স্বপ্ন – প্রসেনজিৎ রায়

স্বপ্ন – প্রসেনজিৎ রায়

স্বপ্ন   (ছোটোগল্প)

প্রসেনজিৎ রায়

রাত তখন আনুমানিক একটা। অল্পক্ষণ আগেই বৃষ্টি থেমেছে। ভেজা রাস্তায় স্ট্রিটলাইটের হলুদ আলো ছড়িয়ে আছে। চারপাশে গভীর নীরবতা। শুধু দূরে কোথাও জল পড়ার শব্দ। রাস্তার পথকুকুরের দল নিজেদের অদৃশ্য দায়িত্বে ব্যস্ত। মাঝে মাঝে একজন ঘেউ ঘেউ করে উঠছে, বাকিরা আবার থেমে যাচ্ছে, তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে।

রাজপথের পাশের সরু গলির একটি বাড়ির জানালায় তখনও আলো জ্বলছে। সবুজ বসে আছে টেবিলের সামনে। তার সামনে অফিসের কিছু হিসাবের কাগজ, ল্যাপটপ আর একটি খাতা। অথচ সবুজের চোখ সেদিকে নেই। তার দৃষ্টি আটকে আছে অনেক বছরের পুরোনো খাতাটির উপর। ফিকে হয়ে গেছে মলাটের রং। কোণগুলো ছিঁড়ে গেছে। পাতাগুলো হলদেটে। তবু খাতাটিকে দেখলেই সবুজের মনে হয়, এই ছোট্ট জিনিসটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে তার হারিয়ে যাওয়া একটা জীবন।

ছোটবেলায় সবুজের স্বপ্ন খুব বড় ছিল না। সে শুধু ভালো একটা চাকরি করতে চেয়েছিল। আর নিজের নামে বের করতে চেয়েছিল একটা বই। গল্প লিখতে সে ভালোবাসতো খুব। স্কুলের মাঠে বসে, নদীর ধারে পাথরের ওপর পা ছড়িয়ে, ট্রেনের জানালায় মাথা ঠেকিয়ে কিংবা গভীর রাতে ঘরের হালকা আলোয় জানালার বাইরে তাকিয়ে সে গল্প লিখতো। এতে থাকতো নদী, বৃষ্টি, অচেনা মানুষ, হারিয়ে যাওয়া শহর আর এমন সব স্বপ্ন, যেগুলোর কোনো ঠিকানা ছিল না বাস্তব পৃথিবীতে।

একদিন স্কুলের বাংলা শিক্ষক তার খাতা পড়ে বলেছিলেন, ‘তুই লিখে যা। একদিন তোর বই বেরোবে।’ সেদিন কথাটা শুনে সবুজ হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরেছিল।

বাবা তখন অসুস্থ। সংসারে টানাটানি। তবু রাতে খাতাটা বুকে নিয়ে শুয়ে সে মনে মনে বলেছিল – একদিন আমি অনেক বড় লেখক হবো। উচ্চমাধ্যমিকের পর বাবার অসুস্থতা বেড়ে গেল। কলেজে ভর্তি হলেও নিয়মিত পড়াশোনা করা সম্ভব হলো না। সংসারে ওষুধের খরচ, ছোট বোনের পড়াশোনা, বাজার, সব মিলিয়ে প্রতিটি টাকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল তার কাছে।

একদিন বাবা বিছানায় শুয়ে বলেছিলেন, ‘তুই পড়াশোনাটা শেষ করিস বাবা। আমার জন্য থামিস না।’ সবুজ কিছু বলেনি, শুধু বাবার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়েছিল। কয়েক মাস পর বাবাই চলে গেলেন।
তারপর আর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি রইল না।

শহরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হিসাব রক্ষকের চাকরি পেল সবুজ। বেতন খুব বেশি নয়, তবে সংসার চলে যেত। প্রথম দিন অফিসে যাওয়ার সময় তার হাতে ছিল সেই পুরোনো গল্পের খাতা। দুপুরের বিরতিতে সে খাতাটা বের করেছিল। একটি গল্প শুরু করার ইচ্ছে হয়েছিল। প্রথম পাতায় লিখেছিল — ‘নদীর ওপারে বাড়ি’।
তারপর কিছুক্ষণ কলম হাতে বসে থেকে খাতাটা বন্ধ করে রেখেছিল। সে জানত না, ওই শিরোনামের পর আর কোনোদিন একটি গল্পও লেখা হবে না।

চাকরি যত স্থায়ী হল, সময় তত কমতে লাগল। সকাল আটটায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাত আটটা-নয়টায় ঘরে ফিরত সে। মাসের শেষে হিসাব মেলাতে রাত আরও বাড়ত। কখনো কখনো রবিবারও অফিস করতে হত। ধীরে ধীরে গল্পের খাতা চলে গেল টেবিলের ড্রয়ারে। তারপর একদিন সেই ড্রয়ারও হয়ে গেল বন্ধ।

বিয়ের পর আরও বেড়ে গেল দায়িত্ব। তার স্ত্রী মন্দ মানুষ না। সংসারটাকে ভালো রাখার জন্যই সে সবসময় হিসাব করে চলতো। এক রাতে খাওয়ার সময় স্ত্রী বলেছিল, ‘এই মাসে মায়ের ওষুধের খরচটা একটু বেশি হয়েছে, বাড়ি ভাড়াটাও দিতে হবে।’ সবুজ চুপচাপ ভাত নাড়ছিল।
-– শুনছো ?
–- হ্যাঁ।
–- তোমার বেতনটা যদি আর একটু বাড়তো!
সবুজ একটু হেসে বলেছিল, ‘চেষ্টা করছি।’
স্ত্রী আর কিছু বলেনি।
কিছুক্ষণ পর খুব আস্তে বলেছিলো, ‘তুমি আগে তো খুব লিখতে। এখন আর লেখো না কেন?
সবুজ হাত থামিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘সময় কোথায়?’
–- সময় কি কখনও নিজে থেকে পাওয়া যায়?
সবুজ কোনো উত্তর দেয়নি।

সেদিন রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে অনেকক্ষণ জেগে ছিল সে। মনে হচ্ছিল, সে কি শুধু সারাজীবন ধরে টাকা কামানোর চেষ্টাই করতে থাকবে? তার নিজের জন্য কি কিছুই থাকবে না?

তারপর দিনগুলো আরও দ্রুত চলে গেল।

অফিসের খাতা, বিল, ভাউচার, ব্যাংক স্টেটমেন্ট আর কম্পিউটারের পর্দার সংখ্যাগুলো যেন ধীরে ধীরে তার জীবনের সমস্ত রং মুছে দিল।
শরীরও একসময় প্রতিবাদ করতে শুরু করল।
পেটের সমস্যা, অনিদ্রা। রাতে বিছানায় শুয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকত সে। ঘুম এলেও ভোরের আগে বারবার ভেঙে যেত। ডাক্তার বলেছিলেন, ‘আপনাকে একটু বিশ্রাম নিতে হবে। মানসিক চাপ কমাতে হবে। সবুজ মৃদু হেসে বলেছিল, ‘চেষ্টা করবো ডাক্তারবাবু।’
ডাক্তার তার দিকে তাকিয়ে আবার‌ও বলেছিলেন, ‘চেষ্টা নয়, খুব দরকার। বাড়ি ফেরার পথে কথাটা বারবার কানে বাজছিল সবুজের। বিশ্রাম তো তার জীবনে বিলাসিতা।

একদিন অফিসে সামান্য একটা হিসাবের ভুল হয়েছিল। মালিক সবার সামনে তাকে খুব বকাঝকা করলেন–- এতদিন কাজ করার পরও এই ভুল? মাথায় কী থাকে আপনার?
সবুজ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল।
নিজের টেবিলে ফিরে এসে সে জানালার বাইরে তাকাল। কাঁচের ওপারে ব্যস্ত শহর। মানুষ ছুটছে। গাড়ি ছুটছে। সবাই যেন কোথাও না কোথাও যাচ্ছে।
শুধু সে কোথা‌ও যেতে পারছে না। সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে মা জিজ্ঞেস করেছিলেন, ’কী হয়েছে বাবা? মুখটা এমন লাগছে কেন?’
সে জুতো খুলতে খুলতে বলেছিল, ‘কিছু হয়নি মা।
স্ত্রীও জিজ্ঞেস করেছিল, ‘শরীর খারাপ?’
–- না।
–- তাহলে এত চুপচাপ কেন?
সবুজ না তাকিয়েই বলেছিল, ’ক্লান্তি লাগছে।
এই ‘ক্লান্তি’ শব্দটার আড়ালে যে কতটা ভাঙন লুকিয়ে ছিল, বুঝতে পারেনি কেউ।

সেই রাতেই অনেকদিন পর সবুজ টেবিলের ড্রয়ার খুলল। বের করল পুরোনো খাতাটা। পাতা উল্টাতে উল্টাতে তার চোখে পড়ল নিজের কিশোর বয়সের হাতের লেখা। এক পাতায় লেখা রয়েছে, ‘মানুষের সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা হল নিজের স্বপ্ন দেখার অধিকার।’ আরেক পাতায়, ‘একদিন আমি আমার গল্প হবো।’ শেষ বাক্যটির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল সে।
তারপর খুব আস্তে নিজের উদ্দেশ্যেই বলল, ‘হতে পারলাম কই!’ খাতাটা বন্ধ করে সে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে তখন আবার বৃষ্টি পড়ছে। মায়ের ঘর থেকে ভেসে আসছে কাশির শব্দ। পাশের ঘরে স্ত্রী ঘুমিয়ে।
জানালার কাঁচে নিজের মুখ দেখল সবুজ।
নিজেকে নিজের কাছেই বড় অচেনা লাগছিল। হঠাৎ তার মনে হল, নদীর ধারে বসে যে ছেলেটা গল্প লিখত, সে কি সত্যিই কোনোদিন ছিল? নাকি সেও ছিল একটা স্বপ্ন?

পরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার সময় সিঁড়িতে হঠাৎ বসে পড়ল সবুজ। শরীরটা কেমন যেন অবশ হয়ে এসেছিল। স্ত্রী ছুটে এসে বলল, ‘সবুজ!’
সে কোনো উত্তর দিতে পারল না। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো তাকে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডাক্তার বললেন, দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, ঘুমের অভাব আর অতিরিক্ত মানসিক চাপ তাকে অনেকটাই দুর্বল করে দিয়েছে।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সবুজ প্রথমবার বুঝল, শরীরের অসুখের চেয়েও বড় একটা অসুখ হয়তো তার মনের ভেতরে বাসা বেঁধেছে।

এক সন্ধ্যায় স্ত্রী তার পাশে এসে বসে বলল, ‘তুমি আমাকে কখনও কিছু বলো না কেন?’
সবুজ চুপ করে রইল।
–- তোমার কী কষ্ট হয়, আমি জানি না। তুমি কী চাও, সেটাও জানি না।
সে ধীরে ধীরে স্ত্রীর দিকে তাকাল। আর, অনেকক্ষণ পর বলল, ’আমি একটা বই লিখতে চেয়েছিলাম। স্ত্রী অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বই?’
সবুজ মৃদু হেসে বলল, ’হ্যাঁ, ছোটবেলা থেকে।’
–- তাহলে লেখোনি কেন?
সবুজ জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সময় হয়ে ওঠেনি।’
স্ত্রী তার হাতটা শক্ত করে ধরল।
–- সময় আবার হবে। দেখো।
সবুজ কোন উত্তর না দিয়ে চোখ বন্ধ করল।

কয়েকদিন পর মা হাসপাতালে এলেন।
ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন, ’তুই ছোটবেলায় কত গল্প লিখতিস মনে আছে? বলতিস, তোর বই বেরোবে।’
সবুজ চোখ খুলে বলল, ’মনে আছে মা।’
–- তাহলে বাড়ি চল। আবার লিখবি।
সবুজ মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, হ্যাঁ মা, বাড়ি যাবো।
মা হাসলেন। সবুজের চোখে তখন অন্যরকম একটা প্রশান্তি।

সেদিন রাতে বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ছিল একটার পর একটা।
হাসপাতালের করিডোরে মৃদু আলো। চারপাশে ওষুধের গন্ধ। বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে সবুজের মনে পড়ল — বহু বছর আগের সেই নদীর পাড়, কিশোর সবুজ, হাতে সাদা খাতা, দূরে ভেসে যাচ্ছে একটা নৌকা। আর খাতার পাতায় জন্ম নিচ্ছে এক একটা গল্প।
হঠাৎ সে মাকে ডাকল, ’মা…’
–- কী বাবা?
–- আমার খাতাটা কি বাড়িতে আছে?
মা একটু অবাক হয়ে বললেন, ‘আছে তো। কেন?’

সবুজ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘এমনিই।’ মা আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।
সবুজ চোখ বন্ধ করল। তার ঠোঁটে ফুটে উঠল মৃদু একটা হাসি। পাশে বসে স্ত্রী তার হাত ধরে ছিল।
কিছুক্ষণ পর সবুজ হঠাৎ খুব আস্তে বলল, ‘একদিন যদি সময় পাও… খাতাটা খুলে দেখো।
স্ত্রী তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী দেখব?’
সবুজ উত্তর না দিয়ে ধীরে ধীরে চোখ বুজে নিল।

ভোর হতে না হতেই হাসপাতালের জানালায় আলো ফুটতে শুরু করেছিল। সবুজের চোখ তখন বন্ধ। আর ধীরে ধীরে আলগা হয়ে গেল হাতের মুঠো। আর হৃদয় বিদারক কান্না যেন বিদীর্ণ করে দিচ্ছিল বিশাল আকাশের বুক।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দিন পুরোনো খাতাটা বের করল সবুজের স্ত্রী। প্রথম পাতায় কিশোর সবুজের স্বপ্ন। মাঝের পাতাগুলোয় কয়েকটি অসমাপ্ত গল্প। এক জায়গায় লেখা – ‘নদীর ওপারে বাড়ি।’ তারপর আর কিছু নেই।
শেষ পাতাটা খুলল, সেটা সাদা পাতা।
অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। মনে পড়ল, সবুজ বলেছিল, সময় হয়ে ওঠেনি।
আজ অনুভব করল — সময় হয়তো হয়েছিল, শুধু সবুজ নিজের জন্য সময়টুকু রাখতে পারেনি। স্ত্রী ধীরে ধীরে খাতাটা বন্ধ করল।

বাইরে তখন সংসার আবার তার নিয়মে চলতে শুরু করেছে। সে ভাবতে লাগলো, জীবন তো নিয়ম মেনেই এগিয়ে চলবে, অথচ একটি স্বপ্ন, কখন যে নিঃশব্দে পথ হারিয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই।
শেষ পাতাটা তাই সাদা‌-ই রয়ে গেল।