সদানন্দ সিংহের ছোটদের গল্প

ওয়ার্ল্ড ফেমাসের গপ্পো       (ছোটদের গল্প)

সদানন্দ সিংহ

চিংড়িমামা আর ফড়িংমামা দু’জনকে আজ একসঙ্গে দেখে খুবই অবাক হয়ে গেলাম। অবাক হবো নাইবা কেন ? যে লোকের কানে ফড়িংমামার কথা ঢুকলেই রাগে ফেটে পড়ত, সেই তিনিই কিনা আজ ফড়িংমামার সঙ্গে বন্ধুত্ব বাগিয়েছে! সত্যিই নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সন্ধ্যে হয়ে আসছিল। অবিশ্বাসী চোখ নিয়েই আমি হাবুরাম আর আমার ছোটভাই সুদেব বাড়ি ফিরে এলাম।

চিংড়িমামা আর ফড়িংমামাদের ভালো নামও আছে। তবুও আমরা ওই নামেই ডাকি। কারণ তাঁদের চেহেরা এবং স্বভাবটা চিংড়ি-ফড়িঙের মতো।

রাতে পড়তে বসে সুদেব বলল, দেখলি দাদা, আজ চিংড়ি-ফড়িঙের কেমন জোট! মাইরি আজ নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিনা।
বললাম, সত্যিই তাই। অদ্ভুত। ব্যাপারটা চিংড়িমামাকেই জিজ্ঞেস করতে হবে।
বলতে না বলতেই দরজায় কারুর পায়ের আওয়াজ পেলাম আমরা। দরজার দিকে দেখলাম। যা ভেবেছি তাই। আমাদের চিড়িংমামাই স্বয়ং এসে হাজির। এসেই চিংড়িমামা আরম্ভ করল, কী হে ছোকরারা, আমার ব্যাপার দেখেই স্ট্রেঞ্জ ? বুদ্ধু সব কোথাকার। ফড়িংকে তোরা আজ পর্যন্ত চিনলি না। আমিই প্রথম চিনলাম। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের মতো আমিই প্রথম আবিষ্কার করলাম। নইলে এটা অজানাই রয়ে যেত। তাই আমিই হলাম ওয়ার্ল্ড ফেমাস ফড়িংবক্সিংবাস। বুঝলি কিছু ?
বলতে বলতে চিংড়িমামা এসে চেয়ার টেনে আমাদের সামনে বসলো। আমি আর সুদেব মাথা নেড়ে বললাম, বুঝলাম না।
চিংড়িমামা পকেট থেকে একটা নস্যির কৌটো বের করল। তারপর এক টিপ নস্যি নাকে টেনে বলল, জানি, তোরা হচ্ছিস এক-একটা গুবরে পোকা। কী করেই বা বুঝবি! আমি ছাড়া ফড়িংকে কে-ই বা চিনবে? তোদের মাথায় তো মরুভূমির বালি ছাড়া কিছুই নেই। তাই তো স্কুলের পরীক্ষায় তোরা সবসময় লাস্ট।
আমি প্রতিবাদ করলাম, অংকে আমি লেটার মার্ক আর বাকি সাবজেক্টে অ্যাভারেজ পঞ্চাশের ওপর পেয়েছি।
সুদেব বললো, আমার অ্যাভারেজ মার্ক ষাটের কাছাকাছি।
— হয়েছে হয়েছে তোরা ওইটুকুই পারবি। বলে চিংড়িমামা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল। তারপর আবার শুরু করল, তোরা কি ফড়িংবক্সিংবাস-এর মানে কিছু বুঝলি?
আমরা দুজনেই মাথা নাড়লাম, না।
চিংড়িমামা শুরু করল, তবে শোন্‌ বোকারা। প্রথমেই আমি তোদেরকে বলে রাখি, আমি হলাম পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ব্যায়ামবীর, শ্রেষ্ঠ পালোয়ান। এতোদিন আমি তোদেরকে ইচ্ছে করেই জানাইনি। যাক সেকথা। ফড়িংবক্সিংবাস কথাটির মধ্যে তিনটি শব্দ আছে; প্রথমটি হচ্ছে ‘ফড়িং’, দ্বিতীয়টি হচ্ছে ‘বক্সিং’ আর শেষ শব্দটি হচ্ছে ‘বাস’। প্রথম এবং দ্বিতীয় শব্দ অর্থাৎ ‘ফড়িংবক্সিং’-এর মানে হচ্ছে ফড়িঙের একটা বক্সিং। অর্থাৎ কিনা আমি সেদিন ফড়িঙের একটা বক্সিং খেয়েই উল্টে পড়ে গেলাম! সত্যি প্রথমে বিশাসই হয়নি যে আমার চেয়েও কোনো বড় পালোয়ান পৃথিবীতে আছে যার এক ঘুসিতেই কিনা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পালোয়ান উল্টে পড়ে যেতে পারে! উল্টে পড়ে বেশ ব্যথা পেয়েছিলাম। তারপর রাগের চোটে একসময় মনে হয়েছিল, দিই, পৃথিবীটাকে এক ঘুসি মেরে এক্ষুণি ধ্বংস করে দিই। কিন্তু পরক্ষণেই গর্বে আমার বুক ফুলে উঠলো। আমি এক আবিষ্কারক বনে গেলাম। এতবড়ো একজন পালোয়ান যার এক ঘুসিতেই স্বয়ং আমিই কিনা উল্টে পড়ে গেলাম, তাকে আমিই কিনা কলম্বাসের মতো আবিষ্কার করে ফেললাম। নিজেকে ধন্য মনে করে আমি উঠে ফড়িঙের শ্রীচরণে লুটিয়ে পড়ে বললাম, প্রভু, তুমি আজ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পালোয়ানকে এক ঘা মেরে শুইয়ে দিয়েছো। আগে ভাবতেই পারিনি আমার চেয়ে আরো একজন বড় পালোয়ান পৃথিবীতে আছে যাকে আমি আজ আবিষ্কার করে ফেললাম। তাই প্রভু একজন আবিষ্কারক হিসেবে আমার জন্যে সুন্দর একটা নাম কিংবা উপাধি ঠিক করে দাও যাতে আমার নাম ইতিহাসে লেখা থাকে। তখন ফড়িংপ্রভু খুশি হয়ে আমার নাম দিল ফড়িংবক্সিং। নামটা শুনে আমি আবার বললাম, প্রভু ফড়িংবক্সিং নামটা একটু কেমন কেমন লাগছে। দয়া করে কলম্বাস নামের মতো একটা ঘাস, খাস, বাস, মাস, লাস লাগিয়ে দাও। তখন ফড়িংপ্রভু দয়া করে নাম দিলো ফড়িংবক্সিংবাস। আমার নামে চারিদিকে ধন্য ধন্য পড়ে গেল। যেখানে যেতাম সেখানেই শুনতে পেতাম, ফড়িংবক্সিংবাস জিন্দাবাদ। কি রেডিও, কি টিভি, কি পত্রিকায় আমার নাম এতো প্রচার হতে লাগল কি আর বলব তোদের। শুনতে শুনতে আমার কান এতো ঝালাপালা হল যে শেষে বিরক্ত হয়ে একঘন্টার জন্যে চন্দ্রলোকে চলে যেতে হল।
অনেকক্ষণ কথা বলার পর চিংড়িমামা এবার থামল। চেয়ারে একটু নড়েচড়ে বসল।
সুযোগ পেয়ে এবার আমি একটু মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলাম, চন্দ্রলোকে একঘন্টার জন্যে ঘুরে এলে? তা কোন্‌ চন্দ্রযানে করে?
তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে চিংড়িমামা বলল, তোরা কি কোনো কথারই ঠিক অর্থ ধরতে পারবি না কোনোদিন? আসল কথা হল আমি একঘন্টার জন্যে ইসরো স্পেস সেন্টার ঘুরে এসেছিলাম। সেখানে আমার এক বন্ধুর দাদা বিজ্ঞানীর সঙ্গে বসে চন্দ্রযানকে পরিচালনা করলাম। বুঝলি বোকাগণ?
আমি আবার বললাম, তাছাড়া চিংড়িমামা, তোমার নাম কোনো পত্রিকায়, টিভি, রেডিওতে দেখিনি শুনিনি কেন?
আমার কথায় চিংড়িমামা রেগে উঠল, দেবো একটা চড়। সারাদিন শুধু আজেবাজে পত্রিকা পড়বি, অখাদ্য টিভি চ্যানেল দেখবি, রেডিও কোনোদিন গান ছাড়া শুনবি না, তাহলে আসল খবরগুলি কী করে পাবি রে হতচ্ছাড়া?
সুদেব বলে উঠল এইসময়, আচ্ছা সেদিন ফড়িংমামা কেনই বা তোমাকে বক্সিং মারলো?
প্রশ্ন শুনে চিংড়িমামা খুশি হল। বললো, হ্যাঁ বলছি তোদের। সেদিন আমি অনেকগুলি টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। সে প্রায় লাখ খানেক টাকা হবে।
মাঝখানে আমি একটু ফোঁড়ন কাটলাম, লাখ খানেক টাকা, সে তো অনেক টাকা! তুমি কোথায় পেলে ?
চিংড়িমামা জবাব দিলো, শুনে যা মূর্খরা। কথার মাঝখানে ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে উঠবি না। সেদিন আমি যখন টাকাগুলি নিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম তখন পথে চারজন ডাকাত আমার পথ আটকে দাঁড়াল। ডাকাতগুলির হাতে পিস্তল, স্টেনগান, রাইফেল আর লেসার গান। ওদের দেখে আমার করুণাই হচ্ছিল। ছোট্ট বাচ্চারা পৃথিবীখ্যাত পালোয়ানকে চিনতেই পারেনি। ওসব অস্ত্র তো আমার কাছে কিছুই না। শিক্ষা দেবার জন্যে ওদের দিকে একটা ঘুসি ছুড়লাম। ঐ এক ঘুসিতেই চার ডাকাত জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল।
আমি আর সুদেব একসঙ্গে বলে উঠলাম, এক ঘুসিতে চার ডাকাত লুটিয়ে পড়ল ?
আমাদের কথায় চিংড়িমামা বললো, তা নয় তো কি। এক ঘুসির চোটে শুধু ওরা কেন, ওদের মরা বাপ-মা-দাদু চৌদ্দগুষ্টিই শুয়ে পড়লো। ঠিক সে সময় ফড়িংপ্রভু রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। তখন আমার ছুঁড়ে দেওয়া ঘুসির একটু হাওয়া লাগতেই ফড়িংপ্রভু একটু হেলে পড়েছিল। আর তাতেই এগিয়ে এসে পাল্টা আমাকে এক বক্সিং মারলো। তারপরের ঘটনা তো ইতিহাস। সবই বলেছি তোদের।
এবার আমি বললাম, তুমি কিরকম ওয়ার্ল্ড ফেমাস! কেউই জানেনা ব্যাপারটা। পাড়ার কেউ না। আমরাও আগে জানতাম না কেনো ?
চিংড়িমামা লাফিয়ে উঠল, বলিস কি, এ্যাতো বড় একটা খবর কেউ জানে না? জানে, সবাই জানে।  মূর্খ তোরাই শুধু জানিসনি। দাঁড়া, জানাচ্ছি এখনই। কথাগুলি বলেই চিংড়িমামা উঠে দাঁড়িয়ে আমার আর সুদেবের পিঠে দুটো চাপড় লাগিয়ে দিলো। চাপড়টা বেশ জোরেই লেগেছিল। ব্যথা পাচ্ছিলাম।
কাঁদো কাঁদো স্বরে সুদেব বললো, এক্ষুণি আমি মাকে বলে দিচ্ছি।
সুদেব উঠতে যাচ্ছিল। চিংড়িমামা সুদেবকে জোর করে বসিয়ে বললো, আরে ছ্যাঁ, তোরা দেখছি সত্যিই মূর্খ। আমি আদর করে একটু চাপড় মারলাম, আর তোরা অমনি রেগে গেলি!
চিংড়িমামা উঠে দাঁড়ালো। পকেট থেকে একমুঠো চকোলেট বের করে টেবিলের ওপর রাখল আর বলল, ওয়ার্ল্ড ফেমাসের পুরস্কারস্বরূপ এক চকোলেট কোম্পানি আমাকে এক ট্রাক চকোলেট দিয়ে গেছে। এখন চকোলেট খা তোরা। পরে আরো অনেক চকোলেট এনে দেবো তোদের। আর হ্যাঁ, তোরা আমাকে আর চিংড়িমামা বলে ডাকিস না।
আমি বললাম, তাহলে কি ফড়িংবক্সিংবাসমামা বলে ডাকবো?
চিংড়িমামা বলল, আরে ওটা তো আমার উপাধি। ও নামে ডাকবি কেন? তোরা আমাকে জটুমামা বলেই ডাকিস। কেমন? আমি এখন যাচ্ছি। ইংল্যান্ড থেকে আমার একটা ফোন আসার কথা।
চকোলেটগুলির অর্ধেকটা আমার পকেটে চালান করে বললাম, সেটা কি ইংল্যান্ডের মহারানির ফোন?
বাকি চকোলেটগুলিকে হাতে নিয়ে সুদেব বললো, তারপর হয়তো আমেরিকা থেকে ফোন আসবে।
— যত্তোসব এঁচোড়ে পাকা ছেলে। বলেই চিংড়িমামা বেরিয়ে গেল।