
মাস্টারস্ট্রোকের প্রয়োজনীয়তা
সদানন্দ সিংহ
ভূমিকা
না, না, আমি কোনো রোগ বা শারীরিক বিপর্যয়ের কথা বলছি না। আমি যে মাস্টারস্ট্রোকের কথা বলছি, সেটা হচ্ছে মাস্টার লোকেরা যে স্ট্রোক করেন সেই মাস্টারস্ট্রোকের কথাই বলতে চাইছি। জানি, ‘মাস্টারস্ট্রোক’ কথাটার সঙ্গে সবাই কমবেশি পরিচিত, বিশেষ করে শচীনের মাস্টারস্ট্রোক কিংবা পুতিনের মাস্টারস্ট্রোক। কিন্তু আমি এও জানি, আপনার নিজের মাস্টারস্ট্রোক নিয়ে হয়তো কোনোদিন আপনি চিন্তাই করেননি। কথাগুলি কি অদ্ভুত শোনাচ্ছে ? হয়তো ভাবছেন, এটাকে এখানে টেনে আনার অর্থ কী ? তাহলে আসুন, মাস্টারস্ট্রোকের সারমর্ম এবং এর জাদু আবিষ্কারের চেষ্টা করা যাক। কারণ মাস্টারস্ট্রোক হচ্ছে একটা শিল্প। আর আপনি নিজেই যে কোনো না কোনো দিকে আপনি এক-একজন মাস্টার, সেটা হয়তো আপনি টের পাননি। আপনি হয়তো টেরই পাননি, আপনার দ্বারাই এক মাস্টারস্ট্রোক করা সম্ভব। কারণ ব্যক্তিগত বা কর্মজীবনের জন্য আমাদের কোনো কোনো সময় মাস্টারস্ট্রোকের দরকার হয়।
মাস্টারস্ট্রোক কী
মাস্টারস্ট্রোক হল এমনই একটি পদক্ষেপ যা এতটাই কার্যকরী যে এটি এক সাময়িক বা দীর্ঘস্থায়ী চিহ্ন রেখে যায়। কোনো একটি সময়ে সত্যিই অসাধারণ কিছু তৈরি করার জন্য মাস্টারস্ট্রোক উপস্থাপিত করা হয়। এটিকে এক নিখুঁত দাবার চাল হিসাবে ভাবা যায় যার এক শৈল্পিক চাল হয়ে সবকিছু পাল্টে দেয় এবং এটি এক জাদুকরী মুহূর্ত নিয়ে উপস্থিত হয়ে নিখুঁতভাবে বাস্তবায়িত হয়, যা সকলের চোখকে বিস্মিত করে। তাই
যে-কোনো মাস্টারস্ট্রোক কারুর জীবনে কর্মে শ্রেষ্ঠত্ব, বিচক্ষণতা, দক্ষতা নিয়ে এক বিচারবোধ এনে দিতে পারে।
তাহলে মাস্টারস্ট্রোককে নিয়ে কি আলাদা করে চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন? হ্যাঁ নিশ্চয়ই, এর জন্য যে বিষয়ের ওপর প্রয়োগ করা হবে তার ওপর গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করার প্রয়োজন যার স্ট্রোক-টা এক সৃজনশীলতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে ছাঁচ ভাঙা, নতুন, অপ্রত্যাশিত ধারণাও থাকতে পারে। এটি প্রচলিত রীতিনীতি থেকে আলাদা করে এক নতুন অনুসন্ধানের পথ খুলে দিতে পারে।
ইতিহাসে মাস্টারস্ট্রোক
ইতিহাস মাস্টারস্ট্রোকে ভরা এবং সবগুলির কথা বলা এখানে সম্ভবও নয়। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটির কথা বলা যায়। এডিসনের আলোর বাল্বের কথাই ধরুন। এটি কেবল আলো ছিল না; এটি অকল্পনীয় উপায়ে জীবনকে আলোকিত করেছিল। এডিসনের আবিষ্কার সমাজকে বদলে দিয়েছিল, দিন এবং জীবনযাত্রাকে প্রসারিত করেছিল। শিল্পকলায়, দা ভিঞ্চির “মোনালিসা” একটি কালজয়ী মাস্টারস্ট্রোক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। কেবল একটি চিত্রকর্ম নয়, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মনমুগ্ধকর একটি মাস্টারপিস। প্রতিটি ব্রাশস্ট্রোক দা ভিঞ্চির দক্ষতা এবং দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করে। শেক্সপিয়ারের “হ্যামলেট” এবং “রোমিও এবং জুলিয়েট” এর মতো নাটক যা গল্প বলার ধরন এবং ভাষাকে রূপ দিয়েছে, যেখানে “সমস্ত পৃথিবী একটি মঞ্চ” হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। টলস্টয়, গোর্কি, রবীন্দ্রনাথ — এরকম আরো ভূরিভূরি উদাহরণ টানা যায়।
আধুনিক সময়ে মাস্টারস্ট্রোক
আজ মাস্টারস্ট্রোক এখন নতুন আকার নিয়ে দেখা দিয়েছে। ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক এবং টুইটারের মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি আমাদের সংযোগ, ভাগাভাগি এবং যোগাযোগের পদ্ধতির যুগান্তকারী পরিবর্তন করেছে। তারা বিশ্বব্যাপী মিথস্ক্রিয়াকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে এবং কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করেছে। এখন বৈদ্যুতিন ব্যবস্থা আমাদের জীবনেরই অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। ইদানীং এ.আই. টেকনোলোজি সবকিছুকেই সহজ করে তুলেছে। যদিও একসময় আমাদের দেশে ব্যাঙ্কের কর্মীরা কম্পিউটারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল, কারণ তখনকার সময়ে বৈদ্যুতিন ব্যবস্থাটা ভুল পদক্ষেপ বলে মনে হয়েছিল। সময় সবকিছুকে পালটে দেয়। সমগ্র পৃথিবীতে বৈদ্যুতিন ব্যবস্থা চালু করাটাই আজ শ্রেষ্ঠ মাস্টারস্ট্রোক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকের কোলাহলপূর্ণ পৃথিবীতে, একটা মাস্টারস্ট্রোক একটি নক্ষত্র হিসাবে জ্বলজ্বল করে। এটি মানুষের সম্ভাবনা, সাধারণ সীমানা ভাঙার ক্ষমতার প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করে এবং এক নতুন মান নির্ধারণ এবং সীমা অতিক্রম করার বিষয়ে ভাবায়। এক মোহিত মাস্টারস্ট্রোক এখনকার প্রজন্মের কাছে এক রেফারেন্স হয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। আবার এমন মাস্টারস্ট্রোকও আছে যাকে অনেকে বলেন কার্যকারী মাস্টারস্ট্রোক, কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে দেখা যায় সেগুলি এক-একটা ব্যর্থস্ট্রোক ছাড়া আর কিছুই নয়। যেমন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রচুর সিদ্ধান্ত।
মাস্টারস্ট্রোকের প্রকারভেদ
মাস্টারস্ট্রোক দু রকমের হতে পারে — ওপেন মাস্টারস্ট্রোক এবং হিডেন মাস্টারস্ট্রোক। ওপেন মাস্টারস্ট্রোক হচ্ছে এমন মাস্টারস্ট্রোক যিনি প্রয়োগ করেন তিনি সবার সামনেই প্রয়োগ করেন। আর হিডেন মাস্টারস্ট্রোক হচ্ছে গুপ্ত মাস্টারস্ট্রোক যা সবার অজান্তেই প্রয়োগ হয়ে যায় এবং সঠিকভাবে কার্যকরী হয়ে যায়।
সময় নির্বাচন এবং বাস্তবায়ন
সময় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক সময় নির্বাচনে ভুল থাকলে সেরা ধারণাটিও ব্যর্থ হতে পারে, ফলে কোনো মাস্টারস্ট্রোক ব্যর্থতায় পর্যবাসিত হতে পারে। ২০০৭ সালে অ্যাপলের আইফোনের কথা ভাবুন, এমনই এক সময়ে এক মাস্টারস্ট্রোক দিয়ে এটি চালু হয়েছিল ঠিক যখন স্মার্টফোন বিপ্লবের জন্য সমস্ত বিশ্ব এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অপেক্ষা করছিল। প্রযুক্তি, ভোক্তা প্রস্তুতি এবং চাহিদা আইফোনের সাফল্যের জন্য একত্রিত হয়েছিল। আর কার্য সম্পাদনও গুরুত্বপূর্ণ। একটি দুর্দান্ত ধারণা থাকা যথেষ্ট নয়; আপনাকে অবশ্যই এটিকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত করতে হবে সঠিক সময়ে। একটি মাস্টারস্ট্রোক প্রায়শই সতর্ক পরিকল্পনা এবং নিখুঁত বাস্তবায়নের মাধ্যমে সফল্ভাবে বাস্তবায়িত হয়। এর জন্য এক স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি, কৌশলগত চিন্তাভাবনা এবং দৃঢ়তা এবং অভিযোজনযোগ্যতার সাথে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার ক্ষমতা প্রয়োজন।
মাস্টারস্ট্রোক, ব্যক্তিগত বা কর্মজীবনে
ব্যক্তিগত জীবনে আপনি যাই হোন — কারুর পিতামাতা বা কারুর সন্তান বা সরকারি কর্মী বা ব্যাঙ্ককর্মী — বা যাই হোন না কেন, যদি আপনার জীবনে কোনো চ্যালেঞ্জ আসে তবে আপনি নিশ্চিতভাবে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্যে মাস্টারস্ট্রোক প্রয়োগ করতে পারেন। প্রথমেই এজন্য আত্মবিশ্বাস দরকার। আত্মবিশ্বাসই নিয়ে আসে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার ক্ষমতা। আপনিই ঠিক করবেন আপনার মাস্টারস্ট্রোকটা কী ধরনের হবে — ওপেন না হিডেন। আপনার নিজস্ব মাস্টারস্ট্রোক কীভাবে তৈরি করবেন তা নিয়ে প্রথম আপনিই ভাববেন। আপনার আবেগটাকে জাগ্রত করুন, তারপর কৌশলগুলি কী কী হতে পারে তা সনাক্ত করুন। গভীরভাবে ডুব দিন। দরকারে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, একটি মাস্টারস্ট্রোক রাতারাতি জন্মায় না। এর জন্য অধ্যবসায় এবং ব্যর্থতা থেকে শেখার প্রয়োজন। চ্যালেঞ্জগুলিকে বৃদ্ধির সুযোগ হিসাবে আলিঙ্গন করুন এবং প্রতিক্রিয়ার জন্য উন্মুক্ত থাকুন। অনুপ্রেরণাদায়ক চ্যালেঞ্জিং লোকেদের সাথে নিজেকে ঘিরে রাখুন। এই সময় কারুর সহযোগিতা অপ্রত্যাশিত সাফল্যের জন্ম দিতে পারে। আপন লোকদের সঙ্গে ধারণা ভাগাভাগি করে নেওয়া উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে পারে এবং সম্ভাবনাকে প্রসারিত করতে পারে। এজন্যে ঝুঁকি নিতে হবে। আরামের জায়গা থেকে বেরিয়ে আসার মাধ্যমে প্রায়শই বড় বড় সাফল্য আসে। ঝুঁকিকে সৃজনশীলতার অনুঘটক হিসেবে গ্রহণ করা শিখতে হবে।
ইদানীং মাস্টারস্ট্রোক
ইদানীং মাস্টারস্ট্রোকের ব্যবহার বেশি দেখা যায় রাজনৈতিক কারণে। ভোটের আগে কোনো প্রকল্প ঘোষণা বা কিছু চালু করার মাস্টারস্ট্রোক, এ দল ছেড়ে ও দলে যাওয়ার মাস্টারস্ট্রোক, বিধানসভা ছেড়ে রাজ্যসভায় যাওয়ার মাস্টারস্ট্রোক, মৌলবাদী মাস্টারস্ট্রোক, জেন জি মাস্টারস্ট্রোক, সাম্রাজ্যবাদী মাস্টারস্ট্রোক ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে এসব মাস্টারস্ট্রোকগুলো সব বড়ো বড়ো ব্যাপার নিয়ে। সাধারণ মানুষের মাস্টারস্টোকগুলো আবার একটু অন্যরকমের এবং তার মধ্যে দু রকমের মাস্টারস্ট্রোকই বেশির ভাগ সাধারণ মানুষ ব্যবহার করেন — ১) কাউকে দাবিয়ে রাখার জন্য মাস্টারস্ট্রোক, ২) নিজের স্বার্থসিদ্ধি কিংবা প্রতিষ্ঠানের জন্যে মাস্টারস্ট্রোক। এই দু রকমের মাস্টারস্ট্রোক এমনভাবে প্রয়োগ করা হয় যা প্রকাশ্যে কমই আসে। আগে পরাধীন ভারতবর্ষে স্বাধীনতাকামীদের যে মাস্টারস্ট্রোকগুলো ছিল সেটা দেশ এবং সমাজের স্বার্থে। এখন সামাজিক উন্নতির মাস্টারস্ট্রোকের কথা আমরা প্রায় ভুলতে বসেছি। তবে বিজ্ঞানী, দার্শনিক এবং প্রকৃত কবি-লেখকেরা মাস্টারস্ট্রোক নিয়ে ভাবেন না মোটেই, তাঁরা নীরবে কাজ করে যান এবং তাঁদের সব বক্তব্য বা লেখাগুলো কালক্রমে একদিন এক-একটা মাস্টারস্ট্রোকে পরিণত হয়।
মাস্টারস্ট্রোকের প্রভাব
পরিশেষে বলা যায়, একটা মাস্টারস্ট্রোক এক দুর্দান্ত ধারণা বা প্রকল্পকে অতিক্রম করে এক নতুন প্রভাব তৈরি করে। একটা মাস্টারস্ট্রোক কেবল তার স্রষ্টার উপকার করে না; এটি তরঙ্গায়িত হয়, অনেককে প্রভাবিত করে। এটি অন্যদের উদ্ভাবনকে অনুপ্রাণিত করে, নতুন মান নির্ধারণ করে এবং প্রায়শই শ্রেষ্ঠত্বের জন্য একটি মানদণ্ড হয়ে ওঠে। এছাড়া একটা মাস্টারস্ট্রোক ভবিষ্যত প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। এটি বড় স্বপ্নদর্শীদের অনুপ্রাণিত করে এবং উৎসাহিত করে। এর প্রভাব তাৎক্ষণিক সাফল্যের বাইরেও বিস্তৃত হয়, এবং এমন একটি উত্তরাধিকার তৈরি করে যা সমাজের নিয়মকে চ্যালেঞ্জ করে। তাই আমাদের ব্যক্তিগত বা কর্মজীবনের চ্যালেঞ্জগুলিকে দূর করার জন্য চিরকাল মাস্টারস্ট্রোকের প্রয়োজনীয়তা থেকে যাবে। তবে মাস্টার লোক এবং মাস্টার মাইন্ডেড লোক — এই দু ধরনের লোকের মধ্যে যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য তা আপনাকে বুঝতে হবে, কারণ মাস্টার মাইন্ডেড লোকে আমাদের এই পৃথিবীটা এখন কিলবিল করছে।