
ধূ ধূ প্রান্তর (অনুগল্প)
স্বাতী ধর
এবার ধানের গোছাগুলি হয়েছে বেশ। বৃষ্টি সময় মত এসেছিল বলে চাষিদের কারুরই ক্ষতি হয়নি। খরচও বেশ কমে গেছে। ধান পেকে ধানের গোছাগুলিও এখন হলুদ হয়ে এসেছে। বাদল ক্ষেতের আল দিয়ে এগোতে এগোতে তার সীমানার ধানক্ষেতের মাঝ বরাবর চলে এসেছে। এইসময় সে দেখল ধানক্ষেতের আল দিয়ে কারা সব মাথা নিচু করে লুকিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। — কে ওখানে ? কে ? বলে বাদল সামনে এগিয়ে কিন্তু কাউকেই দেখতে পেল না। ওরা সব অন্যদিকে সরে গেছে। বাদল তাড়াতাড়ি আল বেয়ে পশ্চিমদিকে গেল। কিন্তু কাউকেই পেল না। হয়তো ওরা পূবদিকে সরে গেছে, বা উত্তরদিকে অথবা দক্ষিণদিকে সরে গেছে। খি খি হাসি শোনা যাচ্ছে, কিন্তু ওদের ধরা যাচ্ছিল না। এভাবে লুকোচুরি খেলে বাদল একটু ক্লান্ত হয়ে পড়ল। খি খি হাসির আওয়াজ কিন্তু তখনো শোনা যাচ্ছে। এই আওয়াজ শুনে বাদল কিন্তু নিশ্চিতভাবে বুঝে গেছে, এটা দূরন্ত ছেলেদের কান্ড। বাদল চেঁচিয়ে বলল, তোমরা কি আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলছ ? ওদিক থেকে উত্তর এল, হ্যাঁ। বাদল এবার বলল, তাহলে আমি হেরে গেছি। তোমরা এখন সব বেরিয়ে এস।
এবার একে একে ছেলের দল হি হি করে হেসে সবাই উঠে দাঁড়াল। পাঁচজনের দল। সবার বয়েস তেরোর কাছাকাছি। ওরা বাদলের কাছে আসে। চারজনকে বাদল চেনে, গ্রামেরই ছেলে। বাদল জিজ্ঞেস করল, তোমরা এখনে কী করছ ?
— কাকু, আমরা পল্টুকে গ্রামের ক্ষেত দেখাচ্ছি। আর কাকু পল্টুকে আমরা বারবার বললাম, ক্ষেতের ধান কাটা হলে এখানে মাইলের পরে জুড়ে মাইল খেলার মাঠ তৈরি হবে। সে একথা বিশ্বাসই করেনি। সে বলছে যে এমন খেলার মাঠ নাকি কোনখানে নাই।
যে ছেলেটা এতক্ষণ কথা বলছিল তাকে চেনে বাদল। তার নাম শ্যামু, গ্রামের স্কুল মাস্টারের ছেলে। আর পল্টু নামের ছেলেটি যে কোনোদিন গ্রামে আসেনি তাও সে বুঝতে পারে। শ্যামুই আবার বলে, পল্টু শহরে থাকে। সে আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে।
বাদল পল্টুকে জিজ্ঞেস করে, তোমাদের ওখানে খেলার মাঠ নেই ?
— না। খেলার জায়গা নেই। মাঝেমাঝে মা-বাবার সাথে পার্কে গেলে তখন খেলি।
— স্কুলে ?
— নেই।
এবার বাদল বলল, ওরা যা বলেছে, সব ঠিক। কিছুদিন পরেই এখানে ধান কাটা হবে। তারপর শীতকালে ধানক্ষেত সব শুকিয়ে যাবে। তারপর শুধু ধূ ধূ প্রান্তর, মাঠ। এক দৌড়ে এপার-ওপার করতে খুব কষ্ট হবে। তখন তুমি বেড়াতে এস। দেখবে কী সুন্দর মাঠ তৈরি হয়েছে। সেখানে কোথাও ফুটবল খেলা হবে, কোথাও ভলিবল, কোথাও ক্রিকেট, কোথাও দাড়িবান্দা, কোথাও গোলাছুট ……।
কথাগুলি শুনতে শুনতে পল্টুর চোখে খুশির ঝিলিক ফুটে ওঠে, সে জবাব দেয়, আমি আসব, আমি খেলব। এমন মাঠ আমি নিজের চোখে দেখব।