দৃষ্টিবিভ্রম – বিজয়া দেব

দৃষ্টিবিভ্রম – বিজয়া দেব

দৃষ্টিবিভ্রম     (ছোটোগল্প)

বিজয়া দেব

ঘুম থেকে উঠেই ফ্রিজ খোলার একটা বিচ্ছিরি অভ্যেস আছে দৃষ্টির। কিছু না নিজের পছন্দের খাবার কী কী মজুত আছে দেখে নেওয়া। যদি থাকে ঠিক আছে, না থাকে তো অফিস থেকে ফেরার পথে নিয়ে আসে সে। আসলে অভীককে বলেও কোনও লাভ হয় না। আজও খুলল সে, আজ শনিবার, তার অফিস নেই আজ।
এদিকে অভীক অফিসের কাজে গিয়েছে ব্রাসেলস। ও একটা য়ুরোপীয় কোম্পানিতে কাজ করে, সেলস ম্যানেজার। বছরে পাঁচ-ছ’বার ওর ট্যুর থাকে। এই ফ্ল্যাটে দৃষ্টি ও অভীক দু’জন থাকে। কাজের মাসি রাখে না ওরা। নিজেরাই যা হোক একটা কিছু করে খেয়ে নেয়।
আজ একবার বাড়ি যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। মা এখন তার অপেক্ষায় থাকে না সে জানে। মা এখন বড্ড বিভ্রান্ত। অতীত ও বর্তমানকে মেলাতে গিয়ে নাজেহাল। আজকাল রাগ করেও দৃষ্টিকে আর কিছু বলে না। মা আসলে মেয়েদের সুখদু:খ কষ্ট নিয়ে অনেক লড়াই করেছে। বাবা ওতে সাপোর্ট দিত, দিত কী এখনও দেয়। মা অবশ্য নিজেকে নারীবাদী বলে প্রচার করে না, তবে হৃদয় দিয়ে বোঝে। মানে সহানুভূতির ব্যাপারটুকু আছে।
বাড়িতে থাকলে নিজের স্বাধীনতা নষ্ট হত খুব। তাই দৃষ্টি এখানে চলে এসেছে। সে অভীকের সাথে লিভ ইন করছে। মা-র এতেই খুব আপত্তি ছিল। বাবারও। দৃষ্টিকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছে তাঁরা।
তারপর বাবা বলেছিল — বেশ তুমি বলছ তোমার জীবন তোমার। এখানে এসে নাক না গলাতে। বেশ তাই হোক।
তারপর বাবা বলেছিল মাকে — পিয়া, তুমি কি আমার সাথে একমত?
মা বলেছিল — বেশ। এরপর থেকে দিনে একবার খোঁজ নেব বাবা কিংবা আমি, রাতে ঘুমোবার আগে। অথবা তুমি করবে।
প্রথম প্রথম রাতে ঘুমোবার আগে একবার ফোন করতো তাঁরা। আজকাল সেটা সপ্তাহে এক কিংবা দু’বারে এসে ঠেকেছে।
না ওরা সত্যিই কিছু বলে না।

একদিন পাশের বাড়ির দিয়া আন্টি মা-কে ছাদে পেয়ে জিজ্ঞেস করেছিল — দৃষ্টি বাড়ি থাকে না? ওমা ও তো এখানেই চাকরি করছে। বাড়ি থাকে না তো, কোথায় থাকে?
মা উত্তরে কিছু বলেনি। সে তখন বাড়ি গিয়েছিল। ছাদের একপাশে ছিল। আন্টি তাকে দেখতে পায়নি। মা উত্তর না দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে কথা বলছিল।

ফোনটা বেজে উঠল। মা।
— দৃষ্টি, আমরা আজ শান্তিনিকেতন যাচ্ছি, একটা প্রোগ্রাম আছে।
— অহো। বাবা তো রয়েছে, তাই না?
— না, বাবাও যাচ্ছে আমার সাথে।
— কিন্তু আমি আজ বাড়ি আসছি। ক’টা দিন তোমাদের ওখান থেকেই অফিস করব। আজ শনিবার, আমি বুধবার অব্দি থাকবো। অভীক বুধবার রাতে ফিরবে। এসে আমাকে ফোন করবে, তারপর আমি যাবো। তোমাদের না গেলে হবে না?
— প্রোগ্রাম তো ক্যান্সেল হচ্ছে না।
— তাতে কী? তোমাদের শরীর খারাপ হলে কী করতে?
— যেতাম না! কিন্তু শরীর তো খারাপ হয়নি।
— এসব কী বলছ মা, আমার এখানে একা ভালো লাগছে না।
— চলে এসো। আমি চাবি রেখে যাবো পাশের বাড়িতে।
দৃষ্টি রাগ করে ফোনটা রেখে দিল।

শান্তিনিকেতনে সোনাঝুরির হাটেই এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে পিয়া ও সমুদ্র। দৃষ্টির মা ও বাবা। পিয়া আর সমুদ্র বসে বাউলগান শুনছে। এখানে মিঠি নামে একটি মেয়ে কাঁথাস্টিচ করে, পিয়া ও সমুদ্র এবার ওর বাড়িতেই থাকবে। নাহলে ওরা হোটেলেই থাকে। মিঠির বাড়ি গ্রামে। অনেকটা ছড়ানো প্রকৃতি মিঠির গ্রামেও নাগরিকতা ও পণ্যায়ন কেড়ে নিচ্ছে। তবে মিঠির ঘরটি মাটির। খুব গোছানো। দেয়ালে বড় করে রবীন্দ্রনাথের ছবি টাঙানো। এই পরিবেশে কী করে মিঠিকে তার বর মদ গিলে এসে রোজ মারছে, টাকাপয়সাও কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে, কে জানে। মূলত এই কারণেই শান্তিনিকেতনে আসা।

শান্তিনিকেতনও আর আগের মতো নেই। সোনাঝুরির অপূর্ব প্রকৃতিকে কেড়ে নিয়েছে এই হাট।
— মেয়েটা এলো কিনা খোঁজ নেবে না? সমুদ্র গান শুনতে শুনতে বলে।
— নিয়েছি, আসেনি।
— হুম। না এলেই পারতে তো। একা ওর ভালো লাগছে না।
— ওর আমাদের সাথে এখন থাকতেই বা ভালো লাগবে কেন?
— তাহলে আমাদের মন খারাপ করছে কেন?
— বাবা মা হয়েছি তাই।
— হুম।

সত্যিই, কেমন একটা কষ্টকর চাপা ব্যথা। পিয়া ভাবে, তবে সে এলো কেন? আত্মভিমান? একমাত্র সন্তানের কাছে? এখানে আসার আগে সমুদ্র ও সে দুজনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, না, কোনও আপোষ নয়। কিন্তু ভেতরটা কেমন যেন অস্থির, মানসিক স্থিতিটা নেই, সমুদ্রেরও তাই হচ্ছে।
পিয়া আজকাল পেছনে তাকাতে চায় না। ভাবেও না। কারণ পরিস্থিতি এখন কারো হাতে নেই। ধর্ষণ নামক সামাজিক ব্যাধি দ্রুতহারে বাড়ছে। সেই পরিস্থিতিতে সে আজ একা থাকা একমাত্র মেয়ের সহযোগিতা করল না। করল না তার কারণ আছে। বেশিদিনের কথা নয়, সমুদ্রের মাসতুতো দাদার মেয়ে এলা এভাবেই একা একা ঘুরে বেড়াতো তার চাকরির সূত্রেই। দিল্লিতে সহকর্মীর সাথে লিভ ইন করতে শুরু করলো। তারপর হঠাৎ শোনা গেল এলা খুন হয়েছে। পিয়া এরপর থেকে দৃষ্টিকে অনেক বুঝিয়েছে। বাড়ি ছেড়ে কেন সে লিভ ইন করতে চাইছে অভীকের সাথে? অভীকের বাড়িও এই কলকাতায়। বাড়িতে বাবা মা বোন আছে। পিয়া বলেছিল — এক কাজ করি। অভীকের সাথে তোর বিয়ে দিয়ে দিই।
শুনে দৃষ্টি রাগ করে বলতো — সেই এক গাঁইয়া বুদ্ধি। বিয়ে দিয়ে দিই! তুমি তো মেয়েদের স্বাধীনতা নিয়ে কীসব লেখালেখি করেছ। পড়িও না ওসব। ছাইভস্ম সব।

আজকাল শুধু যে মেয়ে খুন হচ্ছে আর ধর্ষিতা হচ্ছে তাও নয়, কিছুদিন আগেই একটি ছেলেও খুন হয়েছে, সাথে একটি মেয়ে আর একটি ছেলে ছিল। এদেরও এই শহরে বাড়িঘর আছে। কিন্তু তিনজনে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকতো। এটা দ্রুত সম্পর্ক গড়াভাঙার সময়, শুধু সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া হলে ক্ষতি ছিল না। কিন্তু খুন! মেয়ে হলে ধর্ষণ ও খুন, ছেলে হলে খুন।

বাউলদের দল এখন সেই অতিপ্রচলিত গানটি গাইছে – “তোমায় হৃদ – মাঝারে রাখব ছেড়ে দেব ন”
এই গানগুলো এখন আপাদমস্তক পোশাকি। এই সমুদ্র আর পিয়া বাউলের বেশ ধারণ করে যদি গান গাইতে লেগে যায়, কে আর চিনবে যে ওরা মোটেই বাউল নয়!

দৃষ্টি অভীককে ফোন করল। অভীক ফোন ধরল না। রাগ করে দৃষ্টি বেরিয়ে পড়ার কথা ভাবল। ঘড়িতে রাত আটটা। একটু সময় ভাবলো দৃষ্টি। তারপর আয়নায় দাঁড়ালো। পরনে একটি সাধারণ টি-শার্ট ও ট্রাউজার্স। দু’হাতে মুখটা একটানে সাফ করে একটা স্নিকার্স পায়ে গলিয়ে ও ওয়ালেট নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
অদূরেই একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকে একপাশে একটা সিঙ্গেল চেয়ার টেবিলে বসে পড়ল। মোবাইল ফোন বের করে কতগুলো মেসেজ করল অভীককে। উঁহু সেগুলো পৌঁছোলো না। সামনে ওয়েটার দাঁড়িয়ে। কিছু একটা তো অর্ডার করতে হবে, কিছু খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। দুপুরে অর্ডার করে একটা পিৎজা আনিয়েছিল, বিকেলে এককাপ কফি বানিয়ে খেয়েছে। একমুহূর্তে চোখের সামনে ভেসে উঠল মা-র মুখখানা। রাত হলে প্রায়ই ডালভাত ডিমআলু সেদ্ধ। একসময় এনিয়ে কত রাগারাগি করে না খেয়ে বাইরে থেকে মাটন বিরিয়ানি এনে খেয়েছে। অভীককে ফোন করে বলতো — এই অভীক, চলে আয়। মাটন বিরিয়ানি আনিয়েছি। একা খেতে ভালো লাগছে না। মা সেই আলুডিম সেদ্ধ আর ডাল সামনে ধরে বলছে, খাও খাও। চলে আয় প্লিজ, বিরক্ত লাগছে।
মা চাকরি করে, তাই বাবা কিছু বলে না, তাহলে বাবা নিজে করুক, না, তা-ও করে না।
অভীক বলতো — তাহলে তুই করে নিতে পারতিস।
— তুই করিস বাড়িতে?
— আরে রান্নার লোক আছে, সে করে নেয়।
— তাই এতো উপদেশ, পাজি ছেলে!
কিছুক্ষণ পর মা এসে দেখতো সে অভীকের সাথে বিছানার ওপর বসে মাটন বিরিয়ানি খাচ্ছে। মা কথা না বলে চলে যেতো।
ওয়েটার ছেলেটি চলে গেছে। কিছু একটা তো খেতে হয়। কিন্তু আজ সেই আলুডিম সেদ্ধ গরম ভাত আর এক বাটি মুগের ডাল বড্ড টানছে।
আজকাল মাঝে মাঝেই অভীকের সাথে ঝগড়া বেঁধে যায়। অফিস থেকে এসে অভীক মাঝেসাঝে রান্না করে। দৃষ্টির রান্নাটা আসে না। দু’চারদিন করেছে, কিন্তু সেটাতে ভারী ঝক্কি। অভীক কিছু বলে না। মুখ নীচু করে খেয়ে নেয়। তারপর কেমন একটা আলগা আলগা ব্যবহার করে। একদিন তো তাকে না বলেই বেরিয়ে গেল। জানালায় দাঁড়িয়ে সে দেখল অভীক ক্যাব বুক করছে। ফিরল বেশ রাত করে। সে রাতে তুমুল ঝগড়াঝাঁটি হয়েছিল।

কিছু না খেয়েই হঠাৎ উঠে এলো দৃষ্টি। বেশ রাত হয়েছে। রাতের মহানগরী নাকি মেয়েদের জন্যে ভয়ঙ্কর। রাস্তায় লোকজন বেশ কম। এই অঞ্চলটা একটু ফাঁকা। সে এখন আনমনে হাঁটছে। অভীক এখন কেন যেন তার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মা-বাবাও তো কম যায় না। তার জন্যে আজকাল তাঁরা আর অপেক্ষায় নেই। এই বিশাল পৃথিবীতে তাঁর জন্যে যদি কেউ অপেক্ষায় থাকে না তাহলে সে আছে কীসের জন্যে এক নিদারুণ শূন্যতা নিয়ে নাকি শূন্যতাই বাস্তব! বাকি সব ভুয়ো আর ধোঁয়াশা!

হুঁস করে একটি গাড়ি এসে থামলো ফুটপাথের পাশ ঘেঁষে। সে তাকিয়েও তাকাল না, একই গতিতে হাঁটতে লাগলো। গাড়িটা শ্লথগতিতে তার সাথে সাথেই চলছে। গা করলো না সে।
— হ্যালো! শুনছেন?
— বলুন শুনছি। বলে সে হাঁটতেই থাকে।
— শুনতে হলে যে দাঁড়াতে হয়।
কথা না বলে লম্বা লম্বা পায়ে দৃষ্টি হাঁটতেই থাকে। হাঁটতে হাঁটতে টের পায় কেউ একজন পেছন পেছন আসছে, গাড়ির আওয়াজ আর শোনা যাচ্ছে না।
— এই যে শুনুন, একটু তো দাঁড়ান।
দৃষ্টি বুঝতে পারছে লোকটি তাকে ধরেই ফেলবে। তার এই একক জীবনের মূল্য আর কতটুকু! একমাত্র ভরসার আশ্রয় মা=বাবার কাছেও সে হারিয়ে ফেলেছে তার মূল্য। না, নিজেকে সে কোনও কিছুর জন্যে দায়ী করবে না। খাওয়াদাওয়ার রুচি মানুষের নিজস্ব। সে কোথায় থাকবে না থাকবে সেটাও তার নিজস্ব পছন্দের ব্যাপার। না, ডিপ্রেশনে সে ভুগবে না। আত্মহত্যা করা যাবে না, তাহলে এটাই প্রমাণিত হবে যে সে ডিপ্রেশনে ভুগছিল। তাহলে?

— কোথায় চলেছেন? আরে এতো জোরে ছুটছেন যে!
লোকটি এবার তার মুখের সামনে এসে পথ আড়াল করে দাঁড়াল।
— পথ ছাড়ুন।
দৃষ্টি নিজের কণ্ঠে নিজেই যেন চমকে উঠল। সে একবারও দেখছে না লোকটা কেমন দেখতে, সে বুঝেই নিয়েছে লোকটা তার কাছে কি চাইতে এসেছে। এই দেশে এখনও মেয়েরা যৌনপুতুল। সে যে মানুষ সেটা বুঝি কেউ-ই জানে না। আবার এক শ্রেণীর মানুষের শিক্ষাদীক্ষায় আচার আচরণে ভদ্রতা আর সভ্যতা একেবারে উপছে পড়ছে!
— আপনি কি একা থাকেন? আমিও একা থাকি।
— আপনার সাহস দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। এখন কী করবেন? ধর্ষণ?
লোকটি রহস্যময় হাসল। তারপর বলল — রাতের শহর ম্যাডাম। হতেই পারে যা খুশি তাই।
— তারপর কি মেরে ফেলবেন?
— আপনি মরতে রাজি?
— আমার রাজি-অরাজিতে কী আছে? এই যে আপনি সেই থেকে আমার পিছু নিয়েছেন সেটা তো আমার রাজি-অরাজিতে হয়নি!
— রাত ক’টা বাজে ম্যাডাম? ঘড়ি দেখেছেন?
— তাতে আপনার কী? আমি সারারাতই আজ রাস্তায় কাটাব, তাতে আপনার অসুবিধে আছে? কীসের অসুবিধে?
— আমি ভাবছি আপনার সাথে বসে খানিকটা কথা বলি।
— আমার মোটেই কথা বলতে ইচ্ছে নেই। আপনি পথ ছাড়ুন, নাহয় আমি পুলিশ ডাকব।

রাস্তাঘাট বেশ ফাঁকা হয়ে গেছে। কিছু লোক চলাচল আছে। দৃষ্টি ইচ্ছে করলেই চেঁচিয়ে কিছু লোক তো জড়ো করতেই পারে। অদূরে রাস্তার মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের চলাচল দেখা যাচ্ছে। কিন্তু অদ্ভুত কৌতূহল হলো তার, রাতের পৃথিবী মেয়েদের জন্যে নিরাপদ নয় কেন এ নিয়ে কৌতূহল, যেন সে এর শেষ দেখতেই চায়। যদি এই রাতটা তার জন্যে শেষ রাত হয়ে থাকে, নাহয় হলোই। পৃথিবীতে সবাই অতিথি। তার বেশ কিছুদিন এই রহস্যঘন পৃথিবীতে ঘোরাফেরা তো হলো। কিন্তু পালিয়ে সে কিছুতেই এই রাস্তা ছেড়ে যাবে না। বাড়ি ফিরবে সে স্বাভাবিক ছন্দে। আর এই লোকটা যদি তাকে আজ মেরে ফেলে ধর্ষণ করে, তাহলে সে নিজের নাম হারিয়ে ফেলবে, হয়ে যাবে অভয়া বা নির্ভয়া। সে তো তা-ও মোটেই চায় না। কিন্তু একটি রাতও কি এই আকাশ বাতাস মেয়েদের জন্যে খোলামেলা হয়ে উঠতে পারলো না? কিন্তু কেন? কেন? কেন? দৃষ্টি তার সামনে লোকটার দেয়াল টপকে যাবার জন্যে একটুখানি ফাঁক খোঁজে।
— আপনি তো আজ খাননি কিছুই। চলুন ওই রেস্তোরাঁয় বসি খানিক, যেখানে গেছিলেন।
— আপনি টিকটিকিগিরি ছেড়ে আমার পথ ছাড়ুন। সরে দাঁড়ান। নিজের চরকায় তেল দিন।
— আচ্ছা আমরা কি বন্ধু হতে পারি না?
— না পারি না।
— কথা দিলাম, আপনাকে ধর্ষণ কিংবা খুন কোনওটাই করব না। একটুখানি গল্প করব, একটুখানি খাওয়াদাওয়া করব, তাতে কী যায় আসে!
— আগে আমাকে একটা কথার উত্তর দিন তো, যদি কোনও যুবক রেস্তোরাঁয় বসে কিছু না খেয়ে উঠে যায়, একা একা পথ হাঁটতে হাঁটতে নিজের খেয়ালে একটা রাত বাইরে কাটাতে চায়, তার পিছু নেবেন এইভাবে? বন্ধু করতে চাইবেন আগ বাড়িয়ে? রেস্তোরাঁয় বসে এভাবেই লক্ষ করবেন সে খেলো কি খেলো না!
— না। সে হয়তো করবো না। কারণ সে আমারই মতোই এক পুরুষ। দেখুন ম্যাডাম, যে ব্যাপারটা ঘটছে মেয়েদের সঙ্গে আকছার, যার জন্যে আপনার মুখে স্বতঃস্ফূর্ত প্রথম প্রশ্নটাই ছিল আপনাকে ধর্ষণ করে খুন করব কিনা, তাই না? নাহলে আপনি আমাকে প্রথমেই এই প্রশ্নটা কেন করলেন? এই ব্যাপারটা প্রাকৃতিক কি সামাজিক তা নিয়ে কিছু বলতে চাইছি না। আমরা প্রাকৃতিক নাকি সামাজিক প্রাণী নাকি রাষ্ট্রযন্ত্রের পুতুল তা নিয়েও কোনও মন্তব্যে যাচ্ছি না আপাতত। আপনি আমার প্রস্তাবে রাজি?
আজ কি শেষ দেখাটা দেখে নেবে দৃষ্টি? হ্যাঁ সেই ভালো। বলল — বেশ চলুন।

রেস্তোরাঁয় বসে লোকটাকে দেখে একটু অবাক হলো দৃষ্টি। লোকটার বয়েস অনেকটাই। অন্তত ষাটের উপর তো হবেই। তবে দেহ সুঠাম রয়েছে এখনও। চোখের আশপাশে বয়েস তার অল্প থাবা বসিয়েছে। যার জন্যে একে প্রথম বার্ধক্যের পর্যায়ে ঠেলে দেওয়া চলে। মানে ষাট থেকে পঁয়ষট্টি।
— আমাকে দেখে কি মনে হয় আপনাকে ধর্ষণ ও খুন করতে পারি?
— না তা হয়তো মনে হয় না, কিন্তু করতেও পারেন।
— খুন?
— নিজে হয়তো করবেন না, তবে সুপারি লাগিয়ে করতে পারেন।
— হুম। আপনি সাহসী, নিজেকে বাঁচাবার শক্তি আছে কি? বলছি দৈহিক শক্তির কথা, অথবা একখানা রিভলবার সাথে নিয়ে চলার কথা!
— উঁহু। কিছুই নেই।
— হুম। সেই তো। তাহলে আপনি কি জোর করে ধর্ষিতা কিম্বা খুন হতে চাইছেন?
— তা কেন হবে? একটু স্বাধীনভাবে একা একটি রাত রাস্তায় হেঁটে হেঁটে পর্যবেক্ষণ করতে চাইছিলাম আর বুঝতে চাইছিলাম “স্বাধীন’’ শব্দটির অর্থ।
— পেলেন?
— নাহ!
— আমি পেতে দিলাম না?
— এডজ্যাক্টলি।
— একা থাকেন?
— ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই।
— বেশ বেশ। কিন্তু আমরা বন্ধু হতে চেয়েছিলাম।
— আমি চাইনি, চেয়েছেন আপনি।
— বেশ, তাহলে একতরফা বন্ধুত্ব হোক। আমি এই বয়সেই বর্তমান সময়ে মেয়েদের সামাজিক অবস্থান এইরকম একটা বিষয় নিয়ে গবেষণা করছি।
— বাহ দারুণ তো। কেন এই বয়সে এইরকম একটি বিষয় নিয়েছেন?
— আপনি আমার কথা শুনতে আগ্রহী তো?
— বলুন।
— আপনার বয়েসি আমার একটি মেয়ে রাতের আঁধারে হারিয়ে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও তার কোনও হদিস মেলেনি। আমার স্ত্রী এরপর থেকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে। বর্তমানে সে মানসিক হাসপাতালে। বাড়িতে মেয়ের স্মৃতি চারপাশে ছড়ানো। কিছুতেই তাঁকে সামলানো যায় না। আমি সত্যিই গবেষণা করছি। কারণ আমি এক আইনজীবী। অনেক ধরনের কেস ঘাঁটতে হয়। এরমধ্যেই গবেষণার কাজ চালাচ্ছি। আমি নাইট ক্লাবেও যাই, যেখানে তরুণ তরুণীরা সারারাত ফুর্তি করে যায়। আমি এককোণে বসে দেখি।
দৃষ্টি মাথা নীচু করে বসে আছে। কী বলবে সে! কতটাই না অপমানিত করেছে সে লোকটাকে!
— আজকাল বুঝেছেন রাত হলে শুধু মায়ের স্বপ্ন দেখি, কতটা বছর হয়ে গেল মা চলে গেছেন পৃথিবী ছেড়ে, কিন্তু রাত হলেই মা আসেন। বলেন রাতের পৃথিবীটা খুঁজে বেড়িয়ে আসিস। হয়তো কখনও প্রাপ্তিকে পেয়ে যাবি। আমার একমাত্র মেয়ের নাম রেখেছিলাম প্রাপ্তি। তাই আর কি। আপনি কি বাড়ি ফিরবেন?
–দু:খিত। আপনাকে অনেক খারাপ কথা বলেছি। ক্ষমা করবেন। তবে আমি একাই বাড়ি ফিরতে চাই।
— বেশ। তাহলে এখন ওঠা যাক।

দৃষ্টি হাঁটছে। কিন্তু অনুভব করছে পেছন পেছন একটি গাড়ির হেডলাইট তাকে পথ দেখিয়ে চলেছে। বিরক্ত বোধ করলেও ভেতর থেকে একটা নিশ্চিন্তবোধ তাঁকে বেশ আরাম দিচ্ছিল।