লড়াই – প্রসেনজিৎ রায়

লড়াই – প্রসেনজিৎ রায়

লড়াই

প্রসেনজিৎ রায়

সকালবেলা বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে বেরিয়েছিলেন প্রতাপবাবু। বয়স ৪৭, সরকারের একটি দপ্তরে করণিক হিসেবে কর্মরত। মাসের শুরুতে বেতন হাতে এলেও মাসের শেষ দিকে সংসার চালাতে হিমশিম খান তিনি। বাজারে ঢুকেই প্রতাপবাবু প্রথমে আলুর দাম জিজ্ঞেস করলেন।
— আলু কত করে কেজি?
— চল্লিশ টাকা কেজি।
প্রতাপবাবু চমকে উঠলেন — চল্লিশ টাকা কিলো?
— দাদা এর থেকে কমে আর কোথাও পাবেন না, যদি পান নিয়ে যান।
তিনি আর কথা বাড়ালেন না। এক কেজি আলু নিলেন, তারপর পেয়াজ, টমেটো, ডাল, তেল, মাছ প্রতিটি জিনিসের দাম শুনতে শুনতে তাঁর কপালে ঘাম জমল। দোকানদার যখন রান্নার তেলের দাম বলল প্রতাপবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
বাড়ি ফিরে জিনিসপত্র দেখে স্ত্রী রিমাদেবী জিজ্ঞেস করলেন — আজ দেখছি জিনিস অনেক কম এনেছো, লিস্টে তো আরো অনেক কিছু লিখে দিয়েছিলাম। প্রতাপবাবু হেসে বললেন, লিস্ট লিখতে তো আর টাকা লাগে না।
রিমা কিছু বললেন না, তিনি প্রতাপবাবুর কথার অর্থ বুঝতে পারলেন।
তাদের এক ছেলে নবীন কলেজে পড়ে, মেয়ে মিলি স্কুলে। বাড়িভাড়া, বিদ্যুতের বিল, ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ, ওষুধ, যাতায়াত — সবমিলিয়ে মাসের বাজেটে এমনিতেই টানাটানি। তার উপর নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম প্রতিদিন অল্প অল্প করে বেড়েই চলেছে। সেদিন দুপুরে রিমাদেবী ছোট ছোট করে মাছের টুকরো করে রান্না করলেন। ছেলে খেতে বসে বলল — মা, মাছের টুকরোগুলো এতো ছোট কেন?
রিমা দেবী হাসলেন — ছোট করে মাছ কাটলে সেগুলো কম তেলে ভালো ভাজা করা যায়। বেশি তেল খাওয়া শরীরের জন্য খারাপ। প্রতাপবাবু ছেলের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলেন, তিনি জানেন কথাটার আসল কারণ। রাতে প্রতাপবাবু মাসের খরচের হিসাব লিখতে লাগলেন। তার কপালের ভাঁজ আরো গভীরতর হল। স্ত্রী পাশে এসে বললেন — অনেকে তো শুনেছি অফিসে ওভারটাইম করে, তোমাদের অফিসে কি ওভারটাইম করা যায় না ? প্রতাপবাবু বললেন – এটা কি কোম্পানি নাকি সরকারের অফিস। আট ঘন্টাই কাজ করো আর ২৪ ঘন্টাই কাজ করো, বেতন এক টাকাও বাড়বে না। দেখি কি করা যায় …
কিছুক্ষণ নীরবতার পর মিলি এসে বাবার পাশে বসল, তার হাতে ছোট্ট একটি খাম। সেটা বাবার হাতে দিয়ে মিলি বলল — বাবা এটা তোমার জন্য। প্রতাপবাবু খাম খুলে দেখলেন তার ভেতরে কিছু টাকা। জিজ্ঞেস করলেন — এগুলো কীসের টাকা ? মিলি মাথা নীচু করে বলল — স্কুলের টিফিন খাওয়ার জন্য তুমি যে টাকা দাও সেগুলো আমি খরচ করিনি। টাকাটা বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। প্রতাপবাবুর বুকটা কেমন করে উঠল। তিনি মেয়েকে কাছে টেনে বললেন — এই টাকাগুলি রাখ্, তোর দরকার হবে। আর কে বলেছে স্কুলের টিফিন না খেয়ে টাকা বাঁচানোর জন্য ? কাল থেকে টিফিন খাস্।
মিলি মাথা নাড়ল, না বাবা আমাদের সবার জন্যই এখন টাকা দরকার। ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল…
প্রতাপবাবু জানালার বাইরে তাকালেন — রাস্তার ওপারে স্ট্রিটলাইট জ্বলছে, রাস্তায় দামি দামি গাড়ি চলছে। সব কিছুই যেন তার নিজের সাথে বেমানান মনে হল। তার মনে হল দাম শুধু বাজারের পণ্যে বাড়ছে না, দাম বাড়ছে মানুষের স্বপ্নেরও। আগে যে পরিবার নিয়ে তিনি মাঝে মাঝে বাইরে খেতে যেতেন, ঘুরতে যেতেন, এখন সেই টাকায় সংসারের সবজি কিনলে আনন্দ পাওয়া যায়। পরদিন সকালবেলা প্রতাপবাবু আবার বাজারের থলি নিয়ে বাজারের দিকে রওনা দিলেন। রিমাদেবীর বাজারের লিস্ট আজ অনেকটাই ছোট। এত ছোট লিস্ট দেখে জিজ্ঞাসা ভরা চোখে প্রতাপবাবু তাকাতেই স্ত্রী বললেন আজ শুধু দরকারি জিনিসগুলির লিস্ট দিয়েছি। মাসটা কোনভাবে কাটিয়ে দিতে হবে। কথাটা শুনতে শুনতেই প্রতাপবাবুর চোখ পড়ল টেবিলের উপর রাখা মিলির খামে। মেয়েটি নিজে না খেয়ে যে টাকা জমিয়ে ছিল সেটাই যেন তার বুকের ভিতর আগুন ধরিয়ে দিল। বাজারের থলি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন বাজারের উদ্দেশ্যে।
বাজারে বিভিন্ন জিনিসপত্রের দাম করতে করতে হঠাৎ চোখে পড়ল এক বৃদ্ধা হাতে অল্প কিছু টাকা নিয়ে বারবার হিসাব করছেন।
— বাবা এক কেজি চাল দাও তো।
দোকানদার বলল, এতে এক কেজি হবে না, মাসিমা।
বৃদ্ধা কাঁপা গলায় বললেন — ঠিক আছে বাবা যা হয়, তাই দিয়ে দাও।
প্রতাপবাবুর বুকের ভেতর যেন কিছু একটা খেলে গেল। তিনি নিজের ব্যাগ থেকে টাকা বের করে বললেন উনার চালের দামটা আমি দিয়ে দিচ্ছি, উনাকে এক কেজি চাল দিয়ে দাও।
বৃদ্ধা অবাক হয়ে তার দিকে তাকে জিজ্ঞেস করলেন — তুমি কে বাবা ? প্রতাপবাবু মৃদু হেসে বললেন — আমি, ধরে নিন আপনাদেরই একজন।
সেদিন বাজার থেকে ফিরে তিনি রিমাদেবী আর সন্তানদের সব কথা খুলে বললেন। তারপর বললেন — আমরা প্রত্যেকে আলাদা আলাদা দাম বাড়ার সাথে লড়ছি, তাই সবাই হারছি, হয়তো সবাই মিলে একসাথে দাঁড়ালে কিছু একটা করা যাবে।
পরেরদিন তিনি পাড়ার মানুষদের সবাইকে ডাকলেন। প্রথমে দশজন এলো, তারপর কুড়িজন, তারপর প্রায় গোটা পাড়া। প্রতাপবাবু বললেন — আমরা কারো বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে আসিনি। আমরা শুধু জানতে চাই কেন একই জিনিসের দাম প্রতিদিন বাড়ছে? কোথায় কোন জিনিসটার কত দাম তার হিসেব আমরা রাখবো, অযৌক্তিক দাম দেখলে আমরা সবাই মিলে প্রতিবাদ করব আর পাড়ায় যাদের সামর্থ্য আছে তারা মিলে দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য ন্যায্য মূল্যের বাজার চালু করব। কথাগুলো শুনে সবাই একমত হল। ঠিক তখনই তাদের পাড়ারই এক ব্যবসায়ী এগিয়ে এল। সে রেগে গিয়ে বলল — বেশি কথা বলবেন না, বাজার কীভাবে চলে সেটা আপনাদের জানার দরকার নেই। প্রতাপবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর পকেট থেকে একটা ছোট ডায়েরি বের করলেন — বাজার কীভাবে চলে সেটা আপনারাই বুঝুন, কিন্তু মানুষের পেট কীভাবে চলে সেটা আমরা বুঝি। ভিড়ের মধ্যে কানাঘুষা শুরু হল। প্রতাপবাবু ডায়েরি সবাইকে দেখালেন — এতে গত তিন মাসের চাল, ডাল, তেল আর সবজির দাম লেখা আছে আর লেখা আছে কোন দোকান কত দামে কিনেছে, আর কত দামে বিক্রি করেছে। এতে কৃষকরাও ঠকছে আর আমরাও। আমরা কারো ব্যবসা বন্ধ করতে চাই না, কিন্তু সাধারণ মানুষের দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে যদি কেউ অন্যায় লাভ করে তাহলে আমরা চুপ থাকবো না। কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাড়ার মানুষ সবাই সহমত জানাল। পাড়ার ব্যবসায়ীটি এবার চুপ হয়ে গেল।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পাড়ার সকলের তত্ত্বাবধানে শুরু হল সমবায় বাজার। পাড়ার শিক্ষিত বেকাররা অল্প লাভে নিজেরাই এর দায়িত্ব নিল। কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য আনা হলো অযথা মধ্যস্বত্বভোগীর খরচ কমল। পাড়ার মানুষও বুঝল শুধু অভিযোগ বা আন্দোলন করলে দাম কমে না, নিজেদের ব্যবস্থা নিজেরাই করতে হয় সবাই এক হয়ে।
এক মাস পর প্রতাপবাবু আবার বাজারের অবস্থা বোঝার জন্য বাজারে গেলেন। দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন — এক কেজি আলু কত করে? দোকানদার দাম বলল। প্রতাপবাবু অবাক হয়ে গেলেন, দাম আগের চেয়ে কম। বাড়ি ফিরে তিনি ব্যাগটা স্ত্রীর হাতে দিলেন। রিমাদেবী জিজ্ঞেস করলেন — আজ এত হাসছো কেন ? প্রতাপবাবু বললেন — আজ শুধু বাজারের দাম কমেনি, মনে হচ্ছে আজ আমাদের অসহায়ত্বের দামটাও কিছুটা কমেছে। মিলি দৌড়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
জানালার বাইরে ততক্ষণে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। অনেকদিন পর সেই বৃষ্টির শব্দ প্রতাপবাবুর কাছে শুধু বৃষ্টির শব্দ বলে মনে হল না, মনে হল মূল্যবৃদ্ধির শহরে মানুষের বুকের উপর জমে থাকা ভস্মের উপর যেন স্বস্তির জল পড়েছে। দাম বাড়ার বিরুদ্ধে প্রতাপবাবুর লড়াই পুরোটা হয়তো শেষ হয়নি কিন্তু এই লড়াইয়ে তিনি এখন আর একা নন।