ছোটগল্প

ঈশানকোণ একটি সাহিত্যের ওয়েবজিন শরৎ পর্যায় অগাস্ট-সেপ্টেম্বর ২০১৭ ইং 

সুকান্ত কিংবা শুভর জগৎ 
সদানন্দ সিংহ


ইদানীং সুকান্তর মগজের মনিটারে মাঝে মাঝে কীসব সংখ্যা ফুটে ওঠে। দুশো পঞ্চাশ প্লাস এক হাজার পাঁচশো প্লাস চার হাজার দুশো প্লাস আটশো সত্তর ...... ইত্যাদি ইত্যাদি। এইভাবে শুধু প্লাসের পর প্লাস। তারপর হয়তো একসময় ‘... কতো’? উত্তরটা কিন্তু আর মনিটারে ফুটে ওঠে না। এই উত্তরটার জন্যে সে যে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, তাও না। তবে এটা তো ঠিক, নিজের মনে আসা যে কোনও প্রশ্নের উত্তর সবারই জানতে ইচ্ছে করে। কেউ হয়তো প্রবল বেগে, কেউ উদাসীনভাবে। আর সুকান্ত এর কোনোটার মধ্যেই নেই। উত্তরটা তার জানার ইচ্ছে আছে, ব্যস এইটুকুই।
স্কুলে সুকান্ত অঙ্কে মোটেই কাঁচা ছিল না। মনে আছে, একবার ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষায় সে অঙ্কে লেটার মার্ক পেয়েছিল। অন্যসময়েও সে সবসময় শতকরা পঞ্চাশের ওপর মার্ক পেয়েছে বরাবর। যোগ অঙ্কে তার খুব কমই ভুল হয়েছে। তারপর স্কুল ছেড়েছে কতগুলো দশক হয়ে গেল। শুধু হঠাৎ ইদানীং মাঝে মাঝে এইসব কেমন সংখ্যাগুলো ফুটে উঠছে। কিন্তু যোগফল সে আর খুঁজেই পাচ্ছেনা।
রাত এখন বারোটার ওপর। সুকান্ত ফেসবুক খুলে বন্ধুদের কিছু পোস্টিং দেখে লাইক-কমেন্ট করার পর সে প্রয়োজনীয় একটা ইমেল পাঠায়। তারপর সে তার ডেস্কটপ কম্পিউটারটা বন্ধ করে দেয়। সুকান্ত জানে, তার অর্ধাঙ্গিনী নীলিমা এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সে যখন নীলিমার কাছে শুয়ে পড়বে তখন তার অর্ধাঙ্গিনীটি মোটেও টের পাবেনা। তারপর একসময় হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে হয়তো জিজ্ঞেস করবে, কখন এলে ? আর বলার সঙ্গে সঙ্গেই আবার ঘুমের ভেতর তলিয়ে যাবে।
সুকান্ত উঠে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। রেফ্রিজারেটার থেকে ঠাণ্ডা জলের বোতল বের করে ঢক্‌ঢক্‌ করে জল খায়। জলটা বেশ ঠাণ্ডা। গলা দিয়ে জল নামার সময় সে গলার ভেতরে একটা চিনচিন বেদনা টের পায়। ঠাণ্ডা জল খেলে তার সবসময় এমন হয়। তবু সে খায়।
এবার সে শুভর ঘরে যায়। শুভ তার বিছানায় দেয়ালের দিকে মুখ করে ঘুমিয়ে আছে। বিছানার সঙ্গেই তার পড়ার টেবিল। টেবিলের ওপর শুভর ডায়েরি খোলা অবস্থায় পড়ে আছে। এই ডায়েরিটিই শুভ কিছুদিন আগে তার কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছিল। সিলিং ফ্যানের তীব্র হাওয়ায় ডায়েরির পাতাগুলি এলোমেলো খুলে যাচ্ছে। সুকান্ত ডায়েরিটি বন্ধ করতে গিয়ে হঠাৎ ডায়েরির এক পাতায় কার্টুনের মতো দুটো ছবি দেখতে পায়। সুকান্ত ডায়েরির পাতাটাকে হাতে চেপে ছবি দুটোকে দেখতে থাকে। ছবিগুলির একটি পুরুষের এবং অন্যটি নারীর। পুরুষ ছবিটির পাশে লেখা আছে, বাবা তুমি কেমন ? আর নারী ছবিটির পাশে লেখা আছে, মা কেমন ভালো ? ছবি এবং লেখাগুলির মাধ্যমে শুভ ঠিক কী বোঝাতে চাইছে, সুকান্ত বুঝতে চেষ্টা করে। একসময় ডায়েরিটি বন্ধ করে সুকান্ত নিজের ঘরে চলে আসে এবং আলো নিভিয়ে নীলিমার পাশে শুয়ে পড়ে। যথারীতি নীলিমা কিছুই টের পায় না।
সুকান্তর চোখে সঙ্গে সঙ্গে ঘুম আসেনা। শুভ তাদের একমাত্র ছেলে। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে সে সবেমাত্র ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ঢুকেছে। সে তার ছেলের সঙ্গে এতোকাল যাবৎ ঠিক বন্ধুর মতো ব্যবহার করে এসেছে। ছেলেকে এখনও কোনোদিন তেমনভাবে বকেনি। কোনও কোনও সময় দরকারে মৃদু ভর্ৎসনা মৃদু বকা দিয়েছে। ওইটুকুই। তারপর ওই মৃদু বকাবকির পর সঙ্গে সঙ্গেই আবার বন্ধুর মতো গলা জড়িয়ে ধরেছে। শুভও মাঝে মাঝে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে কথা বলে, আবদার করে। তবে নীলিমা প্রায়সময়েই ছেলেকে বকাবকি করে একটা শাসনের মধ্যে রাখতে চায়। এটা নিয়ে অনেকবার তার আর নীলিমার মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়েছে।
তবে ইদানীং সুকান্ত দেখেছে শুভ মাঝে মাঝে নিজস্বভাবে কীসব চিন্তা করে। কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে সুকান্ত ছেলেকে খারাপ বন্ধু, ড্রাগস্‌, এমন কি এইডস নিয়েও সতর্ক করেছে। উত্তরে শুভ শুধু বলেছে, বাবা তুমি কোনো চিন্তা কোরো না। আমি এখন শিশু নই। এরপর সুকান্ত এসব নিয়ে আর কথা বাড়ায়নি। তবে তিনদিন আগে ছেলের গালে আঙুলের লাল দাগ দেখে আবার সে উদ্বিগ্ন। জিজ্ঞেস করলে ছেলে তো প্রথমে কিছুই জানাতে চায়নি। পরে বাবার পীড়াপীড়িতে বাধ্য হয়ে শুভ জানায় যে কলেজের এক সিনিয়র দাদা নাকি চড় মেরেছে বইয়ের ব্যাগকাঁধে কলেজে গিয়েছিল বলে। সুকান্ত বুঝতে পারে, র‍্যাগিং-এর নামে কলেজের সিনিয়র ছাত্রেরা নতুন ছাত্রদের উপর অত্যাচার চালাচ্ছে। বাবার উদ্বিগ্ন মুখ দেখে শুভই আবার জানায়, চিন্তার কিছু নেই। এজন্যে তোমাকে কোথাও যেতে হবে না। আমি এবং আমার বন্ধুরা মিলে কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত কমপ্লেন করে এসেছি। কথাগুলি শুনে সুকান্তর টেনশন বেড়ে যায়, বলিস কী! এরপর কি তোকে সিনিয়ররা ছেড়ে দেবে ? সঙ্গে সঙ্গেই শুভ আবার জানায়, আমাদের কমপ্লেন পেয়েই একটা এনকোয়ারি কমিটি গঠিত হয়েছে। দ্যাখো এবার, অত্যাচারী সিনিয়র দাদাদের কী শাস্তি হয়। বাবা, আমি আর আমার বন্ধুরা মিলে ঠিক করেছি র‍্যাগিং নামের কলঙ্কটাকে আমরা মুছে দেবার চেষ্টা করব। আর ভয় ? আমরা কাউকেই ভয় পাইনা এখন। তুমি শুধু শুধু চিন্তা কোরো না এখন।
পিতার মন সুকান্তের। চিন্তা আরো বেড়ে যায়। নীলিমাকে ঠাণ্ডা মাথায় সব খুলে বলতে হবে। তবে ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে সে টের পায়, শুভর চোখে সুগভীর এক দৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা যাতে শুভর নিজস্ব বিচার এবং বুদ্ধির ব্যবহারে এক নিজস্ব জগৎ তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। সেখানে হয়তো সুকান্তের আর দরকার পড়বে না। সুকান্ত কিছু করতে চাইলেও হয়তো কিছু করা যাবে না।
সুকান্তর মনে পড়ে, শুভ বছরখানেক আগে একদিন বলেছিল, বাবা আমি একটা গল্প লিখব। খুশি হয়ে সুকান্ত বলেছিল, কী গল্প ? শুভ বলেছিল, গল্পটা হল খুব খারাপ একটা লোকের। একটা নির্জন দ্বীপে সে বন্দি হয়ে পড়বে। কিন্তু সেখানে তো লোকজন নেই, তাই সে আর খারাপ কাজও করতে পারছে না। কারণ সে যা করে কেঊ তো তাকে আর খারাপ বলছে না।
-- বাঃ, তারপর ?
-- তারপর সে দ্বীপটাকে ভেঙে টুকরো টুকরো করার জন্যে চেষ্টা চালিয়ে যাবে। শেষে বৃদ্ধবয়সে লোকটা বুঝতে পারবে তার জীবনটাই বৃথা।
-- খুব ভালো। লেখো, লেখো।
সুকান্ত তখনই বুঝেছিল শুভর একটা নিজস্ব দর্শন ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। এবং আস্তে আস্তে তা পরিপূর্ণতা লাভ করছে।

চোখে একটু ঘুমের ঘোর লেগেছে মাত্র । ঠিক এইসময় সুকান্ত পরিষ্কার শুভর গলা শোনে, বাবা। চোখ খুলে সে দেখে লাইট অন্ করে শুভ সামনেই দাঁড়িয়ে। সে একটু অবাক হয়ে উঠে বসে। জিজ্ঞেস করে, কী।
-- বাবা, আমি একটু বেরুচ্ছি।
শুভর কথা শুনে সুকান্ত আরও অবাক হয়। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকায়। রাত একটা বেজে গেছে।
শুভ যেন একটু ধরা গলায় বলে, বাবা, তুমি তো জয়কে দেখেছিলে। আমাদের বাড়িতে কয়েকবার এসেছিল। কিছুক্ষণ আগে ফোনে জানলাম, জয় আজ মারা গেছে। আমার বন্ধুরা সবাই জয়ের বাড়ি যাচ্ছে। আমিও যাচ্ছি।
মনে পড়ে যায় সুকান্তর। জয় আর শুভ একসঙ্গে স্কুলে পড়েছিল। স্কুলের পর জয় অন্য একটা কলেজে ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু যোগাযোগ ছিল ওদের মধ্যে। লম্বায় প্রায় ছ’ফিটের কাছাকাছি, সুন্দর, প্রাণচঞ্চল ছেলেটা আজ মারা গেছে ! সুকান্তর ঠিক বিশ্বাস হয়না। বলে, সত্যি তো ?
-- সত্যিই বাবা। আজ ওর একটা পরীক্ষা ছিল কলেজে। বাড়িতে এসে নাকি বমি করেছিল। তারপরেই সব শেষ। অথচ ওর বাবাই ডাক্তার। আমি বেরুচ্ছি বাবা।
সুকান্তর বলার কিছুই ছিল না। শুধু জিজ্ঞেস করে, আমি কি তোমার সঙ্গে যাব ?
-- না বাবা। আমার জন্যে সৌম্য বাইক নিয়ে রাস্তায় অপেক্ষা করছে।
-- ঠিক আছে, যাও। সঙ্গে মোবাইল ফোনটা নিয়ে যেও।
-- আচ্ছা।
শুভ দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। সুকান্ত দরজা বন্ধ করে দেয়।

ধীরে ধীরে রাত বাড়তে থাকে। সুকান্তর চোখে আর ঘুম আসেনা। ড্রয়িং রুমে বসে সে টিভির স্যুইচ অন্ করে সাউন্ডটা মিউট করে দেয়। ন্যাশেনাল জিওগ্রাফির চ্যানেল চলছে। একটা সিংহ তীব্র বেগে দৌড়োতে দৌড়োতে এসে লাফ মেরে একটা বাইসনের গলা কামড়ে ধরেছে। বাইসনটা নিচে গড়িয়ে পড়েছে। আরেকটা চ্যানেল পাল্টায় সে। একটা সোপ অপেরা চলছে। এগুলো আবার নীলিমার প্রিয় চ্যানেল। তার মোটেই ভাল লাগেনা। সে অনবরত চ্যানেল পাল্টাতে থাকে। শেষে টিভির স্যুইচ অফ্ করে দেয়।
ঘন্টাখানেক পর সুকান্ত শুভকে ফোন করে। শুভ তখন শ্মশানে। তারপর ক্লান্ত সুকান্ত ড্রয়িংরুমের সোফায় শুয়ে পড়ে। আস্তে আস্তে তার দু চোখ বুজে আসে।
একসময় কলিংবেলের টুংটাং আওয়াজে সুকান্তর ঘুম ভেঙে যায়। রাত তখন প্রায় তিনটে। তাড়াতাড়ি উঠে সে দরজা খুলে দেয়। বিধ্বস্ত অবস্থায় যেন শুভ সামনে দাঁড়িয়ে। সে শুভর মনের অবস্থা সহজেই অনুমান করে নেয়। কীভাবে সান্ত্বনা দেবে সে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। শুধু বলে, যা হবার তা তো হয়ে গেছে। আমারও খুব খারাপ লাগছে। সব কথা পরে শুনছি। শ্মশান থেকে এসেছ, বাথরুমে ভালো করে স্নান সেরে নাও। শার্ট-প্যান্ট বাথরুমে ভিজিয়ে রেখে এসো। একটা গামছা এনে দিচ্ছি।
কিছুক্ষণ পর শুভ স্নান সেরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে। ধীরে ধীরে নিজের ঘরে চলে যায়। সুকান্ত শুভর ঘরে যায়। শুভ একটা বারমুডা প্যান্ট পরে নিয়েছে ইতিমধ্যে। সুকান্ত কাছে গিয়ে শুভর পিঠে হাত রাখতেই হঠাৎ শুভ হু-হু করে কাঁদতে থাকে আর বলতে থাকে, জয়ের শরীরটা আগুনের ভেতরে জ্বলতে জ্বলতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। দু’দিন পরেই ওর জন্মদিন ছিল। আমাদের সবাইকে একটা ভালো রেস্তরাঁয় খাওয়াবে কথা দিয়েছিল। হঠাৎ কী যে হয়ে গেল! মৃত্যু ব্যাপারটাই খুব খারাপ বাবা। সবকিছু হারিয়ে যায়।
সুকান্ত বুঝতে পারে এই মৃত্যুর ঘটনাটা শুভর কাছে সর্বপ্রথম এক প্রিয়জনের মৃত্যুর অভিজ্ঞতা। ছেলেকে কাছে টেনে নিয়ে সে বলে, মৃত্যু আমাদের অপরিহার্য অঙ্গ। এটাই জগতের নিয়ম। এটাকে গ্রহণ না করে উপায় নেই আমাদের। জয় বড় ভালো ছেলে। আমাদের স্মৃতিতে ও চিরদিন থাকবে।
শুভ তবু হু-হু করে কাঁদতেই থাকে। সুকান্ত বেশ বুঝতে পারে, পৃথিবীর সব জাগতিক অভিজ্ঞতাকে নিজস্বভাবে গ্রহণ করে শুভর একটা নিজস্ব জগৎ তৈরি হয়ে গেছে। এই নিজস্ব জগৎটা একদিন ধীরে ধীরে বড় হয়ে পৃথিবীর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে।
এইসময় সুকান্ত টের পায়, তার মগজের মনিটারে আবার কীসব সংখ্যার যোগ ফুটে উঠতে শুরু করেছে। আর আশ্চর্য, যোগগুলির যোগফলও এবার টপাটপ মিলে যাচ্ছে।
                                                                                                                                     HOME

এই লেখাটা শেয়ার করুন