ছোটগল্প

ঈশানকোণ একটি সাহিত্যের ওয়েবজিন জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি-মার্চ ২০১৮ ইং 

ব্রিজ ধ্বসে যায়
দীপঙ্কর সাহা  

সারা ব্রিজ থরথর করে কাঁপে। নদী ও প্রকৃতি স্তব্ধ। ঐ মুহূর্ত সুনন্দ অনুভব করে পদ্মাসনের মাঝে --- চলচ্চিত্রে দেখা দৃশ্যের মতো ব্রিজ উড়ে যাচ্ছে ভয়ানক শব্দে!
সুনন্দ বুক চেপে মাটিতে ঝুঁকে পড়ে।
ঠিক সেই মুহূর্তে পায়ের শব্দ হয়, বাতাস ভারী ঠেকে --- শুকনো পাতায় সর্‌সর্‌ শব্দ।
সুনন্দ মাথা তুলেই বুঝতে পারে কে এসেছে!
এরপর আমাদের প্রিয় উত্তেজনা ও জুলুমের দৃশ্য!
আকাশ ফাটানো হাসি ও মিছিলের ঝড়!
বাঁ হাতটা রক্তে ভেসে যায়, দুটি ডুমো মাছি ভনভন করে উড়ছে। ভোরের প্রথম আলো ধানক্ষেত ও নদী শুয়ে আছে পরম মমতায়।
সুনন্দ ঘুমচোখে দেখতে পায়, এক পাক দু’পাক খেয়ে কমলা রঙের হেলিকপ্টারটা --- সবুজ ধানক্ষেত ছাড়িয়ে অনেক উঁচুতে অদৃশ্য হয়ে যায়।
একবার ব্রিজ পার হতে গিয়ে সুনন্দ --- প্রায় মাঝামাঝি আসার পর হেলিকপ্টারের আওয়াজ তীব্রতর হতে থাকলে সে ঘুরে দাঁড়ায়, চকিতে দেখতে পায় হেলিকপ্টার থেকে ঝোলানো দড়ির সিঁড়িতে একজন লোক ঝুলে আছে। আর হেলিকপ্টারটা কালো ভ্রমরের মতো রিজ ঘিরে পাক খেতে থাকে। সুনন্দ ভাবে, হেলিকপ্টার থেকে নিশ্চিত লোকটি ব্রিজে নামার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। সে ভয় পায় আর ব্রিজ দুলে ওঠে। টলোমলো শরীরে ঝুঁকে পড়ে ব্রিজের রেলিং ধরে। সুনন্দ দেখতে পায় নদীর স্রোত স্তব্ধ হয়ে আছে। একটু দূরে স্টিমারের ডেকে একজন সারেঙ্গী দড়ি বেঁধে বালতি ছুঁড়ে দিছে নদীতে। জল তুলছে সাদা ফেনাময় আর ঢালছে নিজের গায়ে।

ব্রিজ ভেঙে যাবার পর সুনন্দ অনেকক্ষণ কোন কথা বলতে পারেনি।
নদী স্তব্ধতার কালো আঁচল বিছিয়েছে। চরাচরে কোন শব্দ নেই। রাত্রির আশঙ্কা ও মিতিচ্ছন্নতা সুনন্দ টের পায়। সে উঠে দাঁড়ায় শিরদাঁড়া সোজা করে। একটি নক্ষত্র সেসময় খসে পড়ে নদীর ভেতরে।

ব্রিজ গড়ে তুলতে সুনন্দ একঘন্টা সময় নিয়েছে। স্বেদবিন্দু সুনন্দের পেশি-কপালে। শিশির পড়ছে একটানা তরমুজ ক্ষেতের ভেতর। ভোরের আভাতে সোনালি ব্রিজ যেন উজ্জ্বল বীণা।
সুনন্দ আর দেরী করেনা। কাঁচকাটা বাতাসের ভেতর ব্রিজে এসে যখন সে পা রাখে --- ঝাঁকে ঝাঁকে স্মৃতি তাকে তাড়া করে আনে ব্রিজের মাঝ অবধি। হাঁটা থামিয়ে সুনন্দ এবার মুখোমুখি হয়!
ব্রিজে কিছুক্ষণ থাকলেই – কতো কথা মনে পড়ে। মানুষের গড়া ইতিহাস কালিমালিপ্ত --- কেমন ধূসর অবয়বহীন --- আধো জাগরণ!
সুনন্দ ঘোরের ভেতর ব্রিজ পার হতে থাকে।
কালো অজগরের মতো মিছিল আসছে এইদিকে। ব্রিজের শেষমাথায় কালো ধোঁয়া উড়ছে। ঘোর কেটে গেলে সুনন্দ আচমকা তীব্র শিস দেয় – ব্রিজ ফুঁড়ে বুলেটের গতিতে একজোড়া কুত্তা লাফায়। মাথার ভেতর বিপ্‌ বিপ্‌ আওয়াজ, এটেনশানের ভঙ্গিমায় কোমরবন্ধে হাত চালায় সে এবং এগিয়ে যায় কালো অজগরের সামনে।
সেই সময় একজন পুলিশ অফিসার এগিয়ে আসে। সুনন্দ তাকে না দেখার ভান করে। সময় অনন্ত প্রবাহিনী। জুতোর মচমচ শব্দ আশঙ্কার মতো এগিয়ে আসছে। ব্রিজ থেকে অনেক দূরের আলোকশিখা দেখতে গিয়ে সুনন্দ টের পায় --- পুলিশ অফিসার তার পাশে দাঁড়িয়ে। বাতাস সজলতায় চোখেমুখে ঝাপটাচ্ছে। রণক্লান্ত সৈনিকের মতো সুনন্দ পাশ ফেরে। সে বলে, কোথায় যাবেন? চলুন।
                                                                                                                                     HOME

এই লেখাটা শেয়ার করুন