ভালোবাসা কি বিনিময় – রণজিৎ রায়

ভালোবাসা কি বিনিময় – রণজিৎ রায়

ভালোবাসা কি বিনিময়    (অনুগল্প)

রণজিৎ রায়


ব্যস্ততাময় ব্যাঙ্কের শাখা। মৃন্ময় ও শ্রদ্ধা উভয়েই কর্মতৎপর কর্মী। সুযোগ পেলে হাসি-মজা বন্ধ নেই। দিনের শেষে ফিরে যাবার মুহূর্তে মৃন্ময় আলতো করে সোয়েটার গায়ে জড়িয়ে বলে, “আর দেরি করা ঠিক হবে না। গিন্নি অপেক্ষায় হয়তো ব্যাকুল। আমরা তো আর অন্যদের মতো কেবল টাকা রোজগারের ধান্দায় নেই।”
শ্রদ্ধা মুহূর্তে কড়া জবাব দেয়, “আপনিই কেবল বউকে খুব বেশি ভালোবাসেন ! অন্য কেউ না ?”
– আপনাদের ভালোবাসা তো রোজগারের সঙ্গে সম্পর্ক। আমরা নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসি একে অপরকে। এতে কোনো ভেজাল নেই। আপনারা ভালোবাসেন না, একথা বলছি না। তবে রোজগারের ব্যাপারটা জড়িত থাকলে ভেজাল থাকবেই। তাহলে আগামী এক সপ্তাহ ছুটি নেন, কতটুকু স্বাধীনতা আছে দেখি ?
– কী বললেন ? এক সপ্তাহ ? আমার ইচ্ছে হলে এক সপ্তাহ কেন, এক মাস ছুটি নেব।
– চেষ্টা করে দেখতে পারেন। তবে আমি কারও সংসারে অশান্তি ডেকে আনতে চাই না। পরীক্ষা করতে বলছি।
– অশান্তি কেন হবে ? ভালোবাসা এত ঠুনকো নাকি ? কাল এসে আপনার মুখের ওপর জবাব দিয়ে এক মাসের ছুটির দরখাস্ত দেব।
– এত লম্বা কেন, কম দিনের ছুটি নিয়ে পরীক্ষা করে দেখুন না। আপনার ছুটিতে আমি আপনার অনেক কাজ করে দেব ব্রাঞ্চের, কথা দিলাম।
মৃন্ময়কে এড়িয়ে শ্রদ্ধা বলে, “দাদা দেখুন, মৃন্ময়দাকে আশকারা দিয়ে কতটা মাথায় তুলেছেন !”
আধিকারিক বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, “আমাকে নিয়ে আবার পড়ছো কেন ? তোমাদের নিজেদের কথায় আমাকে টানছো কেন ?”
– আপনিও চুপচাপ থেকে মজা নিচ্ছেন বলে মনে হল। তাই বললাম।

পরদিন কারও মুখে কোনো কথা নেই। অবসর সময়ে সীমা জিজ্ঞাসা করে, “শ্রদ্ধা তোমার ছুটির কী হল ?”
শ্রদ্ধা রেগে গিয়ে বলে, “দাদা (আধিকারিকের দিকে চেয়ে) আপনি কিছু মনে করবেন না। পুরুষ জাতটা হল বেইমান ও সুবিধাবাদী। আমি ওকে বললাম, আমি কয়েকদিন ছুটি নেব। সে বলে, ছুটি নেবে কেন ? কী হয়েছে তোমার ?”
– কিছুই হয়নি। এমনিতেই বিশ্রাম করার জন্যে ছুটি নেব।
– অহেতুক তুমি ছুটি নষ্ট করবে কেন ? তুমি তো অবুঝ নও। এভাবে ছুটি নষ্ট করলে শেষে না উইদাউট পে তে থাকতে হয়। তোমার কী কষ্ট বলো। ডাক্তার আমার বন্ধু। এখুনি নিয়ে যাব।
তুমুল ঝগড়া করলাম। দক্ষযজ্ঞ অবস্থা। তবে মনে আলোড়ন তোলে একটি কথা, সব ভালোবাসায় কি স্বার্থ জড়িয়ে থাকে! ভালোবাসা কি তাহলে এক বিনিময় ? যাক মৃন্ময়দাকে এসব বলার দরকার নেই, তাহলে আরও মাথায় ওঠবে।
হঠাৎ মৃন্ময়বাবু সামনে এসে বলে, “আমাকে বলার কী দরকার ? আমি কি জিজ্ঞাসা করেছি ? আমি কি না জেনে কথাটা বলেছি ? দাদাকে কিছু মনে করতে না বলে পুরুষ সম্পর্কে যা তা বলেছেন। দাদা কি পুরুষ নন ? মামলা আমার সঙ্গে, এখন সব পুরুষকে দোষারোপ করছেন। আরে পুরুষরা চাকুরিরত মেয়েদের কেন বিয়ে করে এটা আবার বলে দিতে হয় নাকি ? আপনার এত কম বুদ্ধি আমি বিশ্বাস করি না।”
– সুযোগ পেয়েছেন, বলে যান। হাতি খাদে পড়লে চামচিকাও ঠ্যাং তোলে।
– এভাবে বলাটা কি ঠিক হল ? নিজের বোকামির ফল ভোগ করছেন। আমাকে তো আপনার ধন্যবাদ দেওয়া উচিত।
শ্রদ্ধা দ্রুত উত্তর দিতে যাচ্ছিল। বাধা দিয়ে আধিকারিক এসে জল ঢেলে আগুন নিভিয়ে দেয়। নতুবা আরও কতক্ষণ দাউ দাউ করে জ্বলতো কে জানে !