
দাম্পত্য জীবন (ছোটোগল্প)
সদানন্দ সিংহ
প্রভাতদের একটা কিং সাইজের বক্সখাট আছে। বক্সখাট-টা ত্রিশ বছরের পুরোনো। তনিমার বিয়ের পর বাপের বাড়ি থেকে যেসব জিনিস এসেছিল তার মধ্যে এই খাট-টাও ছিল। বিয়ের দু বছর পরে জায়গার অভাব বলে এই খাট-টার স্থান হয়েছিল ছাদের ওপরের ঘরে। সেদিন বক্সখাটের ভেতরটা পরিষ্কার করতে গিয়ে ত্রিশ বছরের পুরোনো তিন ব্যাণ্ডের রেডিওটা খাটের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। এই রেডিওটাও তনিমার বাপের বাড়ি থেকে এসেছিল ত্রিশ বছর আগে। রেডিওটার ওপর এখন ধুলোর অনেক আস্তরণ। প্রভাত রেডিওটাকে ছাদের ওপর নিয়ে একটা রং করার ব্রাশ দিয়ে ভাল করে পরিষ্কার করে। তারপর ঠিক করে নতুন ব্যাটারি কিনে রেডিওটাকে চালু করার চেষ্টা করবে।
ত্রিশ বছর অতিবাহিত দাম্পত্য জীবনের সারাদিন ব্যাপী খিটখিটে মেজাজের তনিমাও রেডিওটাকে দেখে আজ বেশ খুশি। ত্রিশ বছর আগে ওরা দুজন প্রতিদিন এই রেডিও বাজিয়েই গান-খবর শুনতো। রাতে রেডিওটার অবস্থান তাদের বিছানাতেই হত। রেডিওর গান-খবর শুনতে শুনতে ওরা ঘুমিয়ে পড়তো একসময়। তারপর মাঝরাতে উঠে দুজনের কোনো একজন রেডিওটা বন্ধ করতো। বলা বাহুল্য তখন অই রাতে রেডিওর প্রচারও বন্ধ হয়ে যেতো, ফলে রেডিওতে চোঁ চোঁ আওয়াজ হতে থাকত। বহুদিন পর রেডিওটাকে দেখে তনিমা জিজ্ঞেস করে, ওটা কি ঠিক আছে ? প্রভাত জবাব দেয়, জানি না। নতুন ব্যাটারি এনে চেক করতে হবে। তাও জানি না, বড় সাইজের ব্যাটারি গুলো পাওয়া যাবে কিনা।
বিকেলে পাড়ার এক দোকান থেকে প্রভাত বড় সাইজের ব্যাটারিগুলি পায়। চারটে ব্যাটারি কিনে আনে প্রভাত। বাড়িতে এসে রেডিওটাতে ব্যাটারিগুলি লাগায়। রেডিওটার সুইচ অন করে। কিন্তু কাজ হয় না। রেডিওটা নিশ্চুপ। প্রভাত বারবার সুইচটা অন-অফ করতে থাকে। তারপরেও রেডিওটা নিশ্চুপ।
এরমধ্যে তনিমা এসে খোঁজ নেয়, চালু হচ্ছে না বুঝি ? প্রভাত উত্তর দেয়, না, এখনও হয়নি। মনে হয় ভেতরেও অনেক ধুলোবালি জমে গেছে। কাভারটা খুলে ভেতরের ধুলোবালি সব পরিষ্কার কর্তে হবে, মনে হয় তাতে কাজ হবে।
— বদ্ধ বক্সখাটের মধ্যে অত ধুলোবালি কোত্থেকে এল, আশ্চর্য। বলে তনিমা অন্যদিকে চলে যায়।
প্রভাত রেডিওটার কাভারটা স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে খুলে প্রথমে রং করার ব্রাশের সাহায্যে ভালো করে ধুলোবালি পরিষ্কার করে। তারপর ভেতরের সার্কিটে লাগানো সব ক্যাপাসিটর, ট্র্যানজিস্টর, ডায়োড, অন-অফ সুইচ সহ সব পার্টসের কানেকশানের প্রান্তগুলি একে একে সাবধানে একটা ইলেকট্রিক টেস্টারের অগ্রপ্রান্তে তুলো প্যাঁচিয়ে সেই তুলো কেরোসিনে ডুবিয়ে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করতে থাকে।
প্রভাতের মা মারা গেছেন আজ ছ বছরের ওপর হয়ে গেছে, আর আজ মায়ের রেখে যাওয়া এক দু’লিটার কোকাকোলার বোতলে রাখা কেরোসিনটা বেশ কাজে লেগে গেছে।
রেডিওটা এভাবে পরিষ্কার করতে করতে প্রভাতের সারা বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যে হয়ে যায়। সন্ধ্যে পেরিয়ে শেষে রাত সাতটা। আজ আশ্চর্য। আজ তনিমা একটুকুও বকবক করেনি। অন্যদিন হলে সে এরমধ্যেই অনেকবার বলে ফেলতো, “খেয়ে-দেয়ে আর কাজ নেই, সব অকাজের কাজ নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত। কেনো ? তুমি জান না, ঘরের চাল শেষ হয়ে যাচ্ছে, আনতে হবে না ? তেলও আধা লিটার মাত্র রয়ে গেছে।” প্রভাত হয়তো জবাব দিতো, “আরে তুমি অত টেনশান নিচ্ছ কেনো, আশ্চর্য ! গোরার দোকানে ফোন করলেই, সব ঘরে এসে যাবে। বলো ক’বস্তা বাসমতি চাল চাই তোমার ?” এতে তনিমা হয়তো ক্ষেপে গিয়ে উত্তর দিতো, “একমাসে দু’জনের জন্যে ক’বস্তা লাগে তাও বলে দিতে হয়, কী মানুষ নিয়ে যে ঘর করছি !” এভাবে কথার পর কথা, কে কার খুঁত বের করবে, তা নিয়ে ফালতু সব তর্কবিতর্ক। প্রতিদিন, কমপক্ষে এক-দু’বার তো হবেই। এইসব কথাবার্তা তীব্রভাবে হলে, তবেই শেষে তনিমা ঘুরেফিরে একটাই কথা বলে, হ্যাঁ হ্যাঁ তোমাকে আমি ভালোই চিনি, তুমি একটা স্বার্থপর, নিজের ব্যাপারটা তুমি ভালোই বোঝো। এই কথার সঠিক উত্তর আজো প্রভাতের জানা নেই।
রাত সাতটার পর শ্রীকান্তের ফোন আসে। শ্রীকান্ত তাদের একমাত্র ছেলে। বৌমাকে নিয়ে মুম্বাই থাকে। এক নামী কোম্পানির সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ছেলে মাকে ফোন করেছে। তনিমা ছেলেকে তার বাবার রেডিও সংক্রান্ত সব খবর সবিস্তারে জানায়। তারপর ফোনটা প্রভাতকে ধরিয়ে দেয়। ছেলে বলে, “কেনো এত কষ্ট করে পুরোনো জিনিসটাকে চালু করার চেষ্টা করছ। আমি একটা নতুন কিনে পাঠাচ্ছি, ওখানে এফ এম ব্যান্ডও থাকবে।” প্রভাত ছেলেকে বলে, আরে না না, তার কোনো দরকার নেই। পুরোনো রেডিওটা পেলাম বলেই দেখছি চালু করা যায় কিনা ……।
তারপর রাত সাড়ে সাতটার আগেই রেডিওটা চালু হয়ে যায়। প্রভাতের খুশি যেন আর শেষ হয় না। তনিমাও আজ খুব খুশি।
প্রভাত বলে, আর সাতদিন পরেই তো মহালয়া। মহালয়ার দিন এবার খুব ভোরে উঠে এই রেডিও অন করব। তারপর দু’জন মহালয়া শুনবো। মনে আছে তোমার ? মহালয়ার দিন আমরা দু’জন খুব ভোরে হাঁটতে হাঁটতে বুদ্ধমন্দির পেরিয়ে রাজ্যপাল ভবন, তারপর রাজ্যপাল ভবন পেরিয়ে মালঞ্চনিবাস চলে যেতাম।
তনিমা বলে, তারপর তুমি মালঞ্চনিবাসের কাঁঠালিচাঁপার গাছ থেকে খুঁজে খুঁজে কাঁঠালিচাঁপা পেড়ে আমার হাতে দিতে আর বলতে যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও একদিন এই গাছ থেকে কাঁঠালিচাঁপা পেড়েছিলেন।
প্রভাত তনিমার কাছে যায়। তনিমার গাল দু’টো দু’হাতে টিপে বলে, তুমি এখনো আগের মতই সুন্দর। তনিমা যেন লজ্জা পায়, যাঃ আমি আগের মত একদম নই, বুড়ি হয়ে গেছি।
— একদম না। বলেই প্রভাত তনিমার গালে একটা চুম্বন এঁকে দেয়। প্রত্যুত্তরে তনিমাও প্রভাতের গালে এক চুম্বন এঁকে দেয়। এইভাবে ওরা ত্রিশ বছর আগের এক রঙিন দিনের নষ্টালজিয়ায় হারিয়ে যেতে চায়। সেতু হয় এক পুরোনো দিনের রেডিও। তারপর আলিঙ্গনাবদ্ধ স্ত্রীর গায়ের গন্ধ নিতে নিতে প্রভাতের এক উপলব্ধি হয়, দাম্পত্য জীবন যেন এক আয়নার মত যেখানে কালের নিয়মেই বছর বছর সে আয়নায় ধুলোবালি জমতে থাকে। মাঝে মাঝে সেই ধুলোবালিকে ঝেড়ে পরিষ্কার করতে হয়। নইলে সব ঝাপসা হয়ে যায়। তখন কেউ কাউকে আগের মত সঠিকভাবে আর চিনতে পারে না।