ব্যাকটেরিয়া – সদানন্দ সিংহ

ব্যাকটেরিয়া – সদানন্দ সিংহ

ব্যাকটেরিয়া        (ছোটোগল্প)

সদানন্দ সিংহ

(১)
হঠাৎ আজ সূর্যটা বেশ বেঁকে গেল। তুহুরিয়ার জলে তার ছায়া। সে ছায়ার দিকে সুখবীরের চোখ। তখন কি অবাস্তব কিছু ঘটে চলছিল ? একদম না। যা ঘটে চলেছে বা যা ঘটছে তা কানায় কানায় বাস্তব। তাই সুখবীর চেঁচাল, “বাণী, এদিকে দেখে যাও।”
বাণী তখন এক গাছের ছায়ায় বসে এক শতরঞ্চি পেতে চা টিফিনের আয়োজন করছিল। চা বাগানের কাছাকাছি এই নির্জন জায়গায় ওরা বাইক নিয়ে মাঝে মাঝে আসে। ছোট্ট টিলা, ঘাস, গাছপালা, পাখি এবং তুহুরিয়ার মত ছোট্ট ধারার মাঝে সময় কাটাতে বেশ ভাল লাগে ওদের। বাণী উত্তর দিল, “কী আবার হল ?”
ওদিক থেকে উত্তর আসে, “আজও সূর্যটা বেঁকে যাচ্ছে।”
শুনে বাণী দৌড়ে এলো সুখবীরের কাছে। তুহুরিয়ার জলে বাঁকা সূর্যকে দেখলো। তারপর উচ্ছ্বাস ভরা কণ্ঠে বলে, “এবার তাহলে দমকা হাওয়া আসবে। পরপর তিনবার। প্রথমবার, দ্বিতীয়বার, তারপর তৃতীয়বার।”
— “হ্যাঁ। তারপর আসবে ঘূর্ণিবাতাস।”
— “কিন্তু সে ঘূর্ণিবাতাসকে তো আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।”
— “নিশ্চয় খুঁজে বের করতে হবে এবং করবই।”
— “তারপর?”
— “তারপর আবার কী। ঘূর্ণিবাতাসে ঢুকে পাখির মতো ভেসে বেড়াব। উপর থেকে পৃথিবীটাকে দেখবো।”
— “না।”
বাণীর জবাব শুনে সুখবীর একটু অবাক, “না মানে ! কতবার দু’জনে একসঙ্গে ভেসে বেড়িয়েছি।
বাণী জবাবে বলে, “কিছুদিন আগেই তুমি হাসপাতালে আই সি ইউ-তে ছিলে। এখনও তুমি সুস্থ নও। তোমার মেডিকেশন চলছে।”

বাণীর কথাগুলি অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। নিজের শরীরটাকে নিয়ে সুখবীরও বেশ বিরক্ত। বছরের পর বছর তার শরীরে কীসব ঘটে চলেছে। ফলে মাঝে মাঝে সে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বেশি অসুস্থ হলে আবার হাসপাতালেও ভর্তি হতে হচ্ছে। গত পনের বছরে কিডনি স্টোনের জন্য দুবার, ফিসারের জন্যে একবার, ব্রেনের কাছাকাছি টিউমারের জন্যে একবার — মোট চারবার সে অপারেশনের মুখোমুখি হয়েছে। চিকিৎসা করাতে গিয়ে লাখ লাখ টাকার বিল এসেছে। তবে রক্ষে, সে একটু বুদ্ধি করে আগে থেকেই তার পরিবারের জন্যে ক্যাশলেস মেডিক্লেম ইন্সিউরেন্স করে নিয়েছিল, ফলে তাকে হাসপাতালের বিলের দশ-বিশ অংশ মাত্র দিতে হয়েছে। তবে ইনফেকশান তো একটা না একটা লেগেই আছে। তার করোনাও একসময় হয়েছে, অবশ্য বাণীরও হয়েছিল একসঙ্গে। তবে এসব তাকে একদম কাবু করতে পারেনি।
এবারও সে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ইনফেকশনের জন্যে। হঠাৎ সে দেখে পেচ্ছাব করার সময় পেচ্ছাবের সাথে টাটকা লাল রক্ত এবং রক্তের ক্লথ বেরিয়ে এসেছে। প্রথমে সে ভেবেছিল জল কম খাওয়ার কারণে হচ্ছে, তাই পরপর দু গ্লাস জল খেয়ে নিয়েছিল। কিন্তু পেচ্ছাবের সাথে রক্ত পড়া থামছিল না বলে সে শেষে হাসপাতালে চলে যায়। হাসপাতালের ইউরোলজিস্ট ডাক্তার তাকে দেখে আই সি ইউ-তে পাঠিয়ে দেন। সেখানে ওষুধ-ইঞ্জেকশনের পাশাপাশি তার মূত্রনালি দিয়ে এক বড় তিন চ্যানেলের ক্যাথিটার ঢুকিয়ে তার মাধ্যমে তিনদিন একনাগাড়ে ইরিগেশন চালানো হয়। সঙ্গে চলে সিসটোকপি, আলট্রা সোনোগ্রাফি, হোল অ্যাবডমেন স্ক্যানিং এবং রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা। আস্তে আস্তে ইউরিনের মধ্যে রক্তের পরিমান কমে আসতে থাকে। চারদিন পর ইউরিনে আর রক্ত ছিল না। রোগ নির্ণয় হয় ইউরিন ব্লাডারে ইনফেকশন। প্রস্টেট গ্ল্যান্ডদের আকৃতিও বৃদ্ধি পেয়েছে আর ইউরিন ব্লাডারের এক জায়গায় নাকি বেশ থিকনেস বেড়ে গেছে এবং সে জায়গাটার বায়োপসি টেস্ট করা দরকার। সুখবীর বায়োপসি টেস্ট পরে করাবে বলে হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়েছিল। কিন্তু সত্যি বলতে কি, বাড়ি ফিরেও সে পুরোপুরি সুস্থ ছিল না। কোথাও একটা গণ্ডগোল রয়ে গেছিল। হয়তো তার যৌনাঙ্গের মাধ্যমে তিন চ্যানেল বিশিষ্ট এক বিরাট ক্যাথিটার ফিট করা হয়েছিল বলে তার এই অরগ্যানে নিশ্চয়ই রক্তপাত হয়েছিল। কারণ ওটা ফিট করার সময় সে অসম্ভব যন্ত্রণা অনুভব করেছিল, যন্ত্রণায় চেঁচিয়েছিল। এর আগে সে জানতোই না ক্যাথিটারও বিভিন্ন রকমের হয়। হাসপাতালে থাকাকালীন ক্যাথিটারের নল তার লিঙ্গের যেসব জায়গা দিয়ে গেছে সেসব জায়গায় অনবরত এক ইরিটেশন এবং জ্বালা অনুভব করে গেছে। কারণ সেখানেও আরেক ইনফেকশন শুরু হয়ে গেছিল। এটা সে টের পেয়েছে ক্যাথিটার খুলে নেওয়ার পর। তখন সে দেখেছে, ইউরিন পাস করার সময় তার লিঙ্গের ভেতরে এক শিরশির জ্বালা — কোনো ক্ষতস্থানের ওপর মৃদু আঙুল ছোঁয়ালে যেরকম অনুভূতি হয় ঠিক সে রকম। তাই সে আরেক হাসপাতালে গিয়ে আউটডোরে একজন ইউরোলজিস্টকে দেখাল। ইনিও সমস্ত রিপোর্ট দেখে ইউরিন ব্লাডারের বায়োপসি করার পরামর্শ দিলেন, লিঙ্গের ভেতরের ইনফেকশনের ব্যাপারটায় গুরুত্বই দিলেন না। তাতে সে আবার আরেকজন প্রাইভেট স্পেশালিস্ট ডাক্তারকে দেখালো। ইনি সব কিছু দেখে সাতদিনের জন্যে অ্যান্টিফাংগাল এবং অ্যান্টিবায়োটিক — এই দু’রকমের ওষুধ খেতে বললেন। সাতদিন ওষুধগুলি খাবার পরও ইউরিন পাস করার সময় যে জ্বালা হচ্ছিল তা ঠিকভাবে কমছিল না, মাত্র দশ শতাংশ কমেছিল। ফলে ডাক্তারের পরামর্শে শেষে ইউরিন কালচার করতে দিল। কিন্তু ইউরিন কালচারের রিপোর্ট আসতে কমপক্ষে তিনদিন লাগে। অগত্যা সেই রিপোর্টের অপেক্ষায় ছিল সে আর বাণী।

(২)
একসময় দমকা হাওয়া এল পরপর তিনবার — প্রথমবার, দ্বিতীয়বার, তারপর তৃতীয়বার। কিছুক্ষণ পরে সুখবীররা দেখলো দূরে চা বাগানের ভেতর একটা ঘূর্ণি বাতাস এদিকওদিক খেলে বেড়াচ্ছে। সুখবীর বললো, চলো আমরা ঘূর্ণির দিকে যাই।
বাণী আবার বললো, না। আজ না। আগে তুমি সুস্থ হও।
— আরে, আমি তো সুস্থই আছি।
— আজ তোমার ইউরিন কালচারের রিপোর্ট আসবে। ওটা দেখে ওষুধ খেয়ে আগে সুস্থ হও আগে।
— আরে, ওষুধ তো খাওয়া যাবে সে নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। তার আগে ভাবো তো, এই ঘূর্ণির ট্র্যাপে পড়লে শরীরের ব্যাকটেরিয়াগুলি অবস্থা কী হবে ?

এইসময় সুখবীররা দেখলো, ঘূর্ণিটা দ্রুত ওদের দিকে এগিয়ে আসছে। তারপর কাঊকে কিছু করার সময় না দিয়ে ধুলোর এক ঝড়ের মাঝে ঘূর্ণিটা ওদেরকে টেনে নিল এবং প্রায় একশো ফুট ওপরে শূন্যের মাঝে ওদেরকে ভাসিয়ে দিল। কিছুটা ভয়ে, কিছুটা আনন্দে এবং উত্তেজনায় একে অপরকে ওরা আকড়ে ধরে রইল। ঘূর্ণিটা ওদেরকে অনেক দূরে টেনে নিয়ে এলো। তারপর আবার ওদেরকে সেই আগের জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে এসে ধপ করে মাটিতে ফেলে দিল। মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওরা কিছুটা ব্যথা পেল বটে, কিন্তু শূন্যে ভেসে চলার অনুভূতির উত্তেজনায় সে ব্যথা কোথায় যেন হারিয়ে গেল।

(৩)
রাত দশটা। বাড়ি ফেরার পর সুখবীরদের ডিনার হয়ে গেছে। মোবাইলে অনেকগুলো ম্যাসেজ এসে জমা হয়ে আছে। সুখবীর ম্যাসেজগুলি একটা একটা করে দেখছিল। সে লক্ষ করলো ইউরিন কালচার রিপোর্ট ডাউনলোধ করার জন্যে এক ম্যাসেজ বিকেলেই এসে গেছিল। রিপোর্ট ডাউনলোড করার জন্যে আইডি ও পাসওয়ার্ডও জানিয়ে দিয়েছে। সুখবীর তাড়াতাড়ি প্যাথোলজির সাইটে গিয়ে আইডি ও পাসওয়ার্ড দিয়ে রিপোর্ট ডাউনলোড করে নেয়। তারপর একটু জোরে আওয়াজ করে বাণীকে জানায়, ইউরিন কালচারের রিপোর্ট এসে গেছে।
বাণী দৌড়ে আসে। বলে, রিপোর্টে কী লেখা আছে পড়ে যাও।
পিডিএফ ফর্মেটে লেখা রিপোর্টটাকে গুগোল ড্রাইভের পিডিএফ ভিউয়ার দিয়ে খুলে সুখবীর জোরে জোরে পড়তে থাকে, Gentamicin — Resistant, Amikacin — Resistant, Amoxycilin/Clavulanic — Resistant, Piperacillin+Tazobactam — Resistant, Cefuroxime — Resistant, Cefepime — Resistant, Ceftriaxone — Resistant, Ciprofloxacin — Resistant…… সুখবীর পড়া থামিয়ে দেয়। বাণীকে বললো, আশ্চর্য, আমার শরীরের ব্যাকটেরিয়াগুলি এতগুলি ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। আরো অ্যান্টিবায়োটিকের নাম এখানে দিয়েছে, সবগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাকটেরিয়াগুলি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। এদেরকে কোনো ওষুধেই মারা সম্ভব নয়।
বাণীর গলায় উৎকণ্ঠা ফুটে উঠল, তাহলে কী হবে ?
মোবাইলে রিপোর্টটা মন দিয়ে দেখতে দেখতে সুখবীর জানালো, হ্যাঁ তবে একটা মাত্র ওষুধ দেখতে পাচ্ছি যেখানে ব্যাকটেরিয়াগুলি বংশবৃদ্ধি করতে পারেনি।
সুখবীর মোবাইলটা বন্ধ করে দিয়ে বললো, আগামীকাল ডাক্তারের কাছে রিপোর্টটা নিয়ে যাব।

রাত আরো বেড়ে গেলে সুখবীর আর বাণী ঘুমিয়ে পড়ল।
রাত দুটোর সময় সুখবীরের মোবাইলটা বলে উঠল, “Now the time is 2 am” ।
আওয়াজটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সুখবীর ঘুমের মাঝে তড়াক করে উঠে বসে গেল। তারপর বাণীকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করল, শুনছো, এইমাত্র রাত দুটোর ঘোষণা হল।
চোখ বন্ধ করেই বাণী অস্ফুট স্বরে বললো, হ্যাঁ-আ-আ-আ।
সুখবীর আবার বললো, শোনো এখন কোটি কোটি শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়া লিঙ্গের ছিদ্রপথ দিয়ে ছুটে বেরিয়ে আসবে। তারপর হয়তো সবাইকে আক্রমণ করার জন্যে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে। এখন আমাদের এক যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি থাকা দরকার।
কথাটা সুখবীর বলল বটে, তবে নিজে তো ঢালহীন তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দার ছাড়া তো কিছুই নয় — বিশেষ করে যে শত্রুকে সে নিজে এবং তার মতো অন্যরা নিজেদের শরীরে ধারণ করে লালন পালন করে শক্তিশালী করে তুলেছে সেই শত্রুর বিরুদ্ধে !
সুখবীরের সংশয় বাণী টের পায়। তাই চোখ খুলে সে বলল, ঘূর্ণির ট্র্যাপ তো গেল, আরেকটা কালচার করাও। সব ঠিক হয়ে যাবে।
বাণীর কথায় সুখবীর ঠিক করে, হ্যাঁ আগামীকাল আবার ইউরিন কালচার করাতে হবে। তবে ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে সে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে সারাজীবন। আর সেজন্যে সে সঠিক কৌশল অনুশীলন করে যাবে এবার থেকে।