ছাদবিড়াল – সদানন্দ সিংহ

ছাদবিড়াল – সদানন্দ সিংহ

ছাদবিড়াল          (অনুগল্প)

সদানন্দ সিংহ

কয়েকদিন হয়ে গেছে ছাদবিড়ালটার আর দেখা নেই। আজো তাই। মাছওয়ালাদের পেছনেও ছাদবিড়ালটাকে আর দেখা যাচ্ছে না। নইলে ভোরে ঘুম থেকে উঠেই ঝুমুর যখন দরজা খুলে ব্যালকনিতে যেত তখনই সে দেখত ছাদবিড়ালটা তার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। সে তখন হুলোর জন্য রাখা ছ’কেজি-র যে ক্যাটফুডের প্যাকেট আছে সেখান থেকে প্লেটে কিছু ক্যাটফুড নিয়ে ছাদবিড়ালটাকে দিত। বিড়ালটা চটপট খেয়েই কার্নিস বেয়ে চলে যেত। কারণ তাদের হলো এই ছাদবিড়ালটাকে দেখলেই তেড়ে ভাগিয়ে দেয়। ছাদবিড়ালটা ওইটুকু খাবারের জন্যেই প্রতিদিন ভোরে আসত। অন্যসময়ে খুব কমই আসত।

ছাদবিড়াল নামটা মিমি দিয়েছিল। মিমি ঝুমুরের আট বছরের মেয়ে। মিমি বলেছিল, ঘরহীন কুকুরদের যদি পথকুকুর বলা হয় তাহলে ঘরহীন যে বিড়ালরা ছাদে থাকে তারাই ছাদবিড়াল। ঝুমুর দেখেছে, সত্যিই এই বিড়ালটা ছাদেই থাকে। কেউ ছাদ থেকে তাড়িয়ে দিলে আরেক বাড়ির ছাদে চলে যায়। এছাড়া ঝুমুর লক্ষ করেছে, এই বিড়ালটা সকালে এ পাড়ায় যেসব মাছওয়ালা মাছ বিক্রি করতে আসে তাদের পেছন পেছন ম্যাঁও ম্যাঁও করে ডেকে মাছওয়ালাদের পিছু পিছু দৌড়োয়। কেউ মাছ কিনলে সেই মাছ যখন মাছওয়ালা কেটে দেয় তখন মাছের শরীরের যেসব অংশ ফেলে দেওয়া হয় সেগুলি বিড়ালটা খায়। সারাদিন ধরেই বিড়ালটা খাবারের খুঁজে ব্যস্ত থাকে। মাঝে মাঝে খুব খিদে পেলে বিড়ালটা বিকেলেও ঝুমুরদের ব্যালকনিতে চুপিচুপি এসে উপস্থিত হয়। আর হুলো ওকে দেখলেই দৌড়ে এসে তাড়িয়ে দেয়। বিড়ালটা তখন পালিয়ে যায়।

আজ রবিবার, বন্ধের দিন। আট দিন হয়ে গেল, ছাদবিড়ালটার এখনো দেখা নেই। সকাল সাতটা। মিমি ঘুম থেকে উঠে ব্যালকনিতে গিয়েই মাকে ডাকে, মা, তাড়াতাড়ি এসো, দেখে যাও।
— কী আবার দেখার আছে। বলতে বলতে ঝুমুর এসে ব্যালকনিতে উপস্থিত।
— ঐ দেখো। ছাদবিড়াল।
ঝুমুর দেখে রাস্তার ওপারে শুভদের বাজে মালপত্র রাখার যে আটফুট বাই ছ’ফুট একচালা টিনের ছোট্ট ঘর আছে সেই ঘরের একচালা টিনের ছাদের ওপর এক সাদা রঙের বিড়াল শুয়ে আছে। ঝুমুর ভালো করে দেখে নিশ্চিত হয়, হ্যাঁ ছাদবিড়ালটাই।
— মা, তুমি ওকে ডেকে খাবার দাও। ও এতদিন খেতে পায়নি।
— হ্যাঁ হ্যাঁ, ডাক ওকে।
মা-মেয়ে দু’জনে ছাদবিড়ালটাকে ডাকতে থাকে, আয় আয় …। বিড়ালটা কোনো সাড়া দেয় না। ওরা আবার ডাকে। কিন্তু সাড়া পায় না। অনেকক্ষণ ডাকার পর ছাদবিড়ালটা একবার মাথা তুলে ‘ম্যাঁও’ বলে জবাব দেয়। তারপর আবার মাথা নামিয়ে দেয়। এবার ঝুমুর মেয়েকে বলে, ও আসবে। তুমি ব্রেকফাস্ট সেরে পড়তে বসো।

ঘন্টাখানেক পর ঝুমুর যখন আবার ব্যালকনিতে যায় তখন সে দেখে পাশের বাড়ির কার্নিশে ছাদবিড়ালটা দাঁড়িয়ে আছে। বিড়ালটাকে দেখে সে অবাক হয়। একেবারেই রোগা হয়ে গেছে বিড়ালটা। আর চারপায়ে দাঁড়িয়ে ও টলছে। ঝুমুর ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, এ অবস্থা কী করে হল ! কেউ কি ওকে মেরেছে, নাকি কেউ বিষ দিয়েছে ? বিড়ালটা তাকে দেখে মৃদু স্বরে ‘ম্যাঁও’ করে ডেকে ওঠে। ও এত দুর্বল যে পাশের বাড়ির কার্নিশ থেকে তাদের বাড়ির কার্নিশে আগের মত আর লাফ দিয়ে যেতেও পারছে না। তারপরেই ঝুমুরের চোখের সামনে ব্যাপারটা ঘটে যায়। বিড়ালটা পাশের বাড়ির কার্নিশ থেকে তাদের বাড়ির কার্নিশে যাবার জন্য এক লাফ দেয়। কিন্তু ঠিকভাবে পৌঁছতে না পেরে বিড়ালটা নিচে গড়িয়ে চলে যায়। ঝুমুর শুনতে পায়, নিচে পড়ার সময় ধুপধাপ করে দু বার আওয়াজও হয়েছে। ঝুমুর আর কিছু না ভেবে তাড়াতাড়ি দৌড়ে নিচে চলে যায়। দেখে, বিড়ালটা চিৎ হয়ে ড্রেনের ঢাকনার ওপরে পড়ে রয়েছে, আর ওর সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। ঝুমুর বুঝতে পারে, দুর্বল শরীর নিয়ে পড়ে যাওয়ার সময় দেয়ালে এবং বাউন্ডারির ওয়ালে ধাক্কা খেয়ে হয়তো ড্রেনের শক্ত ঢাকনার ওপর আছড়ে পড়েছে। ঝুমুরের সামনেই বিড়ালটার কাঁপুনি কিছুক্ষণের মধ্যেই থেমে গেল। ঝুমুর তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে নিজের ঘরে গিয়ে চুপিচুপি মিমির বাবা রমেনকে ডাকে, উঠো উঠো, একটা বিড়াল আমাদের কার্নিশ থেকে নিচে পড়ে গেছে। ওটাকে একটু পশু হাসপাতালে নিতে হবে।
রমেন তখন মোবাইল দেখছিল। দুজন তাড়াতাড়ি নিচে চলে আসে। রমেন বিড়ালটাকে হাত দিয়ে ধরে বিভিন্ন পরীক্ষা করে বলে, এ তো মারা গেছে।
ঝুমুর জবাব দেয়, বিড়ালটার কথা কিন্তু মিমিকে বলো না। ও খুব কষ্ট পাবে। কথাগুলি বলতে বলতে ঝুমুরের চোখেও তর তর করে জল নেমে আসে, সত্যিই বিড়ালটার প্রতি তারও খুব মায়া পড়ে গেছিল। ঝুমুর আবার বলে, আচ্ছা, পেটের দায়ে পৃথিবীর সব অসহায় জীবদের শেষপর্যন্ত কি এই অবস্থা হয় ?
রমেন চুপ। নিজের স্ত্রীকে সান্ত্বনা দেবার মত ভাষা এখন তার নেই।