
তেভাগা আন্দোলনের পটভূমি ও পরিচিতি
সুদীপ ঘোষাল
তেভাগা আন্দোলন ছিল মূলত শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার বিপ্লব। কৃষিনির্ভর ভারতবর্ষ হলেও বেশিরভাগ কৃষক ছিল ভূমিহীন। যার ফলে তারা কোনো জমিদার বা জোতদারের অধীনে জমি বর্গা নিয়ে চাষ করত। চাষাবাদ শেষে উৎপন্ন ফসলের তিনভাগের দু’ভাগই দিতে হতো জমির মালিক তথা জমিদার বা ভূস্বামীদেরকে। আর অবশিষ্ট একভাগ পেত বর্গাচাষি। অথচ উৎপাদন ব্যয় সংশ্লিষ্ট সকল খরচ এবং কায়িক শ্রম সবটাই দিত চাষিরা। কিন্তু এর বিনিময়ে তারা ভাগ পেত মাত্র একভাগ, লাভ সবটুকুই নিয়ে নিত জমির মালিক। এই একভাগ পরিমাণ ফসল দিয়েই খেয়ে না খেয়ে কোনোভাবে দিনাতিপাত করত বর্গাচাষিরা।
মালিক ও বর্গাচাষিদের মধ্যে প্রচলিত ফলন ভাগ করার প্রচলিত ব্যবস্থা ১৯৪৬ সালের দিকে হুমকির মুখে পড়ে যায়, যখন বর্গাচাষিরা একে অন্যায় বলে অভিহিত করে। যুগ যুগ ধরে শোষণ ও নিপীড়নের শিকার হতে হতে যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখন সোচ্চার হয়ে ওঠে বর্গাচাষিরা। তারা দাবি জানায়, উৎপাদিত ফসলের তিনভাগের একভাগ পাবে জমির মালিকেরা আর বাকি দু’ভাগ দিতে হবে বর্গাচাষিদের। কেননা জমিতে বীজ বপন থেকে শুরু করে সব ধরনের শারীরিক শ্রম দেয় বর্গাচাষিরা। তাদের এই তিনভাগের এক ভাগ দাবী থেকেই আন্দোলনের নাম হয়ে উঠে ‘তেভাগা আন্দোলন’।
ভারতবর্ষে কৃষক সম্প্রদায় মূলত নিঃস্ব হতে থাকে ব্রিটিশ আমল থেকেই। এর আগেও বিদেশি বণিক গোষ্ঠীর দ্বারা শাসন শোষণের শিকার হলেও কৃষকদের উপর এভাবে লোলুপ দৃষ্টি দেয়নি অন্য কোনো শাষকগোষ্ঠী। মোগল শাসনামলে জমির মালিক বা শাসনকর্তাদেরকে জমির এক-তৃতীয়াংশ বা তার চেয়েও কম পরিমাণ খাজনা প্রদান করলেই চলত। তখন অবশ্য কৃষকের যথেষ্ট পরিমাণ জমির মালিকানাও ছিল, সেই সাথে শাসকরাও ছিলেন যথেষ্ট নমনীয়।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে কৃষকদের বেহাল দশা এবং তেভাগা আন্দোলনের ক্ষেত্র কীভাবে প্রস্তুত হয়েছে, তা বুঝতে হলে ফিরতে হবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের দিকে। তেভাগা আন্দোলনের সাথে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের একটা পরোক্ষ এবং সূক্ষ্ম যোগসূত্র রয়েছে। ১৭৯৩ সালে ব্রিটিশ গভর্নর কর্নওয়ালিস কর্তৃক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালুর পর থেকে বাংলার কৃষকেরা একের পর এক হারাতে থাকে জমির মালিকানা। এ বন্দোবস্ত চালুর ফলে জমির মালিকানা চলে যায় জমিদারদের হাতে। কৃষকেরা জমির মালিকানা হারিয়ে পরিণত হয় ভাড়াটে মজুরে।
তেভাগা আন্দোলনের ইতিহাস জানতে হলে সে সময়ের ভূমি ব্যবস্থা বিষয়ে জানা প্রয়োজন। বাংলার গ্রামীণ সমাজে ব্রিটিশ শাসনের আগে পর্যন্ত ভূমির মালিক ছিলেন চাষিরা। মোগল আমল পর্যন্ত তারা এক তৃতীয়াংশ বা কখনো কখনো তার চেয়েও কম ফসল খাজনা হিসাবে জমিদার বা স্থানীয় শাসনকর্তার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে প্রদান করতেন। ব্রিটিশ শাসনামলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে প্রথা প্রচলনের ফলে চাষিদের জমির মালিকানা চলে যায় জমিদারদের হাতে। জমিদাররা জমির পরিমাণ ও উর্বরতা অনুযায়ী ব্রিটিশদের খাজনা দিত। জমিদারদের সাথে ফসল উৎপাদনের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এ সময় জমিদার ও কৃষকদের মাঝখানে জোতদার নামে মধ্যস্বত্বভোগী এক শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। এরা পত্তনি প্রথার মাধ্যমে জমিদারদের কাছ থেকে জমি পত্তন বা ইজারা নিত। এই জোতদার শ্রেণি কৃষকের জমি চাষ তদারকি ও খাজনা আদায়ের কাজ করতো। ফসল উত্পাদনের সম্পূর্ণ খরচ কৃষকেরা বহন করলেও যেহেতু তারা জমির মালিক নন সে অপরাধে উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক তুলে দিতে হতো জোতদারদের হাতে। এ ব্যবস্থাকে বলা হতো আধিয়ারা । জোতদারি ও জমিদারি প্রথা ক্ষুদ্র কৃষকদের শোষণের সুযোগ করে দেয়। খাজনা আদায়ের জন্য জোতদাররা এদেরকে দাসের মতো ব্যবহার করে। উৎপন্ন ফসলের পরিবর্তে একসময় কৃষককে বাধ্য করা হয় অর্থ দিয়ে খাজনা পরিশোধ করতে। ফলে কৃষকেরা গ্রামীণ মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হন। সর্বস্বান্ত হয়ে এক সময়ের সমৃদ্ধ বাংলার কৃষক পরিণত হন আধিয়ার আর ক্ষেত মজুরে। জমিদার-জোতদারদের এই শোষণ কৃষকের মনে বিক্ষোভের জন্ম দেয়। এই বিক্ষোভকে সংগঠিত করে ১৯৩৬ সালে গঠিত হয় ‘সর্ব ভারতীয় কৃষক সমিতি’। ১৯৪০ সালে ফজলুল হক মন্ত্রিসভার উদ্যোগে বাংলার ভূমি ব্যবস্থা সংস্কারের প্রস্তাব দেয় ক্লাউড কমিশন । এই কমিশনের সুপারিশ ছিল জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ করে চাষিদের সরাসরি সরকারের প্রজা করা এবং তাদের উৎপাদিত ফসলের তিনভাগের দুইভাগের মালিকানা প্রদান করা। এই সুপারিশ বাস্তবায়নের আন্দোলনের জন্য কৃষক সমাজ ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। এছাড়া জনসাধারণের কাছ থেকে হাটের ‘তোলা’ ও ‘লেখাই’ সহ নানা কর আদায় করা হতো। এসব বন্ধের জন্য আন্দোলন জোরদার হয়।
ছেচল্লিশ সালের দাঙ্গা ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষকে পরিহার করে হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে এই কৃষক আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। নিখিল ভারত কৃষক সভার নীতি ছিল কৃষক ঐক্য যার ভিত্তিতে তেভাগা আন্দোলন জেলায় জেলায় সমস্ত ভ্রাতৃঘাতী বিবাদকে ত্যাগ করে ছড়িয়ে পড়ে। সমিতি গঠন, মহিলা কর্মী গড়ে তোলা, সংগ্রামী তহবিল এবং রাজনৈতিক শিক্ষাদানের ক্লাস ইত্যাদির মাধ্যমে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলাতে কৃষক সংগ্রামীরা একজোট হন। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উত্তরবঙ্গ বিভিন্ন জায়গায় কৃষকেরা তেভাগার দাবী তুলেছিলেন।
তেভাগা আন্দোলনের প্রথম শহীদ ছিলেন দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার তালপুকুর গ্রামের সমির উদ্দিন ও শিবরাম মাঝি। সমির উদ্দিন ছিলেন মুসলমান এবং শিবরাম মাঝি ছিলেন আদিবাসী হাসদা সম্প্রদায়ের।
এছাড়াও বালুরঘাট মহকুমায় তেভাগা আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। পুলিশ ও জোতদারদের মিলিত আক্রমণ চরমে উঠে খাঁপুর গ্রামে। ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭ তারিখে উক্ত গ্রামের কৃষক নেতাদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ উক্ত গ্রামে যায়। কৃষকগণ, যাদের ভেতরে অনেকেই ছিলেন সাঁওতাল, তীর, ধনুক, দা ও টাঙ্গি নিয়ে প্রতিরোধ করেন। তারপর পুলিশের গুলিতে ২২ জন শহীদ হন। শহিদদের নামগুলো হচ্ছে যশোদারানি সরকার, চিয়ারসাই শেখ, কৌশল্যা কামারনী, গুরুচরণ বর্মণ, কমরেড হোপন মার্ডি, মাঝি সরেন, দুখনা কোলকামার, পুরণা কোলকামার, ফাগুয়া কোলকামার, ভোলানাথ কোলকামার, কৈলাশ ভুঁইমালী, থোতো হেমরম, ভাদু বর্মণ, আশু বর্মণ, মঙ্গল বর্মণ, শ্যামাচরণ বর্মণ, নগেন বর্মণ, ভুবন বর্মণ, ভবানী বর্মণ, জ্ঞান বর্মণ, নারায়ণ মুর্মু এবং গহুনিয়া মাহাতো।
তেভাগা আন্দোলন ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর-এ শুরু হয়ে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত চলে। বর্গা বা ভাগ-চাষীরা এতে অংশ নেয়। মোট উৎপন্ন ফসলের তিন ভাগের দুইভাগ পাবে চাষী, এক ভাগ জমির মালিক- এই দাবি থেকেই তেভাগা আন্দোলনের সূত্রপাত। এই আন্দোলনের জনক নামে খ্যাত হাজী মহম্মদ দানেশ। বর্গাপ্রথায় জমির সমস্ত ফসল মালিকের গোলায় উঠত এবং ভূমিহীন কৃষক বা ভাগ-চাষীর জন্য উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক বা আরও কম বরাদ্দ থাকত। যদিও ফসল ফলানোর জন্য বীজ ও শ্রম দু’টোই কৃষক দিত। তৎকালীন দুই বাংলায় এই আন্দোলন সংগঠিত হয়। তবে দিনাজপুর ও রংপুর জেলায় এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করেছিল।
প্রধান দাবিঃ- ক) তেভাগা আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি ছিল উৎপন্ন ফসলের ২/৩ ভাগ তাদের দিতে হবে। খ) জমিতে ভাগ চাষীদের দখলিসত্ব দিতে হবে। গ) ভাগচাষির খামারে ধান তুলতে হবে। ঘ) ভাগ চাষের ধান বুঝে নিয়ে জমির মালিকরা রসিদ দেবে।
সোমনাথ হোড়ের চিত্র এবং দিনপঞ্জি ‘তেভাগার ডায়েরী’ উল্লেখযোগ্য রচনা। গোলাম কুদ্দুসের মত প্রথিতযশা সাহিত্যিকেরা তেভাগা আন্দোলনের ওপর উপন্যাস কবিতা রচনা করেন। সলিল চৌধুরীর গান ‘হেই সামালো ধান’ ও কবিয়াল নিবারণ পন্ডিতের ‘মোদের দুখের কথা কাহাকে জানাই’ এর নাম করা যায়। এছাড়াও শওকত আলি রচনা করেন নাঢ়াই। চলচ্চিত্র: তেভাগা আন্দোলন নিয়ে গিয়াসউদ্দিন সেলিমের কাহিনীতে ২০০০-২০০১ অর্থবছরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অনুদানে ‘আধিয়ার’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এটি পরিচালনা করেছেন সাইদুল আনাম টুটুল।
(সংযোজনঃ তেভাগা আন্দোলনের ফসল ভাগাভাগির তাৎক্ষণিক দাবি পুরোপুরি পূরণ না হলেও, এর ফলাফল সুদূরপ্রসারী ছিল। এটি ভূমি সংস্কারের ভিত্তি স্থাপন করেছিল, কৃষকদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়িয়েছিল, মহিলা কৃষকদের সংগঠিত করে ‘নারী বাহিনি’ গঠিত হয়েছিল, এবং জমিদারের শোষণ ও ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠেছিল এবং তা পরবর্তীকালে নকশাল আন্দোলন ও অন্যান্য কৃষক আন্দোলনে প্রভাব ফেলেচিল। ১৯৪৯ সালে বর্গাদারী আইন (Bargadari Act) পাস হয়েছিল, যা বর্গাদারদের দুই-তৃতীয়াংশ ফসলের অধিকার স্বীকৃতি দিয়েছিল। তবে তার বাস্তবায়ন দেরিতে শুরু হয়েছিল।)