ভরতপুর পক্ষী অভয়াঅরণ্যে

ভরতপুর পক্ষী অভয়াঅরণ্যে
সদানন্দ সিংহ

এবার প্রখর উত্তাপের মাঝে মে মাসের বৃন্দাবন সফরের আগেই ভেবেছিলুম ভরতপুর অভয়াঅরণ্যে যাবো। ভরতপুর বাদে রাজস্থানের আজমির, জয়পুর, বিকানীর, জয়সলমের, পুষ্কর, উদয়পুর, মাউন্ট আবু ইত্যাদি জায়গাগুলি অনেক আগেই ঘুরেছি। কিন্তু মুশকিল হয়ে দাঁড়াল এবার আমার ভরতপুর যাবার প্রস্তাবে আমার গিন্নির সরাসরি ‘না’। ফলে আমি আগে থেকে ভরতপুরে হোটেল বুক করা, ট্রেনের টিকিট কিছুই করিনি। শুধু বৃন্দাবনের জন্যে বুক করে রেখেছিলাম। কিন্তু কে আর জানতো, শেষে ভরতপুরেই যে চলে যেতে হবে। ব্যাপারটা একটু গোলমেলে হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বৃন্দাবন সফরের শেষে কোলকাতায় ফেরার জন্যে মথুরার স্টেশনে আমরা ট্রেনের অপেক্ষা করছিলুম। ট্রেন একঘন্টার ওপর লেটে চলছিল। ফলে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে করতে তীব্র গরমে হাঁসফাঁস করছিলাম। এইসময় মোবাইলটা দেখলাম ব্যাটারি প্রায় চার্জ নেই। তো আমি কাছাকাছি একটা চার্জিং বোর্ডের সামনে গিয়ে মোবাইলটা চার্জ করছিলাম। ভেবেছিলাম ১০০% চার্জ করে নেবো। এদিকে বারবার গিন্নি আমাকে চলে আসতে বলছিলো। এদিকে আমার মোবাইলের ১০০% চার্জ কিছুতেই হচ্ছিল না। এই অবস্থায় ট্রেনটা গড়গড় করে এসে পড়ল। সবকিছু গুঁটিয়ে আমরা আমাদের কোচের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলাম। আমাদের কোচটা আমাদের বসার স্থান থেকে অনেক দূরে। অথচ আগের কয়েকটা ট্রেনের কোচ নাম্বারের ডিসপ্লে দেখে আমরা আমাদের কোচের কাছাকাছিই বসেছিলাম। কিন্তু আমাদের ট্রেনটার নাম ছিল তুফান মেইল। নামে তুফান কামে বোগাস; সবসময় এটা সাত ঘন্টার ওপর লেটে চলে। ওটা যখন এল তখন দেখলাম কোচের ডিসপ্লে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে। প্রায় দৌড়ে আমাদের কোচের কাছাকাছি আসার আগেই দেখলাম ট্রেনটা ছেড়ে দিচ্ছে। আর আমিও যেন কেমন তখন, যে-কোনো একটা কামরায় উঠে গেলেই পারতাম, কিন্তু কেন জানি উঠলাম না। মনে হয় ভূতে পেয়েছিলো, ভূতে পেলে নাকি এমন হয়। অবশ্য ভূত জিনিসটা কেমন জানি না। আস্তে আস্তে আমাদের চোখের সামনেই একসময় ট্রেনটা আমাদের ফেলে রেখে চলে গেল।
তারপরের অবস্থাটা কী হল, আমি আর বলছি না। আপনারা নিজের নিজের মতো কল্পনা করে নিন। আমি শুধু গিন্নিকে শান্ত করার জন্যে একটা বসার জায়গায় বসালাম। গিন্নি একেবারে সঠিক লক্ষ্যে কৈফিয়ত চাইল, “কেন তুমি যে-কোনো কামরায় উঠলে না? পরের স্টেশানে নেমে আমাদের কামরায় গেলেই হত। বারবার আমি বলেছি। কেন তুমি আমার কথাটার গুরুত্ব দাওনি? তুমি কী? তুমি একটা অদ্ভুত লোক!” আসলে এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর আমার ছিল না। তাই বললাম, “সত্যিই বড্ড ভুল হয়ে গেছে। আজ ফেরা হলো না, ঠিক আছে। এক-দু’দিন পরে নাহয় ফিরবো, কী আর হবে এতে।” গিন্নি তবু গজগজ করতে থাকে, “বুঝতে পেরেছি। তোমাকে আমি সঙ্গে করে বৃন্দাবনে এনেছি বলে তুমি এরকমটা করেছ। না এলেই পারতে।”
যাই হোক, একসময় গিন্নি শান্ত হল। আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “এক-দু’দিন পরে টিকিট পাবে কী?” আমি ‘চেষ্টা করছি’ বলে আমার ট্যাব থেকে টিকিট কাটার চেষ্টা করলাম। দেখলাম মেন্টেনেন্সের জন্যে IRCTC-র ওয়েবসাইট ডাউন। বললাম, “ওয়েবসাইট ডাউন আছে। চলো রিজার্ভেশান কাউন্টার থেকে কাটবো।”
রিজার্ভেশান কাউন্টারের দিকে যাবার সময় বললাম, “হাতে এক-দু’দিন সময় তো পাব, চলো এই ফাঁকে ভরতপুর ঘুরে আসি। ওখান থেকেই ফেরা যাবে।”

শেষপর্যন্ত রিজার্ভেশান কাউন্টার থেকে দু’দিন পরের আজমির-শেয়ালদা ট্রেনের টিকিট কাটলাম। সেখান থেকে বাসস্ট্যান্ডে গেলাম। তারপর বাসে করে ভরতপুর পৌঁছে গেলাম দু’ঘন্টার কম সময়ে। গিন্নি বলল, “শেষে তোমার ভরতপুরেই এলাম। তুমি কি ইচ্ছে করেই ট্রেন ছেড়ে দিয়েছিলে এখানে আসার জন্যে?”

ভরতপুরে এসে বুঝলাম বড় ভুল সময়ে এসে পড়েছি। ৪০ ডিগির লু চলছে। ওখানে কোথাও বিদ্যুৎ নেই। দু’দিন আগের ঝড়ে ইলেকট্রিক তার সব ছিঁড়ে গেছে, প্রচুর ইলেকট্রিক পোস্ট, গাছ উপড়ে লন্ডভন্ড। এই ঝড়ে উত্তর ভারতে ১২৫ জনের ওপর মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। বলা যায়, এক চুলের জন্যে আমরাও বেঁচে গেছিলাম। ঘটনা ঘটেছিল বৃন্দাবন সফরের সময়। আমরা দুজন এক হোটেল থেকে রাতের খাবার খেয়ে আমাদের হোটেলে ফিরছিলাম রাস্তার কিনার দিয়ে। সে সময় হুড়মুড় করে ঝড় শুরু হল। আর ঝড় শুরু হতেই আমাদের কাছের এক বিরাট গাছ ভেঙে রাস্তার মাঝখানে পড়ল। ঐ সময় এক প্রাইভেট কার রাস্তায় যাচ্ছিল। গাছটা ঠিক ঐ গাড়ির ওপর ভেঙে পড়ল। দেখলাম কারের মাঝখানটা চ্যাপটা হয়ে গেছে। ভেতরে দুজন মহিলা যাত্রী রক্তাত্ত হয়ে জ্ঞানহীন অবস্থায় পড়ে আছে।

ভরতপুরের বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি সব হোটেলগুলি তখন জেনারেটারে পাখা-লাইট জ্বলছে, কিন্তু এসি চলছে না। হোটেল কর্তৃপক্ষও গ্যারান্টি দিতে পারছে না যে দু’দিনের মধ্যেই এসি চলবে কিনা। গিন্নি নির্দেশ দিল, নন-এসি কামরা নাও, শুধুশুধি কেন বেশি ভাড়া দেবে। তাই নিলাম। শেষপর্যন্ত দেখলাম, গিন্নির কথাই ঠিক। দু’দিন পরেও বিদ্যুৎ আসেনি।

ভরতপুর অভয়াঅরণ্যে

ভরতপুর অভয়াঅরণ্য আমাদের হোটেলের কাছেই। অটো ভাড়া মাত্র ৫০ টাকা। ওখানে গিয়ে দেখলাম আসলে এই অভয়াঅরণ্যের নাম ‘কেওলাদেও জাতীয় উদ্যান’। ভেতরে ঢুকে বুঝলাম এই সময়ে সাধারণত কেউ এখানে আসে না। রিক্সায় চড়ে ভেতরে যেতে যেতে এক ভারতীয় দম্পতিকে রিক্সা করে ফিরে আসতে দেখলাম। আরেকটু এগোবার পর দেখলাম দু’জন বিদেশী-বিদেশিনীকে রিক্সেয়। আর দেখলাম চার-পাঁচজন কিশোর সাইকেলে সফর শেষ করে ফিরে যাচ্ছে। ট্যুরিস্ট বলতে এই কয়েকজনকেই দেখলাম।

ভরতপুর অভয়াঅরণ্যে

কী দেখলাম? দেখলাম, ঝড়ে অনেক গাছ উপড়ে রাস্তার পাশে, বনে-জঙ্গলে পড়ে রয়েছে। নির্জন রাস্তাঘাট। দু’পাশের জল অনেক জায়গায় শুকিয়ে গেছে। যেখানে জল আছে সেগুলিতেও জলের ভাগ বেশি নেই। আমাদের গাইড জানাল, সিজন টাইমে রাস্তার দু’দিকের সমস্ত জায়গা জলে ভরে যাবে, সমস্ত গাছপালায় হাজার হাজার দেশী-বিদেশী পাখিতে ভরপুর থাকবে। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। আপশোশ হলো, সেসব দেখতে পেলাম না বলে। দেখলাম কিছু গোসাপকে, এক উইঢিপির পাশে এক সাপকে, এক গাছের কোটরে এক প্যাঁচাকে, দু’টো অ্যান্টিলুপকে, একটা কচ্ছপকে যেটা রাস্তা পেরিয়ে এক বিল থেকে অন্য বিলে যাচ্ছিল। আমরা ওটাকে হাতে ধরে রাস্তা পার করিয়ে দিলাম। জলে কিছু দেশী পাখিকে দেখলাম মাছ শিকারের চেষ্টা করছে যেগুলি মাত্র তিনটি প্রজাতির। গাছের ডালে চড়ুই, বাবুই, চাতক ইত্যাদি অনেক দেশী পাখি ওড়ে বেড়াচ্ছিল। ডালে আরো কয়েকটা প্রজাতির দেশী লাল-নীল পাখি দেখলাম যেগুলি আগে দেখিনি। গাইড প্রত্যেকটি পাখিগুলির প্রজাতির নামগুলিও বলেছিল, এইমুহূর্তে মনে নেই। গাইড অন্তত একটা বিদেশী পাখি দেখাবার চেষ্টা করছিল যেগুলি কোনোভাবে আহত হবার দরুন আর ফিরে যেতে পারেনি। দুরবিন দিয়ে খুঁজছিল সেটাকে। খুঁজে পাওয়া যায়নি। অভয়াঅরণ্যের ভেতরে ওয়াচ টাওয়ার আছে, একটা শিব মন্দির আছে। একটা থ্রি স্টার লজ আছে। গাইড জানাল, রাত্রে এলে নাকি হায়েনা, নেকড়ে, চিতাবাঘ দেখা যায়। আমরা যে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম সে রাস্তায় নাকি এখন পর্যন্ত দু’বারে দু’টো বাঘ এসেছে। একদিন এই রাস্তাতেই বর্তমান রেঞ্জারের চোখে একটা বাঘ থাবা বসিয়েছিল, যার দরুন রেঞ্জারের এক চোখ এখন কানা। একটা বাঘকে ধরে রণথাম্ভোর জাতীয় উদ্যানে পাঠানো হয়েছে। মাঝে মাঝে চিতাবাঘ এসে বসে থাকা মানুষকে পেছন থেকে নাকি আক্রমণ করে এখানে, তবে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো মানুষকে আক্রমণ করেনি। এইসব দেখে ফিরতে ফিরতে সময় লাগল প্রায় তিন ঘন্টা। বুঝলাম, সিজন টাইমে এলে এই সময়টাই পাখি দেখতে দেখতে কমপক্ষে ছয়-সাত ঘন্টা লেগে যাবে। আমাদের রিক্সাচালকটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পাঞ্জাবি। রিক্সাটা তার নিজের। ভেতরে যাবার রেজিস্টার্ড রিক্সার সংখ্যা নাকি একশো সাতাশের মতো। রেজিস্টার্ড প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গাইডের সংখ্যাও কম নয়। সব সিরিয়াললি তাদের নাম্বার আসে। এই অফসিজনে নাকি ভাগ্যক্রমে ওরা আমাদের পেয়ে গেছে, নইলে শূন্যহাতে ওদের ফিরতে হত। রিক্সাচালকটি দেখলাম অনেকগুলি পাখির বাংলা নাম জানে। রিক্সাচালকটি কিছু বকশিশ চাইছিল। যেভাবে এই ঠাঠা রোদে রিক্সা চালিয়েছে না দিয়ে যাই কই।

          ভরতপুর অভয়াঅরণ্যে           

যাঁদের এখানে যাবার ইচ্ছে আছে তাঁদের জ্ঞাতার্থে জানাই, এখানে ভেতরে যাবার জন্যে জনপ্রতি প্রবেশমূল্য ৭৫ টাকা, আর শুধুমাত্র ভিডিও ক্যামেরার টিকিট লাগে, রিক্সা ঘন্টায় ১৫০ টাকা, গাইড খরচ ঘন্টায় ২৫০ টাকা। এছাড়া সাইকেল ঘন্টা হিসেবে ভাড়া পাওয়া যায়। ভেতরের ফরেস্ট লজের বর্তমান অফসিজনের রুম ভাড়া প্রতিদিন কমপক্ষে ২৫০০ টাকা, সিজনে সেটা ১০০০০ টাকা। বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি হোটেলের অফসিজনের ডবল বেড এসি রুম ১৫০০ টাকা থেকে ২০০০, নন-এসি ৭৫০-১০০০ টাকা। আর হাজার হাজার দেশীবিদেশী পাখি দেখার জন্য ভরতপুর যাওয়ার উৎকৃষ্ট সময় সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস।

          ভরতপুর অভয়াঅরণ্যে

আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে ১৮০০ শতাব্দীতে মহারাজ সূরজ মল দ্বারা তৈরি লোহাগড় দুর্গে গেলাম। দুর্গের চারিদিক জুড়ে এখনও গভীর জল। একসময় এখানে নাকি কুমির ছাড়া থাকতো যাতে শত্রু এসে আক্রমণ না করতে পারে। বর্তমানে নাকি এটা সুইসাইড পয়েন্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন সমস্ত দুর্গটা সরকারি সম্পত্তি। দুর্গের ভেতরে মিউজিয়াম, কিশোরী মহল, বাঁকে বিহারী মন্দির। এই মন্দিরের বিগ্রহ গোবর্ধন পর্বত থেকে রাজ আমলে নিয়ে আসা হয়েছিল।
ভরতপুরে আর দেখার মত কিছু নেই, সব একদিনেই সেরে ফেলা যায়।
হোটেলে ফিরে এসে তীব্র জ্বর ও পেটখারাপে আক্রান্ত হলাম। সঙ্গে সবধরনের ওষুধ ছিল। সেগুলি খেয়ে পরদিন মোটামুটি সুস্থ হলাম। গিন্নিকে বললাম, “দেখো, এই অবস্থায় যদি সেই তুফান মেলে থাকলাম তাহলে তো বিপদে পড়ে যেতাম। এটা বোধহয় তোমার রাধাকৃষ্ণই বাঁচিয়েছেন।” দেখলাম আমার কথাটা গিন্নির পছন্দ হয়েছে।
প্রসঙ্গত আবার জানিয়ে রাখছি, ভরতপুরে পাখি দেখার উৎকৃষ্ট সময় হচ্ছে সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস। বাড়িতে দূরবিন থাকলে অবশ্যই সঙ্গে নিয়ে আসবেন। নইলে গাইডের দূরবিনের সাহায্য নিতে হবে।
তবে মনে একটা আক্ষেপ থেকে গেল, ভরতপুরে গেলাম অথচ বাঁধনহারা রংবেরঙের পাখিদের দেখতে পেলাম না। আবার একটা গোল খেলাম যেন। অবশ্য সারাজীবন গোল খেতে খেতে আমি বেশ অভ্যস্ত হয়ে গেছি।