ঘড়ি – সদানন্দ সিংহ

ঘড়ি – সদানন্দ সিংহ

ঘড়ি      (অনুগল্প)

সদানন্দ সিংহ

রবিবারে দশ বছর পর সীতেশের সঙ্গে রতনের এক পার্কে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল। সীতেশ তার পাঁচ বছরের ছেলেকে নিয়ে এক পার্কে ঢুকছিল, তখনই সে রতনকে দেখে পার্কের এক কাঠের বেঞ্চিতে বসে রয়েছে। রতনের পাশেই একটা বছর চারেকের ফুটফুটে মেয়ে বল নিয়ে খেলছে।
রতন তার বন্ধু বা বন্ধুস্থানীয় নয়। দশ বছর আগে দুজনেই ছিল বেকার, দুজনেই চাকরির জন্যে চেষ্টা চালাচ্ছিল। ফলে প্রায়ই দুজনের দেখা হয়ে যেত বিভিন্ন জায়গায় — পাব্লিক লাইব্রেরিতে, ইনফরমেশান সেন্টারে, এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে, বাণিজ্য মেলায়, টেক মেলায়, রবীন্দ্র ভবনে — ইত্যাদি এইসব অনেক জায়গায়। তাদের মধ্যে কোনো কথা হত না।
সেই সময় সীতেশ লক্ষ করেছিল, রতনের হাতঘড়িতে সবসময় পনের মিনিট স্লো চলছে। যতবার তার সাথে রতনের দেখা হয়েছে ততবারই এই ব্যাপারটা সে লক্ষ করেছে। তার হাতটা কেবল নিশপিশ করত ঘড়ির কাঁটা দুটোকে ঘুরিয়ে ঠিক করে দেবার জন্য।
বলা বাহুল্য, একদিন পাব্লিক লাইব্রেরিতে রতনের সঙ্গে দেখা হতেই সীতেশ সুযোগ দেখে হঠাৎ রতনের ঘড়ি পরা হাতটাকে চেপে ধরে ঘড়ির কাঁটা দুটোকে ঘুরিয়ে পনের মিনিট ফাস্ট করে দেয়।
হঠাৎ এ ঘটনায় রতন একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলছিল, কী-কী-কী হ-হ-চ্ছে ?
সীতেশ বলেছিল, পনের মিনিট স্লো চলছিল, ঠিক করে দিলাম।
তারপরই শুরু হয়ে গেছিল দুজনের মধ্যে তুমুল ঝগড়া।
রাগে রতন গোঁ-গোঁ করছিল, কে বলেছে তোকে আমার ঘড়ি ঠিক করতে ? আমি আমার ইচ্ছেমতো আমার ঘড়ি পনের মিনিট কেন বিশ মিনিট স্লো করে রাখব, তাতে তোর কী ?
সীতেশ জবাব দিয়েছিল, কেন স্লো চলবে ? পৃথিবীতে ঘড়ি চলার একটা নিয়ম আছে, সেভাবেই কেন চলবে না ? কেন ভুল সময় চলবে।
— ঐ স্লো চলাটাই আমার কাছে সঠিক সময়। আমি আমার নিয়মে চলব, তাতে তোর কী ?
এ কথার জবাব সেদিন সীতেশ আর দিতে পারেনি। তবে আজ দশ বছর পর রতনকে দেখে সে বুঝতে পারল, প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই তার নিজস্ব এক-একটা ঘড়ি আছে এবং সেটা সেই মানুষের নিজস্ব নিয়মেই চলে যার যার সঠিক পথে। কোনো নিয়মের বাইরে থেকেও।