
চিরন্তন ভবিতব্য (অনুগল্প)
প্রসেনজিৎ রায়
সোসিওলজি নিয়ে মাস্টার্স করছে অনিকেত। তার প্রজেক্টের বিষয় বৃদ্ধাশ্রম। এখন থেকে বছর পঞ্চাশ ষাটেক আগে নাকি বৃদ্ধাশ্রম ছিল আমাদের দেশে। বুড়ো বয়সে ছেলেমেয়ে ঘরে জায়গা না দিলে এখানেই ঠাঁই মিলত বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের। এমন বৃদ্ধাশ্রম তো এখন আর নেই। এখন ছেলেমেয়ে মা-বাবার সাথে থাকলে না চাইলে তাদেরকেই আলাদা হয়ে যেতে হয়, মা-বাবা বাড়িতেই থাকেন সরকারি নির্দেশনামা অনুযায়ী। তাই বৃদ্ধাশ্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে এখন এমন কোনো লোককে খুঁজে বের করতে হবে, যার বয়স একশোর কাছাকাছি, যদিও কাজটা মুশকিল।
এখন মানুষরা মডার্ন নাকি অস্বাভাবিক বোঝা মুশকিল। শোনা যায়, আগে নাকি মানুষ সিনেমাহলে গিয়ে সিনেমা দেখত, স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখত। অনেকে নাকি নিজেরাও মাঠে খেলতে যেত। ভাবা যায় — কি বোরিং ! এখন সব মানুষই রিলস বানিয়ে টাইম পাস করে। কোথাও হেঁটে যাচ্ছে জায়গাটা সুন্দর, মোবাইলটা অটোমেটিক মুডে রেখে নেচে গেয়ে রিলস বানিয়ে নিল সোশ্যাল মিডিয়ায় আপডেট দেবার জন্য। কে কোথায় নাচল কারো ভ্রূক্ষেপ নেই, সবাই বানাচ্ছে। কাউকে ভালোই লাগে, কারো ভাবভঙ্গি দেখে মস্তিষ্কবিকৃত বলে মনে হয়।
২০২০ সালে জন্মানো জনার্দন সরকার ত্রিপুরার বিরল প্রৌঢ় ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম। আজ ওনার ৯৯ তম জন্মবার্ষিকী। নাতিদের সাথে থাকেন। স্ত্রী গত হয়েছেন বছর কুড়ি হবে। ঘুম থেকে উঠে বারান্দার আরামকেদারায় বসে রোদতাপ নিচ্ছেন, হঠাৎ পাশের মুঠোফোন বেজে উঠল। ওপাশে অনিকেত। বৃদ্ধ কল্যাণ দপ্তরের ওয়েবসাইটে তাঁর নম্বর পেয়ে ফোন করেছে বৃদ্ধাশ্রম সম্পর্কে জানার জন্যে। কথা শেষ করে ফোন রেখেই জনার্দনবাবুর চোখের সামনে ভেসে উঠল পুরনো স্মৃতিকথা — খেলার মাঠ, বন্ধুবান্ধব, ফেসবুক, বৃদ্ধাশ্রম থেকে শুরু করে নিজের প্রেমিকা এবং স্ত্রীর কথা। অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল দুটি চোখ। আসলে আমরা যতই মডার্ন হই না কেন, কিছু কিছু জিনিস কখনোই পরিবর্তন হবার নয়। সুখস্মৃতি রোমন্থন করে অশ্রুসিক্ত হওয়াটাও সর্বকালীন জমানার অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের এক অনিচ্ছাকালীন ভবিতব্য।