প্রথম গোয়েন্দা কেস – সদানন্দ সিংহ

প্রথম গোয়েন্দা কেস – সদানন্দ সিংহ

প্রথম গোয়েন্দা কেস   (ছোটোদের গল্প)

সদানন্দ সিংহ

রবিবার এলে আমি অপেক্ষায় থাকি, যদি কেঊ আসে — গোয়েন্দা তদন্তের জন্য। কিন্তু কেউ আসে না। কয়েক নিষ্ফল রবিবার পার হয়ে যাবার পর এক রবিবারে এসে যেন ভাগ্যে শিকে ছিড়ল। সকালে গোবর্ধনদা এসে খবর দিলেন, একটা কেস পাওয়া গেছে।
আমি তো খুশিতে ডগমগ। বললাম, তাহলে শুরু করা যাক।
— তবে সেজন্য আমাদেরকে বাইরে যেতে হবে।
— কোথায় ?
— যেখান থেকে কেসের শুরু করতে হবে, সেখানে।
আমার যেন তর সইছিল না। আমি তৈরিই ছিলাম, তাড়াতাড়ি বললাম, হ্যাঁ হ্যাঁ চলুন। কিন্তু যাব কোথায় ?
গোবর্ধনদা কিন্তু জায়গার নাম বললেন না। শুধু বললেন, সে জায়গায় তুমি অনেকবারই গেছো, গেলেই দেখবে।
মাকে “একটু বাইরে যাচ্ছি” বলে আমি গোবর্ধনদা্র সঙ্গে বেরিয়ে এলাম।

যে জায়গায় এসে পৌঁছলাম সেটা গোবর্ধনদাদেরই বাড়ি। আমি একটু আশ্চর্য হয়ে বললাম, এখান থেকেই শুরু হবে আমাদের প্রথম কেস ? ঠিক আছে, প্রথম কেস – ফ্রীতে আমরা করব।
গোবর্ধনদা বললেন, না না। ফ্রীতে করতে হবে না। দাদা বলেছে, একশ টাকা দেবে।
শুনে আমি খুশি হলাম, প্রথম কেস। একশ টাকা পেলেও মন্দ নয়। বললাম, তাহলে শুরু করা যাক।
— হ্যাঁ, এখান থেকেই শুরু করতে হবে–।
— এখান থেকেই? বলে আমি এদিক ওদিক তাকালাম। আমরা দাঁড়িয়েছিলাম বারান্দায়। সেখানে লাল রঙের মাঝারি আকারের একটা প্লাস্টিকের বালতি বাদে কিছুই দেখতে পেলাম না। বললাম, এখানে একটা বালতি ছাড়া আর কিছুই তো দেখতে পাচ্ছি না।
গোবর্ধনদা বললেন, হ্যাঁ, ওই বালতি থেকেই শুরু করতে হবে। ব্যাপারটা খুলেই বলছি। আজ সকালে দাদাকে বলেছিলাম, আমরা মানে হাবু আর আমি, দুজন শখের গোয়েন্দাগিরি করি, তাই কোনো তদন্তের প্র্য়োজন হলে আমাদের বোলো। শুনে দাদা বলল, ঠিক আছে, তাহলে এই বালতি থেকে যে শোল মাছটা উধাও হয়ে গেছে, ওটা খুঁজে এনো, ফী হিসেবে একশ টাকা দেবো।
গোবর্ধনদার কথা শুনে আমি অবাক হলাম, মাছ কোথায় না কোথায় লাফিয়ে চলে গেছে, সে মাছটাকে খুঁজে এনে দিতে হবে ? এটা কি গোয়েন্দাদের কাজ ? কোনো গোয়েন্দারা কি এমন কাজ করবে কোনোদিন ?
বললাম, গোবর্ধনদা – মাছ খোঁজা গোয়েন্দাদের ঠিক কাজ না। এটা বরং আমরা বাদ দিই।
গোবর্ধনদা বেশ অবাক হয়ে বললেন, সে কী ! আমি ধরে-ক’য়ে কেসটা নিলাম, এখন বাদ দেবো ? তাছাড়া এটা আমাদের প্রথম কেস, আমাদের করা উচিত।
বাধ্য হয়ে বললাম, ঠিক আছে। তাহলে শুরু করা যাক।

আমি লাল রঙের বালতিটার কাছে গেলাম। কাছে গিয়ে দেখলাম, বালতির মুখটা একটা স্টিলের থালা দিয়ে ঢাকা। আমি স্টিলের থালাটাকে তুলে দেখলাম, বালতির আর্ধেকটা জলে ভর্তি আর জলের মধ্যে ফুট খানেক লম্বা তিনটে জ্যান্ত শোল মাছ।
গোবর্ধনদা বললেন, চারটে ছিল। এখন তিনটে।
চিন্তা করতে লাগলাম, মাছটা কোথায় যেতে পারে ? বললাম, উঠোনের প্রতিটি কোণে খুঁজতে হবে – ঘাসের নীচে, গাছের নীচে, সব জায়গায়।
গোবর্ধনদা বললেন, ওসব জায়গায় আমি আর দাদা – দুজনে কয়েকবার খুঁজেছি। আচ্ছা চলো, আবার খুঁজি।
দুজনে মিলে উঠোনের সব জায়গায় তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম। মাছের কোনো চিহ্নই নেই।
গোবর্ধনদা বললেন, এক কাজ করি। আমি মাছের মতো বসে বসে লাফ দিয়ে যেতে থাকি। দেখি, কোনো সূত্র পাওয়া যায় কিনা।
বলেই গোবর্ধনদা বসে পড়ে লাফ মেরে যেতে থাকলেন। আমি দেখলাম, গোবর্ধনদা লাফ মারতে মারতে বারান্দা থেকে উঠোনে নামলেন, তারপর গেইটের দিকে যেতে থাকলেন। তারপর গেইট থেকে বেরিয়ে ড্রেইনের দিকে যেতে থাকলেন। শেষে উঠে দাঁড়িয়ে ফিরে এলেন আবার বারান্দায়। বললেন, মনে হয় ড্রেনে লাফিয়ে চলে গেছে। মাছটাকে আর পাওয়া যাবে না।
আমি প্রতিবাদ করে বললাম, আমি মানতে পারলাম না। মাছটা কি জানে যে ড্রেইন কোনদিকে আছে ?
গোবর্ধনদা একটু ভেবে বললেন, ঠিকই বলেছ। আমি নাহয় জানি ড্রেনটা কোথায়, মাছটা কীভাবে জানবে ! আচ্ছা এক কাজ করি, মাছগুলোকে উঠোনে ছেড়ে দিয়ে দেখি কোনদিকে যায় ?
— এটা করা যেতে পারে। আমি বললাম।

গোবর্ধনদা বালতিটাকে উঠোনে নিয়ে বালতি থেকে মাছগুলোকে তুলে উঠোনে ছেড়ে দিলেন। দেখলাম তিনটে মাছ তিনদিকে লাফিয়ে যাচ্ছে।
আমি তখন বললাম, গোবর্ধনদা, মাছগুলোকে আগের মতো বালতিতে রেখে দিন। এভাবে কিছুই প্রমাণ হিসেবে নেওয়া যাচ্ছে না।
গোবর্ধনদা মাছগুলোকে তুলে আবার বালতিতে রেখে দিলেন। তারপর বালতির মুখটাকে আগের মতো থালা দিয়ে ঢেকে বারান্দায় রাখলেন। তারপর বললেন, এর দ্বারা কিন্তু প্রমাণ হল মাছটা যে-কোনো দিকে যেতে পারে।
গোবর্ধনদা কথাটা কিন্তু ঠিকই বলেছেন। গোয়েন্দাদের মুল মন্ত্রের কথাটা আমার মনে পড়ল – “যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পার অমূল্য রতন”। আমি গোবর্ধনদার কথাটা আবার চিন্তা করতে লাগলাম — ‘মাছটা যে-কোনো দিকে যেতে পারে’। আমার মনে হল, মাছটা তাহলে ঘরের ভেতরেও ঢুকতে পারে।
বললাম, গোবর্ধনদা ঘরের ভেতরে একবার খুঁজে দেখি।
গোবর্ধনদা জবাব দিলেন, মাছটা পাগল নাকি যে ঘরের ভেতরে মরার জন্যে ঢুকে যাবে ?
— তবু একবার শেষ চেষ্টা করে দেখা যাক না।
গোবর্ধনদা রাজি হলেন। তারপর আমরা ঘরের ভেতরটা তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগলাম।
শেষপর্যন্ত অবশ্য মাছটাকে আমরা খুঁজে বের করলাম। গোবর্ধনদার খাটের নীচে থেকে।