
হর্ষবর্ধনের যজ্ঞ
সদানন্দ সিংহ
অনেকদিন পর একসঙ্গে আমরা পাঁচজন মানে আমি, জগা, গোবরা, ফটকে এবং সুদেব গোবর্ধনদার বাড়ির দিকে যাচ্ছি। গোবর্ধনদা আমাদের যেতে বলেছেন, কারণ বিকেলে নাকি এক যজ্ঞের আয়োজন করেছেন হর্ষবর্ধনদা। হর্ষবর্ধনদার কাঠের ব্যবসা নাকি মন্দ চলছে। তাই কোথাকার এক গণৎকার বিধান দিয়েছেন যজ্ঞ করলে নাকি ব্যবসার মন্দ অবস্থা কেটে যাবে। আমাদের আবার যজ্ঞ-টজ্ঞের প্রতি কোনো আকর্ষণ নেই। সত্যি বলতে কী, আমরা যাচ্ছিলাম ভালো কিছু খাবারের লোভে। যজ্ঞের আয়োজন যখন হয়েছে তখন ভালো একটা খাওয়া-দাওয়ারও নিশ্চয়ই আয়োজন করা হয়েছে। পেট ভরে সে খাবার খাওয়াই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।
গোবর্ধনদাদের বাড়ি পৌঁছে সেই গণৎকারকে চাক্ষুষ দেখালাম। তিনি তদারকি করছেন যজ্ঞের সরঞ্জামগুলি — কোথায় কী রাখতে হবে, কোথায় কীভাবে যজ্ঞ শুরু হবে। হর্ষবর্ধনদা এবং গোবর্ধনদা দুজনেই সেটা সামলাতে খুব ব্যস্ত। আমাদের একপলক দেখেই গোবর্ধনদা বললেন, কিছুক্ষণ পরেই যজ্ঞ শুরু হবে, তোমরা বসো এখন।
যজ্ঞের আয়োজন বারান্দায় হচ্ছে। বারান্দায় বেশ কিছু প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা আছে। সে চেয়ারে সবাই বসে পড়ল। আমি কিন্তু বসলাম না। আমি লক্ষ করছি কোথায় পুজোর বা যজ্ঞের ভোগের খাবার রাখা আছে। সেগুলি আমি কোথাও দেখলাম না। উশখুশ করছিলাম, এত কষ্ট করে এসে খাওয়া-দাওয়া কি হবে না ? আমি তাই গোবর্ধনদার সঙ্গে কথা বলার জন্য সুযোগ খুঁজছিলাম এবং গোবর্ধনদার কাছাকাছি ঘুরঘুর করছিলাম। সে সুযোগ আসতেই আমি গোবর্ধনদাকে জিজ্ঞেস করলাম, এই যজ্ঞে কি প্রসাদ খাওয়া হবে না ?
গোবর্ধনদা একটু মুচকি হাসলেন। বললেন, ঘরে চলো, দেখাচ্ছি।
গোবর্ধনদা আমাকে ঘরের ভেতরে নিয়ে গেলেন। দেখলাম, তিনটে থালার মধ্যে রসগোল্লা, কালোজাম, সন্দেশ, পেড়া, বিভিন্ন ফল — আরো কতো কী। এসব দেখে লোভ সংবরণ করতে বেশ কষ্ট হল। গোবর্ধনদাকে জিজ্ঞেস করলাম, কখন যজ্ঞ শেষ হবে ?
গোবর্ধনদা বললেন, শুরুই তো হয়নি। শেষ কখন হবে সেটা আমি পরোহিতকে জিজ্ঞেস করছি।
বুঝলাম পুরোহিত মানে সেই গণৎকার মহাশয়টি। বললাম, থাক, আমরা বরং অপেক্ষা করি।
— আচ্ছা। জটুবাবু এলে আমাকে বলো। তাঁকেও নেমন্তন্ন করেছিলাম।
জটুবাবু মানে আমাদের চিংড়িমামা। চিংড়িমামা আসবে শুনে ভালো লাগল না, কারণ কীসব ফন্দিফিকির তার মাথায় কেবল ঘোরাঘুরি করে। সেগুলি আমাদের পছন্দ না। আমার মুখ থেকে চিংড়িমামা আসার খবর শুনে জগা বলল, দেরি করেই আসুক। আগে আমরা সব খেয়ে নিই।
কিন্তু আমাদের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে চিংড়িমামা কিছুক্ষণের ভেতরই এসে পড়ল। এসেই চিংড়িমামা বলে উঠল, কী হে, সব হাভাতের দল, কিছু খাবারের গন্ধ পেলেই হল।
শুনে ফটকে রেগে উঠল, আমরা হা-হাভাতের দল নই।
এইসব কথাবার্তার ভেতর গোবর্ধনদা আমাদের মধ্যে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, জটুবাবু আপনাকে দাদা ডাকছে।
চিংড়িমামা জিজ্ঞেস করল, কেন ?
— পুরোহিত মশাই বলছেন, যজ্ঞে বসার জন্য দুজন লোক দরকার। দাদা আমাকে সঙ্গে নিয়ে বসতে চেয়েছিল। আমি জানালাম, আমার তো পেট খারাপ, যজ্ঞে বসে যদি আমার পায়খানা পেয়ে যায় তাহলে আমি উঠে যাব। তাতে পুরোহিত মশাই বললেন উঠে যাওয়া চলবে না। তাই দাদা আপনাকে নিয়েই বসতে চাইছেন।
আমি তাড়াতাড়ি বললাম, হ্যাঁ হ্যাঁ। এসব উনার কাছে কোনো ব্যাপারই না।
গোবর্ধনদা চিংড়িমামাকে একপ্রকার টেনে নিয়ে গেলেন। আমাদের মনে হল, কিছুক্ষণের জন্যে আমরা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।
যজ্ঞ একসময় শুরু হল। আর একসময় শেষও হল। গোবর্ধনদা প্রসাদ বিলি শুরু করলেন। হর্ষবর্ধনদা এবং চিংড়িমামাকে কিন্তু পুরোহিত মশাই মুক্তি দিলেন না। পুরোহিত মশাই জানিয়ে দিলেন, সূর্য অস্ত যাবার পর আসন ছেড়ে উঠা যাবে। শুনে আমরা সবাই বেশ খুশি হলাম, এবার নির্বিঘ্নে প্রসাদ খাওয়া যাবে।
হাতে প্রসাদের এক বড়ো প্লেট নিয়ে আমি যজ্ঞস্থলের দিকে এগোলাম। দেখলাম, হর্ষবর্ধনদা চোখ দুটো বন্ধ করে আসন গেড়ে বসে আছেন। দেখলাম, চিংড়িমামাও আসন গেড়ে বসে আছে, কিন্তু চিংড়িমামার চোখ দুটো একদম খোলা। সেই দুচোখ দিয়ে চিংড়িমামা আমার দিকে ক্রুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি বেশ মজা পেলাম। প্লেট থেকে রসগোল্লা, কালোজাম, সন্দেশ, পেড়া — সব চিংড়িমামাকে দেখিয়ে দেখিয়ে তারিয়ে তারিয়ে খেতে লাগলাম।