পার্শ্ববর্তী দেশ শ্রীলঙ্কা

পার্শ্ববর্তী দেশ শ্রীলঙ্কা

সদানন্দ সিংহ

শ্রীলঙ্কায় ইদানীং যেভাবে জনসাধারণ শাসক শ্রেণির প্রতি ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন সেরকম দৃশ্য আমি আগে কোনোদিন দেখিনি। যেভাবে নিরস্ত্র জনতা প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতির ঘর দখল করে লুঠপাট চালিয়েছে সেভাবে অন্য কোনো দেশে হয়েছে কিনা জানি না। এটা করতে খুব একটা বাধাও পেতে হয়নি। পুলিশ ও মিলিটারির কোনো তেমন প্রতিরোধ দেখা যায়নি যেখানে মিয়নমারের মতো দেশগুলিতে জনসাধারণকে গুলি করে হত্যা করে দমিয়ে দেওয়া হয়। হয়তো জনসাধারণের প্রতি শ্রীলঙ্কার পুলিশ ও মিলিটারির একটা নীরব সমর্থন ছিল।

দেশের ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ফলেই আজ শ্রীলঙ্কা অশান্ত। এই মুহূর্তে শ্রীলঙ্কায় জ্বালানি নেই, বিদ্যুৎ নেই, খাবার নেই, ওষুধ নেই। আর্থিক বিপর্যয়ের ফলে বন্ধ হয়ে গিয়েছে স্কুল। প্রবল অর্থকষ্টে পড়েছে একাধিক অনাথ আশ্রমও। না খেয়ে, আধপেটা খেয়ে দিন কাটছে ওই অনাথ আশ্রমের শিশুদের। শ্রীলঙ্কার বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডারও প্রায় শূন্য। ভারত বাদে কোন দেশ বা আই এম এফ-এর মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠান নতুন করে ধার দিতে চাইছে না। তাই জ্বালানি কিনতে পারছে না শ্রীলঙ্কা। তার জন্য মুখ থুবড়ে পড়েছে শ্রীলঙ্কার স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড। প্রধানমন্ত্রী বদল করেও দেশের পরিস্থিতির বিশেষ বদল এখনও হয়নি।

বিক্ষোভে সামিল হাজার হাজার জনতা হামলা চালিয়েছে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি গোটাবায়া রাজাপক্ষের সরকারি বাসভবনে। নিরাপত্তা রক্ষীরা হাজার হাজার জনতাকে আটকাতে পারেনি। জোর করে রাষ্ট্রপতির বাড়িতে ঢুকে বিক্ষোভকারীদের রাষ্ট্রপতির বাড়ির পুলে সাঁতার কাটতেও দেখা গিয়েছে। পুলে নেমে দেশের জাতীয় পতাকা নাড়তে বিক্ষোভকারীদের দেখা যায়, এমন কি ছাদ থেকে পুলে ঝাঁপ দিতেও দেখা গেছে।

এখানেই শেষ নয়, রাষ্ট্রপতির বাসভবনের রান্নাঘরও দখল করে নেয় বিক্ষোভকারী জনতা। রান্নাঘরে রাখা ড্রিংকস এবং খাবার খায়। সেখানে সকলে মিলে গ্যাস চালিয়ে রান্না করতেও দেখা গেছে। অবশ্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে আগেই খবর পেয়ে রাতেই রাষ্ট্রপতি গোটাবায়া রাজাপক্ষকে সেনার সদর দফতরে সরিয়ে দেওয়া হয়।

এরপর একদিন হয়তো শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি কিছুটা ঠাণ্ডা হবে। রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীও হয়তো বদলে যাবেন। কিন্তু ভুখার মিছিল থামবে কি? রাষ্ট্রপতি এবং শ্রীলঙ্কার মন্ত্রীসভা কীভাবে এর সমাধান করবেন? সেটা হয়তো ভবিষ্যৎ বলবে। তবে কোনো দেশের উন্নতির জন্যে দেশের জনসাধারণের বলিষ্ঠ অংশগ্রহণ ছাড়া সেই দেশের উন্নতি সম্ভব নয়। সেজন্যে প্রথমেই কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত লোক, আধিকারিক বা মন্ত্রীকে দেশছাড়া করা দরকার। শ্রীলঙ্কার জনসাধারণের সে কাজটাই এখন করতে হবে। শ্রীলঙ্কার জনতা যেখানে মিশে আছে সিংহলি, তামিলি, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ — দেশের উন্নতির স্বার্থে তাঁরা তা এখন করতেও পারবেন বোধহয়।