গোবর্ধনের মুক্তি – সদানন্দ সিংহ

গোবর্ধনের মুক্তি – সদানন্দ সিংহ

গোবর্ধনের মুক্তি      (ছোটোদের গল্প)

সদানন্দ সিংহ

আমাদের পাড়াতে এক নতুন খাবারের দোকান খোলা হয়েছে। ভাবলাম, খাই বা না খাই, সেই দোকানটার সামনে একটু ঘুরে আসি। গিয়েই দেখলাম চিংড়িমামাকে, গপগপ করে সেই দোকানের সিঙাড়া খাচ্ছে। আমাকে দেখেই চিংড়িমামা বলে উঠল, এই যে গোয়েন্দা হাবু। এদিকে কী মনে করে!
বললাম, এই নতুন দোকানটাকে একটু দেখতে এলাম।
— অঃ, তাই ? তা এটা তো খাবারের দোকান, কিছু কিনে-টিনে খা। দশ টাকায় তিনটে সিঙাড়া দিচ্ছে। পকেটে টাকা আছে ? জানি, তোদের পকেট সবসময়েই ফাঁকা। কী আর করবে, অন্যের খাওয়া দেখ।
আমার পকেট তখন সত্যিই ফাঁকা তখন। এটাও জানি, নিজের স্বার্থ ছাড়া চিংড়িমামা কাউকেই খাওয়ায় না। সিঙাড়া দেখে আমারও খুব খেতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু লোভ সংবরণ করে বললাম, না, আমার এখন খাওয়ার ইচ্ছে নেই একদম।
চিংড়িমামা খেতে খেতে বলল, আহা-হা, সিঙাড়াটার স্বাদটা অপূর্ব। তা আমার পকেটে দশটা টাকা আছে, ইচ্ছে করলে ওটা তুমি নিতে পার। তবে এই টাকা এক সপ্তাহের মধ্যেই ফেরত দিতে হবে, নইলে কিন্তু প্রতি সপ্তাহে ডাবল করে বাড়তে থাকবে।
ভাবলাম, এক সপ্তাহের মধ্যে দশ টাকা ফেরত দেওয়া, এ আর এমন কী ব্যাপার। চিংড়িমামার কাছ থেকে দশটাকা নিয়ে আমিও গপাগপ তিনটা সিঙাড়া খেয়ে নিলাম।
পরে বুঝতে পেরেছিলাম, কী কুক্ষণেই না আমি ওই দশ টাকা ধার নিয়েছিলাম।

আমি দু সপ্তাহ ধরে পকেটে দশ টাকা নিয়ে ঘুরলাম, কিন্তু চিংড়িমামার দেখা পেলাম না। তিন সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পর চিংড়িমামার দেখা পেলাম। আমি দশ টাকা বাড়িয়ে দিতেই চিংড়িমামা বলল, আশি টাকা দিতে হবে।
— কী ইয়ার্কি করছ!
— মোটেই ইয়ার্কি না। হিসেবটা বোঝো। প্রথম সপ্তাহ পেরিয়ে গেলে কুড়ি টাকা হত, দ্বিতীয় সপ্তাহ পেরিয়ে গেলে চল্লিশ, আর তৃতীয় সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার জন্যে আশি।
আমি একটু রেগেই বললাম, আমি সেই এক সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার আগে থেকেই টাকা নিয়ে ঘুরছি, তোমাকে আমি পাইনি। আমার কোনো দোষ নেই।
— না না, এসব বললে হবে না। আশি টাকাই দিতে হবে। ঠিক আছে, আমি এখন দশ টাকা রাখছি, বাকি সত্তর টাকা কবে দেবে, বল্।
আমার ভীষণ রাগ হচ্ছিল চিংড়িমামার ওপর। এ কেমন জুলুমবাজি! ঠিক করলাম, আর আমি কোনো টাকাই দেব না। শুধু তারিখের পর তারিখ দিয়ে যাব, কিন্তু টাকা আর দেব না।
বললাম, বাকি টাকা আগামী শনিবার। বলেই আমি চলে এলাম।
পরের সপ্তাহে চিংড়িমামার সাথে দেখা হতেই চিংড়িমামা বলল, একশ চল্লিশ টাকা হয়েছে।
আমি বললাম, টাকা নেই, আগামী শনিবার দেব।
পরের সপ্তাহে চিংড়িমামা বলল, দুশো আশি।
আমি বললাম, আগামী শনিবার দেব, টাকা নেই।
তার পরের সপ্তাহে চিংড়িমামা বলল, পাঁচশ ষাট।
যথারীতি আমি বললাম, আগামী শনিবার। বলেই আমি দৌড়ে চলে গেলাম।
কিন্তু পরের সপ্তাহে দেখা হতেই চিংড়িমামা আমার একহাত খপ করে ধরে বলল, এগারশো বিশ হয়েছে। ঠিক করে বল্ কবে দিবি।
আমারও মেজাজ খারাপ হয়ে গেল, বললাম, আগে হাত ছাড়ো।
এইসময় দেখলাম গোবর্ধনদা কোত্থেকে এসে উপস্থিত হয়েছেন আমাদের সামনে। চিংড়িমামা আমার হাত ছেড়ে দিয়ে বলল, এবার সঠিক করে বল্, কবে টাকা দিবি?
আমি রেগেই বললাম, যে সপ্তাহে শনিবার নেই, সে সপ্তাহে দেব।
চিংড়িমামা যেন অবাক হল, অ্যাঁ বলিস কী ? যে সপ্তাহে শনিবার নেই ? ঠিক আছে, চল্, আমাকে ক্যালেন্ডারে দেখিয়ে যা, কোন্ সপ্তাহে শনিবার নেই।
আমাদের কাণ্ড দেখে গোবর্ধনদা বুঝতে পারছিলেন না, ঠিক কী হয়েছে। আমি গোবর্ধনদাকে শুরু থেকে সব জানালাম। সব শুনে গোবর্ধনদা চিংড়িমামাকে বললেন, আমার আছে একশ টাকা আছে, আপনি এটা রাখুন, আর বাকি টাকা মাফ করে দিন।
চিংড়িমামা ছোঁ মেরে টাকাটা নিয়ে পকেটে চালান করে বলল, আপনি যখন বলছেন ঠিক আছে। আমি নেহাৎ ভালো মানুষ বলেই মাফ করে দিলাম। বলেই চিংড়িমামা চলে গেল।
আমার ওই একশ টাকার জন্যে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, কেমন অন্যায়ভাবে জুলুমবাজি করে টাকাটা নিয়ে গেল। আমি বললাম, কেনো শুধুশুধি টাকাটা জলাঞ্জলি দিলেন ?
গোবর্ধনদা উত্তর দিলেন, আরে ঐ টাকাটা কোনো ব্যাপার না। দরকার পড়লে দাদার গদি থেকে আরো আনা যাবে। আমি দরকার পড়লেই আনি, কেউ টের পায় না। পেলেই বা কী হবে ? ছোটোভাই-ই তো নিয়েছে। শুধু দাদার নতুন কাঠের কারবারটা দাঁড়িয়ে গেলেই হল। আর, আমি দাদার আদেশে প্রতি শনিবার শনিপুজো করতে করতে আর ভালো লাগছে না। অন্তত একটা শনিবার যদি মুক্তি পেতাম। আচ্ছা, কাউকে না জানালেও আমাকে বলো, ঠিক কোন্ সপ্তাহে শনিবারটা নেই। কেমন ?
গোবর্ধনদার কথা শুনে আমি হাঁ হয়ে গেলাম। কী উত্তর দেব ভেবেই পেলাম না।