
রতিবাবুর কথা (অনুগল্প)
অভিজিৎ চক্রবর্তী
আমার সহকর্মী রতিবাবুর সব ব্যাপারেই উৎসাহ। বিয়ে থা করেননি, আর করবে বলেও মনে হয় না। অফিসে কোথায় কে কী করছেন, কী লিখছেন, কোথায় যাচ্ছেন, সবদিকেই তার অসীম আগ্রহ। তিনি চলতে চলতে হঠাৎ থেমে উঁকি দিয়ে পেছনে দাঁড়িয়ে দেখবেন, বিষয়টা কী। আপনি হয়তো আনমনে মোবাইলে স্ক্রল করছেন, হঠাৎ পেছনে শ্বাসের শব্দ শুনে ঘুরে তাকিয়ে দেখবেন রতিবাবু, ‘এই জুতা দেইখা লাভ নাই। আমার ভাই গত মাস কিনছে, সপ্তাহ যাইতে না যাইতেই ফাইট্যা চৌচির।’
এছাড়া পৃথিবীর সকল জ্ঞান তার নখদর্পণে। সকল অভিজ্ঞতা যেন তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে নেওয়া হয়ে গেছে। অনেকটা সবজান্তা গোছের। সেদিন যেমন রাশিয়ার বৈকাল হ্রদ নিয়ে কথা হচ্ছিল। বলল, ‘ও ঐ জায়গায় গেছে আমার এক দাদুর ভাইয়ের ছেলে। ফ্রেশ ওয়াটার। এখন তো রাশিয়ার সঙ্গে ইন্ডিয়ার সম্পর্ক ভালো, যান না, ঘুইরা আইয়েন’, তারপর এশিয়ার জিও-পলিটিক্স অর্থনীতি… কত কী।
বিজন নতুন জয়েন করেছে অফিসে। সে এসব সহ্য করতে পারে না। মাঝেমাঝেই বলে ‘এত মাতে কেমনে।’ একদিন তো কথায় কথায় বলেই ফেলে, ‘যারা বেশি কয়, তারা অনেক ভুল কয়।’
রতিবাবু বললেন, ‘ঠিক কইছো বিজন, আমার এক বন্ধু আছিল, এত কথা কইত…।’ অফিসে হাসির রোল ওঠে।
সেদিন একজন সহকর্মী বদলি হয়েছেন। তাকে কোনও উপহার দিতে হবে। লেজার পিরিয়ডে তার অনুপস্থিতিতে এই নিয়ে চলছে আলোচনা। সিদ্ধান্ত হল, একটা শাড়ি দেওয়া হবে। সুনীতার উপরে ভার। সে অনলাইন কিনুক, না হয় অফলাইন। ও মোবাইলে একটা ছবি দেখাল সবাইকে। একটা শাড়ি মিটিং চলাকালীনই সে দেখতে দেখতে পছন্দ করেছে। নতুন ডিজাইন।
রতিবাবু বসেছিলেন উল্টোদিকের চেয়ারে। টেবিলের উপর ঝুঁকে পড়লেন সুনীতার হাত থেকে মোবাইলটা নেবার জন্য। মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখেই বললেন, ‘ও এই শাড়িটা, কোয়ালিটি তেমন ভালো না, গায়ে খোঁচায়। আমার বোন গত মাসে কিনছে।’
সুনীতা সিরিয়াস। বলল, ‘রতিদা, এইটা পরশু লঞ্চ করেছে। এই দেখেন পাবলিশিং ডেট দেখেন। আমি এই সাইটে প্রায়ই আসি।’
রতিবাবু বিমর্ষ। বললেন, ‘রঙটা কেমন মাজা মাজা।’
সুনীতা ফের বলল, ‘কত উজ্জ্বল, কী বলেন রতিদা। বিমলাদি’কে দারুণ মানাবে।’
রতিবাবু যেন কিছুতেই আজ পেরে উঠছেন না। শেষে বিরস বদনে বললেন, ‘দেখো, বিমলার পছন্দ হয় কি না, ওর তো কমলা রং পছন্দ।’
সবাই বিস্ময়ে রতিবাবুর দিকে তাকায়। এমন সময় লেজার শেষে ক্যান্টিন থেকে বিমলাও স্টাফরুমে ঢুকছিলেন। হয়তো শেষ দু-তিনটি কথা তার কানে গিয়ে থাকতে পারে।
আমরা দূর থেকে দেখলাম বিমলাদির গাল যেমন অনাবশ্যকভাবে লাল হয়ে উঠেছে। না কি সে আমাদেরই মনেরই ভুল ছিল কে জানে!