আগুন রাঙানো সুর – গুলশন ঘোষ

আগুন রাঙানো সুর – গুলশন ঘোষ

আগুন রাঙানো সুর       (অনুগল্প)

গুলশন ঘোষ

ল্যাদ খেয়ে শুয়ে আছি। সকাল ৯টা। গিন্নির চিৎকারে বিছানা ছেড়ে তাড়াতাড়ি স্নানে গেলাম। সকালেই পাশের বাড়ি থেকে খুব জোরে বক্স-এর আওয়াজ আসছে। স্নান সেরে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে টেবিলে খেতে বসেই রোজকার মুদ্রাদোষে জিজ্ঞাসা করলাম — আজ কী কী হয়েছে?
গম্ভীর কণ্ঠে গিন্নির জবাব — কোনোদিন তুমি চারটে পদ ছাড়া ভাত মুখে তুলেছ শুনি! গোটা বাজার তুলে এনে তো ফ্রিজে ঢুকিয়ে দাও। তারপর সারা সপ্তাহ পড়ে পড়ে ঘুমাও। আচ্ছা তুমি আমায় কাজের লোক ছাড়া বৌ বলে ভাব! হাড়কিপ্টে একটা লোক। আমাদের বিয়েটাও ভালো করে করলে না।
বুঝলাম গিন্নির মেজাজ পুরো বৈশাখের দুপুর। যদিও এখন বৈশাখ আসতে বাকি। আমাদের ডাইনিং-এর জানালার পাশেই পলাশ গাছটার মাথা গেরুয়া সিং উঁচিয়ে দেখছে আমার দিকে। কিছু না বলে নিজেই উঠে ছুরি দিয়ে চটজলদি গাজর-শশা-পেঁয়াজ-লেবু কেটে নিলাম। জানালায় চোখ যেতে দেখি গাজর আর পলাশের রং মিশে গেছে।

বাসমতি চালের ভাপে মন চনমন করছে। ডেকচির ঢাকন সরাতেই দেখি সোনামুগের ডাল। পাতে নিয়ে দেখলাম ওরে বাস — ডালে কাতলা মাছের মুড়ো। বড়ি দিয়ে সজনে ডাঁটার শুক্তো। লাউ-পালং শাকের চচ্চড়ি। বড় বড় দুটো কাতলার চাকা। সঙ্গে বাউলও আছে। তাও আবার রাই সর্ষে বাঁটা আর লেবু দিয়ে টক। উফ্‌… । খেতে খেতে বললাম — প্রতিটা রান্নাই আজ সেরা। গপ গপ করে খেয়ে চলেছি। বললাম, চাটনি নেই-। পুরো যেন বউভাতের খাবার খাচ্ছি।
গিন্নি একটু থেমে বলে, কোনোদিন চাটনি থাকে না শুনি। পরশুর একটু পাঁপড় পড়ে আছে দেব ?
গানের আওয়াজ বন্ধ হয়ে সানাই বাজতে শুরু করেছে। গায়ে হলুদ যাবে।
— দেখো কত ধুম-ধাম করে বিয়ে করছে। আর আমাদের বিয়েতে একটা সানাই পর্যন্ত বাজাওনি। তুমি নাকি আবার রাইটার্সের বড়োবাবু। ঠিক করে বিয়েটাও করনি। তুমি তো কাজের লোক এনেছ। ভালোবাসলে বউভাতে অন্তত সানাইটাও বাজাতে বুঝেছ।
শান্ত করতে একটু আক্ষেপ করার মতো বলি — আহ! ব্যাপারটা তা নয়…। আমার আর কিছু বলে ওঠার আগেই গিন্নি আবার গর্জন করে বলে, থামো তুমি—
দেখি কোথা থেকে একটা ছোট্ট হলুদ প্রজাপতি গিন্নির বাঁ হাতের বাহুতে এসে উড়ে বসল। একমুখ মেকি হাসি নিয়ে খুশি করতে প্রজাপতির দিকে আঙুল দেখিয়ে বললাম — আরে বাস দেখো দেখো এটাই প্রকৃত ভালোবাসা!
— রাখো তোমার অমন শুকনো ভালোবাসা।
আমিও আজ প্লেট পরিষ্কার করে খেয়ে আঙুল চাটছি দেখে গিন্নি বলল, তাড়াতাড়ি নাও -– আঙুল পরে চাটবে।
প্লেটটা সিঙ্কে নামিয়ে দিয়ে বললাম — ফ্রিজে মিস্টি আছে?
— তুমি তো ভাত খেয়ে মিস্টি খাওয়া না! আজ কী জন্য — নিমন্ত্রণ নেই বলে?
— হ্যাঁ, কিন্তু এখন যে সানাই বাজছে, মিস্টি খেলে ‘বউভাত’-এর খাওয়াটা কমপ্লিট হয়ে যেত, সেই সঙ্গে আমাদেরটাও — তা না হলে আবার যে সানাই ভাড়া করতে হবে!