলেন। খানিকটা অভিমানী গলায় বললেন, “তুই টাকা নিয়েই ভাবলি রে মাধব? গোঁফ গজানোর আগে থেকে তুই আমার সারথী। এই পতাকাটা আমার বাবা নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন। এই পতাকাটা আমি প্রতি বছর নতুন প্রজন্মের হাতে দিয়ে যাই কেন জানিস? কারণ আমি বিশ্বাস করি, দেশের স্বাধীনতার আসল আলো কেবল ইতিহাসের বইয়ে আটকে নেই; তা লুকিয়ে আছে এই শিশুদের নিষ্পাপ, উজ্জ্বল চোখের দৃষ্টিতে। এই মানিকচকের প্রতিটা শিশুই আমার সন্তান। ওদের চোখে স্বাধীনতার আলোটা জ্বালিয়ে যাওয়াই আমার শেষ কাজ।”
মাধব উত্তর দিল না, শুধু বিরক্তির সঙ্গে পিকাপের হাতলে একটু জোরে মোচড় দিল।
টোটো চলল মানিকচকের মূল রাস্তার দিকে। মোড়ের বিশ্বনাথের চায়ের দোকানে তখন ছুটির সকালের জমজমাট আড্ডা চলছিল। চারিদিকে উৎসবের আমেজ। লাউড স্পিকারে তারস্বরে দেশাত্ববোধক গান চলছে। সুধীরবাবু ভাবছিলেন, এর মধ্যে অনেক গানই আজকাল শুধু এই বিশেষ দিনগুলোতেই শোনা যায়। পতাকা বুকে নিয়ে তাঁকে টোটোয় বসে থাকতে দেখে আড্ডার ভিড় থেকে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল।
পাড়ার চটপটে ক্লাব সম্পাদক শুভাশিষ সেলফি পোজ দিয়ে আইফোনের ক্যামেরা ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, “দেখছিস রে? বুড়ো সুধীর মাস্টারের ব্যামোটা দেখ! হরিমোহিনী তো গেল, তাও স্বাধীনতা দিবসের বাতিক বুড়োর গেল না। এই বয়সে ঘরে বসে হরিনাম না করে টোটো চড়ে পতাকা তুলতে বেরিয়েছে।”
শুভাশিষের সময় এখন ভালো যাচ্ছে। গঙ্গার পাড়ে বালির বস্তা ফেলার টেন্ডারটা পেতে আগুনে অনেক ঘি দিতে হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু এখন সে আগুন ভালোই উত্তাপ ছড়াচ্ছে। গতমাসের পেমেন্ট পেয়েই কিনেছে লেটেস্ট এই আইফোন। এখন কারণে অকারণে লোকের সঙ্গে কথা বলার সময় আনমনে সে মোবাইলটা উল্টে পেছনের কামড় বসানো আপেলের লোগোটা পরিষ্কার করে।
পাশে বসা স্থানীয় এক আম ব্যবসায়ী ইমতিয়াজ। সম্প্রতি তার রাজনীতির প্রতি টান বেড়েছে। সামনের পঞ্চায়েত নির্বাচনের টিকিটটা যাতে পান সেটা নিশ্চিত করতে কোনো সুযোগই তিনি ছাড়ছেন না। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে তীব্র কটাক্ষ করলেন, “আরে থোড়াই না দেশপ্রেম। আজকাল তো কার দেশপ্রেম বেশি তা নিয়ে বাজারে কম্পেটিশন চলছে। এই তো কাল মোবাইলে দেখছিলাম — কারা সাচ্চা ইন্ডিয়ান আর কারা অনুপ্রবেশকারী, তা নিয়ে খেয়োখেয়ি! এদিকের মাটির মানুষের স্বদেশপ্রেম খাঁটি, নাকি ওপার বাংলা থেকে ভাঙন আর রক্ত পেরিয়ে আসা জনগোষ্ঠীর চোখের জল খাঁটি — সেই হিসেব মেলাতেই সাংবাদিক ব্যস্ত। তা স্কুল তো আর নেই, কিন্তু আজকের দিনে পতাকা তোলা মিস করলে চলবে কেন?”
পাশের হাইস্কুলের শিক্ষক বিকাশবাবু কিন্তু গর্জে উঠলেন, “ঠাট্টা করিস না শুভাশিস। আর সব কথায় রাজনীতি টানবেন না ইমতিয়াজ সাহেব। সুধীরবাবু যখন এই মানিকচকে মাস্টারি শুরু করেছেন, তখন আমাদের জন্মও হয়নি। ওঁর বাবার বুকে ভারতের মানচিত্র আঁকা ছিল। আর ওঁর ভেতর আসল ধর্মনিরপেক্ষ ভারতটা আছে বলেই আজও এই বয়সেও লড়ছেন। তোদের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক-কমেন্টের ভণ্ডামি ওঁর মধ্যে নেই। ওঁর মতো মানুষের কোনো সীমান্ত হয় না।”
শুভাশিস অবশ্য সেসব কথায় কান না দিয়ে অনলাইনে ‘ইন্ডিপেন্ডেন্সডে সেল’-এ কেনা ট্রাই-কালার চশমা চোখে দিয়ে মোড়ের বিশাল তোরণের সামনে সেলফি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যে #TruePatriot লিখে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট হবে। আজকের দিনে চারটে রিলস না বানালে, তেরঙা নিয়ে ডিপি না দিলে কিসের দেশপ্রেম? বুড়ো তো এখনও সেই উনিশ শতকে পড়ে আছে।


প্রগতি প্রাইমারি স্কুলও সুধীরবাবুর অতি পরিচিত। এখানকার পূর্বতন হেডমাস্টার নিতাই প্রামাণিকের সঙ্গে তাঁর বয়েসের তফাৎ প্রায় পঁচিশ বছরের হলেও মনের মিল ছিল। আগে নানান অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে আসার পাশাপাশি নিয়মিত অতিথি শিক্ষক হিসাবে বিনা বেতনে ক্লাসও নিতেন তিনি। তবে কোভিডে নিতাইবাবু চলে যাওয়ার পরে তিনি আর আসেননি। লোকমুখে শুনেছেন পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। অভিজ্ঞ মালি না থাকলে সাজানো বাগানে আগাছার জঙ্গল হতে বেশি সময় লাগে না। টোটো স্কুলে পৌঁছতেই জনাছয়েক ক্লাস ফোরের ছেলেমেয়ে তাঁকে দেখে এগিয়ে এসে প্রণাম করল। “মাস্টারমশাই, আপনি এসেছেন! চল আমরা স্যারকে অফিস ঘরে নিয়ে যাই।”
কিন্তু স্কুল মাঠের কোনায় শহীদ বেদির দিকে চোখ পড়তেই থমকে গেলেন সুধীরবাবু। সেখানে বিশাল সাউন্ড সিস্টেম বসানো হয়েছে, চারপাশে রঙিন বেলুন আর নেতাদের ফ্লেক্স। সুধীরবাবু ইতস্তত করে সেদিকে এগোতেই লম্বাচুলো, হাতে মোটা বালা পরা বছর পঁচিশ-এর একটা ছেলে এসে মেকি হেসে পথ আটকাল।
“আরে মাস্টারমশাই! আজ এদিকে কি মনে করে? ও প্রোগ্রাম দেখবেন? তার তো দেরি আছে। দাদার আজ হেব্বি ব্যস্ততা। তাও হেডমাস্টার আমাকে ধরেছিল। অনেক কষ্টে দাদকে রাজি করিয়েছি। প্রোগ্রাম শুনবেন তো ওদিকে গিয়ে বসুন না।“— স্থানীয় নেতার ডানহাত বলে পরিচিত সুজন ঘোষ গলাটা মোলায়েম করে বলল।
“না, মানে আমার একটা দরকার ছিল। হেডস্যার আছেন কিনা দেখি।“
“আরে আজ তো ছুটি। কাল আসবেন। আর আমি হেডমাস্টারকে দোকানে পাঠিয়েছি দাদার জন্য ঠান্ডা আনতে। বার বার বলে দিলাম সেদিন। আজ এসে দেখি ভুলে মেরে দিয়েছে।“
“অ্যা্ঁ…”
“কিছু বললেন মাস্টারমশাই?”
“না, মানে আমি একটু পতাকা তুলতে এসেছিলাম ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে। উনি অনুমতি দিলেই…”
“লে হালুয়া ! আপনি কেন তুলবেন পতাকা? হরিমোহিনী তো গঙ্গার তলে চলে গেল, তা বলে কি মাথা খারাপ হয়ে গেল আপনার? বয়স হয়েছে, এখন এসব ঝামেলায় কেন? আপনার এই ঝুলো পুরোনো পতাকা দিয়ে কী হবে? আমাদের দাদা আজ পঞ্চায়েতের ফান্ড থেকে আনা পঞ্চাশ ফুটের মেগা-ফ্ল্যাগ তুলবেন। আর পুরো তিরিশ টাকার প্যাকেট দেবেন ইস্টুডেন্টদের; আর মাস্টাররা পাবে পঞ্চাশের। আপনাকেও একটা পঞ্চাশের মাল আমি ম্যানেজ করে দেবো। দাদার পাশে দাঁড়িয়ে দুটো ছবি তুলুন, ফেসবুকে লাইভ হবে। আপনি এলাকার রিস্পেক্টেড লোক। শুনেছি আপনার বাপের নাম ছিল এককালে। দাদা সবসময় আপনাদের পাশে আছে। তবে মাতব্বরি আর সেয়ানাগিরি কিন্তু আমার হজম হয় না। মটকা গরম হয়ে যায়।”
কথাগুলো সোজা গিয়ে বুকে লেগেছিল সুধীরবাবুর। একটা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিল। তার উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছিল ইস্পাত কঠিন স্নায়ুর রন্ধ্রে রন্ধ্রে। কিন্তু আজ সুধীরবাবু কিছুতেই মেজাজ হারিয়ে এই সুন্দর সকালটা নষ্ট করবেন না। তাই মৃদু হেসে মাধবকে বাঁশটা টোটো থেকে নামাতে বারণ করলেন। যে পতাকায় তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রামী পিতার রক্ত আর ঘাম লেগে আছে; তা এখানে তোলার প্রশ্নই ওঠে না।


সকাল প্রায় ন’টা। শ্রাবণের শেষেও ফাঁক পেলেই সূর্য তার দহনক্ষমতা দেখাচ্ছে। ক’দিনের অনুপস্থিতির পরে আজ তার কাজের ভারী উৎসাহ। টোটোটা ছুটে চলেছে মানিকচক মোড়ের বড় খেলার মাঠটার দিকে। সেখানে পাড়ার বাচ্চা ছেলেরা নিজেরাই একটা প্লাস্টিকের জাতীয় পতাকা বাঁশে উল্টো করে টাঙিয়ে ফেলেছিল অজান্তে। সুধীরবাবু টোটো থেকে নেমে পরম আদরে বাচ্চাদের ডেকে পতাকাটি সোজা করে বাঁধতে শেখালেন। ছেলেরা খুব উৎসুক হয়ে বলল, “ও সার, তুমি আমাদের মাঠে পতাকা তুলবা?”
সুধীরবাবু মহা আনন্দে বাঁশটা পোঁতার জন্য এগোতেই, কোথা থেকে হুড়মুড় করে তিন-চারজন ষণ্ডামতো অচেনা লোক ছুটে এসে পথ আটকাল।
“এ কী করছেন দাদু? পাগল হলেন নাকি? ওদিকে সরুন। দেখছেন না প্যান্ডেলের কাজ চলছে? বাঁশটাও কি আমাদেরই ঝাড়ল নাকি রে মদনা?”
সুধীরবাবু বিনীতভাবে বললেন, “বাবা, আমি তো পুরো মাঠ নিচ্ছি না। এই কোণে বাচ্চাদের নিয়ে একটু মাটি খুঁড়ে শুধু…”
“রাখুন তো আপনার ফ্যাচফ্যাচ!” দলের সর্দার অহংকারে চেঁচিয়ে উঠল, “এখানে একটু পর মালদার তিনটা নার্সিংহোমের মালিক ডাক্তার পি. কে. বাসু আসছেন। আর থানার আইসি সাহেবতো আসবেনই। ডাক্তার বাসু ক্লাবে পাঁচ লাখ টাকা ডোনেশন দিয়েছেন, আর থানার বড়বাবুও লাফড়া হলে আমাদের সিকিউরিটি দেন। ওনারা যৌথভাবে ফ্ল্যাগ হোস্টিং করবেন। পুরোটা লাইভ হবে ক্লাব এর ফেইসবুক চ্যানেলে। আপনি ওখান থেকে বাঁশ সরান! আজ এসব বাচ্চাদের চু-কিত্-কিত্ খেলা আর আপনার সেয়ানা পতাকাবাজি এখানে চলবে না। ভিআইপি গাড়ি ঢুকবে এখুনি।”


সুধীরবাবু খানিকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে দেশপ্রেমীদের মঞ্চসজ্জা দেখলেন। তারপর পাঞ্জাবির পকেট হাতড়ে রুমাল বার করতে যাবেন, টোটোর তীক্ষ্ণ কিন্তু সংক্ষিপ্ত হর্ন কানে এল। ঘাম মুছতে মুছতে তিনি ফিরে আসতেই মাধব আধ-খাওয়া সিগেরেটটাকে ডান হাতের মধ্যমার সজোরে টোকায় পাশের খোলা নার্দমায় ফেলে দিল। সিটের তলা থেকে ঘষাখাওয়া প্লাস্টিকের জলের বোতল বার করে কুলকুচি করল। তারপর সিটে বসে সুধীরবাবুর দিকে ফিরে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতে তিনি বললেন- “ওই পুরোনো প্রাথমিক হাসপাতালটার পেছনের ফাঁকা জায়গাটায় চল।”

একটা প্রাচীন বটগাছের নিচে কিছুটা ফাঁকা জমি। সুধীরবাবু টোটো থেকে নেমে কোথায় মাটি খোঁড়া যায় মাধবকে দেখাচ্ছেন, অমনি দুটো বাইকে তিনজন যুবক এসে দাড়াল। ইটভাটার মাফিয়া ও প্রোমোটার বিজু সাহা সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সুধীরবাবুর চোখে চোখ রেখে বলল —
“শুনুন মাস্টারমশাই, এই জমিতে বাঁশ পোঁতার চেষ্টা করবেন না। এটা সরকারি খাস জমি কিন্তু এখন আমাদের প্রজেক্টের আন্ডারে। জমি দখলের মতলবে পতাকা গাঁড়বেন, তারপরে মিডিয়া আর নাগরিক সমাজের লাফড়া শুরু! না না — ওসব চলবে না। এসব ভংচং অন্য কোথাও গিয়ে মারুন।”
সুধীরবাবু কিছু বলার আগেই মাধব চেঁচিয়ে উঠল, “অ্যাই ভাই! ইটা কী হচ্ছে হা? খালি দশ মিনিটের তরে পতাকা তুলবে, তাতেই তোদের জমি দখল হয়া যাবে?”
বিজু সাহার চ্যালা খেঁকিয়ে উঠল, “ভাড়ার টাকা গুনে হাওয়া লে বে। বেশি পেঁয়াজি করলে টোটো সমেত গঙ্গায় ফেলে দেব। তুমি ছো-তো, অন্য কোনো বাগানে ফুল হয়ে ফো-তো।” মাস্তানের দল গুটখা খাওয়া কালো-কালো দাঁত বের করে হাসতে থাকল।
মাধব চোয়াল শক্ত করে ওদের দিকে এগোতেই সুধীরবাবু মাধবকে হাত ধরে টেনে আনলেন, “থাক থাক। ওদের সাথে তর্ক করিস না।” কিন্তু মস্তিষ্কের দিকে ধেয়ে চলা উষ্ণ শোনিতপ্রবাহকে ঠান্ডা করতে তাঁকেও বেগ পেতে হচ্ছিল।

মাধব টোটোয় উঠে আর অকারণে হর্ন দিল না। লুকিং গ্লাসে সুধীরবাবুর ঘামে ভেজা মুখটা দেখল — ধবধবে সাদা পাঞ্জাবিটা ভিজে গায়ে সেঁটে গেছে, কিন্তু হাত দুটো তখনও সেই পুরোনো তেরঙা পতাকাটাকে নিজের কোলের সন্তানের মতো আঁকড়ে ধরে আছে। তার যেন মনে হলো, টোটোর চাকাগুলো ভারী হয়ে রাস্তার সঙ্গে মিশে যেতে চাইছে।


ঘড়িতে তখন দুপুর বারোটা। মাথার ওপর সূর্য আগুন ঝরাচ্ছে। সুধীরবাবু বললেন, “চলরে, আমাকে এবার বাড়ি পৌঁছে দে। আজ আর আমার বাবার কাছে দেওয়া কথা রইল না…”

মাধব কিন্তু টোটোটা শিমুলতলার দিকে ঘোরাল না। সে হুট করে হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে মানিকচকের একদম শেষ প্রান্তে বাঁধের দিকে দুর্বার গতিতে পক্ষীরাজ উড়াল।
সুধীরবাবু অবাক হয়ে বললেন, “কোথায় যাচ্ছিসরে মাধব?”
মাধব দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আজ তোমার পতাকা উঠবেই দাদু।”

টোটো গিয়ে থামল গঙ্গার বাঁধের গা ঘেষে থাকা নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো কিছু ছিন্নমূল মানুষের অস্থায়ী ডেরায়। সেখানে সরকারি পাতলা ত্রিপল খাটিয়ে, গরু-ছাগলের সঙ্গে একপ্রকার নরককুণ্ডে বাস করছে কিছু পরিবার। তিনদিনের টানা বৃষ্টিতে চারপাশ কাদা আর পঙ্কিলতায় বিষাক্ত।
টোটো থামতেই হাঁটু পর্যন্ত লুঙ্গি আর ছেঁড়া স্যান্ডো পেরা এক মাঝবয়েসি লোক, দুটি যুবক ও তার পেছনে একদল অর্ধ-উলঙ্গ কাদামাখা শিশু ছুটে এল।
“সার আপনি? আপনি এই দুপুরে এখান?”
সুধীরবাবু চিনতে পারলেন। তাঁর সেই হরিমোহিনী স্কুলের এককালের অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র — মনসুর। ওদের অনেক চাষের জমি ছিল। বেশি পড়ালেখা করলে যদি ছেলেরা চাষ না করে এই ভয়ে ওদের বাবা ছেলেদের হাইস্কুলে পড়ায়নি। কিন্তু নদীর পথ পরিবর্তনের ফলে ঘর জমি হারিয়ে আজ তারা সর্বস্বান্ত।
“মনসুর! তুই এখানে কবে থেকে রে?”
“জষ্ঠীর গোড়া থেকি, ইস্কুলের পরের দিনই তো সব গেল।” মনসুর গলার কাছে দলাপাকানো কান্না চেপে বলল, “তিন পুরুষের ভিটা, বিঘা আটেক চাষের জমি বাকি ছিল — তা গাঙে এবার সবই গিলে নিল। এই একটু সরকারি ত্রিপল খাঁট্যা আমরা দশ-বারো ঘর মানুষ পড়ে আছি। পঞ্চায়েত বা হাইস্কুলের ত্রাণশিবিরেও ঠাঁই হয়নি আমাদের।“
“কোনটা তোর ব্যাটা, মনসুর?”
“দুটাই, সার। ইডা বড়। ইডারো পড়ালেখা হলো না। এখন জিদ ধরছে ‘সাউথ’ যাবে মিস্তিরির লেবার খাটতে। কিন্তু ওর আম্মা যেতি দেয় না। তার দিদির ব্যাটাও গেছিল গত বছর কুরবানীর পরে। বিল্ডিং এর কাজ করতি করতি খোলা তারে কারেন্ট খায়া পুড়ে ঝামা কয়লা হয়ে গেছে। এমন হালত, বডি চিনা যায় না। “

সুধীরবাবুর চোখে মুখে অস্বস্তি মেশানো উশখুশে ভাবে ফুটে উঠল। তির্যক চোখে মাধবকে দেখলেন। সে বাঁশ নিয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়াছে। মনসুর বোধহয় তা বুঝেই কথা ঘোরালো — “কিন্তু সার, ভর দুপুরে কাদা ঠেল্যা আর হাতে বাঁশ-পতাকা লিয়ে কুথায় ঘুরছেন?”
সুধীরবাবু ধসে পড়া গলায় বললেন, “সকাল থেকে হন্যে হয়ে ঘুরছি রে মনসুর। একটু পতাকা তুলে বাচ্চাদের লজেন্স দেব বলে। কিন্তু জায়গা পেলাম না। “
মনসুরের চোখ দুটো মুহূর্তে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে ঘামে ভেজা বৃদ্ধ শিক্ষকের হাত দুটি নিজের দুই শক্ত হাতে চেপে ধরে বলে উঠল — “গাঙে মোদের জমি কাড়তে পেরেছে সার, কিন্তু এই দেশটা তো আমাদেরও। আজ এখানেই পতাকা তুলুন সার। সেই আমাদের ইস্কুলের মতন…”
মনসুরের কথা শেষ হতে না হতেই মাধব কাদা-জল তোয়াক্কা না করে একাই বাঁশটা তুলে এগিয়ে গেল। মনসুরের দুই ছেলে, সাজ্জাদ আর ওমরও এগিয়ে এল। তাদের পেছনে চললো খড়ি ওঠা হাত-পা আর রুক্ষ চুলের কচিকাঁচার দল। মাধব আর সাজ্জাদ মিলে সেই কাদার মধ্যেই নিজেদের সমস্ত শক্তি দিয়ে বাঁশটা সোজা করে পুঁতে দিল।
একটি ছেড়া ফ্রক পরা বছর আটেকের মেয়ে দৌড়ে গিয়ে পাশের ঝোপঝাড় থেকে বুনো ফুল এনে পতাকার ভাঁজে বেঁধে দিল।
মধ্যাহ্নের তপ্ত সূর্যকে তুচ্ছ করে মানিকচকের সুধীরমাস্টার কাঁপা কাঁপা হাতে পতাকাতলার দড়িতে টান দিলেন। বাতাসে ফড়ফড় করে উড়ে উঠল তেরঙা। আর পতাকার ভাঁজ থেকে সেই বুনো ফুল ঝড়ে পড়ল নিচে দাঁড়িয়ে থাকা আহমেদ, খুশি, ফুলি, ইমরানদের ধুলোকাদামাখা ছোট্ট শরীরে। সুধীরবাবুর দুই গালে তখন অশ্রুর ধারা।
না ছিল মাইক, না কোনো সাউন্ড বক্স। কিন্তু ওই ছিন্নমূল পরিবারের রোদে পোড়া ছেলেমেয়েগুলো একযোগে খালি গলায় গাইতে শুরু করল জাতীয়সঙ্গীত।

সুধীরবাবু ঝোলা হাতড়ে লজেন্সের কৌটোটা বের করলেন। পরম মমতায় তিনি সকলের হাতে একটি একটি করে চকলেট গুঁজে দিতে লাগলেন।
টোটোর বোনেটে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মাধব নিজের পুরোনো গামছাটা দিয়ে ঘাম মুছছিল। গামছার কোণে চোখ ছুঁতেই মাধব থমকে দাঁড়াল — তার তপ্ত ঘামের সঙ্গে কখন যেন এসে মিশে গেছে চোখের জল, সে টেরই পায়নি।
সুধীরবাবু লজেন্সের কৌটোটা মাধবের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বিষণ্নতা মেশানো তৃপ্ত গলায় বললেন, “নে রে মাধব, তুইও একটা নে। তোর জন্যই আজ পতাকা ভাসতে পারল।”
মাধব ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে লজেন্সটা নিল। তারপর হাঁটু গেড়ে বসে প্রবীণ মাস্টারমশাইয়ের কাদা-লাগা দুটি পা স্পর্শ করে মাথায় ঠেকাল।

তখনি দূরে নদীর ওপারে ঘন কালো মেঘের মধ্যে বিদ্যুৎ চমকে উঠল। বিহ্বল সুধীরবাবু চকিতে পতাকার দিকে তাকালেন। গঙ্গার এলোমেলো হাওয়ায় পতাকা দুলছে। ক্ষণিকের ভ্রূকুটি, তারপর সেদিকে তাকিয়েই তাঁর ঠোঁটের কোণায় স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। মাধবের চোখে চোখ রেখে তিনি বললেন — “এতগুলো বছর আমি এই পতাকা বুকে আগলে রেখেছি। কিন্তু ভয় হত, আমার স্বপ্নের ডালি আমি কার জিম্মায় দিয়ে যাব। পরের বছর, যদি আমি না থাকি, কিরে মাধব…পারবি না?” বর্ষায় কানায় কানায় ভরা পুকুরে যেভাবে পূর্ণিমার চাঁদের ছায়া পড়ে, তেমনি মাধবের সজল চোখের তারায় তখন প্রতিবিম্বিত হচ্ছে স্বপ্নের তেরঙ্গা।