
গোয়েন্দার নেমপ্লেট (ছোটোদের গল্প)
সদানন্দ সিংহ
একটা নেমপ্লেট বানাব ভাবছিলাম, যেখানে দু লাইনে লেখা থাকবে — “শখের গোয়েন্দাঃ হাবু / সহকারীঃ গোবর্ধন” এবং এই নেমপ্লেটটা টাঙানো থাকবে আমাদের গেইটে। কিন্তু আমার কথা শুনে মা খুব হাসলেন, পরে বললেন, যা, তোর বাবাকে জিজ্ঞেস কর। আমি গিয়ে বাবাকে বলতেই বাবা তো যেন অবাক হয়ে বললেন, সে কি, তুই গোয়েন্দা হলি কবে ? সহকারী আবার গোবর ধন।
আমি বললাম, বাবা, গোবর ধন নয়, ওটা হবে গোবর্ধন।
— গোবর ধন আর গোবর্ধন, সে একই ব্যাপার।
— তাহলে নেমপ্লেট লাগাব বাবা?
এবার বাবা যেন একটু সিরিয়াস হলেন। বললেন, সত্যি সত্যিই নেমপ্লেট লাগাবি ?
— হ্যাঁ বাবা।
আমার উত্তর শুনে বাবা একটু কী যেন চিন্তা করলেন। তারপর বললেন, ঠিক আছে। তবে আমার দুটো শর্ত আছে।
— প্রথম শর্তটা আগামীকাল বলব, সেটা একটা ধাঁধা হবে অথবা একটা কেস্ হবে। তবে সেটা বলব গোয়েন্দা এবং তার সহকারী — দু’জনের সামনে। প্রথম শর্ত উত্তীর্ণ হলে দ্বিতীয় শর্ত। দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে — নেমপ্লেট গেইটে লাগানো যাবে না, লাগাতে হবে বারান্দায়।
আমি বললাম, কিন্তু গেইটে না লাগালে তো সবাই দেখতে পাবে না।
বাবা হেসে বললেন, চেনা বামুনের পৈতা লাগে না। তাই ওটা কোন ব্যাপারই না।
আমি মেনে গিয়ে বললাম, ঠিক আছে।
পরদিন ছিল রবিবার। স্কুল বন্ধ। তাই সকালে ব্রেকফাস্ট খেয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর আমি গোবর্ধনদাকে আমাদের বাড়িতে ডেকে নিয়ে এলাম। গোবর্ধনদা তো মহাখুশি, আজ কোনো ধাঁধা অথবা কোনো কেসের সমাধান করতে হবে। খুশিতে এক আত্মবিশ্বাস নিয়ে গোবর্ধনদা বললেন, ধাঁধা হলে তুমি সমাধান করবে, আর যদি কোন কেস হয় সেটা আমি চুটকি মেরে সমাধান করে দেব।
বাবা কোথায় জানি বেরিয়ে গেছেন। আমি আর গোবর্ধনদা অপেক্ষা করতে লাগলাম।
ঘন্টাখানেক পর বাবা এলেন। হাতে একটা বাজারের ব্যাগ। ব্যাগের মুখটা বাঁধা। ভেতরে কী আছে বোঝার উপায় নেই। ব্যাগটা নিচে রেখে বাবা বললেন, এই যে গোয়েন্দারা, ব্যাগটার ভেতরে কী আছে তা হাতে স্পর্শ না করে বল তো।
গোবর্ধনদা তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, শাক-সবজি আলু বেগুন মাছ-মাংস।
বাবা বললেন, হল না। এছাড়া এতগুলি নাম বললে হবে না, একটা নাম বলতে হবে।
— তাহলে ওটা নিশ্চয় নিশ্চয় রসগোল্লা। আবার গোবর্ধনদা বললেন।
আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম গোবর্ধনদা রসগোল্লার নাম নিবেন। কারণ হর্ষবর্ধনদা এবং গোবর্ধনদা দুজনেই সামনে রসগোল্লা পেলেই গপাগপ খেয়ে নেন। রসগোল্লার নাম শুনলেই গোবর্ধনদার মুখে লালা ঝরে।
এবার বাবা বললেন, হল না। এবার কিন্তু শেষবার। আর সুযোগ দেওয়া যাবে না।
আমি গোবর্ধনদাকে বললাম, এবার কিন্তু আমি বলব।
— ঠিক আছে। গোবর্ধন যেন একটু দুঃখিত হলেন, রসগোল্লা এলো না বলে।
আমি চিন্তা করতে লাগলাম, কী হতে পারে ব্যাগের ভেতরে ? কিছুদিন আগে মা বাবাকে বলেছিলেন এবার খেজুরের রস খাওয়াই হয়নি। বাবা তখন বলেছিলেন, একদিন সময় করে কিনে আনবেন। তাই আমি নিশ্চিত হলাম, ভেতরে খেজুরের রস।
বললাম, ভেতরে খেজুরের রস।
— একদম ঠিক। বলেই বাবা ঘরের ভেতর চলে গেলেন।
গোবর্ধনদার মুখে এবার চওড়া হাসি, আমাকে বললেন, আমি দু গ্লাস খেজুরের রস খাবো। আমি গোবর্ধনদার দিকে তাকালাম, কী মহাপেটুক লোক রে বাবা। ভেবেছিলাম, আমিই কয়েক গ্লাস খেজুরের রস খাবো। সেটা বোধহয় আর হয়ে উঠবে না।