সাইকেল – বিল্লাল হোসেন

সাইকেল – বিল্লাল হোসেন

সাইকেল       (ছোটোগল্প)

বিল্লাল হোসেন

ঘুম থেকে ওঠেই জব্বার সাইকেলটা নিয়ে বসে। সাফসুতরো করে। জয়েন্টে জয়েন্টে নারকেল তেল লাগিয়ে একটু রোদে রাখে। সাইকেলটা তখন চকচক করে। জব্বার দাঁড়িয়ে তার রূপ দেখে। একমনে কথা বলে — তুই না থাকলে কি যেখানে সেখানে কাজের জন্য ছুটে যেতে পারতাম ! সংসারটা কি চলত? চলত না। পথঘাটের অবস্থা তো ভাল নয়। খুব কষ্ট হয় তোর, নারে !

রাস্তায় দাঁড়িয়ে তখন রাসমনি হাঁকে, কৈরে জব্বার ! দেরি হয়ে যাচ্ছে তো !
— আসছি, পাঁচটা মিনিট দাঁড়া।
— আয় আয়, শিগগির আয়। যেতে সময় লাগবে।

দশমাইল পাকাসড়ক। কোথাও গর্ত, কোথাও বেরিয়ে আছে হাড়-পাঁজরা। মূল সড়ক থেকে আরও আড়াই মাইল। টিলা আর জঙ্গল। উঁচু-নীচু খাড়া। বেজায় ঝক্কি ! সাইকেলটা তখন বোঝা হয়ে যায়। খাড়া টিলা বেয়ে ওঠার সময় পেছন থেকে ধাক্কায় রাসমনি। নামার সময় টান দিয়ে ধরে, গতি সামলায়। কখনও সাইকেলটা কাঁধে নেয় জব্বার। এরপর নিষিদ্ধ গাঁজাবাগান। দেশে তো কাজ নেই। শিক্ষিত ছেলেরা জেনে বুঝেও টাকা লগ্নি করে। খুব সাবধানে থাকতে হয়। পুলিসের হাতে পড়লেই জেল ! তবে মজুরি বেশি। সেই লোভে কেউ কেউ আসে। কাজ করতে করতে পরস্পর ঠাট্টা মশকারা করে। বলাই হাঁকে — কীরে জব্বার চুলে ছাঁট, গোঁফে তা ! জামাই জামাই ভাব ! ব্যাপারটা কী?
রাসমনি সুর মেলায়, হু, তার ঘরের মানুষ তেতো হয়ে গেছেরে বলাই ! তাই…। সন্দেহ গুরুতর।
পুলিন খোঁচা মারে মাঝখানে, তোর মতো সুন্দরী থাকতে জব্বারের আর চিন্তা কী?
রাসমনি পাল্টা মারে, হ্যাঁ’রে মুখপোড়া, আমার ঘরের তান গাঁজা খাইলেঅ তার চে হাজারগুন ভাল। আমারে সাইকেলে বয়ে নিতেই জব্বইরা হাপায়। তার সাইকেল কড়মড় করে।
সবাই হা হা করে হাসে। খানিকটা দূর থেকে কুমুদ গলা ছাড়ে, কী-রে জব্বর ! তোর দেহ সাইকেল….!
— দেহ সাইকেল রে, দেহ সাইকেল। কোন কারিগর দরদ মাইখ্যা বানাইছে। সাইকেলের মতই তার কারিগরি। একসময় শরীরের মতো সাইকেলটাও চলত। আমার মতো তার কলকব্জাও ছিল টাইটফিট। দিনে দিনে তার কলকব্জা লুজ হয়ে যাচ্ছে আমারই মতো।
বাগানের অন্যপ্রান্ত থেকে সুকুমার গান ধরে —
“মন আমার দেহ ঘড়ি সন্ধান করি
কোন মিস্ত্ররী বানাইয়াছে
মন আমার দেহ ঘড়ি…।”

কথায় কথায় কাজ এগোয় হু হু করে। সূর্য লাল হতে শুরু করে। জব্বার তাড়া দেয় — আজ তো হাটবার ! খরচাপাতি নিবি না? চল চল।
বাজারের কথা শুনে ক্ষোভ উগরে দেয় রাসমনি — আর বাজার ! হাত পুড়ে যায় ! প্রতি সপ্তায় দাম বাড়ে। বেঁচে থাকা মুশকিল !
কোদালে ভর দিয়ে বলাই ওঠে দাঁড়ায় — আমাদের বুকে জেগে থাকা আগুন আর বিক্ষোভ জানাবার কোন এজলাস নাই রে !
অভিযোগ বিবৃত করতে করতে তবু বাজারমুখী হয় খাটুরে মানুষগুলো।

মূল সড়কে নেমে রাসমনি লাফ দিয়ে ওঠে বসে। জব্বার হাঁটুতে জোর জমিয়ে প্যাডেল মারে। বডঢেপা হাট বেশি দূর না। ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে বহু শব্দের সমাহার; শোরগোল। শ্রোতারা যেন দিন দিন আরও বদির হয়ে যাচ্ছে ! তাই সাধ্যমতো সবাই আরও জোরে বলার চেষ্টা করে।
সাইকেল এগোয়। মানুষের কোলাহল ছাপিয়ে আসে মাইকের আওয়াজ। মনুফকিরের নামে ভিখ মাঙে। বাবার নাম শুনেই রাসমনি আবেগে গদগদ, তোর মনুফকির আমার মনুগোঁসাই। জাত কারে কয় জব্বার ! তোর ‘মই’, ‘আমার মইমাতা’। কী আশ্চর্য ! ফকিরের দরবারে সব সমান।

পাঁচ গাঁয়ের মানুষ আসে হাটে। কেউ বেচতে, কেউ কিনতে। কেউ আসে নুব্জ হয়ে, কেউ মাথা উঁচিয়ে, কেউ বিমর্ষ, কেউ মৌন, কেউ উদ্বেল। সবাই নিজের মতো। সবার ভঙ্গি, আচরণ যেন অতিমানবীয় অভিনয়। মানুষের ভিড়ে, মানুষের শব্দে-গন্ধে জব্বারের মন দরিয়ার মতো থইথই করে। নিজেকে আর খুঁজে পায় না। বুকে যেন কোন রহমান লিখে দিয়েছে, “সন্ধান চাই”। এই আজব বোধ তাকে কষ্ট দেয়। ডানহাতটা বুকে রাখে।
পেছন থেকে রাসমনি তার মৌনতা ভাঙে — কিরে, খাবি না কিছু ? আশানন্দের দোকানের লুচি !
— হে, চল চল।
পেছনে বলাই বলে — দাঁড়া, কেবল তোরা খেলেই হবে !
রাসমনি একটা খায় আরেকটা শাড়ির আঁচলে বাঁধে। জব্বার অবাক হয়ে রাসমনির দিকে চেয়ে থাকে। মুচকি হাসে। তার হাসিটা বুঝে রাসমনি !
আমার ঘরের মানুষটা নেশাভাঙ করে সত্য রে। আমার সঙ্গে কলহ করে। আবার ঘুরে ফিরে আমার কাছেই আসে। তারে তখন শিশুর মতে মনে হয়। দিলে খায়। না দিলে খায় না। নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে। আমি তারে কিছু দিতে পারিনিরে ! একটা সন্তানও না…! রাসমনির চোখে জল।

এই হাটে সবকিছুর ব্যবস্থা আছে। বশিকরণ, ভাগ্যপরিবর্তণ, বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণ, জিন-ভুত থেকে মুক্তি… । গ্রামীণ মানুষের সমস্ত বিপদ থেকে মুক্তির নিদান এই হাটে। তবু কষ্ট যায় না, বিপদ কাটে না ! মনের আশ মিটে না।
গ্রামের হাট, সন্ধ্যের পর আর বেশি দূর গড়ায় না। ভাঙতে শুরু করে। রাসমনি লাফ দিয়ে ওঠে। জব্বার প্যাডেল মারে। ভাঙা রাস্তায় লটখট করে সাইকেলটা। জব্বারের বুকে লাগে।
— ঘরের পাশে একটা সেগুন গাছ ছিল, বুঝলি। ওইটা বেঁচে কিনেছিলাম সাইকেলটা। যদি আমি ফুরিয়ে যাবার আগে সাইকেলটা ফুরিয়ে যায় তা হলে উপায় কী হবে ! এই দুঃসময়ের দেশে সংসারটা টেনে নেব কীভাবে, রাসু?
আকাশে চাঁদ। আলোয় ফকফক করে। আকাশের দিকে চেয়ে রাসমনি বলে — আমার ঠাকুরদা পেটে-ভাতে কাজ করত। বাবাও দিনমজুরি করে রক্ত জল করেছে ! আমিও…। দিনকে দিন আরও গরিব হয়ে যাচ্ছি। সরকার ফ্রি চাল দিয়ে অন্য সবকিছুর দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এই আজব ধাঁধা গোল থেকে বেরোবার পথ নেই !
দীর্ঘশ্বাস ফেলে জব্বার। চলতে চলতে রোজ গান শোনাত। আজ জীবনের গল্প শোনাচ্ছে — আমার বয়স যখন ন’বছর বাবা মারা যায়। ডাক্তার দেখিয়ে আর ওষুধ কেনার টাকা থাকত না। বাবা ঠিক করলেন আর ওষুধ খাবেন না। দাওয়ায় বসে তিনি বলতেন, ওষুধ-বড়ি গরিবের জন্য না। মায়ের কষ্ট দেখে তেরো বছর বয়স থেকে দিনমজুরি শুরু করি। ছোট বলে টাকাও কম। মার চোখে পানি।
ধীরে ধীরে, হেলেদুলে চলছে সাইকেল। যেন কর্মস্থলে পৌঁছে দেওয়া এবং ঘরে ফিরিয়ে নেবার বড় দায় এই দুই-চাকার। সামনে রাস্তাটা ভাঙা, দুজনে নামে। আবার ওঠে। পাচারের গাড়িগুলো দুরন্ত গতিতে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে যাচ্ছে।
রাসমনি হা হা করে ওঠে — দেখলি কেমন গা ঘেঁষে গেল! আরও ধারে ধারে চালা।
— জীবনে কিছুই করতে পারলামনা বুঝলি। ভেবেছিলাম ছেলে-মেয়েগুলোরে লেখাপড়া করাব। চাকরি-বাকরি পাবে। এখন দেখি এই সোনার হরিণ গরিবের জন্য না। পৃথিবীতে এসে কেবল কষ্ট আর হতাশা নিয়ে গেলাম !
— আমরা সবাই পরাজিত। কষ্টই আমাদের সঙ্গী, বুঝলি।
পেছন থেকে হু হু করে এল সুকুমার আর বলাই। চলতি সাইকেল থেকে সুকুমার গলা ছেড়ে হাঁকে — রাসুও-ও এই বুড়ার সঙ্গে পিরিতি করে লাভ নেই। তার চেয়ে আমার লগে চল।
— দাঁড়া দাঁড়া আমারে নিয়ে যা। পালাস কেনঅঅঅ… ?
সাদা জোছনা ছড়িয়ে পড়েছে। পিট পিট করছে জোনাকি। সামনে ফাঁসি দেওয়া ঢোঙ। খাড়া ডাউন। রাসমনি বলল — নেমে যাই।
— না, বসে থাক। নামলেই দেরি হবে।
বলতে বলতে নামতে শুরু করে। শক্ত করে ব্রেক কষতেই শব্দ করে ছিড়ে যায়। সাইকেল ছুটছে পাগলা ষাঁড়ের মতো। উল্টো দিক থেকে ছুটে আসছে পাচার গাড়ি….। চিৎকার করে ছিটকে পড়ে রাসমনি। সাইকেলটা ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে জব্বার। এটা বিকল হলে সংসারটা চলবে না।
ততক্ষণে পাচার গাড়িটা ভয়ঙ্করভাবে চলে আসে সামনে। সাইকেলটা ঝটিতি বাঁদিকে ঠেলে দিতে পারলেও নিজে সরে আসতে পারেনি জব্বার। অর্ধ-শব্দ আর্ত কান্না। জোছনা জুড়ে রক্ত, মৃত্যু…।