
ফেরিওয়ালা (অনুগল্প)
গুলশন ঘোষ
৩টে ১০-এর কলকাতা-ব্যাঙ্গালোর ফ্লাইটে কপোতাক্ষী ও তার মেয়ে স্বর্ণালী চেপে বসে। সেফটি ডেমনস্ট্রেশন শুরু হতেই বুক দুরুদুরু করে কপোতাক্ষীর। বহুবার উড়োজাহাজের আওয়াজ শুনেছে, কিন্তু চড়ার কথা স্বপ্নেও ভাবেনি। ভয়-মিশ্রিত এক আনন্দ। উড়ে চলেছে স্বপ্ন মেঘের ভিতর দিয়ে।
প্লেন ওড়ার কয়েক ঘন্টা পর দু’জন তরুণ-তরুণী একটি সার্ভিস ট্রলি করে খাবার পরিবেশন করতে শুরু করে।
১জন তরুণী কপোতাক্ষীর কাছে এসে বিনয়ের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করল — ম্যাডাম, ভেজ না নন-ভেজ?
কিছু না বুঝে হাঁ করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে সে।
— দুটোই ভেজ। স্বর্ণালী জানাল।
তার মা স্ন্যাকস নিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। স্বর্ণালী তার মাকে বুঝিয়ে দিয়ে খেতে শুরু করে।
কপোতাক্ষী যেন স্বর্গরথে ওড়ে যাচ্ছে। কত কিছুই তার মনে পড়ছে। জানালা দিয়ে নীচে তাকাতেই মেঘের ফাঁক দিয়ে তার গ্রামকে খোঁজে। যে গ্রামে সে রোজ বিকেলে টিং টিং টিং ঘণ্টা বাজিয়ে ফেরি করে। মনে পড়ে স্বর্ণালীর বাবাকে। মানুষটা আজ বেঁচে থাকলে – কত সুখীই না হতো মেয়েকে দেখে।
টেক-অফের পর প্লেন যত উপরে ওঠে, ততই নীচের শহর, ব্যাক্তি মানুষের মুখ ক্রমশ মিলিয়ে যায় – সমষ্ঠিতে। কপোতাক্ষী দেখে সোনালি বিকেলের রোদ্দুর মাখা প্লেনের ডানা।
নীচের শহর ক্রমশ স্পষ্ট হতে শুরু করল।
চাঁপদা। বিকেল – টিং টিং টিং। ঘণ্টার আওয়াজ শুনে দূরের দোতলা বাড়ির জানালা থেকে একটি আদুরে কণ্ঠতরী ভেসে আসে — ও ফেরিওয়ালা, ও ফেরিওয়ালা।
থমকে দাঁড়িয়ে, পথ পাল্টায় কপোতাক্ষী—
টুকটুক করে এগিয়ে গেলো আওয়াজের উৎসের দিকে।
বাড়ির মেন গেটে কো-অর্ড-সেট পরে দাঁড়িয়ে একুশ বছরের এক দীপ্ত তরুণী। হাতে মোবাইল। পাশেই তার মা।
তরুণীর মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে কপোতাক্ষী।
জি.আই.-এর রিং-এ গাঁথা জিভ সুড়সুড় করা হরেক রকম পলিথিনে মোড়া যত ভাজাভুজির মালা। সেখান থেকে অর্ডার মতো শাকিভাজা, সবুজ মটর ও বাদামভাজা ছিঁড়ে দিল তরুণীকে।
প্যাকেটগুলি নিয়ে সে যে পথে বাড়ির ভিতর গেলো – সেই দিকেই তাকিয়ে ফেরিওয়ালা জিজ্ঞাসা করে — ও কে? কী করে?
— আমার মেয়ে। কেবিন ক্রু। ব্যাঙ্গালোরে থাকে।
কথাটা ফেরিওয়ালা মাথার উপর দিয়ে গেল। স্মৃতি অস্থির হয় তরুণীকে দেখে।
— কেবিন ক্রু’র মা ফেরিওয়ালাকে একশ টাকার নোট ধরিয়ে বলে জিজ্ঞাসা করে- অনেক দিন এদিকে আসনি কেন?
— মেয়ের সঙ্গে ব্যাঙ্গালোরে গেসলুম। সরকারি কলেজে ডাক্তারিতে ভত্তি হয়েচে। এই কথা বলে চল্লিশ টাকা ফেরত দিয়ে আবার টিং টিং টিং আওয়াজ করে হাঁটতে শুরু করে ফেরিওয়ালা।
কেবিন ক্রুর মা ভাবে কান হয়তো কিছু ভুল শুনেছে।
নারকেল গাছের মাথার অনেক উপর থেকে ভেসে আসছে উড়োজাহাজের আওয়াজ। এই তরুণীর মুখ দেখে তার মনে পড়ে সেদিন উড়োজাহাজের ঠেলাগাড়ির জলছবি। হাঁটতে হাঁটতে তার এটাই মনে হচ্ছে, ওরা আকাশ পথে ফেরি করছিল। ওদেরকে গ্রামের কেউ চিনবে না। কিন্তু নীচে থাকা আমাদের মতো ফেরিওয়ালার মুখগুলো সবার কাছে বড্ড চেনা।