
দেবারি গণ (অনুগল্প)
গুলশন ঘোষ
পাশের বাড়িরও লোক জানে না বাড়িতে প্রস্ববণ কখন আসে, কখন যায়। ছেলেবেলা থেকেই সে তার সম-জুটিদের থেকে একটু আলাদা। শান্ত। মাটির মতোই সহনশীল। মুখচোরা স্বভাবের। কিন্তু, পড়াশোনায় তুখোড়। স্বপ্ন জ্যোতির্বিজ্ঞানী হবে।
সাধ পূরণ হল যখন, সরকারি প্রতিষ্ঠার বেদিতে নিজেকে স্থাপন করতে বয়স গড়িয়েছে আটত্রিশ-এ।
জোর কদমে শুরু হল পাত্রী খোঁজা। দু’বছর ধরে অর্ধ-শতাধিক যোগাযোগ করেও জুড়ি মিলল না।
কখনও বয়স বেশি, কখনও বা ছেলের সার্ভিস কন্যার বাড়ি থেকে দূরে হওয়ার কারণে – কিছু দূর কথা এগিয়েও যোগাযোগ থেমে যায়। কিংবা কোন পাত্রীর পরিবার রাজি হলেও তাদেরকে আবার প্রস্ববণের অপছন্দ। শেষে একপ্রকার হতাশ হয়ে দেখাশোনা বন্ধ করে দিয়েছে।
এই সময়-ই প্রস্ববণের অফিসের সিনিয়ার সুরেশবাবু তার আত্মীয়ের মধ্যে একটি যোগাযোগ করে। মেয়ে দেখতে গেল প্রস্ববণ। মেয়েকে পছন্দ তার।
সৌম্যকান্তি প্রস্ববণকেও দেখে অপছন্দ করল না মেয়ের বাড়ির লোক।
মেয়েপক্ষও এলো প্রস্ববণের বাড়ি। তারপর ফোনে ফোনে নানা জিজ্ঞাসাবাদ চলে মাঝে মাঝেই।
একদিন প্রস্ববণকে মেয়ের বাবা ফোন করে জিজ্ঞাসা করেন, ‘বাবা তোমার কোন নক্ষত্রে জন্ম ? গণ কী ?’
এসব কথা শুনে প্রস্ববণ কিছুক্ষণ নির্বাক থাকে। তারপর সংক্ষিপ্তভাবে জবাব দেয় – ‘জানি না।’
এতগুলো বছর ধরে সে মহাবিশ্বের গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান নিয়ে কত কত বই পড়েছে। সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে জেনেছে। জার্নালে লেখা প্রকাশ করেছে। কিন্তু, কোনদিন একবারের জন্যও মনে প্রশ্ন জাগেনি তার কোন নক্ষত্রে জন্ম। তার জন্মকুণ্ডলীর গ্রহের অবস্থান কী? এবার তাকে জানতে হবে!
এতদিন ছাত্র-গবেষক তার কাছে মহাবিশ্বের রহস্য, গ্রহ নক্ষত্রের সৃষ্টি আয়ুষ্কালের কথা জেনে এসেছে। এখন সে তার নিজের জন্মলগ্নের গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান জেনেছে জ্যোতিষের কাছে — রাশি কর্কট। অশ্লেষা নক্ষত্র। গণ – দেবারি।
মেয়ের বাবাকে জন্মকুণ্ডলী থেকে প্রাপ্ত রাশি, গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান ও গণের কথা জানিয়ে দেওয়ার পর থেকেই ফোন করা বন্ধ করে দিয়েছে।
হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধের কারণ প্রস্ববণের অজানা। তাই সে সুরেশবাবুকে মেয়ের বাবার কাছে খোঁজ নিতে বলে।
মেয়ের বাবাকে সুরেশবাবু ফোন করে তাদের মতামত জানতে চান। তিনি মেয়ের বাবার কাছে শোনেন – ‘ছেলের দেবারি গণ। মেয়ের আমার নরগণ।’
অসুরের মতো প্রকাণ্ড চেহারার সুরেশবাবুও এই কথা শুনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কিছুক্ষণ চুপ হয়ে যান। তারপর খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে মেয়ের বাবাকে বলেন- ‘দেবতার মতো সুন্দর ছেলে যদি অসুর গণ হয় তা হলে আমি কী?’