
প্রাচীন ভারতে জ্যোতির্বিদ্যার পরিচয়
প্রোজ্জ্বল মণ্ডল
প্রাচীন ভারতের বৈদিক মুনি-ঋষিরা ধ্যান যোগ বলে তাদের মতাদর্শ বেদ, নক্ষত্রকল্প, শাস্ত্র ইত্যাদি গ্রন্থে মহাবিশ্বের মহাজাগতিক শক্তি যেমন সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, জোয়ার-ভাটা, আবর্তন-পরিক্রমণ গতি ইত্যাদি সম্মন্ধে লিখে রেখে গেছেন, যা ছিল পাশ্চাত্য দেশের বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের ধারণা দেওয়ার বহু পূর্বেই।
বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে ও সংস্কৃতির চর্চার অভাবে সেই সব জ্ঞান বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যারফলে পাশ্চাত্য দেশগুলোর থেকে ভারত পিছিয়ে পড়েছে। এইসব সংশোধন হওয়া প্রয়োজন। এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি─
বেদে সূর্যগ্রহণের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা :-
যত্ ত্বা সূর্য স্বর্ভানু স্তমবিধ্যদাসুরঃ।
অক্ষেত্রবিদ যথা মুগ্ধো ভুবনান্যদীধয়ুঃ।।
─ ঋগবেদ ০৫/৪০/০৫
[অর্থ :- হে সূর্য, যাকে (চাঁদ) তুমি তোমার নিজ আলো উপহার স্বরূপ প্রদান করেছ, তাঁর (চাঁদের) দ্বারা যখন তুমি আচ্ছাদিত হও, তখন আকস্মিক অন্ধকারে পৃথিবী ভীত হয়।]
সূর্যকে সমস্ত গ্রহ পরিক্রমন করে, বেদে তার প্রমাণ:-
“পঞ্চারচে পরিবর্তমানে তস্মিন্নাতস্থর্ভুবনানি বিশ্বা।”
─ ঋগবেদ ১/১৬৪/১৩
[অর্থ :- পৃথিবীসহ সমস্ত গ্রহ নিজ অক্ষের চারিদিকে এবং সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তন করে।]
বেদে উল্লেখিত সূর্যের নিজ অক্ষের উপর আবর্তন ও পরিক্রমণ
যজুর্বেদে ৩৩/৪৩ নং মন্ত্রে উল্লেখ আছে —
সূর্য তার গ্রহদের নিয়ে (ছিন্ন অংশ) মাধ্যাকর্ষণ শক্তিতে প্রদক্ষিণরত অবস্থায় নিজ কক্ষপথে ও নিজের অক্ষে প্রদক্ষিণ করে।
বেদে পৃথিবী যে চলনশীল তার প্রমাণ:─
অহস্তা যদপদী বর্ধত ক্ষাঃ শচীভির্বেদ্যানাম্।
শুষ্ণং পরি প্রদাক্ষিণিদ্বিশ্বায়বে নি শিশ্নথঃ।।
─ (ঋগ্বেদ ১০/২২/১৪)
[অর্থ- পৃথিবী যদিও হস্তপদহীন তথাপি ইহা চলিতেছে, অবশ্য জ্ঞাতব্য পরমাণুর শক্তি দ্বারা সূর্যের চারিদিকে ইহা প্রদক্ষিণ করিতেছে, হে পরমাত্মন্। সমগ্র মানবের মধ্যে আস্তিক্য বোধ জাগাইবার জন্যই তুমি এরূপ রচনা করিয়াছ।]
চাঁদ এর যে নিজস্ব আলো নেই, বেদে তার প্রমাণ ─
সোমো বধূয়ুরভবদশ্বিনাস্তামুভা বরা।
সূর্যাং যৎপত্যে শংসন্তীং মনসা সবিতাদদাৎ।।
─ (ঋগ্বেদ, ১০/৮৫/৯)
[অর্থ – এই মন্ত্রে বধূরূপী চন্দ্র এবং বররূপী সূর্যের উপমা দেওয়া হচ্ছে, যেখানে সবিতা চন্দ্রকে আলো উপহার দিচ্ছেন। অর্থাৎ, চাঁদের আলো যে সূর্য থেকে প্রাপ্ত, তার সুন্দর একটি উপমা সহকারে বর্ণনা পবিত্র বেদে দেওয়া হয়েছে।]
অত্রাহ গোরমন্বত নাম ত্বষ্টুরপীচ্যম্।
ইত্থা চন্দ্রমসো গৃহে।
─ (ঋগ্বেদ, ১/৮৪/১৫)
[অর্থ – জ্ঞানী ব্যক্তিমাত্রেই জানেন সূর্যালোক আবদ্ধ থাকে চন্দ্ররূপ দুর্গের ভেতর।]
চন্দ্র ও সূর্য্যের গ্রহণ, নক্ষত্রবৃত্ত, রাশিচক্র, জোয়ারভাটাদি তত্ত্ব, তিথি-বার ইত্যাদির ব্যবস্থাচক্র প্রভৃতি আর্য্যঋষিরাই প্রথমে আবিষ্কার করেছিলেন। পৃথিবী যে গোলাকার তাহা আর্য্যঋষিগণ ইংরেজরা এদেশে আসার বহুপূর্ব্বে আবিষ্কার করেছিলেন যথা—
“কপিথ – ফলবৎ বিশ্বং
দক্ষিণোত্তরয়োঃ সমম্ ।”
– নক্ষত্রকল্প
[অর্থ- পৃথিবী কপিথফল অর্থাৎ কোয়াতবেলের ন্যায় গোলাকার এবং উত্তর ও দক্ষিণে কিঞ্চিৎ চাপা।]
“সৰ্ব্বতঃ পর্ব্বতারাম-গ্রাম-চৈত্যচয়ৈশ্চিতঃ।
কদম্ব-কেশরগ্রন্থিকেশর-প্রসবৈরিব ।।”
─ সিদ্ধান্ত শিরোমণি
[অর্থ – কদম্ব যেমন গোলাকার ও খেসরসমূহে পরিবেষ্টিত, সেইরূপ এই পৃথিবীও গোলাকার এবং সর্ব্বদিকেই গ্রাম, বৃক্ষ, পৰ্ব্বত, নদ-নদী, সমুদ্র ইত্যাদির দ্বারা পরিবেষ্টিত ।
পৃথিবীর যে গতি আছে তাহা গ্রীসদেশীয় পণ্ডিত পিথাগোরাসের জন্মের বহু পুর্বে এবং ইটালী দেশীয় কোপারনিকাসেরও বহুপুর্ব্বে আর্যভট্ট বলে গিয়েছিলেন]
“চলা পৃথ্বী স্থিরা ভাতি ।” — আৰ্য্যভট্ট
[অর্থ- পৃথিবী চলছে, কিন্তু মনে হচ্ছে যেন স্থির রয়েছেত]
ভপঞ্জরঃ স্থিরো ভুরেবাবৃত্ত্যা-বৃত্ত্যা-প্রতিদৈবসিকৌ ।
উদয়াস্তময়ৌ সম্পাদয়তি নক্ষত্ৰ গ্ৰহানাম্ ॥
─ আৰ্য্যভট্ট – ভপঞ্জর
[অর্থ – নক্ষত্রমণ্ডল, রাশিচক্র স্থির আছে। কিন্তু পৃথিবী বারংবার আবৃত্তি বা পরিভ্রমণ দ্বারা গ্রহ নক্ষত্রাদির প্রাত্যহিক উদয়াস্ত সম্পাদন করছে]
এই গতিবিচার দ্বারা সূর্য্যের উদয়াস্ত সম্বন্ধে ভিন্ন ভিন্ন দেশে যে সময়ের তারতম্য হয় তাও পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের বহু পুর্ব্বে ভারতীয় ঋষিগণ আবিষ্কার করেছিলেন—
“লঙ্কাপুরেঽকস্য যদোদয় : স্যাৎ
তদা দিনাৰ্দ্ধং যমকোটি-পুৰ্য্যাম্ ।
অধন্তদা সিদ্ধপুরেঽস্তকালঃ
স্যাৎ – রোমকে রাত্রিদলং তদৈব॥”
[অর্থ — লঙ্কায় যখন সূর্যের উদয় হয়, তখন যমকোটিপুরীতে দ্বিপ্রহর বেলা, আর যখন লঙ্কার অধোভাগে সিদ্ধপুরে সূর্য অস্তগমনোন্মুখী তখন রোমদেশে রাত্রিকাল]
পৃথিবী যে শূন্যমণ্ডলে অবস্থিত এবং পৃথিবীর যে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি আছে তা স্যার আইজাক নিউটন জন্মগ্রহণ করিবার বহু পূর্ব্বে ভারতীয় ঋষিগণ আবিষ্কার করেছিলেন।
সূৰ্য্যসিদ্ধান্ত লিখেছেন —
“ভূগোলো ব্যোম্নি তিষ্ঠতি।”
[অর্থ- গোলাকার পৃথিবী শূন্যমণ্ডলে অবস্থান করছে]
ভাস্করাচার্য্য তাহার সিদ্ধান্ত শিরোমণিতে লিখেছিলেন—
“নান্যাধারং স্বশক্ত্যা বিয়তি চ নিয়তং তিষ্ঠতীহাস্য পৃষ্ঠে। নিষ্ঠং বিশ্বঞ্চ শশ্বৎ সদনুজমনুজা-দিত্যদৈত্যং সমন্ত্যং।।”
[অর্থ- পৃথিবী বিনা আধারে স্বীয় শক্তিদ্বারা আকাশমণ্ডলীতে অবস্থান করছে । এরই পৃষ্ঠে চতুৰ্দ্দিকে দেব, দানব, মানবাদি সমস্ত বসবাস করছে]
মাধ্যাকর্ষণ সম্বন্ধে ভাস্করাচার্য্য তাহার বিখ্যাত“ গোলাধ্যায়”-এ লিখেছিলেন —
“আকৃষ্ট শক্তিশ্চ মহী তয়া যত্
খস্থং গুরু স্বাভিমুর্খং স্বশক্ত্যা।
আকৃষ্যতে তৎ পততীব ভাতি
সমে সমন্তাৎ ক্ব পতত্বিয়ংখে॥”
[অর্থ- পৃথিবী আকর্ষণ শক্তি-বিশিষ্টা। কারণ কোন গুরুভার বস্তু আকাশে নিক্ষেপ করিলে পৃথিবী নিজ শক্তি দিয়ে তাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। কিন্তু আমরা মনে করি যেন তা পতিত হয়। চারিদিকেই সমান আকাশ, কাজেই পৃথিবী ছাড়া পড়বে কোথায়?]
আর্যভট্টও লিখেছিলেন—
“আকৃষ্ট শক্তিশ্চ মহি যৎ তয়া
প্রক্ষিপ্যতে তৎ তয়া ধাৰ্য্যতে।”
[অর্থ – পৃথিবী আকর্ষণ-শক্তি বিশিষ্টা। কারণ যাহা কিছু ঊর্দ্ধে প্রক্ষিপ্ত হয় তাহাই আকর্ষণশক্তি দ্বারা পৃথিবী ধারণ করে]
শাস্ত্রের গুহ্য মর্ম্ম বুঝতে না পেরে আমরা অনেকে রাহু কেতুকে দৈত্য মনে করি এবং এই দৈত্যদ্বয় চন্দ্র – সূৰ্য্যকে মাঝে মাঝে গ্রাস করে এবং সেই জন্যই সূর্য্য ও চন্দ্রগ্রহণ হয় বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু ঋষিগণ ব্রহ্মপুরাণে বহুপূর্ব্বে লিখেছিলেন—
“পৰ্ব্বকালে তু সংপ্রাপ্তে
চন্দ্রার্কো ছাদয়িস্যসি।
ভূমিচ্ছায়াগতশ্চন্দ্ৰং
চন্দ্ৰগোঽকং কদাচন।”
—পৰ্ব্বকালে
[অর্থ- পূর্ণিমা ও প্রতিপদের সন্ধিকালে এবং অমাবস্যা ও প্রতিপদের সন্ধিকালে রাহুরূপ ছায়া চন্দ্র সূর্যকে আচ্ছাদন করে। সেই জন্যই সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ হয়]
সূৰ্য্যসিদ্ধান্ত গ্রন্থে বলেছেন—
“ছাদকো ভাস্করস্যেন্দু
-অধঃস্থো ঘনবস্তুবেৎ।
ভূচ্ছায়াং প্রাঙ্মুখশ্চন্দ্রো
বিশত্যস্য ভবেদসৌ॥”
— সূৰ্য্যসিদ্ধান্ত
উপরোক্ত উল্লেখিত বিভিন্ন গ্রন্থের আলোচিত বিষয় থেকে প্রমাণ পাই শিক্ষা-দীক্ষা, সংস্কার-সংস্কৃতি দিক থেকে প্রাচীন ভারতের বৈদিক সভ্যতা ছিল অনেক বেশি উন্নত। আমরা চাই এইসব বৈদিক জ্ঞান আবার বিশ্বসংসারে ছড়িয়ে পড়ুক।
[তথ্যসূত্র]
১.প্রণব পত্রিকা ── জুলাই,২০২৩
২.হিন্দু শাস্ত্র পরিচয় ── স্বামী অরুণানন্দ