
পরিদের স্থান খাইত পর্বত
সদানন্দ সিংহ
প্রাচীনকাল থেকেই পৃথিবীব্যাপী পরিদের নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত। সে গল্পগুলির রহস্য এখনো বেঁচে আছে বিভিন্ন রূপকথা, উপকথা এবং আমাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের এক ধারার মাধ্যমে। ঠিক সেরকম উত্তরাখণ্ডের খাইত পর্বত — পরি ও অলৌকিক সত্তাদের কিংবদন্তিতে ঘেরা এক রহস্যময় স্থান। বস্তুত উত্তরাখণ্ডকে দেবভূমি বলা হয় এবং এখানে দেখার জন্য অনেকগুলি দুর্দান্ত জায়গা রয়েছে। এই স্থানের সৌন্দর্যকে দেখতে বিদেশ থেকেও বিপুল সংখ্যক পর্যটক আসেন। এই সুন্দর জায়গাগুলোর আড়ালে লুকিয়ে থাকা রহস্যগুলো অবাক করার মতো। আপনি যদি শহরের কোলাহল থেকে দূরে শান্ত এবং রহস্যময় পরিবেশে কাটাতে চান, তাহলে চলে আসুন এই জায়গায়।
খাইত পর্বত উত্তরাখণ্ডের তেহরি জেলার ঘানসালিতে অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই স্থানের উচ্চতা ১০৫০০ ফুট। একে পাহাড়ি গ্রামও বলা যায়। চারপাশে ঘন সবুজ বন-বনানী, ভাসমান দূরে বরফঢাকা শৃঙ্গ, নীরবতার মধ্যে শান্তিতে পথ হাঁটা – সমস্ত কিছু আপনাকে প্রকৃতির এক অদ্ভুত মায়ার জগতে পৌঁছে দেবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চলে আসা গল্পগুলো নিয়ে স্থানীয় লোকদের বিশ্বাস, এই পাহাড়ের কুয়াশাচ্ছন্ন চূড়ায় আত্মা এবং পরিদের বাস। স্থানীয়দের অনেকেই নাকি ভোর বা সন্ধেয় তাঁরা অদ্ভুত আলো এবং পরিদের ছায়ামূর্তি দেখেছেন। এই অলৌকিক মূর্তিগুলো বছরের নির্দিষ্ট সময়ে, বিশেষ করে পূর্ণিমার রাতেও আবির্ভূত হয়। স্থানীয় লোকদের আরো বিশ্বাস যে এই আত্মারা পর্বত এবং এর বাসিন্দাদের রক্ষা করে। কেউ কেউ এই পরিদের যোগিনী ও বনদেবী বলেও ডাকা হয়।
ভ্রমণে শহরের কোলাহল থেকে বহু দূরে এসে এইসব কাহিনি নিয়ে বাস্তবতা খোঁজা অনর্থক, বরং স্থানীয়দের মতো মনে এক রহস্য নিয়ে পাইন ও ওক গাছের বন এবং রঙিন বুনো ফুলের মাঝে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কুয়াশায় ঢাকা বনের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে পাখির ডাকের মাঝে স্বনিল পরিবেশ হারিয়ে যেতে ইচ্ছে হবে। ট্রেকিংপ্রেমীদের জন্যও এ এক স্বর্গ। যাঁরা শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে একটু শান্তির সন্ধান করছেন তাঁদের জন্য খৈত পর্বত এক আদর্শ জায়গা। এখানকার সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত স্মরণীয় মুহূর্ত।
খাইত পর্বতের মন্দির আশীর্বাদপ্রার্থী ভক্তদের একটি উপাসনা ও পূজাস্থল। এখানে সারা বছর ধরে নানা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। জুন মাসে এখানে মেলার আয়োজন করা হয়। সবুজে ঘেরা এই গ্রামটি আপনার মানসিক চাপ দূর করতে সহায়ক হতে পারে। আপনি চাইলে এখানে ক্যাম্পিংও করতে পারেন। তবে খুব সুন্দর এই গ্রামে সন্ধ্যা ৭টার পর ক্যাম্প ছাড়ার অনুমতি নেই। এছাড়াও এখানে গান বাজানো নিষিদ্ধ, বিশ্বাস করা হয় যে পরিরা কোলাহল পছন্দ করে না। মোবাইল নেটওয়ার্ক এখানে খুব দুর্বল।
খাইত পর্বত ভ্রমণের সেরা সময় মার্চ থেকে জুনের প্রথম দিক পর্যন্ত, কারণ তখন এই সময়ে আবহাওয়া মনোরম থাকে, ফুল ফোটে এবং ট্রেকিংয়ের জন্য এটি আদর্শ। জুন থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত দিনের সময় গরম এবংন রাতে শীত পড়ে এবং মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়, ফলে এই সময় না যাওয়াই ভালো। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাসে চারপাশ সবুজে ভরে ওঠে, এই সময়টাও ভ্রমণের উপযুক্ত। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে পরিবেশ খুব ঠান্ডা থাকে এবং তুষারপাত হয়।
খাইত পর্বত থেকে চাম্বা এবং ধনৌলটি ঘোরা যায়। চাম্বাতে লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দিরের মতো প্রাচীন মন্দির এবং ভুরি সিং জাদুঘরও রয়েছে, যেখানে শিল্পকর্ম ও প্রত্নবস্তুর এক অসাধারণ সংগ্রহ আছে। ধনৌলটি জায়গাতেই খাইত পর্বত মন্দির অবস্থিত। এখানকার ইকো পার্ক এবং আপেল বাগানগুলো ঘুরে দেখার মতো।
দেরাদুনের জলি গ্রান্ট বিমানবন্দর হল সবচেয়ে কাছের বিমানবন্দর। ঋষিকেশ রেলওয়ে স্টেশন হল সবচেয়ে কাছের রেলস্টেশান। সড়কপথে ঋষিকেশ রেলওয়ে স্টেশন থেকে খাইত পর্বতের দূরত্ব প্রায় ১০০ কিমি, সময় লাগে তিন-চার ঘন্টা। খাইত পর্বতের চূড়ায় যেতে হলে প্রায় ৪ কিলোমিটারের মতো পথ ট্রেকিং করতে হয়।