
ছন্দপতন
অর্জুন শর্মা
যেখানে সেখানে যখন তখন যার তার সঙ্গে পেরপেরির স্বভাবটা গেল না মনোহরের। মহিমা বলে, “যার হয় নাই নয়-এ, তার হবে না নয় নং একাশিতে।” মনোহর টিপ্পনি কাটে, “একাশির বাকি এখনও নয় দু’গুণে আঠারো বছর। দেখো, একাশির পর ঠিক হবেই হবে।” স্ত্রীকে আগে অর্থাৎ মহিমের জন্মের পর ‘মহিমের মা’ বলে ডাকত। একদিন ‘মহিমের মা’কে সন্ধি করে ‘মহিমা’ করে দিল মনোহর। বলল, “তুমি তো আসলে মহিমাময়। তোমার মহিমায় আমি মুগ্ধ, ধন্য, আপ্লুত।” এতটুকু শুনে মহিমের মা না হেসে থাকতে পারে না। মনোহর এরপর যোগ করল, “আরও আছে, আরও আছে, তোমার মহিমায় আমি একাধারে বিপর্যস্ত ও হাড়ে হাড়ে বিধ্বস্ত।” এবারে মহিমের মা বালিশ নিয়ে তেড়ে আসে।
এসব বহুবছর আগের কথা। বিয়ের অব্যবহিত পরের বছরগুলিতে অর্থাৎ ‘হ্যাঁগো ওগো’র যুগে মহিমের মা-কে জনান্তিকে রূপসী, রুপো, রুপি এমনকি রুপিয়া বলেও ডেকেছে। ‘হ্যাঁগো ওগো’টা অন্যকে শুনিয়ে ডাকা হত। আসল নাম রূপশ্রী ডাকাই হল না। রুপিয়া বলে ডাকলে বালিশের যুদ্ধ শুরু হয়ে যেত। মহিমের জন্মের পর থেকে এক একটা বছর পার হল আর ওইসব পাগলামিও এক এক করে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। হারায়নি শুধু ‘পেরপেরিটা’। এই ‘পেরপেরি’ শব্দটাও মহিমার ডিক্সনারির। কী করবে মনোহর ? কথা না বলে যে থাকতে পারে না ! সে সদাহাস্যময়, অজাতশত্রু। স্কুল, কলেজ, অফিস, বাজার, সর্বত্রই সে বকবকানির তকমা পেয়েছে। কলেজ বন্ধুরা বলত ‘কথার অয়্যারহাউজ’। সুযোগ পেলেই তাকে ঘিরে জটলা বসে যেত। অপিরিচিতকে আপনার করে নিতে তার দু’মিনিটও লাগত না। প্রাণের বন্ধু সুপ্রিয়’র সঙ্গে পরিচয় শুরু এক অদ্ভুতভাবে। কলেজের দ্বিতীয় দিন। প্রথম পিরিয়ডের পর দলবেঁধে সকলে অন্য বিল্ডিং-এ যাচ্ছিল। মনোহর হঠাৎ পেছন থেকে হাঁক দিল, “এই মহাদেব, মহাদেব ?” উচ্চ কন্ঠে ‘মহাদেব’ শুনে সকলে পেছনের দিকে তাকালে মনোহর একজনকে ইঙ্গিত করে বলল, “আমি তোমাকে ডাকছি, লাল গেঞ্জি।” কাছে গিয়েই বলল, “জানি তোমার নাম মহাদেব নয়, কিন্তু তোমাকে আমার খুব ভালো লেগে গেছে। নামটা না হয় ভুলই বললাম, কিন্তু মানুষটা তো তুমিই !” ছেলেটি না হেসে পারে না। করমর্দন করে, একসঙ্গে হাঁটে, গল্প করে, বন্ধু হয়ে যায় সুপ্রিয়।
কলেজ ক্যান্টিনের চালক মোহরের বাড়ির খবর শুধু মনোহরই জানে। মোহরের বড়ো মেয়েটা পোলিওর শিকার হয়ে অচল। মুখটা দুর্গা প্রতিমার মতো। মেয়েকে নিয়ে মোহরের ঘুম নেই দু’চোখে। মনোহর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে এসব জেনেছে। কিছুদিনের মধ্যেই মনোহরকে নিমন্ত্রণ করে বাড়ি নিয়ে গেছে মোহর।
ল্যাবোরেটরির এটেন্ডেন্ট পঞ্চাশোর্ধ মণিদাকে বন্ধুরা নাম দিয়েছিল ‘মাইকেল ফ্যারাডে’। মণিদা কারও সঙ্গে মিশত না। চুপ করে এক কোণায় গালে হাত দিয়ে বসে থাকত। কেউ ডাকলে উঠে গিয়ে টেষ্টটিউব নেড়ে বলে দিত, এটা ফেরাস সল্ট বা এটা ক্যালসিয়াম সল্ট। মিলেও যেত হান্ড্রেড পার্সেন্ট। সেই মণিদার সঙ্গে লুকিয়ে বিড়ি খেত মনোহর। সাইকেলের ক্যারিয়ারে মণিদাকে চাপিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে অনেকদিন। শেষ ক্লাসের দিন মণিদা মনোহরকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেই দিয়েছিল।
পাঁচটা অফিসে চাকুরি করেছে মনোহর। প্রথম অফিসের দিন তো একটা কাণ্ডই হয়েছিল। তেইশ বছরের ছেলে রাশভারি বড়োবাবুর কাছে জয়েনিং লেটার জমা দিল। মেজবাবু অর্থাৎ ফণিবাবু স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলল, “জানিস তো সাতচক্র আবর্তন করে তারপর কেরানির জন্ম হয়, আর বসে বসে মাছি মারে !” ভীষণ বদমেজাজি বলে মেজবাবুকে কেউ ঘাটায় না। অথচ মনোহর প্রথম সাক্ষাতেই দুম করে মুখের উপর বলে দিল, “আমি মাছি টাছি মারতে পারব না। কী কাজ করতে হবে শিখিয়ে দেবেন। না শেখালে আপনাকেই জ্বালাব দিনরাত।” গ্রুপ ডি রতনদা আতঙ্ক-মাখা চোখে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তার ভয় এই বুঝি মেজবাবু দুধের বাচ্চাটাকে মুখ খারাপ করে একটা ধমক মারে। দেখা গেল মেজবাবু চোখ বড়ো বড়ো করে মনোহরের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। পরক্ষণেই বলল, “ওরে বাপরে, এ যে দেখছি এক্কেবারে ধানী লংকা, আমাকে দেখায় ডংকা ! এই রতন, তিনের দুই ফাইলটা আন তো। আর এই যে, কী যেন নাম যশোহর না মনোহর এদিকে এসে বসো। দেখি কেমন কাজ শেখার ইচ্ছে ! তালবেতাল করলে নাক দিয়ে দুধ নয়, এক্কেবারে রক্ত বের করে নেব।” রতন তো ভয়ে ভয়ে মনোহরের কাছে কাছেই ঘুরছিল। পরে মনোহরকে বলেছিল অনেকে নাকি মেজবাবুর কানমলাও খেয়েছে। মুখের ভাষা তো যা তা। তবে সেই প্রথমদিন কাজ শেষে মেজবাবু মনোহরকে নিজের বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল, থাকতে দিয়েছিল তিনদিন। নতুন বাসাবাড়িও ঠিক করে দিয়েছিল মেজবাবু। মেজবাবু এই প্রথম কাউকে বকাঝকা করেনি।
প্রমোশন পেয়ে শেষ পর্যন্ত একাউন্ট্যান্ট হয়েছিল মনোহর। সব অফিসের গ্রুপ ডি কর্মীরা ছিল তার খুব ন্যাওটা। শেষ অফিসের কানুকে তো টিফিন আওয়ারে সামনে বসিয়ে গল্প জুড়ে দিত। কারণ কানুর গল্পের স্টক ছিল সীমাহীন। কানুর সংসারের সব খবর জানত মনোহর।
এসব গল্প সব জানে মহিমা। তাই বলে পথে ঘাটে যার তার সঙ্গে জমিয়ে তুলবে আড্ডা ! উটি-তে বেড়ানোর সময় হোটেলের এটেন্ডেন্ট ছেলেটার সঙ্গে ভাব জমিয়ে নিল মুহূর্তেই। মহিমা কতবার সতর্ক করে বলেছে, “বিদেশ বিভুঁইয়ে যার তার সঙ্গে ভাব করা নিরাপদ নয়।” কে শুনে কার কথা ? সেই ছেলেটা তো একদিন ধরল বাবুকে তার বাড়ি যেতেই হবে ! কাছেই বাড়ি। তার মা বলেছে বাবুকে দেখবে। শেষে অনেক অজুহাত দেখিয়ে নিরস্ত করেছে মহিমা।
রিটায়ারমেন্টের পর এই রোগ যেন আরও বেড়ে গেছে। মাছওয়ালা, সব্জিওয়ালা, ডিমওয়ালা, পুরোনো কাগজওয়ালা – বাড়ি এলেই জুড়ে দেবে গল্প, বাড়ি কোথায়, কে কে আছে, দিনে কত রোজগার হয়, এসবে সংসার চলে কী করে — ইত্যাদি। লোকগুলিও যেন হিপনোটাইজড হয়ে কথার উত্তর দিতে মুখিয়ে থাকে। তাই বলে রিক্সাওয়ালার সঙ্গেও পেরপেরি করবে ? মহিমার ইচ্ছে করে মাঝপথে রিক্সা থেকে নেমে যেতে। বিয়ের পর থেকেই তো এইসব সহ্য করে আসছে। এখন অল্পেতেই রাগ উঠে যায়।
এক সন্ধ্যেবেলায় রিক্সায় চড়ে যাচ্ছিল। শুরু হল সেই রোগ। কোথায় তোমার বাড়ি, কত টাকা হয় একদিনে,আজ কত পেলে, সংসারে কতজন,এই টাকায় হয় – ইত্যাদি। রিক্সোওয়ালা সানন্দে উত্তর দেয় আর বলে, “সবই প্রভুর ইচ্ছে।” তারপর গান ধরে,
আরে রাখলে প্রভু ছাড়ে কে, এই দুনিয়ায় রবে কে ?
যেতে হবে একদিন জানি, দয়াল হৃদে তোমার নামখানি।
রিক্সা থেকে নেমে মনোহর টাকা দিতে গেলে লোকটি বলল, “দাদা, আপনি তো আবার ফিরবেন, যাবার বেলায় নেব।”
“আমার তো দেরি হবে,ডাক্তার দেখাব। ঘন্টাখানেক লাগবে।”
“তাহলে আমি ঘুরে এসে নিয়ে যাব।”
ঠিকঠিক এসেছিল এবং ফেরার পথে আবার গান,
গুরু এই দুনিয়ায় কোথায় মানুষ,সবই তো রঙিন ফানুস !
দম ফুরালে চুপসায় ফানুস, থাকিতে দম বুঝে না,
ও গুরু জোর থাকিতে বুঝে না, বল থাকিতে মানে না,
দুনিয়া এক আজব কারখানা।
রিক্সাওয়ালা দম নিয়ে বলে, “দাদা, বিরক্ত হচ্ছেন না তো ?” মনোহর সহাস্যে বলে, “আরে না, না, চালিয়ে যাও।” লোকটি দ্বিগুণ উৎসাহে ধরে,
জানে সে যাবেই চলে, যেতেই হবে
আজ না হয় কাল,
ও গুরু আলোর মতো সত্য, গুরু জলের মতো সত্য,
তবু করে হানাহানি, মারামারি, কাড়াকাড়ি হায়।
প্যাডেল ঘোরাতে ঘোরাতে লোকটি পদগুলিতে সুর লাগায়। একনাগাড়ে গায় না। দু’লাইন টান দিয়ে মনোহরের সঙ্গে কথা বলে। মহিমার অস্বস্তি লাগলেও মনোহর বলে, “বাঃ বাঃ, বেশ তো, চালিয়ে যাও।” বাড়ির সামনে রিক্সা থামিয়ে চালক বলে, “কেমন লাগল আপনার দাদা ? মনোহর বলে, তুমি খুব ভালো গাও। উৎসাহিত হয়েই লোকটি আবার টান দেয়,
দয়াল তোমার ইচ্ছা, তুমি সাচ্ছা, আমি মিছা,
তোমার সুতায় তুমি নাচাও, আমি নাচি…
মনোহর ভাড়া দিতে দিতে শোনে। মহিমা ঢুকে গেছে ঘরে। মনোহর লোকটিকে বলে, “এসো না ঘরে আরও দু’ এক পদ শুনি।” রিক্সাওয়ালা মহানন্দে ঢুকল। মনোহর বলে, “মনশিক্ষা শোনাও না একখানা।” বলতেই লোকটি শুরু করে দেয়। মহিমা বিরক্ত হলেও লোকটির গান শুনে কিছুটা ছাড় দেয়। মনে মনে লোকটির গলার তারিফ করে। যখন শুনল যে গানের কথাগুলিও লোকটি নিজে লিখেছে, তখন মহিমা সত্যিই অবাক হল। শেষে সামান্য জলপানেরও ব্যবস্থা করল। লোকটা বলল, “আমার নাম কিশোরলাল, সবাই বলে কিশোর কবি। আমার মোবাইল নম্বরটা রাখুন, যখনই কোথায়ও যেতে চাইবেন, আমাকে ফোন করলেই চলে আসব। আমার গান আপনি আগ্রহ করে শুনেছেন এটা আমার খুব মনে থাকবে।”
দিনে দিনে মনোহর কিশোর কবির অনেক তথ্য জানতে পেরেছে। একটা ছেলে কলেজে পড়ে। দিনের প্রথম অংশে কিশোর নিজের সবজিক্ষেত দেখাশোনা করে আর বিকেলের অংশে রিক্সা চালায়। যা পায় তা দিয়ে হাটবাজারের খরচ চলে যায়। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে কীর্তনের দলে ভিড়ে। এইসব আবিষ্কারের আনন্দে মনোহর আত্মহারা। একদিন কিশোরলাল রিক্সায় চাপিয়ে তাকে বাড়িও নিয়ে গিয়েছিল।
পুরোনো কাগজওয়ালা রবি তো মাসে একবার করে এসে দেখা করে যায়। অনেকক্ষণ বসে গল্প করে যায়। রবির মেয়ের বিয়েতেও গিয়েছিল মনোহর। মহিমা এসবে এখন আর বিরক্তি প্রকাশ করে না।
যতক্ষণ ঘরে থাকে ততক্ষণ মহিমার কানের পোকা খুলে নেয়। না শুনতে চাইলেও শুনতে হয়। মনোহরের সাফ কথা, “আমার রোজগারের টাকায় খাওয়া-পরা, আমার গল্প শুনবে না, পেরপেরি সহ্য করবে না তা হবে না !”
গত মাসতিনেক যাবৎ মাঝে মাঝে গলার ব্যথায় ভুগছিল মনোহর। কিশোরের রিক্সায় চড়ে ডাক্তারও দেখিয়েছে। মহিমাকে বলেছে, “কিশোর যখন আছে তোমাকে আর যেতে হবে না।” ডাক্তারের ওষুধেও কমেনি। মহিমা জোর করে ই.এন.টি. স্পেশালিষ্ট দেখিয়েছিল। দিন দিন গলার স্বরের জোর কমে আসছিল। ডাক্তার অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা করে যা বলল তা শুনে কিশোরও কেঁদে দিল। মহিমা নিশ্চুপ হয়ে গেল। ডাক্তার বলেছে মনোহরের ভোকাল কর্ডে মারাত্মক সমস্যা। ঔষধ দিয়েছে, তবে আপাতত সম্পূর্ণ ভোকাল রেষ্ট-এ থাকতে হবে। নতুবা বড়ো ধরনের বিপদ হয়ে যেতে পারে।
কিশোর প্রতিদিন সন্ধ্যায় একবার করে আসে। মনোহরকে গানও শোনায়। মনোহর নিঃশব্দে হাসে আর কিশোর চুপ করে কাঁদে।
সেদিন সন্ধ্যায় কিশোরের সঙ্গে রবিও এসেছিল। মনোহর নিঃশব্দে হাসছে। হাতের কাছে সর্বদা কলম আর প্যাড থাকে। মনোহর মহিমাকে লিখে দিল, “রবি আর কিশোরকে ভালো করে খাইয়ে দাও।” মহিমা টিফিন করে দিয়েছে দুজনকেই। কিশোর যথারীতি গান শুনিয়েছে। ওরা চলে গেলে মনোহর প্যাডে লিখল, “মহিমা, এই ভালো হল, কী বল ? একাশি হওয়ার আগেই পেরপেরিটা বন্ধ হয়ে গেল !” লেখা কাগজটা মহিমার দিকে বাড়িয়ে ধরে। লেখা পড়ে মহিমার দু’চোখ বেয়ে জলের ধারা নামল। মহিমা চোখ বুজে বলল, “একাশি নয়, একশোতেও যেন এমন না হয়। তুমি সারাদিন পেরপেরি করো, যার তার সঙ্গে যখন তখন যা খুশি বকবক করে যাও – ঈশ্বরের কাছে এই আমি চাই।” মনোহর হাত বাড়িয়ে মহিমাকে বুকে টেনে নেয়।