সোনায় সোহাগা – সদানন্দ সিংহ

সোনায় সোহাগা – সদানন্দ সিংহ

সোনায় সোহাগা           (অনুগল্প)

সদানন্দ সিংহ

পাত্রী দেখতে এসেছে অতনু। পাত্রীর বাড়িতে এক সোফায় বসে আছে অতনু এবং অতনুর মা-বাবা। ওপাশের সোফা এবং চেয়ারে পাত্রীর বাড়ির লোকজন। একে একে পরিচয়পর্ব সারা হচ্ছে — মেয়ের বাবা, মেয়ের মা, মেয়ের কাকা, মেয়ের কাকি, মেয়ের ছোটোভাই … ।
অতনুর এসবে মন নেই। মা-বাবার ইচ্ছেতেই সে আজ এসেছে। মা-বাবা উঠে-পড়ে লেগেছে ছেলের বিয়ে দিতে। হবে নাই বা কেন, অতনুর কেন্দ্রীয় সরকারের চাকুরি, ভালোই মাইনে পায়, তবে ‘বিয়ে করব না’ বলে ছত্রিশিটি বসন্ত পার করে দিয়েছে সে, বিয়ে করার তার নাকি একটুকুও ইচ্ছে নেই।
তার কারণও একটা আছে, মেয়ে জাতটার ওপর তার বড়ো ভয় এখন। মনে পড়ে, পাঁচ বছর আগে অফিস দেরী হয়ে গেছিল বলে অতনু সেদিন হুড়মুড় করে ছুটছিল, ঠিক তখনই অনিচ্ছাকৃতভাবে একজন মেয়ের সাথে এক জোরে ধাক্কা লেগে যায়। আর সেই মেয়ে কিনা তখন তার প্রাইভেট জায়গায় এমন এক ক্যারেটে মারল যে অতনু যন্ত্রণায় বসে পড়েছিল। মেয়েটা ক্যারেটে মারার পর বলেছিল, আরেকবার টিজিং করতে এলে আরেকটা ক্যারেটে মারব। যন্ত্রণা পেয়েও অতনু বলার চেষ্টা করেছিল, ম্যাডাম আমি ইচ্ছে করে করিনি। কিন্তু তার কথা কি শোনে মেয়েটা? ওলটে বলেছিল, ওরকম সবাই বলে। মনে রাখবেন, মেয়েরা অবলা নয়। বলেই বীরদর্পে মেয়েটা চলে গেছিল। তারপর থেকে অতনু অচেনা মেয়েদের কাছ থেকে দশ হাত দূরে থাকে।
অতনুর মা-বাবা পাত্রীর মা-বাবার সঙ্গে চুটিয়ে এটা-সেটা আলাপ করে চলেছে। সামনের টি-টেবিলের ওপর রসগোল্লা, কালোজাম ইত্যাদি বিভিন্ন মিষ্টি জাতীয় খাবার। সবাই খাচ্ছে। এইসময় পাত্রীর মা উঠে বলল, আমি মেয়েকে আনছি।
পাত্রীর মা ঘরের ভেতর ঢুকে গেল।
কিছুক্ষণ পর, পাত্রীর মা মেয়েকে সাজিয়ে মেয়ের কাঁধ ধরে আস্তে আস্তে ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। এদিকে পাত্রীকে দেখামাত্র অতনুর তাকে চিনতে একমুহূর্তও দেরি হল না, এ তো সেই ক্যারেটে মেয়ে যে তার প্রাইভেট জায়গায় ক্যারেটে মেরেছিল। অতনু তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বলল, এ বিয়ে আমি করব না। বলেই অতনু দরজার দিকে ছুটে পালাতে যাচ্ছিল। ব্যাপার দেখে কেউ কিছু বুঝে উঠতেই পারছিল না।
এইসময় পাত্রী হঠাৎ বলে উঠল, দাঁড়ান, যাবেন না।
এসব দেখে বাকি উপস্থিত সবাই একে অপরের মুখে তাকাচ্ছিল, ব্যাপারটা কী হতে যাচ্ছে কেউ বুঝতে পারছিল না।
এবার পাত্রী দ্রুত এগিয়ে এসে অতনুর এক হাত খপ করে ধরে ফিসফিস করে বলল, আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে। চলুন ভেতরে।
পাত্রী অতনুকে নিয়ে তার ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। অতনুকে বিছানায় বসিয়ে পাত্রী কান ধরে বলল, Sorry, আমার সেদিন খুব ভুল হয়ে গেছে। সেদিনের ঘটনার জন্যে আমি যে-কোনো শাস্তি মাথা পেতে নিতে রাজি। আপনি আমায় ক্ষমা করে দেবেন।
অতনু বেশ অস্বস্তিতে পড়ল, এভাবে কোনো সুন্দরী মেয়ে Sorry বলেনি তাকে কখনো। তার মনটাও নরম হয়ে গেল, বলল, না না, ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমি এ বিয়েতে রাজি, আপনি?
— আমিও রাজি।
তারপর দুজনের মধ্যে বেশ আলাপ জমে গেল, সময়ের হিসেব তারা বুঝতেই পারল না।

এদিকে বাইরে সবাই বেশ উৎকণ্ঠিত হয়ে বসে রয়েছে। একঘন্টা হয়ে গেল দরজা আর খুলছে না। শেষে পাত্রীর মা দরজায় টোকা দিয়ে বলল, তোমরা কি বেরিয়ে আসবে এখন? সবাই অপেক্ষা করছে।
সঙ্গে সঙ্গেই দরজা খুলে গেল। হবু পাত্র-পাত্রী দুজনেই বেরিয়ে এসে জানাল, এ বিয়েতে আমরা রাজি।

তারপর খুব ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেল। অতনুর বউ এখন খুব খুশি, কারণ সে যা বলে তার স্বামী এখন তাই-ই করে। যদি সে বলে দাঁড়াও, তার স্বামী দাঁড়িয়ে যায়, যদি সে বলে বাঁয়ে যাও, স্বামী বাঁয়ে যায়, যদি বলে ডাইনে যাও, স্বামী ডাইনে যায়। এমন স্বামী পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। আসলে পৃথিবীর সব স্ত্রীরা-ই চায় স্বামী তার কথা মতো চলুক।
তাহলেই সংসার হয় সোনায় সোহাগা।